যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পারমাণবিক আলোচনার মধ্যে মার্কিন কর্তৃপক্ষ পারস্য উপসাগর, আরব সাগর ও তার আশপাশে বিপুল সংখ্যক নৌবাহিনী এবং যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে। একই সময়ে বিশ্বের বৃহত্তম যুদ্ধজাহাজ ও উন্নত বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড এই অঞ্চলে আসছে। এর ফলে একটি যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বিমানবাহী রণতরি এখন ইরানের জলসীমার কাছে অবস্থান করছে।
কিছু গণমাধ্যম বলছে এটা সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরুর আগের প্রস্তুতি। কিন্তু ঘনিষ্ঠভাবে পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এ ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতি মূলত আলোচনার টেবিলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব জোরদার করার জন্য একটি কৌশলও হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের এ সামরিক সমাবেশ কী স্বাভাবিক বিষয়?
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশল অনুসারে দেশটির নৌবাহিনী ধারাবাহিকভাবে কমপক্ষে ছয়টি বিমানবাহী রণতরিকে (যুদ্ধের জন্য) প্রস্তুত অবস্থায় রাখে। তাদের নৌবাহিনীর প্রতিটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপে প্রধান বিমানবাহী রণতরি, বেশ কয়েকটি গাইডেড-ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী এবং ক্রুজার, পারমাণবিক সাবমেরিন ও লজিস্টিক সাপোর্ট জাহাজ অন্তর্ভুক্ত থাকে। এসব বিমানবাহী রণতরি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ৪ থেকে ৮ মাস স্থায়ী সামরিক মিশন পরিচালনা করে।
ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন (সিভিএন-৭২) কিছুদিন ধরে আরব সাগর এবং পারস্য উপসাগরের আশপাশে অবস্থান করছে। সম্প্রতি স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি অনুসারে—বিমানবাহী রণতরিটি উত্তর আরব সাগরে (ওমানের কাছে) অবস্থান করছে।
ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড (সিভিএন-৭৮), যা ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে (ভেনিজুয়েলার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে) দীর্ঘ সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছিল। সম্প্রতি এটি ঘাঁটিতে ফিরে আসছিল। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের সরাসরি নির্দেশে এটি তার রুট পরিবর্তন করে। এখন এ বিমানবাহী রণতরিটি জিব্রাল্টার প্রণালি অতিক্রম করে ভূমধ্যসাগরে অবস্থান করছে। কিন্তু, এটি মূলত ইরানের জলসীমার দিকে আসছে।
মার্কিন নৌবাহিনীর এসব কার্যক্রম মূলত তাদের নৌবহরের রুটিন কর্মসূচির অংশ। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এটা হচ্ছে ইরানকে দ্রুত পারমাণবিক চুক্তিতে সম্মত করতে ট্রাম্পের চাপ প্রয়োগের কৌশল। তবে এ পারমাণবিক আলোচনা ব্যর্থ হলে খুব খারাপ কিছু হবে বলে হুমকি দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট।
যুক্তরাষ্ট্রের এ ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতি কী চাপ প্রয়োগের কৌশল নাকি প্রকৃত সমর প্রস্তুতি?
মার্কিন বিমানবাহী রণতরি মূলত শুধু যুদ্ধের হাতিয়ার নয়, এটি ওয়াশিংটনের বৈশ্বিক শক্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। ইরানকে ঘিরে ধরতে দুটি মার্কিন রণতরী একযোগে মোতায়েন করা একটি স্পষ্ট সামরিক বার্তা দিচ্ছে। এছাড়া এটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পারমাণবিক আলোচনায় মার্কিন কর্তৃপক্ষের শক্তি বৃদ্ধি করেছে। ট্রাম্প মনে করছেন, এ নৌশক্তি প্রদর্শন করে তিনি ইরানিদের সঙ্গে দ্রুত একটি পারমাণবিক চুক্তি করতে পারবেন।
তবে কিছু বিশ্লেষক বলছেন, মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ২৪০ দিনেরও বেশি সময় ধরে সামরিক মিশনে আছে। এ জাহাজের ক্রুরা ক্লান্ত। দীর্ঘ মিশন তাদের যুদ্ধ করার সক্ষমতাকে কমিয়ে দিতে পারে। ইরানকে ঘিরে মার্কিন নৌশক্তির সমাবেশ মূলত কূটনৈতিক চাপ। এখন যুদ্ধ হওয়ার শঙ্কা কম।
যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণাত্মক নীতির বিপরীতে ইরান কী করবে?
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতির পর তেহরান কূটনীতির ওপর জোর দিয়েছে। একইসঙ্গে তারা প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতিও নিচ্ছে।
এ বিষয়ে দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ বলেন, আমরা যুদ্ধ শুরু করতে চাই না। কিন্তু, যদি যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে শত্রুরা তার পরিণাম ভোগ করবে। এ যুদ্ধের সমাপ্তি টানবে ইরান। কিন্তু আমরা সংলাপে বিশ্বাস করি। আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চাই।
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল সৈয়দ আবদুর রহিম মুসাভি বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ করলে ট্রাম্প একটি চরম শিক্ষা পাবেন। ইরানিরা প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত এবং বিভিন্ন বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞাসম্পন্ন। এ কারণে যুদ্ধ হলে তা একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, সামরিক হুমকির মুখে কূটনীতি সফল হয় না। আরাগচি যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পারমাণবিক আলোচনায় একটি খসড়া প্রস্তাব উপস্থাপনের কথাও জানিয়েছেন।




