
কক্সবাজার, ঝালকাঠি, বরগুনা, বাগেরহাটসহ বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে আকাশে শুক্রবার (৮ মে) সন্ধ্যায় রহস্যময় আলো দেখা যায়। উপকূলজুড়ে দেখা ওই আলো ইসরায়েল-আমেরিকার সঙ্গে যুদ্ধে ইরানের ব্যবহৃত সিজ্জিল মিসাইলের আলোর মতো ছিল।
এদিকে ভারত তাদের অত্যাধুনিক আন্তঃমহাদেশীয় হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘অগ্নি-৬’ পরীক্ষার জন্য বুধবার (৬ মে) থেকে শনিবার (৯ মে) পর্যন্ত ওড়িশা উপকূলের আব্দুল কালাম দ্বীপ থেকে শুরু করে প্রায় ৩ হাজার ৫৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ করিডোরজুড়ে নোটাম (নোটিস টু এয়ারমেন) জারি করে। নোটাম জারি করে আকাশসীমা সীমিত করা হয়।
সিজ্জিল মিসাইলের মতো আলো আর ভারতের নোটাম জারি মিলিয়ে অনেকেই উপকূলের ওই ‘রহস্যময়’ আলোকে ক্ষেপণাস্ত্রের আলো বলে ধারণা করেছিলেন। এবার মালয়শিয়া ভিত্তিক সামরিক প্রতিরক্ষা বিষয়ক অনলাইন সংবাদমাধ্যম ডিফেন্স সিকিউরিটি এশিয়া এক প্রতিবেদনে ওই আলোকে ভারতে ‘অগ্নি ৬’ বা অন্য কোনো হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার আলো বলে উল্লেখ করেছে।
ডিফেন্স সিকিউরিটি এশিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৮ মে বঙ্গোপসাগরে ভারতের বহুল আলোচিত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নতুন করে কৌশলগত হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়েছে। কারণ, এই পরীক্ষা এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন চীন, পাকিস্তান এবং হাইপারসনিক অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে ঘিরে পারমাণবিক আধুনিকায়নের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ওড়িশা উপকূলের চন্ডিপুর ও আব্দুল কালাম দ্বীপসংলগ্ন ইন্টিগ্রেটেড টেস্ট রেঞ্জ থেকে উৎক্ষেপণটি পরিচালিত হয়। সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটারের বেশি বিস্তৃত জলসীমা নোটাম করায় প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মধ্যে এটি নিয়ে জল্পনা শুরু হয়।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরেও ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার কথা জানানো হয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া এটিকে ‘পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনে সক্ষম আন্তঃমহাদেশীয় হাইপারসনিক ক্ষেপনাস্ত্র’ বলে উল্লেখ করেছে।
তবে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার বিষয়ে ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার (ডিআরডিও) কিংবা দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, সন্ধ্যার আকাশ চিরে উজ্জ্বল আলোর রেখা দ্রুত উপরে উঠে যাচ্ছে। ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশের সীতাকুণ্ডু ও কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রত্যক্ষদর্শীরা আকাশে দীর্ঘস্থায়ী আলো দেখতে পাওয়ার কথা জানান, যার সাধারণত উচ্চগতির কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্রের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিল রয়েছে।

ডিআরডিও চেয়ারম্যান সমীর ভি কামাথ কয়েক দিন আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, নয়াদিল্লি প্রথম ১০ হাজার কিলোমিটারের বেশি রেঞ্জের একটি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) পরীক্ষা করতে যাচ্ছে। এই দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘অগ্নি-৬’। পারমাণবিক ওয়ারহেডবাহী ক্ষেপণাস্ত্রটি পরীক্ষা করার জন্য প্রস্তুত এবং সরকারের ‘গ্রিন সিগন্যালে’র অপেক্ষায় রয়েছে।
গত বুধবার দেশটির ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলা হয়, ‘অগ্নি-৬: পরাশক্তি হওয়ার পথে ভারতের অগ্রযাত্রা! ১০ হাজারের বেশি কিলোমিটার পাল্লা ও এমআইআরভি প্রযুক্তি নিয়ে অগ্নি-৬ ইতিহাস গড়তে প্রস্তুত। এই ক্ষেপণাস্ত্র ভারতের নিরাপত্তাকে অভেদ্য করে তুলবে এবং আমাদেরকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশগুলোর কাতারে স্থান দেবে। শক্তিশালী ভারত, সুরক্ষিত ভারত!’
বিজেপি একটি ভিডিও আপলোড করেছে। তাতে দলটি ব্যাখ্যা করেছে যে, এখন পর্যন্ত কেবল ‘পাঁচটি দেশের কাছেই আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির ক্ষমতা রয়েছে: আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স ও ব্রিটেন। এখন ভারতও এই একই সারিতে নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চলেছে। অগ্নি-৬ হলো ভারতের পরবর্তী প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র... দূরপাল্লার আঘাত হানার ক্ষমতার ফলে ভারতের প্রভাব কেবল আঞ্চলিকই নয়, বরং আরও বেশি বৈশ্বিক হতে চলেছে।’
অগ্নি-৬ ক্ষেপণাস্ত্রে এমআইআরভি প্রযুক্তি থাকার কথা রয়েছে। এর ফলে একটি ক্ষেপণাস্ত্র থেকেই একাধিক পারমাণবিক ওয়ারহেড ছোড়া যাবে এবং সেগুলো আলাদা আলাদা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পারবে। এতে ক্ষেপণাস্ত্রটির আক্রমণ ক্ষমতা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার সক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে। পাশাপাশি, ভারত সম্প্রতি একটি লং রেঞ্জ অ্যান্টি-শিপ হাইপারসনিক মিসাইলেরও (এলআর-এএসএইচএম) পরীক্ষা চালিয়েছে, যার পাল্লা ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটারের বেশি এবং সর্বোচ্চ গতি ম্যাক ১০ বলে জানা গেছে।
২০২৫ সালের মে মাসে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধের বার্ষিকী উদযাপনের সময় এই আইসিবিএম পরীক্ষার খবরটি সামনে এলো। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর বার্ষিকীর সঙ্গে এই পরীক্ষার সময় মিলিয়ে পাকিস্তান ও চীন উভয়কেই একটি জোরালো কৌশলগত বার্তা দেওয়ার উদ্দেশ্য রয়েছে।




