যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় আপাতদৃষ্টিতে কোনো অগ্রগতি না হলেও ইরানিদের সঙ্গে আমেরিকার নতুন সংঘাতের শঙ্কা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে এ যুদ্ধ নাও হতে পারে। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর এবার যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সর্বাধিক বিমান শক্তির সমাবেশ ঘটিয়েছে। ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযান সম্ভবত একটি বিশাল ও সপ্তাহব্যাপী অভিযান হবে। এটা ভেনেজুয়েলার প্রভাশালী নেতা নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের জন্য জানুয়ারির প্রথম দিকের সামরিক অভিযানের চেয়েও মারাত্মক হবে। এবার ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের মতো একটি সংঘাত বাধতে পারে।
এই মুহূর্তে মার্কিন কর্তৃপক্ষ কী ইরানে আক্রমণ করবে? এ হামলার পরে কী হতে পারে? সে সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। যেহেতেু এসব বিষয়ে কোনো স্পষ্ট বক্তব্য নেই, তাই এ প্রসঙ্গে সঠিক প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৬টি প্রশ্ন তুলেছেন নেট সোয়ানসন। তিনি ইরান স্ট্র্যাটেজি প্রোজেক্ট অ্যাট দ্য আটলান্টিক কাউন্সিলস স্কোক্রফট মিডল ইস্ট সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভের ডিরেক্টর এবং একজন রেসিডেন্ট সিনিয়র ফেলো। আটলান্টিক কাউন্সিলে প্রকাশিত এক বিশদ নিবন্ধে তিনি জানান, ইরানে আঘাত হানার আগে ট্রাম্প, এবং পলিসি মেকারদের ৬টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন
১. ইরানে সামরিক অভিযানের উদ্দেশ্য কী
সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন কী অর্জন করতে চায়, তা নির্দিষ্ট করেনি। তিনটি সম্ভাব্য বিকল্প রয়েছে: ১) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বাস করেন যে একটি আক্রমণ পারমাণবিক ও নিরস্ত্রীকরণ আলোচনায় তার হাতকে শক্তিশালী করবে। ২) প্রশাসন ইরানের নেতৃত্বকে উল্লেখযোগ্যভাবে অবনমিত বা হত্যা করতে চাইছে, যার মধ্যে সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারেন। ৩) সামরিক হামলা মূলত প্রতীকী হবে, যা ইরানের বিক্ষোভকারীদের সমর্থন করার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতিশ্রুতি পূরণ করবে এবং বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে ইরানের সরকারকে সতর্ক করে দেবে।
যদি মার্কিন প্রশাসনের লক্ষ্য এগুলোই হয়, তবে সেসব অর্জনে তাদের বেশকিছু বাধা রয়েছে। ইরান যতই দুর্বল হোক না কেন, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে খামেনির আত্মসমর্পণের সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ সরকার মনে করে যে সামরিক হামলার শিকার হওয়ার চেয়ে তার ক্ষমতা নষ্ট করে ফেলা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়। আদর্শিকভাবে খামেনি সম্ভবত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নত হওয়ার চেয়ে শহীদ হওয়াকেই বেছে নেবেন। যদি ইরানের শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন বা নেতৃত্বকে ঝেড়ে ফেলার কথা আসে, তাহলে দেশটিতে নতুন উত্তরসূরি সামনে আসবে। তাকে নিয়ে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জও সামনে আসবে। ২৮ জানুয়ারি কংগ্রেসে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, খামেনির একজন উত্তরসূরি সম্ভবত শাসন ব্যবস্থার ভেতর থেকেই আসবেন বলে তিনি বিশ্বাস রাখেন। তবে খামেনির স্থলাভিষিক্ত নেতৃত্ব আরও ভালো হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তাও নেই।
২. ইরানের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে
যুক্তরাষ্ট্র ফের হামলা চালালে, ইরানের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে তা নিয়ে মার্কিন সরকার চরম বিভ্রান্তিতে রয়েছে। সম্ভাব্য সংঘাতের আগে ইরান বারবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরুর হুমকি দিয়েছে। কিন্তু অতীতে দেখা গেছে—ইরান বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিদেশি আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় পাল্টা পদক্ষেপ নিয়েছে। এক্ষেত্রে দেশটির যতটুকু ক্ষতি হবে, তারা ততটুকু ক্ষতি করার চেষ্টা করবে। যদি ইরান বুঝতে পারে যে মার্কিন হামলা মূলত প্রতীকী, তাহলে তারা সেই অনুযায়ী পাল্টা পদক্ষেপ নেবে। এবার কিছু মার্কিন সামরিক বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতিরও চেষ্টা করবে ইরানিরা। এ ছাড়া ইরানের প্রক্সি বা সহযোগী যোদ্ধারা এ যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকবে। এবার ইরান এমন ব্যবস্থা নিতে চাইবে যাতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ভবিষ্যতে যথেচ্ছা হামলা করতে না পারে।
৩. এবার কি ট্রাম্প কোনো পরিণতির মুখোমুখি হবেন?
ট্রাম্প এর আগে ইরানে হামলা চালাতে গিয়ে নিজ দেশের ভেতরে কোনো সামরিক বা রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হননি। এ কারণে তিনি আরেকবার সহজেই দেশটিতে হামলার ইচ্ছা প্রকাশ করছেন। তবে এবার ইরানের বিরুদ্ধে একটি নতুন অভিযানের পরিধি নির্ধারণ করা তার জন্য বেশ কঠিন হবে। যদি ইরান পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা করে, তাহলে ট্রাম্পকে দীর্ঘ সংঘাতে লিপ্ত হতে হবে। এ ছাড়া এবার ট্রাম্পের জন্য সম্মান নিয়ে যুদ্ধ শেষ করা বা যুদ্ধবিরতিতে যাওয়া কঠিন হতে পারে।
৪. সংঘাতের আগে কি কোনো সম্ভাব্য কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব?
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের আগে যুদ্ধ বন্ধে এবার কোনো সম্ভাব্য তেমন সম্ভব নাও হতে পারে। মার্কিন হুঁশিয়ারি অনুসারে চুক্তি বা সমঝোতার জন্য ইরানের কাছে দুই সপ্তাহের মতো সময় আছে। কিন্তু এর আগেই যুদ্ধ শুরু হতে পারে। কারণ, একটি অর্থবহ চুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় ছাড় দিতে ইরান সক্ষম বলে মনে হচ্ছে না। এখনও পর্যন্ত দেশটি পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কথা বলার ওপর জোর দিয়েছে এবং ইউরেনিয়াম ‘সমৃদ্ধ করার অধিকার’-এর প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে মনে হচ্ছে। ইরান একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করছে। অপরদিকে ট্রাম্প প্রশাসন যা চায়, তা সম্ভবত ইরানের আত্মসমর্পণ চুক্তির কাছাকাছি। এ কারণে সংঘাত অনিবার্য।
৫. মার্কিন সামরিক অভিযানের প্রতি ইরানি জনগণ কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে
জানুয়ারিতে ইরানি বিক্ষোভকারীদের ওপর কঠোর দমন-পীড়নের পর, ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী দেশটির ওপর পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে। এখন মার্কিন মদদপুষ্ট বিক্ষোভকারীদের ‘সহায়তা’ করার সময় সম্ভবত শেষ হয়ে গেছে। এ মুহূর্তে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা হলে ইরানিরা প্রতিবাদ জানিয়ে রাস্তায় নামতে পারে। কারণ, ইরানিরা যে কোনো মার্কিন হামলার বিরোধী। এর আগে ১২ দিনের যুদ্ধর সময় ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের শাসকদের বিরুদ্ধে জনগণকে জেগে উঠতে বললেও তারা তাতে সাড়া দেননি।
৬. যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক অংশীদাররা কী ভূমিকা পালন করবে
যুক্তরাষ্ট্রের আরব এবং তুর্কি অংশীদাররা ট্রাম্প প্রশাসনকে ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে এবং সংঘাত এড়াতে অনুরোধ করে আসছে। এই অংশীদারদের অনেকেই তাদের দেশে মার্কিন সেনাদের আশ্রয় দেওয়ায় অতীতে ইরানের আগ্রাসনের লক্ষ্যবস্তু ছিল। সংঘাতের সম্ভাবনা যত বাড়বে, ততই এ দেশগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে তা আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হবে। ২০১৯ সালে মার্কিন অভিযানের সময় ইরান সফলভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল। এর ফলে ইরানের প্রতি এসব দেশের নিজ নিজ নীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। ইরান-উপসাগরীয় সম্পর্ক এখন জোরদার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবও প্রকাশ্যে জানিয়েছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের আকাশসীমা আক্রমণের জন্য ব্যবহার করতে পারবে না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় অংশীদারদের ওপর ট্রাম্পের প্রভাব রয়েছে এবং ইরানিরা তা জানে। এবার পরিস্থিতি দ্রুত শান্ত করতে না পারলে ইরান কি উপসাগরীয় অঞ্চলে আক্রমণ করবে? এটা বলা না গেলেও আঞ্চলিক যুদ্ধের শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। অপরদিকে ইসরায়েল কোনও না কোনোভাবে এই মার্কিন অভিযানে অংশগ্রহণ করবে।
(নেট সোয়ানসন: আমেরিকান থিংকট্যাংক আটলান্টিক কাউন্সিলের একজন আবাসিক সিনিয়র ফেলো এবং পরিচালক। তিনি প্রায় ২০ বছর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তা ছিলেন। তার কাজের ক্ষেত্র ছিল ইরান। এ ছাড়া তিনি প্রশাসনের ইরান নীতির একজন সিনিয়র উপদেষ্টা ছিলেন।)




