
বার্সেলোনার বিপক্ষে মৌসুমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের রিয়াল মাদ্রিদের দরকার ছিল কৌশল এবং ঠান্ডা মানসিকতা। কিন্তু মৌসুমের শেষ ক্লাসিকোর ঠিক আগে রিয়াল থেকে যে ছবি বেরিয়ে আসছে, সেটি মাঠের কৌশলের নয়, ড্রেসিংরুমের ভাঙনের।
ফেদেরিকো ভালভার্দে ও অরেলিয়াঁ চুয়ামেনির হাতাহাতি তাই শুধু দুই সতীর্থের উত্তপ্ত মুহূর্ত নয়। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম মার্কার প্রতিবেদন বলছে, এই সংঘর্ষের শিকড় অনেক গভীরে, রিয়াল মাদ্রিদের ভেতরে জমতে থাকা দীর্ঘদিনের অস্বস্তি, কোচিং পদ্ধতি নিয়ে মতবিরোধ এবং জাবি আলোনসো অধ্যায়ের ক্ষত এখনও পুরোপুরি না শুকানোর ফল এই বিতর্ক।
বুধবার (৬ মে) অনুশীলনে ভালভার্দে ও চুয়ামেনির মধ্যকার প্রথম দ্বন্দ্বকে রিয়ালের ট্রেনিং গ্রাউন্ড ভালদেবেবাসের সূত্রগুলো ব্যাখ্যা করেছে ফুটবলের স্বাভাবিক আবেগ হিসেবে, কড়া ট্যাকল, বিশ্বকাপ সামনে রেখে চোটের ভয়, এল ক্লাসিকোর চাপ, সব মিলিয়ে একটি উত্তপ্ত মুহূর্ত। কিন্তু বৃহস্পতিবার সেই ঘটনাই দ্বিতীয় অধ্যায়ে গিয়ে আরও গুরুতর রূপ নেয়। দুই খেলোয়াড়ের সংঘর্ষ ড্রেসিংরুমে গড়ায়, যা ক্লাবের ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
মার্কার দাবি, রিয়ালের ড্রেসিংরুমে ফাটল ধরতে শুরু করে তখনই, যখন কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় জাবি আলোনসোর পদ্ধতি নিয়ে অসন্তোষ আর আড়াল করেননি। শুরুতে বিষয়টি ছিল কেবল ক্রীড়াগত মতবিরোধ, কিন্তু সময়ের সঙ্গে তা ড্রেসিংরুমের ভেতরে আলাদা আলাদা পক্ষ তৈরি করে।
-17782361442970.webp)
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভালভার্দে ছিলেন জাবি-বিরোধী অংশে। চুয়ামেনি ছিলেন আলোনসোর পাশে, পরে আলভারো আরবেলোয়ার সঙ্গেও। ফরাসি মিডফিল্ডার নাকি কখনোই বুঝতে পারেননি, কেন আলোনসোর ওপর এত চাপ তৈরি করা হচ্ছিল।
ঘটনার শুরু বলা হচ্ছে গত অক্টোবর থেকে। তখন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও ভালভার্দেসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় জাবির অনুশীলন পদ্ধতি নিয়ে অসন্তোষ দেখাতে শুরু করেন। অভিযোগ ছিল, অনুশীলনে কৌশলগত তীব্রতা বেশি, ভিডিও বিশ্লেষণ দীর্ঘ ও কঠোর, পদ্ধতিও অনেকের চোখে অতিরিক্ত অনমনীয়। তবে জাবির সমর্থকদের মতে, এসব আপত্তির আড়ালে ছিল ভিনিসিয়ুসকে দলে রাখা-না রাখা নিয়ে তার হতাশা।
পরিস্থিতি এমন জায়গায় যায় যে কৌশলগত সেশনে কেউ কেউ ঘুমানোর ভান করতেন, কেউ আবার কোচ কথা বলার সময় ফিসফিস করতেন। এতে ক্ষুব্ধ হন আলোনসোর প্রতি অনুগত খেলোয়াড়রা। মার্কার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একসময় বিরক্ত হয়ে আলোনসো চিৎকার করে বলেন, তিনি কি কোনো ডে কেয়ার সেন্টারে এসেছেন!
ড্রেসিংরুমের বিভক্তি আরও স্পষ্ট হয় এল ক্লাসিকোর সময়, যখন ভিনিসিয়ুস প্রকাশ্যে অসন্তোষ দেখান। সেই দৃশ্যই নাকি কোচ ও দলের একাংশের সম্পর্কের চূড়ান্ত ভাঙনের প্রতীক হয়ে ওঠে। এরপর জানুয়ারিতে বরখাস্ত হন জাবি আলোনসো। তার জায়গায় রিয়াল দায়িত্ব দেয় আলভারো আরবেলোয়াকে।
কিন্তু আরবেলোয়া পেয়েছিলেন ক্ষতবিক্ষত এক ড্রেসিংরুম। অনেকে বুঝতেই পারেননি, কেন দলের একটি অংশ নতুন শুরু হওয়া একটি প্রকল্পকে ভেতর থেকে নষ্ট হতে দিল। বিশেষ করে যারা আলোনসোর ভাবনায় আস্থা রেখেছিলেন, তাদের মধ্যে এই হতাশা ছিল বেশি। চুয়ামেনি ছিলেন সেই অংশের একজন।
প্রথম দিকে আরবেলোয়া কিছুটা স্থিতি ফেরাতে পেরেছিলেন। দলীয় ডিনার হয়েছে, ইতিবাচক বৈঠকও হয়েছে। কিন্তু ফল খারাপ হতে শুরু করতেই পুরোনো সমস্যাগুলো আবার মাথা তোলে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে অনুশীলনে খেলোয়াড়দের মধ্যে সংঘর্ষ, আন্তোনিও রুডিগার ও কারেরাসের উত্তপ্ত বিবাদ, আর শেষ পর্যন্ত ভালভার্দে-চুয়ামেনির দুই দফা হাতাহাতি, সবই রিয়াল শিবিরের বিষাক্ত পরিবেশের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মার্কার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এখন রিয়াল দলে এমন ছয়জন খেলোয়াড় আছেন, যাদের সঙ্গে আরবেলোয়ার প্রায় কোনো যোগাযোগ নেই। বর্তমান কোচকে নিয়েও অভিযোগ বাড়ছে। অদ্ভুত ব্যাপার, আরবেলোয়ার সবচেয়ে বড় সমালোচকদের মধ্যে কয়েকজন আবার জাবি আলোনসোর সময়ে বেশ স্বচ্ছন্দ ছিলেন এবং তার প্রকল্পের পক্ষেই ছিলেন।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কিলিয়ান এমবাপ্পে অধ্যায়। ফরাসি তারকাকে ঘিরে ড্রেসিংরুমে অস্বস্তি বাড়ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু খেলোয়াড় এমবাপ্পের আচরণে বিরক্ত, আবার তার সমর্থকেরা মনে করছেন, ক্লাবের ভেতরে কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে তার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে।
সব মিলিয়ে রিয়ালের সমস্যা এখন শুধু মাঠের ফল নয়। এর চেয়ে বড় উদ্বেগ, দলটি ভেতর থেকে বিভক্ত। জাবি আলোনসোর বিদায়ের ক্ষত, আরবেলোয়ার প্রতি আস্থার ঘাটতি, বড় তারকাদের অবস্থান, অধিনায়কত্বের কাঠামো, সবকিছু মিলিয়ে রিয়াল মাদ্রিদের ড্রেসিংরুমে নেতৃত্বের সংকটও সামনে এসেছে।
মার্কার দাবি, ক্লাবের ভেতরে অধিনায়ক নির্বাচন পদ্ধতি নিয়েও বিতর্ক শুরু হয়েছে। শুধু সিনিয়রিটির ভিত্তিতে অধিনায়ক বেছে নেওয়া কি সঠিক পদ্ধতি, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অনেকের মতে, দানি কারভাহাল মানসিকভাবে ক্লান্ত, থিবো কুর্তোয়া সম্মানিত নেতা হলেও ক্রমতালিকায় চতুর্থ, আর ভালভার্দে ও ভিনিসিয়ুস ড্রেসিংরুমের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সেরা পছন্দ কি না, সেটি নিয়েও সংশয় আছে।
এমন সময়েই সামনে এল ক্লাসিকো। বার্সেলোনার বিপক্ষে ম্যাচটি রিয়ালের জন্য শুধু পয়েন্টের নয়, মানসিকতারও পরীক্ষা। মাঠে যদি দল একসঙ্গে না থাকে, তবে কৌশল, প্রতিভা, তারকা, কিছুই যথেষ্ট হয় না। ভালভার্দে-চুয়ামেনির সংঘর্ষ তাই এক দিনের উত্তেজনা নয়, রিয়াল মাদ্রিদের বর্তমান অস্থিরতার সবচেয়ে দৃশ্যমান চিহ্ন।




