
প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা দৌড়ে এমন ম্যাচই অনেক সময় মৌসুমের গল্প বদলে দেয়। লন্ডন স্টেডিয়ামে আর্সেনালের সামনে ছিল ফাঁদ, চাপ, স্নায়ুর পরীক্ষা। একদিকে ২২ বছর পর লিগ শিরোপার স্বপ্ন, অন্যদিকে অবনমন বাঁচানোর মরিয়া লড়াইয়ে থাকা ওয়েস্ট হাম। শেষ পর্যন্ত সেই চাপের ম্যাচে লিয়ান্দ্রো ট্রসার্ডের দেরিতে করা গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতে শিরোপার আরও কাছে চলে গেল মিকেল আর্তেতার দল।
ম্যাচের ৮৩ মিনিটে মার্টিন ওডেগার্ডের পাস থেকে নিচু শটে গোল করেন ট্রসার্ড। সেই গোলেই উল্লাসে ফেটে পড়ে আর্সেনাল সমর্থকেরা। তবে জয় নিশ্চিত হয়েছে আরও বড় নাটক পেরিয়ে। যোগ করা সময়ে ওয়েস্ট হাম বদলি ফরোয়ার্ড ক্যালাম উইলসন বল জালে পাঠিয়েছিলেন। লন্ডন স্টেডিয়াম তখন প্রায় বিস্ফোরিত। কিন্তু দীর্ঘ ভিএআর পরীক্ষার পর বিল্ডআপে আর্সেনাল গোলকিপার ডেভিড রায়ার ওপর ফাউলের কারণে গোলটি বাতিল করেন রেফারি ক্রিস কাভানাহ।
এই সিদ্ধান্তই ম্যাচের সবচেয়ে বড় মুহূর্ত। স্কাই স্পোর্টসের বিশ্লেষক গ্যারি নেভিল ঘটনাটিকে প্রিমিয়ার লিগ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভিএআর সিদ্ধান্ত বলেও উল্লেখ করেছেন। কারণ, এই এক সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু একটি ম্যাচে সীমাবদ্ধ নয়। একদিকে আর্সেনালের শিরোপা দৌড়, অন্যদিকে ওয়েস্ট হামের টিকে থাকার লড়াই, দুটির ওপরই এর বড় প্রভাব পড়তে পারে।
জয়ের পর ৩৬ ম্যাচে আর্সেনালের পয়েন্ট ৭৯। এক ম্যাচ কম খেলা ম্যানচেস্টার সিটির পয়েন্ট ৭৪। অর্থাৎ লিগের শেষ দুই ম্যাচ জিতলেই ২২ বছর পর প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা নিশ্চিত করবে আর্সেনাল। তাদের বাকি দুই ম্যাচ বার্নলির বিপক্ষে ঘরের মাঠে এবং শেষ দিনে ক্রিস্টাল প্যালেসের মাঠে।
ওয়েস্ট হামের জন্য হারটি আরও কষ্টের। পুরো ম্যাচে লড়াই করেছে তারা, শেষ দিকে সমতাও প্রায় পেয়েই গিয়েছিল। কিন্তু ভিএআর তাদের আনন্দ কেড়ে নেয়। এই হারের পর অবনমন শঙ্কা আরও ঘনীভূত হলো। টটেনহাম যদি সোমবার লিডস ইউনাইটেডকে হারায়, তাহলে শেষ দুই ম্যাচ বাকি থাকতে নিরাপদ অবস্থান থেকে চার পয়েন্ট দূরে পড়ে যেতে পারে ওয়েস্ট হাম।
ম্যাচ শেষে ওয়েস্ট হাম অধিনায়ক জ্যারড বোয়েন হতাশা লুকাননি। তিনি বলেন, ‘এটা বড় ধাক্কা। আমরা ভেবেছিলাম ম্যাচে ফিরতে অনেক ভালো করেছি, কিন্তু সেটি আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হলো। কাজটা কঠিন হবে। তবে এই ক্লাবে আমরা কখনো ‘অসম্ভব’ বলি না।’
আর্সেনালের শুরুটা ছিল দাপুটে। প্রথম ২০ মিনিটে ওয়েস্ট হামকে প্রায় নিজেদের অর্ধে আটকে রাখে তারা। ট্রসার্ড দুবার গোলের কাছাকাছি গিয়েছিলেন। প্রথমবার তাকে ঠেকান ওয়েস্ট হাম গোলকিপার মাডস হারমানসেন, এরপর তার আরেক প্রচেষ্টা লাগে পোস্টে। রিকার্দো কালাফিওরির শটও গোললাইন থেকে ফিরিয়ে দেন কনস্তানতিনোস মাভ্রোপানোস।
তবে প্রথমার্ধের শেষ দিকে ওয়েস্ট হামও সুযোগ তৈরি করে। ভ্যালেন্তিন কাস্তেয়ানোসের হেড ফুল স্ট্রেচে ঠেকান রায়া। সেই সেভ আর্সেনালকে ম্যাচে রাখে।
প্রথমার্ধেই ধাক্কা খায় আর্সেনাল। চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন রাইটব্যাক বেন হোয়াইট। কিছু সময় ডেকলান রাইস সেখানে দায়িত্ব নিলেও বিরতির পর রদবদল আনেন আরতেতা। ক্রিসথিয়ান মসকেরা রাইটব্যাকে নামেন, কালাফিওরি উঠে যান, মাইলস লুইস-স্কেলি মিডফিল্ড থেকে লেফটব্যাকে চলে যান। এই বদলের পর আর্সেনাল আগের ছন্দ আর পুরোপুরি ফিরে পায়নি।
ওয়েস্ট হাম দ্বিতীয়ার্ধে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। মাতেয়ুস ফের্নান্দেস এক বড় সুযোগ পান। পাবলোর সঙ্গে ওয়ান-টু খেলে প্রায় গোলের মুখে পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু রায়া রিফ্লেক্স সেভে আর্সেনালকে আবারও বাঁচান।
তারপরই আসে ম্যাচের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। বদলি হয়ে নামা ওডেগার্ড শান্ত মাথায় পাস দেন ট্রসার্ডকে। বেলজিয়ান ফরোয়ার্ড নিচু শটে বল জালে পাঠান। শিরোপা দৌড়ে হয়তো এই গোলের মূল্য মৌসুম শেষে আরও বড় হয়ে উঠতে পারে।
আর্তেতা ম্যাচ শেষে রেফারির সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছেন। তার ভাষায়, ‘আজ বুঝলাম রেফারির কাজ কত কঠিন ও কত বড়। খুব কঠিন পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য রেফারিকে অভিনন্দন। এটা এমন এক মুহূর্ত ছিল, যা দুই বড় ক্লাবের ইতিহাস ও গতিপথ বদলে দিতে পারত।’
চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে ওঠার পর একই সপ্তাহে প্রিমিয়ার লিগেও এমন জয় আর্সেনালের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়াবে। কিন্তু আরতেতা জানেন, এখনো কাজ শেষ হয়নি। শেষ দুই ম্যাচে ভুল করলে সিটি সুযোগ নেবে। আর ভুল না করলে, ২০০৪ সালের পর প্রথমবার প্রিমিয়ার লিগ ট্রফি উঠতে পারে আর্সেনালের হাতে।




