
এক রাতের মধ্যে একজন মানুষের জীবনে কত রকম অনুভূতি যে জমা হতে পারে, হান্সি ফ্লিকের চোখ যেন তার উত্তর দিয়ে দিল। ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোক, ক্যাম্প ন্যুর নীরব শ্রদ্ধা, এল ক্লাসিকোর চাপ, আর শেষ পর্যন্ত লা লিগা শিরোপার উৎসব, সবকিছু মিলিয়ে বার্সেলোনা কোচের জন্য রাতটা হয়ে থাকল জীবনের সবচেয়ে আবেগময় দিনগুলোর একটি।
রোববার (১০ মে) রাতে রিয়াল মাদ্রিদকে ২-০ গোলে হারিয়ে লা লিগা শিরোপা নিশ্চিত করেছে বার্সেলোনা। এটি কাতালান ক্লাবটির ইতিহাসের ২৯তম লিগ শিরোপা। তবে ম্যাচের ফলের বাইরেও রাতটার বড় গল্প ছিলেন ফ্লিক। ম্যাচের আগের রাতেই মারা যান তার বাবা। সেই ব্যক্তিগত শোক নিয়েই দর্শকপূর্ণ ক্যাম্প ন্যুতে ডাগআউটে দাঁড়ান জার্মান কোচ।
কিক অফের আগে ফ্লিকের বাবার স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করে পুরো স্টেডিয়াম। সেই মুহূর্তে সম্প্রচার ক্যামেরায় দেখা যায়, চোখের জল ধরে রাখতে পারছেন না ফ্লিক। পাশে ছিলেন তার কোচিং স্টাফ ও খেলোয়াড়েরা। তারা তাকে সান্ত্বনা দেন। সেই নীরবতা থেকেই যেন রাতের আবেগের শুরু।
মাঠে অবশ্য বার্সেলোনা কোচের দল তাকে ঠিক সেই উত্তরই দিয়েছে, যা এমন রাতে একজন কোচ তার খেলোয়াড়দের কাছ থেকে চাইতে পারেন। শুরু থেকেই আগ্রাসী, আত্মবিশ্বাসী ও পরিষ্কার পরিকল্পনার ফুটবল খেলেছে বার্সা। প্রথমার্ধেই ম্যাচের ভাগ্য লিখে দেয় তারা। মার্কাস রাশফোর্ডের দুর্দান্ত ফ্রি-কিকের পর ফেরান তোরেসের গোল, ২০ মিনিটের মধ্যেই ২-০ এগিয়ে যায় স্বাগতিকরা। এরপর আর রিয়াল মাদ্রিদকে ম্যাচে ফেরার সুযোগ দেয়নি ফ্লিকের দল।
এই জয়ে তিন ম্যাচ হাতে রেখেই শিরোপা নিশ্চিত করে বার্সা। আরও বিশেষ ব্যাপার, শিরোপাটা এসেছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদকে হারিয়ে। ক্যাম্প ন্যুর সমর্থকদের সামনে এর চেয়ে মধুর দৃশ্য আর কী হতে পারত!
শিরোপা উৎসবে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন ফ্লিক। স্বভাবতই খুব বেশি কথা বলেননি। কিন্তু তার কণ্ঠে আবেগ ছিল স্পষ্ট।
ফ্লিক বলেন, ‘ম্যাচটা কঠিন ছিল। এই দিনটা আমি কখনো ভুলব না। দলকে ধন্যবাদ জানাতে চাই, ধন্যবাদ জানাতে চাই সবাইকে যারা আমাদের সমর্থন করেছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এমন একটা ভালো দল পেয়ে আমি খুব গর্বিত। সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিটি ম্যাচে লড়াই করার যে দৃঢ়তা তোমরা দেখিয়েছ, তার জন্য ধন্যবাদ। আমি সত্যিই এটা মূল্য দিই। আমার দল অসাধারণ, আমি আনন্দিত। খেলোয়াড়দের নিয়ে আমি খুব গর্বিত। সমর্থকদের সঙ্গে এখানে থাকা, এল ক্লাসিকোতে রিয়াল মাদ্রিদকে হারানো, এটা রোমাঞ্চকর। এখন আমার মনে হয়, আমাদের উদ্যাপন করা উচিত।’
এই শিরোপা ফ্লিকের জন্য শুধু একটি ট্রফি নয়, বার্সেলোনার সঙ্গে তার সম্পর্কেরও বড় সিলমোহর। মৌসুমজুড়ে তার দল খেলেছে ঝুঁকিপূর্ণ, আক্রমণাত্মক, অনেক সময় স্নায়ু পরীক্ষা নেওয়া ফুটবল। সব সময় নিখুঁত ছিল না, কিন্তু কখনো একঘেয়ে ছিল না। বার্সা সমর্থকেরা সেই সাহসী ফুটবলকে গ্রহণ করেছে, আর শেষ পর্যন্ত সেটিই এনে দিল লা লিগা।
রিয়ালের বিপক্ষে এই জয় তাই সংখ্যার হিসাব ছাড়িয়ে গেছে। ২-০ স্কোরলাইন, ২৯তম লিগ শিরোপা, তিন ম্যাচ হাতে রেখে চ্যাম্পিয়ন হওয়া, এসবই বড়। কিন্তু রাতটির আসল ছবি হয়তো অন্যখানে, নীরবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে চোখ মুছছেন ফ্লিক, এরপর কয়েক ঘণ্টা পর সেই মানুষটিকেই আকাশে ছুড়ে দিচ্ছেন তাঁর খেলোয়াড়েরা।




