
রিয়াল মাদ্রিদে কিলিয়ান এমবাপ্পের গল্পটা এমন হওয়ার কথা ছিল না। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর আলোয় তার আগমন হওয়ার কথা ছিল নতুন এক সাম্রাজ্যের শুরু, গ্যালাকটিকো স্বপ্নের পরবর্তী অধ্যায়। গোল আসবে, ট্রফি আসবে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে পাশে নিয়ে ইউরোপ কাঁপাবে রিয়াল, এমন ছবিই কল্পনা করেছিল মাদ্রিদ।
গোল এসেছে। অনেক গোলই এসেছে। কিন্তু ট্রফি আসেনি। আর রিয়াল মাদ্রিদে গোলের সংখ্যাই সব নয়, যদি মৌসুমের শেষে শোকেসে লা লিগা বা চ্যাম্পিয়নস লিগের ট্রফি না ওঠে।
২০২৪ সালে পিএসজি ছেড়ে ফ্রি ট্রান্সফারে রিয়ালে যোগ দেওয়ার পর ১০০ ম্যাচে ৮৫ গোল করেছেন এমবাপ্পে। সংখ্যাটা অবিশ্বাস্য। তবু স্প্যানিশ রাজধানীতে এখন তাকে ঘিরে প্রশ্নের শেষ নেই। কারণ রিয়াল টানা দ্বিতীয় মৌসুমে লা লিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগ ছাড়া শেষ করার পথে। ৩৬ লিগ শিরোপা ও ১৫ ইউরোপিয়ান কাপজয়ী ক্লাবে এমন বাস্তবতা সহজে মেনে নেওয়ার নয়।
তার ওপর সামনে এল ক্লাসিকো। রোববার বার্সেলোনার বিপক্ষে ম্যাচটি রিয়ালের জন্য শুধু মর্যাদার নয়, মৌসুম বাঁচানোর শেষ বাস্তব সুযোগও। লা লিগায় বার্সেলোনার চেয়ে ১১ পয়েন্ট পিছিয়ে থাকা রিয়াল ওই ম্যাচ হারলে বা পয়েন্ট হারালে কাতালানদের শিরোপা নিশ্চিত হয়ে যাবে। অথচ এমন ম্যাচের আগেই আলোচনার কেন্দ্রে মাঠের ফুটবল নয়, এমবাপ্পের চোট, ছুটি, ইয়ট ভ্রমণ আর সমর্থকদের ক্ষোভ।
এপ্রিলের শেষ দিকে রিয়াল বেতিসের বিপক্ষে হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পান এমবাপ্পে। সেই চোটের কারণেই এল ক্লাসিকোতে তার খেলা নিয়ে অনিশ্চয়তা। সাধারণ পরিস্থিতিতে আলোচনার মূল বিষয় হওয়ার কথা ছিল তার ফিটনেস। কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদে সাধারণ পরিস্থিতি বলে কিছু নেই, বিশেষ করে দল যখন ট্রফিহীন মৌসুমের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে।

চোট পুনর্বাসনের সময় গত সপ্তাহে ক্লাবের অনুমতি নিয়ে সার্দিনিয়ায় যান এমবাপ্পে। এখানেই শুরু বিতর্ক। আইনি বা শৃঙ্খলাভঙ্গের প্রশ্ন নেই, কারণ রিয়াল মাদ্রিদ নিজেই তাকে ছুটি দিয়েছিল। কিন্তু সময়টা ছিল স্পর্শকাতর। রিয়াল যখন এসপানিওলের বিপক্ষে খেলছে, তখন এমবাপ্পের ইয়টে সময় কাটানোর ছবি ছড়িয়ে পড়ে। সমর্থকদের একাংশের চোখে সেটি হয়ে ওঠে দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।
রিয়াল কোচ আলভারো আরবেলোয়া অবশ্য খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার কথাই বলেছেন। তার ভাষায়, ছুটির সময়ে এমবাপ্পে অন্য যে কোনো খেলোয়াড়ের মতো যা খুশি করতে পারেন। কিন্তু কোচের এই যুক্তি ক্ষোভ কমাতে পারেনি। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ‘এমবাপ্পে আউট’ দাবির অনলাইন পিটিশন।

পিটিশনের লক্ষ্য ছিল ২ লাখ স্বাক্ষর। ২৪ ঘণ্টার কম সময়ে তাতে স্বাক্ষর পড়েছে ১ কোটি ২০ লাখের বেশি। এই সংখ্যার কতজন সত্যিকারের রিয়াল মাদ্রিদ সমর্থক, সেটি নিশ্চিত করার উপায় নেই। তবু বার্তাটা অস্বস্তিকর। এমবাপ্পের মতো একজন সুপারস্টার, যিনি এই মৌসুমেও সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৪১ গোল করেছেন, তাকেই এখন ক্ষোভের মুখ হতে হচ্ছে।
রিয়ালের বর্তমান অবস্থাই এই ক্ষোভকে আরও তীব্র করেছে। লা লিগায় বার্সেলোনার পেছনে, চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে কোয়ার্টার ফাইনালেই বিদায়, ড্রেসিংরুমে অস্বস্তির গুঞ্জন, ভিনিসিয়ুসের সঙ্গে তার বোঝাপড়া নিয়ে প্রশ্ন, সব মিলিয়ে এমবাপ্পের ওপর আলোটা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এমবাপ্পের প্রতিনিধিরা অবশ্য সমালোচনার জবাব দিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, তার প্রতিশ্রুতি ও দলের জন্য প্রতিদিনের কাজের বাস্তবতা এসব সমালোচনায় প্রতিফলিত হচ্ছে না। অর্থাৎ বাইরের ছবিটা যতটা ঠান্ডা, দূরত্বপূর্ণ বা বিতর্কিত মনে হচ্ছে, ভেতরের বাস্তবতা ততটা সরল নয়, এমন দাবি এমবাপ্পে শিবিরের।
তবু স্পেনের ফুটবল সংস্কৃতিতে ছবি, অঙ্গভঙ্গি, শরীরী ভাষা, সবকিছুরই আলাদা ওজন আছে। গিয়েম বালাগের বিশ্লেষণও সেই জায়গাতেই। তার মতে, স্পেনে খেলোয়াড়দের নিয়ে ছোট ঘটনার মধ্য থেকেও বড় গল্প তৈরি হয়। রিয়াল খারাপ খেললে প্রশ্ন ওঠে, এমবাপ্পে কেন বেশি দৌড়ান না, ভিনিসিয়ুসের সঙ্গে কেন তার রসায়ন তৈরি হচ্ছে না, তাকে নিয়ে দল কেন দুই বছর বড় ট্রফিহীন।
বালাগের চোখে বিতর্কের বড় অংশই ভুল জায়গায়। তার মতে, এমবাপ্পেকে যে কোনো দলই চাইবে, তাকে পাওয়া নিজেই সমস্যা নয়। রিয়ালের সমস্যার জায়গা অন্যত্র। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দল যখন জিতছে না, তখন সুপারস্টারের প্রতিটি সিদ্ধান্তই আলাদা করে দেখা হয়। চোটে থাকা অবস্থায় বান্ধবীর সঙ্গে ছুটি কাটানো, কিংবা রিয়ালের ম্যাচ শুরুর ১৮ মিনিট আগে ব্যক্তিগত বিমানে মাদ্রিদে নামা, এসব ঘটনা তাই দেখতে খারাপ লাগে।

এমবাপ্পের বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগও ঘুরছে, তিনি ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান নিয়ে বেশি সচেতন। সাবেক কোচ জাবি আলোনসোর ঘনিষ্ঠ মহল থেকে এমন ধারণাও এসেছে, এমবাপ্পে নিজের গোলসংখ্যা ও রেকর্ডকে খুব গুরুত্ব দেন। বলা হচ্ছে, হাঁটুতে অস্বস্তি থাকা সত্ত্বেও তিনি খেলতে চেয়েছিলেন, কারণ ক্যালেন্ডার বছরে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ৫৯ গোলের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল। সেই সিদ্ধান্ত চোট পরিস্থিতিতে সাহায্য করেনি বলেই ধারণা।
রিয়ালে এমবাপ্পের শুরুটা অবশ্য ছিল অন্যরকম। বার্নাব্যুতে এসে তিনি যেন বুঝেছিলেন, এখানে তাকে নতুন করে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। কার্লো আনচেলত্তির অধীনে তখন তাকে বিনয়ী, মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা এক সুপারস্টার হিসেবেই দেখা গিয়েছিল। কিন্তু লিভারপুল ও অ্যাথলেটিক ক্লাবের বিপক্ষে দুটি পেনাল্টি মিসের পর তার মানসিক অবস্থায় ধাক্কা আসে। এরপরই যেন সিদ্ধান্ত নেন, নিজের পথেই এগোবেন।
গোল তখনও এসেছে। আনচেলত্তির অধীনে সংখ্যার দিক থেকে তিনি দুর্দান্ত ছিলেন। কিন্তু চলতি মৌসুমে জাবি আলোনসো কিংবা আরবেলোয়ার অধীনে দলগত ভারসাম্যে সেই প্রভাব তৈরি হয়নি। এখানেই বিতর্কের কেন্দ্র। এমবাপ্পে কি যথেষ্ট দ্রুত রিয়ালের কাঠামোয় মানিয়ে নিতে পারেননি, নাকি কোচরাই তার সেরা সংস্করণ বের করতে পারছেন না?
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমের অবস্থানও একরকম নয়। কেউ এমবাপ্পের গোলসংখ্যাকে ঢাল হিসেবে দেখাচ্ছেন, বলছেন ৪১ গোল করা একজন ফরোয়ার্ডকে ব্যর্থ বলা যায় না। আবার অন্য অংশ প্রশ্ন তুলছে, রিয়াল মাদ্রিদের মতো ক্লাবে শুধু গোল করলেই কি চলে, নাকি বড় ম্যাচে নেতৃত্ব, চাপের মুহূর্তে প্রভাব এবং সমর্থকদের সঙ্গে আবেগের যোগও জরুরি?
ভিনিসিয়ুসের সঙ্গে তার সম্পর্কও আলোচনায়। দুজনই বাঁ দিক থেকে খেলতে স্বচ্ছন্দ, দুজনই বল পায়ে ম্যাচ বদলাতে চান। কিন্তু একই আক্রমণভাগে তাদের ভূমিকা কীভাবে ভারসাম্যপূর্ণ হবে, সেটি এখনও পুরোপুরি মেলেনি। রিয়ালের আক্রমণ কাগজে ভয়ংকর, কিন্তু মাঠে সবসময় সুরেলা নয়। এ কারণেই পরবর্তী কোচ নির্বাচনকে স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে দেখছে। সঠিক ম্যানেজারই হয়তো এই দলকে আবার এক সুতোয় বাঁধতে পারবেন।
এমবাপ্পের সামনে তাই অদ্ভুত এক পরীক্ষা। ১০০ ম্যাচে ৮৫ গোল করা একজন ফরোয়ার্ডকে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের কথা বলা অস্বাভাবিক শোনায়। কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদে বাস্তবতা কখনও শুধু সংখ্যায় আটকে থাকে না। সেখানে প্রশ্ন হয়, তুমি কি দলকে ট্রফি এনে দিচ্ছ? তুমি কি বড় রাতগুলো নিজের করে নিচ্ছ? তুমি কি সমর্থকদের বিশ্বাস করাতে পারছো, তুমি শুধু তারকা নও, তুমি তাদের মানুষ?
সার্দিনিয়ার ইয়ট, অনলাইন পিটিশন, চোটের রিপোর্ট, ড্রেসিংরুমের গুঞ্জন, সবকিছু মিলিয়ে এমবাপ্পে এখন মাদ্রিদের সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র। এল ক্লাসিকোতে ফিরতে পারলে সেটি তার জন্য শুধু মাঠে ফেরার ম্যাচ হবে না। হতে পারে নিজের গল্পের নিয়ন্ত্রণ আবার হাতে নেওয়ার সুযোগও।




