বিশ্বকাপে কিছু দল প্রতিপক্ষকে সৌন্দর্যে মুগ্ধ করে, আর কিছু দল প্রতিপক্ষকে অস্বস্তিতে ফেলে। প্যারাগুয়ে সেই দ্বিতীয় ঘরানার দল। ১৬ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা ‘লা আলবিরোহা’ হয়তো তারকায় ভরা নয়, কিন্তু তাদের ফুটবলে আছে জেদ, শরীরী লড়াই, রক্ষণে শৃঙ্খলা আর বড় দলকে ধৈর্য হারাতে বাধ্য করার ক্ষমতা।
এশিয়া পোস্টের বিশেষ আয়োজন ‘৪৮ দিনে ৪৮ দল’-এর আজকের পর্বে থাকছে দক্ষিণ আমেরিকার সেই কঠিন প্রতিপক্ষ প্যারাগুয়ে, যারা ২০২৬ বিশ্বকাপে ফিরছে শুধু অংশ নিতে নয়, আবারও জায়ান্টদের পথ কঠিন করে তুলতে।
দল পরিচিতি
-17779795930080.webp)
দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলে প্যারাগুয়ে এক অদ্ভুত চরিত্রের দল। তাদের ফুটবল ব্রাজিলের মতো সৌন্দর্যনির্ভর নয়, আর্জেন্টিনার মতো শিল্পীসুলভও নয়। প্যারাগুয়ের ফুটবল দাঁড়িয়ে আছে অন্য এক শব্দের ওপর, গারা। অর্থাৎ লড়াই, জেদ, প্রতিরোধ আর শেষ পর্যন্ত হার না মানার মানসিকতা।
‘লা আলবিরোহা’ নামে পরিচিত দলটি ফুটবলের সৌন্দর্যের চেয়ে বেশি বিশ্বাস করে সংগঠন, শৃঙ্খলা আর প্রতিপক্ষকে অস্বস্তিতে ফেলার কৌশলে। বল প্রতিপক্ষের পায়ে ৭০ শতাংশ সময় থাকলেও তাদের সমস্যা নেই। বরং তারা অপেক্ষা করে, কখন ভুল হবে, কখন জায়গা মিলবে, কখন পাল্টা আক্রমণে আঘাত করা যাবে।
কোচ গুস্তাভো আলফারোর অধীনে প্যারাগুয়ে আবার সেই পুরোনো পরিচয় ফিরে পেয়েছে। শক্ত রক্ষণ, ফিজিক্যাল ফুটবল, কম জায়গা দেওয়া এবং সুযোগ পেলে সরাসরি আক্রমণ, এই চার জিনিসেই তাদের ২০২৬ বিশ্বকাপের গল্প তৈরি হয়েছে।
এই প্যারাগুয়ে হয়তো দর্শককে সবচেয়ে সুন্দর ফুটবল দেখাবে না। কিন্তু প্রতিপক্ষকে সবচেয়ে বেশি বিরক্ত করবে নিশ্চিতভাবে।
বিশ্বকাপে ইতিহাস
প্যারাগুয়ের বিশ্বকাপ ইতিহাসে আছে পুরোনো ইতিহাস, দীর্ঘ বিরতি, সোনালি প্রজন্ম এবং অসমাপ্ত আক্ষেপ।
১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপেই ছিল তারা। সেই আসরে বেলজিয়ামকে ১-০ গোলে হারিয়ে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ জয় পায় প্যারাগুয়ে। এরপর ১৯৫০, ১৯৫৮, ১৯৮৬, ১৯৯৮, ২০০২, ২০০৬ ও ২০১০ বিশ্বকাপে খেলেছে তারা। ২০২৬ বিশ্বকাপ হবে তাদের নবম অংশগ্রহণ।

প্যারাগুয়ের সেরা সময় ছিল ১৯৯৮ থেকে ২০১০ পর্যন্ত। এই সময়ে টানা চার বিশ্বকাপে খেলে তারা। ১৯৯৮ সালে হোসে লুইস চিলাভার্ট, কার্লোস গামারাদের প্রজন্ম গ্রুপ পর্বে অপরাজিত ছিল। শেষ ষোলোতে ফ্রান্সের কাছে গোল্ডেন গোলে হারলেও সেই দল বিশ্বকাপে নিজেদের আলাদা পরিচয় তৈরি করে।
২০০২ সালে আবার শেষ ষোলো। জার্মানির কাছে শেষ মুহূর্তের গোলে বিদায়। ২০১০ সালে আসে সবচেয়ে বড় সাফল্য। গ্রুপে ইতালির মতো বর্তমান চ্যাম্পিয়নকে পেছনে ফেলে পরের রাউন্ডে ওঠে প্যারাগুয়ে। শেষ ষোলোতে জাপানকে টাইব্রেকারে হারিয়ে প্রথমবার কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছায়। সেখানে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হার, যে স্পেন পরে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়।

২০১০-এর পর দীর্ঘ অপেক্ষা। ২০১৪, ২০১৮, ২০২২, তিন আসরেই অনুপস্থিতি। এবার ১৬ বছর পর তারা ফিরছে বিশ্বকাপের মঞ্চে।
বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ের পারফরম্যান্স
-17779797359540.webp)
যেভাবে বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ে
প্যারাগুয়ের ২০২৬ বিশ্বকাপে ওঠার গল্পটা সহজ ছিল না। বাছাইপর্বের শুরুতে তারা খুব একটা ভালো অবস্থায় ছিল না। প্রথম ছয় ম্যাচে মাত্র পাঁচ পয়েন্ট নিয়ে বিশ্বকাপ স্বপ্ন ঝুঁকিতে পড়ে যায়।
এরপর আসে গুস্তাভো আলফারোর প্রভাব। ২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেওয়ার পর দলটি বদলে যায়। রক্ষণ শক্ত হয়, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও ফল বের করার ক্ষমতা বাড়ে, আর ডিফেনসোরেস দেল চাকো আবার হয়ে ওঠে কঠিন দুর্গ।

বাছাইপর্বে প্যারাগুয়ে ঘরের মাঠে ব্রাজিলকে ১-০ এবং আর্জেন্টিনাকে ২-১ গোলে হারায়। এই দুই ফলই তাদের বিশ্বকাপে ওঠার পথে বড় মোড় এনে দেয়।
শেষ পর্যন্ত কনমেবল বাছাইয়ে ষষ্ঠ হয়ে সরাসরি বিশ্বকাপের টিকিট পায় প্যারাগুয়ে। ১৮ ম্যাচে ৭ জয়, ৭ ড্র ও ৪ হার, পয়েন্ট ২৮। রক্ষণে তারা ছিল অন্যতম সেরা দল, পুরো বাছাইপর্বে গোল হজম করে মাত্র ১০টি।
বিশ্বকাপ গ্রুপ ও প্রতিপক্ষ
এবারের বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ে রয়েছে গ্রুপ ‘ডি’-তে। তাদের সঙ্গে আছে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া এবং তুরস্ক।
গ্রুপটি বেশ কঠিন। যুক্তরাষ্ট্র স্বাগতিকদের একটি, ঘরের মাঠের সুবিধা থাকবে তাদের। অস্ট্রেলিয়া শারীরিক ফুটবল খেলে, আর তুরস্ক টেকনিক্যাল ও গতিময় দল।
প্যারাগুয়ের প্রথম ম্যাচ যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে। সেই ম্যাচেই বোঝা যাবে, আলফারোর দল বিশ্বকাপে কতটা প্রস্তুত।
বিশ্বকাপের সম্ভাব্য স্কোয়াড
প্যারাগুয়ের সম্ভাব্য স্কোয়াড হয়তো তারকায় ঝলমলে হবে না, কিন্তু এই দলটা জানে তাদের শক্তি কোথায়। রক্ষণে স্থিরতা, মাঝমাঠে কাজের হার, আর সামনে দ্রুত আঘাত করার ক্ষমতাই তাদের মূল ভরসা।
গোলপোস্টে রবার্তো ফার্নান্দেজ, গাস্তন অলভেইরা ও অরল্যান্ডো গিল থাকতে পারেন। প্যারাগুয়ের খেলার ধরন অনুযায়ী গোলরক্ষকের ভূমিকা এখানে বড়। কারণ দলটি অনেক সময় নিচে নেমে চাপ সামলায়, তাই বক্সে সিদ্ধান্ত নেওয়া, ক্রস সামলানো এবং ডিফেন্সকে সংগঠিত রাখা গুরুত্বপূর্ণ হবে।

ডিফেন্সই এই দলের মেরুদণ্ড। অধিনায়ক গুস্তাভো গোমেজ এই লাইনের নেতা। তার সঙ্গে ওমর আলদেরেতে, জুনিয়র আলোনসো ও ফাবিয়ান বালবুয়েনার মতো অভিজ্ঞ সেন্টার-ব্যাকরা প্যারাগুয়েকে শক্ত ভিত এনে দিবেন। হুয়ান হোসে কাসেরেস, গুস্তাভো ভেলাসকেস, আলান বেনিতেস, হুয়ান কানালে ও অ্যালেক্সিস মাইদানার মতো বিকল্প থাকায় ব্যাকলাইনে গভীরতাও আছে। এই রক্ষণ শুধু প্রতিপক্ষকে আটকায় না, ম্যাচের ছন্দও ভেঙে দিতে পারে।
মিডফিল্ডে প্যারাগুয়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্র কাঠামো আর শৃঙ্খলা। মাথিয়াস গালারজা, দামিয়ান বোবাদিয়া, ব্রায়ান ওহেদা ও লুকাস রোমেরোর মতো খেলোয়াড়রা মাঝমাঠে কাজের হার ও ডিফেন্সিভ কভার হিসেবে থাকবেন। ডিয়েগো গোমেজ ফিট থাকলে তিনি বক্স টু বক্স মিড হিসেবে খেলবেন। এই জায়গায় প্যারাগুয়ে খুব বেশি ঝুঁকি নেয় না, বরং প্রতিপক্ষকে জায়গা না দিয়ে ধীরে ধীরে ম্যাচ কঠিন করে তোলে।
আক্রমণভাগে প্যারাগুয়ের গতি ও সরাসরি খেলার হুমকি বেশি। জুলিও এনসিসো ও রামন সোসা দুই প্রান্ত থেকে ড্রিবলিং, গতি ও বিপদজনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেন। মিগেল আলমিরন ফিট থাকলে আক্রমণ ও মাঝমাঠের সংযোগে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। সামনে অ্যান্টোনিও সানাব্রিয়া কম সুযোগের ম্যাচে ফিনিশিং দিয়ে পার্থক্য গড়তে পারেন। তার সঙ্গে অ্যালেক্স আর্সে, গ্যাব্রিয়েল আভালোস ও গ্যাব্রিয়েল কাবায়েরো বিকল্প হিসেবে থাকবেন।
সব মিলিয়ে এই স্কোয়াডের সবচেয়ে বড় শক্তি তার পরিচয়। প্যারাগুয়ে খেলতে নামে না শুধু ম্যাচ জিততে, তারা নামে ম্যাচটাকে কঠিন করে তুলতে। আর বিশ্বকাপে এমন দলই অনেক সময় বড় দলের জন্য সবচেয়ে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।
বি.দ্র: এই স্কোয়াডটি প্যারাগুয়ের সাম্প্রতিক দল, খেলোয়াড়দের ক্লাব ফর্ম, ফিটনেস অবস্থা এবং সম্ভাব্য নির্বাচনের ভিত্তিতে তৈরি। বিশ্বকাপের চূড়ান্ত স্কোয়াড আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত এতে পরিবর্তন আসতে পারে।
শক্তিমত্তা
প্যারাগুয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের রক্ষণ। তারা কম জায়গা দেয়, শরীর ব্যবহার করে, প্রতিপক্ষকে ধৈর্য হারাতে বাধ্য করে। বড় দলগুলোর বিপক্ষে এটাই তাদের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র।
আরেকটি বড় দিক মানসিকতা। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে হারানো দলটি জানে, বড় দলের বিপক্ষে ম্যাচ জেতা অসম্ভব নয়।

দুর্বলতা
সবচেয়ে বড় সমস্যা গোল করার ধারাবাহিকতা। প্যারাগুয়ে ম্যাচে টিকে থাকতে পারে, প্রতিপক্ষকে আটকে রাখতে পারে, কিন্তু সুযোগ কম এলে সেগুলো কাজে লাগাতে হবে।
আরেকটি প্রশ্ন সৃজনশীলতা। আলমিরন বা ডিয়েগো গোমেজ ফিট না থাকলে আক্রমণে গতি ও ফাইনাল বল কমে যেতে পারে।
কোচের কৌশল
গুস্তাভো আলফারো বাস্তববাদী কোচ। তার দল বল দখলের জন্য খেলে না, ফলের জন্য খেলে।

৪-৪-২, ৪-২-৩-১ বা ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী আরও রক্ষনশীল হিসেবে দেখা যেতে পারে। মূল পরিকল্পনা হবে নিচে ব্লক তৈরি করা, মাঝমাঠে লড়াই করা এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণে ওঠা।
প্যারাগুয়ের খেলা দেখতে সবসময় সুন্দর নাও লাগতে পারে। কিন্তু কার্যকর হতে পারে খুবই।
প্যারাগুয়ের হয়ে যারা পার্থক্য গড়ে দিবে
গুস্তাভো গোমেজ এই দলের নেতা। রক্ষণে তার উপস্থিতি প্যারাগুয়েকে স্থিরতা দিবে।
জুলিও এনসিসো আক্রমণে সবচেয়ে প্রতিভাবান নামগুলোর একটি। জায়গা পেলে তিনি ম্যাচে পার্থক্য তৈরি করে দিতে পারেন।

মিগেল আলমিরন ফিট থাকলে তার গতি ও সরাসরি খেলা প্যারাগুয়ের পাল্টা আক্রমণকে বিপজ্জনক করবে।
ডিয়েগো গোমেজ মাঝমাঠে শক্তি ও গতি যোগ করতে পারেন, যদি ইনজুরি কাটিয়ে পুরোপুরি ফিরতে পারেন।
অ্যান্টোনিও সানাব্রিয়ার ওপর থাকবে গোলের দায়িত্ব। কম সুযোগের ম্যাচে তার ফিনিশিং বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রেডিকশন
প্যারাগুয়ে গ্রুপ ‘ডি’-তে ফেভারিট নয়, কিন্তু তাদের অবহেলা করার সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক ও অস্ট্রেলিয়া তিন দলই তাদের বিপক্ষে বল রাখতে পারে, কিন্তু প্যারাগুয়ে সেই ধরনের ম্যাচেই সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক।
তবে আমাদের ধারণা, তারা গ্রুপে তৃতীয় হওয়ার লড়াইয়ে থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে পয়েন্ট তুলতে পারলে নকআউটে ওঠার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে।
প্যারাগুয়ে ১৬ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরছে। কিন্তু তারা শুধু ফিরে আসার জন্য আসছে না।
তারা আসছে প্রতিপক্ষকে অস্বস্তিতে ফেলতে, বড় দলকে ধৈর্য হারাতে বাধ্য করতে, আর নিজেদের পুরোনো পরিচয় আবার মনে করিয়ে দিতে।
প্রশ্ন একটাই, লা আলবিরোহা কি এবারও বড় দলের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে?




