ঢাকা শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
নির্বাচন সর্বশেষ
Live Icon ●LIVE

৪৮ দিনে ৪৮ দল

প্যারাগুয়ে কি এবারও বড় দলের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে?

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস

  ০৫ মে ২০২৬, ১৭:১০

বিশ্বকাপে কিছু দল প্রতিপক্ষকে সৌন্দর্যে মুগ্ধ করে, আর কিছু দল প্রতিপক্ষকে অস্বস্তিতে ফেলে। প্যারাগুয়ে সেই দ্বিতীয় ঘরানার দল। ১৬ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা ‘লা আলবিরোহা’ হয়তো তারকায় ভরা নয়, কিন্তু তাদের ফুটবলে আছে জেদ, শরীরী লড়াই, রক্ষণে শৃঙ্খলা আর বড় দলকে ধৈর্য হারাতে বাধ্য করার ক্ষমতা।

পরিবর্তন অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

এশিয়া পোস্টের বিশেষ আয়োজন ‘৪৮ দিনে ৪৮ দল’-এর আজকের পর্বে থাকছে দক্ষিণ আমেরিকার সেই কঠিন প্রতিপক্ষ প্যারাগুয়ে, যারা ২০২৬ বিশ্বকাপে ফিরছে শুধু অংশ নিতে নয়, আবারও জায়ান্টদের পথ কঠিন করে তুলতে।

দল পরিচিতি

দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলে প্যারাগুয়ে এক অদ্ভুত চরিত্রের দল। তাদের ফুটবল ব্রাজিলের মতো সৌন্দর্যনির্ভর নয়, আর্জেন্টিনার মতো শিল্পীসুলভও নয়। প্যারাগুয়ের ফুটবল দাঁড়িয়ে আছে অন্য এক শব্দের ওপর, গারা। অর্থাৎ লড়াই, জেদ, প্রতিরোধ আর শেষ পর্যন্ত হার না মানার মানসিকতা।

‘লা আলবিরোহা’ নামে পরিচিত দলটি ফুটবলের সৌন্দর্যের চেয়ে বেশি বিশ্বাস করে সংগঠন, শৃঙ্খলা আর প্রতিপক্ষকে অস্বস্তিতে ফেলার কৌশলে। বল প্রতিপক্ষের পায়ে ৭০ শতাংশ সময় থাকলেও তাদের সমস্যা নেই। বরং তারা অপেক্ষা করে, কখন ভুল হবে, কখন জায়গা মিলবে, কখন পাল্টা আক্রমণে আঘাত করা যাবে।

কোচ গুস্তাভো আলফারোর অধীনে প্যারাগুয়ে আবার সেই পুরোনো পরিচয় ফিরে পেয়েছে। শক্ত রক্ষণ, ফিজিক্যাল ফুটবল, কম জায়গা দেওয়া এবং সুযোগ পেলে সরাসরি আক্রমণ, এই চার জিনিসেই তাদের ২০২৬ বিশ্বকাপের গল্প তৈরি হয়েছে।

এই প্যারাগুয়ে হয়তো দর্শককে সবচেয়ে সুন্দর ফুটবল দেখাবে না। কিন্তু প্রতিপক্ষকে সবচেয়ে বেশি বিরক্ত করবে নিশ্চিতভাবে।

বিশ্বকাপে ইতিহাস

প্যারাগুয়ের বিশ্বকাপ ইতিহাসে আছে পুরোনো ইতিহাস, দীর্ঘ বিরতি, সোনালি প্রজন্ম এবং অসমাপ্ত আক্ষেপ।

১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপেই ছিল তারা। সেই আসরে বেলজিয়ামকে ১-০ গোলে হারিয়ে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ জয় পায় প্যারাগুয়ে। এরপর ১৯৫০, ১৯৫৮, ১৯৮৬, ১৯৯৮, ২০০২, ২০০৬ ও ২০১০ বিশ্বকাপে খেলেছে তারা। ২০২৬ বিশ্বকাপ হবে তাদের নবম অংশগ্রহণ।

১৯৯৮ সালের প্যারাগুয়ে দল

প্যারাগুয়ের সেরা সময় ছিল ১৯৯৮ থেকে ২০১০ পর্যন্ত। এই সময়ে টানা চার বিশ্বকাপে খেলে তারা। ১৯৯৮ সালে হোসে লুইস চিলাভার্ট, কার্লোস গামারাদের প্রজন্ম গ্রুপ পর্বে অপরাজিত ছিল। শেষ ষোলোতে ফ্রান্সের কাছে গোল্ডেন গোলে হারলেও সেই দল বিশ্বকাপে নিজেদের আলাদা পরিচয় তৈরি করে।

২০০২ সালে আবার শেষ ষোলো। জার্মানির কাছে শেষ মুহূর্তের গোলে বিদায়। ২০১০ সালে আসে সবচেয়ে বড় সাফল্য। গ্রুপে ইতালির মতো বর্তমান চ্যাম্পিয়নকে পেছনে ফেলে পরের রাউন্ডে ওঠে প্যারাগুয়ে। শেষ ষোলোতে জাপানকে টাইব্রেকারে হারিয়ে প্রথমবার কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছায়। সেখানে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হার, যে স্পেন পরে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়।

২০১০ সালে ইতালিকে হারিয়ে দেওয়া প্যারাগুয়ে

২০১০-এর পর দীর্ঘ অপেক্ষা। ২০১৪, ২০১৮, ২০২২, তিন আসরেই অনুপস্থিতি। এবার ১৬ বছর পর তারা ফিরছে বিশ্বকাপের মঞ্চে।

বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ের পারফরম্যান্স

যেভাবে বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ে

প্যারাগুয়ের ২০২৬ বিশ্বকাপে ওঠার গল্পটা সহজ ছিল না। বাছাইপর্বের শুরুতে তারা খুব একটা ভালো অবস্থায় ছিল না। প্রথম ছয় ম্যাচে মাত্র পাঁচ পয়েন্ট নিয়ে বিশ্বকাপ স্বপ্ন ঝুঁকিতে পড়ে যায়।

এরপর আসে গুস্তাভো আলফারোর প্রভাব। ২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেওয়ার পর দলটি বদলে যায়। রক্ষণ শক্ত হয়, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও ফল বের করার ক্ষমতা বাড়ে, আর ডিফেনসোরেস দেল চাকো আবার হয়ে ওঠে কঠিন দুর্গ।

বাছাইপর্বে প্যারাগুয়ে ঘরের মাঠে ব্রাজিলকে ১-০ এবং আর্জেন্টিনাকে ২-১ গোলে হারায়। এই দুই ফলই তাদের বিশ্বকাপে ওঠার পথে বড় মোড় এনে দেয়।

শেষ পর্যন্ত কনমেবল বাছাইয়ে ষষ্ঠ হয়ে সরাসরি বিশ্বকাপের টিকিট পায় প্যারাগুয়ে। ১৮ ম্যাচে ৭ জয়, ৭ ড্র ও ৪ হার, পয়েন্ট ২৮। রক্ষণে তারা ছিল অন্যতম সেরা দল, পুরো বাছাইপর্বে গোল হজম করে মাত্র ১০টি।

বিশ্বকাপ গ্রুপ ও প্রতিপক্ষ

এবারের বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ে রয়েছে গ্রুপ ‘ডি’-তে। তাদের সঙ্গে আছে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া এবং তুরস্ক।

গ্রুপটি বেশ কঠিন। যুক্তরাষ্ট্র স্বাগতিকদের একটি, ঘরের মাঠের সুবিধা থাকবে তাদের। অস্ট্রেলিয়া শারীরিক ফুটবল খেলে, আর তুরস্ক টেকনিক্যাল ও গতিময় দল।

প্যারাগুয়ের প্রথম ম্যাচ যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে। সেই ম্যাচেই বোঝা যাবে, আলফারোর দল বিশ্বকাপে কতটা প্রস্তুত।

বিশ্বকাপের সম্ভাব্য স্কোয়াড

প্যারাগুয়ের সম্ভাব্য স্কোয়াড হয়তো তারকায় ঝলমলে হবে না, কিন্তু এই দলটা জানে তাদের শক্তি কোথায়। রক্ষণে স্থিরতা, মাঝমাঠে কাজের হার, আর সামনে দ্রুত আঘাত করার ক্ষমতাই তাদের মূল ভরসা।

গোলপোস্টে রবার্তো ফার্নান্দেজ, গাস্তন অলভেইরা ও অরল্যান্ডো গিল থাকতে পারেন। প্যারাগুয়ের খেলার ধরন অনুযায়ী গোলরক্ষকের ভূমিকা এখানে বড়। কারণ দলটি অনেক সময় নিচে নেমে চাপ সামলায়, তাই বক্সে সিদ্ধান্ত নেওয়া, ক্রস সামলানো এবং ডিফেন্সকে সংগঠিত রাখা গুরুত্বপূর্ণ হবে।

প্যারাগুয়ে দল

ডিফেন্সই এই দলের মেরুদণ্ড। অধিনায়ক গুস্তাভো গোমেজ এই লাইনের নেতা। তার সঙ্গে ওমর আলদেরেতে, জুনিয়র আলোনসো ও ফাবিয়ান বালবুয়েনার মতো অভিজ্ঞ সেন্টার-ব্যাকরা প্যারাগুয়েকে শক্ত ভিত এনে দিবেন। হুয়ান হোসে কাসেরেস, গুস্তাভো ভেলাসকেস, আলান বেনিতেস, হুয়ান কানালে ও অ্যালেক্সিস মাইদানার মতো বিকল্প থাকায় ব্যাকলাইনে গভীরতাও আছে। এই রক্ষণ শুধু প্রতিপক্ষকে আটকায় না, ম্যাচের ছন্দও ভেঙে দিতে পারে।

মিডফিল্ডে প্যারাগুয়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্র কাঠামো আর শৃঙ্খলা। মাথিয়াস গালারজা, দামিয়ান বোবাদিয়া, ব্রায়ান ওহেদা ও লুকাস রোমেরোর মতো খেলোয়াড়রা মাঝমাঠে কাজের হার ও ডিফেন্সিভ কভার হিসেবে থাকবেন। ডিয়েগো গোমেজ ফিট থাকলে তিনি বক্স টু বক্স মিড হিসেবে খেলবেন। এই জায়গায় প্যারাগুয়ে খুব বেশি ঝুঁকি নেয় না, বরং প্রতিপক্ষকে জায়গা না দিয়ে ধীরে ধীরে ম্যাচ কঠিন করে তোলে।

আক্রমণভাগে প্যারাগুয়ের গতি ও সরাসরি খেলার হুমকি বেশি। জুলিও এনসিসো ও রামন সোসা দুই প্রান্ত থেকে ড্রিবলিং, গতি ও বিপদজনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেন। মিগেল আলমিরন ফিট থাকলে আক্রমণ ও মাঝমাঠের সংযোগে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। সামনে অ্যান্টোনিও সানাব্রিয়া কম সুযোগের ম্যাচে ফিনিশিং দিয়ে পার্থক্য গড়তে পারেন। তার সঙ্গে অ্যালেক্স আর্সে, গ্যাব্রিয়েল আভালোস ও গ্যাব্রিয়েল কাবায়েরো বিকল্প হিসেবে থাকবেন।

সব মিলিয়ে এই স্কোয়াডের সবচেয়ে বড় শক্তি তার পরিচয়। প্যারাগুয়ে খেলতে নামে না শুধু ম্যাচ জিততে, তারা নামে ম্যাচটাকে কঠিন করে তুলতে। আর বিশ্বকাপে এমন দলই অনেক সময় বড় দলের জন্য সবচেয়ে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।

বি.দ্র: এই স্কোয়াডটি প্যারাগুয়ের সাম্প্রতিক দল, খেলোয়াড়দের ক্লাব ফর্ম, ফিটনেস অবস্থা এবং সম্ভাব্য নির্বাচনের ভিত্তিতে তৈরি। বিশ্বকাপের চূড়ান্ত স্কোয়াড আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত এতে পরিবর্তন আসতে পারে।

শক্তিমত্তা

প্যারাগুয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের রক্ষণ। তারা কম জায়গা দেয়, শরীর ব্যবহার করে, প্রতিপক্ষকে ধৈর্য হারাতে বাধ্য করে। বড় দলগুলোর বিপক্ষে এটাই তাদের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র।

আরেকটি বড় দিক মানসিকতা। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে হারানো দলটি জানে, বড় দলের বিপক্ষে ম্যাচ জেতা অসম্ভব নয়।

দুর্বলতা
সবচেয়ে বড় সমস্যা গোল করার ধারাবাহিকতা। প্যারাগুয়ে ম্যাচে টিকে থাকতে পারে, প্রতিপক্ষকে আটকে রাখতে পারে, কিন্তু সুযোগ কম এলে সেগুলো কাজে লাগাতে হবে।

আরেকটি প্রশ্ন সৃজনশীলতা। আলমিরন বা ডিয়েগো গোমেজ ফিট না থাকলে আক্রমণে গতি ও ফাইনাল বল কমে যেতে পারে।

কোচের কৌশল

গুস্তাভো আলফারো বাস্তববাদী কোচ। তার দল বল দখলের জন্য খেলে না, ফলের জন্য খেলে।

প্যারাগুয়ে কোচ গুস্তাভো আলফারো

৪-৪-২, ৪-২-৩-১ বা ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী আরও রক্ষনশীল হিসেবে দেখা যেতে পারে। মূল পরিকল্পনা হবে নিচে ব্লক তৈরি করা, মাঝমাঠে লড়াই করা এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণে ওঠা।

প্যারাগুয়ের খেলা দেখতে সবসময় সুন্দর নাও লাগতে পারে। কিন্তু কার্যকর হতে পারে খুবই।

প্যারাগুয়ের হয়ে যারা পার্থক্য গড়ে দিবে

গুস্তাভো গোমেজ এই দলের নেতা। রক্ষণে তার উপস্থিতি প্যারাগুয়েকে স্থিরতা দিবে।

জুলিও এনসিসো আক্রমণে সবচেয়ে প্রতিভাবান নামগুলোর একটি। জায়গা পেলে তিনি ম্যাচে পার্থক্য তৈরি করে দিতে পারেন।

এনসিসো ও আলমিরন

মিগেল আলমিরন ফিট থাকলে তার গতি ও সরাসরি খেলা প্যারাগুয়ের পাল্টা আক্রমণকে বিপজ্জনক করবে।

ডিয়েগো গোমেজ মাঝমাঠে শক্তি ও গতি যোগ করতে পারেন, যদি ইনজুরি কাটিয়ে পুরোপুরি ফিরতে পারেন।

অ্যান্টোনিও সানাব্রিয়ার ওপর থাকবে গোলের দায়িত্ব। কম সুযোগের ম্যাচে তার ফিনিশিং বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রেডিকশন

প্যারাগুয়ে গ্রুপ ‘ডি’-তে ফেভারিট নয়, কিন্তু তাদের অবহেলা করার সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক ও অস্ট্রেলিয়া তিন দলই তাদের বিপক্ষে বল রাখতে পারে, কিন্তু প্যারাগুয়ে সেই ধরনের ম্যাচেই সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক।

তবে আমাদের ধারণা, তারা গ্রুপে তৃতীয় হওয়ার লড়াইয়ে থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে পয়েন্ট তুলতে পারলে নকআউটে ওঠার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে।

প্যারাগুয়ে ১৬ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরছে। কিন্তু তারা শুধু ফিরে আসার জন্য আসছে না।

তারা আসছে প্রতিপক্ষকে অস্বস্তিতে ফেলতে, বড় দলকে ধৈর্য হারাতে বাধ্য করতে, আর নিজেদের পুরোনো পরিচয় আবার মনে করিয়ে দিতে।

প্রশ্ন একটাই, লা আলবিরোহা কি এবারও বড় দলের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে?

বাবাকে হারানোর দিনেই বার্সাকে শিরোপা জেতালেন ফ্লিক
এক রাতের মধ্যে একজন মানুষের জীবনে কত রকম অনুভূতি যে জমা হতে পারে, হান্সি ফ্লিকের চোখ যেন তার উত্তর দিয়ে দিল। ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোক, ক্যাম্প ন্যুর নীরব শ্রদ্ধা, এল ক্লাসিকোর চাপ, আর শেষ পর্যন্ত লা লিগা শিরোপার উৎসব, সবকিছু মিলিয়ে বার্সেলোনা কোচের জন্য রাতটা হয়ে থাকল জীবনের সবচেয়ে আবেগময় দিনগুলোর একটি। রোববার (১০ মে) রাতে রিয়াল মাদ্রিদকে ২-০ গোলে হারিয়ে লা লিগা শিরোপা নিশ্চিত করেছে বার্সেলোনা। এটি কাতালান ক্লাবটির ইতিহাসের ২৯তম লিগ শিরোপা। তবে ম্যাচের ফলের বাইরেও রাতটার বড় গল্প ছিলেন ফ্লিক। ম্যাচের আগের রাতেই মারা যান তার বাবা। সেই ব্যক্তিগত শোক নিয়েই দর্শকপূর্ণ ক্যাম্প ন্যুতে ডাগআউটে দাঁড়ান জার্মান কোচ। কিক অফের আগে ফ্লিকের বাবার স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করে পুরো স্টেডিয়াম। সেই মুহূর্তে সম্প্রচার ক্যামেরায় দেখা যায়, চোখের জল ধরে রাখতে পারছেন না ফ্লিক। পাশে ছিলেন তার কোচিং স্টাফ ও খেলোয়াড়েরা। তারা তাকে সান্ত্বনা দেন। সেই নীরবতা থেকেই যেন রাতের আবেগের শুরু। মাঠে অবশ্য বার্সেলোনা কোচের দল তাকে ঠিক সেই উত্তরই দিয়েছে, যা এমন রাতে একজন কোচ তার খেলোয়াড়দের কাছ থেকে চাইতে পারেন। শুরু থেকেই আগ্রাসী, আত্মবিশ্বাসী ও পরিষ্কার পরিকল্পনার ফুটবল খেলেছে বার্সা। প্রথমার্ধেই ম্যাচের ভাগ্য লিখে দেয় তারা। মার্কাস রাশফোর্ডের দুর্দান্ত ফ্রি-কিকের পর ফেরান তোরেসের গোল, ২০ মিনিটের মধ্যেই ২-০ এগিয়ে যায় স্বাগতিকরা। এরপর আর রিয়াল মাদ্রিদকে ম্যাচে ফেরার সুযোগ দেয়নি ফ্লিকের দল। এই জয়ে তিন ম্যাচ হাতে রেখেই শিরোপা নিশ্চিত করে বার্সা। আরও বিশেষ ব্যাপার, শিরোপাটা এসেছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদকে হারিয়ে। ক্যাম্প ন্যুর সমর্থকদের সামনে এর চেয়ে মধুর দৃশ্য আর কী হতে পারত! শিরোপা উৎসবে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন ফ্লিক। স্বভাবতই খুব বেশি কথা বলেননি। কিন্তু তার কণ্ঠে আবেগ ছিল স্পষ্ট। ফ্লিক বলেন, ‘ম্যাচটা কঠিন ছিল। এই দিনটা আমি কখনো ভুলব না। দলকে ধন্যবাদ জানাতে চাই, ধন্যবাদ জানাতে চাই সবাইকে যারা আমাদের সমর্থন করেছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এমন একটা ভালো দল পেয়ে আমি খুব গর্বিত। সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিটি ম্যাচে লড়াই করার যে দৃঢ়তা তোমরা দেখিয়েছ, তার জন্য ধন্যবাদ। আমি সত্যিই এটা মূল্য দিই। আমার দল অসাধারণ, আমি আনন্দিত। খেলোয়াড়দের নিয়ে আমি খুব গর্বিত। সমর্থকদের সঙ্গে এখানে থাকা, এল ক্লাসিকোতে রিয়াল মাদ্রিদকে হারানো, এটা রোমাঞ্চকর। এখন আমার মনে হয়, আমাদের উদ্‌যাপন করা উচিত।’ এই শিরোপা ফ্লিকের জন্য শুধু একটি ট্রফি নয়, বার্সেলোনার সঙ্গে তার সম্পর্কেরও বড় সিলমোহর। মৌসুমজুড়ে তার দল খেলেছে ঝুঁকিপূর্ণ, আক্রমণাত্মক, অনেক সময় স্নায়ু পরীক্ষা নেওয়া ফুটবল। সব সময় নিখুঁত ছিল না, কিন্তু কখনো একঘেয়ে ছিল না। বার্সা সমর্থকেরা সেই সাহসী ফুটবলকে গ্রহণ করেছে, আর শেষ পর্যন্ত সেটিই এনে দিল লা লিগা। রিয়ালের বিপক্ষে এই জয় তাই সংখ্যার হিসাব ছাড়িয়ে গেছে। ২-০ স্কোরলাইন, ২৯তম লিগ শিরোপা, তিন ম্যাচ হাতে রেখে চ্যাম্পিয়ন হওয়া, এসবই বড়। কিন্তু রাতটির আসল ছবি হয়তো অন্যখানে, নীরবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে চোখ মুছছেন ফ্লিক, এরপর কয়েক ঘণ্টা পর সেই মানুষটিকেই আকাশে ছুড়ে দিচ্ছেন তাঁর খেলোয়াড়েরা।
বাবাকে হারানোর দিনেই বার্সাকে শিরোপা জেতালেন ফ্লিক
রিয়ালের সামনেই বার্সেলোনার শিরোপা উৎসব
শিরোপা জয়ের এর চেয়ে মধুর মঞ্চ আর কী হতে পারত স্প্যানিশ জায়ান্ট বার্সেলোনার জন্য! ক্যাম্প ন্যু, সামনে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদ, আর হিসাবটা সহজ, হার এড়ালেই লা লিগা নিজেদের। কিন্তু হান্সি ফ্লিকের দল শুধু প্রয়োজন মেটায়নি, শিরোপা উৎসবের দিনটাকে এল ক্লাসিকো জয়ের রঙে আরও উজ্জ্বল করেছে। ক্যাম্প ন্যুতে রিয়াল মাদ্রিদকে ২-০ গোলে হারিয়ে লা লিগার শিরোপা নিশ্চিত করেছে বার্সেলোনা।  প্রথমার্ধের ২০ মিনিটের মধ্যেই ম্যাচের ভাগ্য প্রায় লিখে ফেলেন মার্কাস রাশফোর্ড ও ফেরান তোরেস। নবম মিনিটে রাশফোর্ডের দুর্দান্ত ফ্রি-কিক, ১৮ মিনিটে তোরেসের ঠান্ডা মাথার ফিনিশ, এই দুই গোলেই রিয়ালকে হারিয়ে নিজেদের ইতিহাসে ২৯তম লা লিগা শিরোপা জিতল কাতালানরা। বার্সেলোনার জন্য জয়টা ছিল প্রতীকীও। পুরো মৌসুমে ঘরের মাঠে দাপট দেখানো দলটি লিগে নিজেদের মাঠে ১৮ ম্যাচের ১৮টিই জিতেছে। সেই নিখুঁত হোম রেকর্ডের শেষ বড় ছবিটা হলো রিয়াল মাদ্রিদের সামনে ট্রফি জয়। লিগে টানা ১০ ম্যাচ জিতল ফ্লিকের দল, যা তার অধীনে বার্সার সেরা ধারাবাহিকতা। ম্যাচের শুরু থেকেই বার্সার আক্রমণে ছিল ধার। অষ্টম মিনিটে বক্সের ঠিক বাইরে বিপজ্জনক জায়গায় ফ্রি-কিক পায় তারা। বলের সামনে দাঁড়ান রাশফোর্ড। কোর্তোয়ার নাগালের বাইরে, দেয়ালের ওপর দিয়ে, ক্রসবারের নিচে নিখুঁত বাঁকানো শটে বল জালে পাঠান ইংলিশ ফরোয়ার্ড। এল ক্লাসিকোতে বার্সার জার্সিতে এমন ফ্রি-কিক গোলের স্মৃতি খুব বেশি নেই। এমনকি একবিংশ শতকে রিয়ালের বিপক্ষে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে এটি বার্সার তৃতীয় ফ্রি-কিক গোল, আগেরটি করেছিলেন লিওনেল মেসি, ২০১২ সালে। রিয়াল সেই ধাক্কা সামলানোর আগেই দ্বিতীয় গোল। ১৮ মিনিটে বাম দিক থেকে ফেরমিন লোপেসের চিপ করা বল বক্সে পান দানি ওলমো। তিনি ব্যাকহিলে বল নামিয়ে দেন তোরেসের সামনে। তোরেস এক টাচ নিয়ে কোর্তোয়ার পাশ দিয়ে বল জালে পাঠান। ২০ মিনিটের মধ্যেই দুই শটে দুই গোল, বার্সেলোনার ক্লিনিক্যাল শুরুতে তখন ক্যাম্প ন্যুতে শিরোপা উৎসবের আবহ। রিয়াল সুযোগ পায়নি, তা নয়। গনসালো গার্সিয়া বক্সে ঢুকে পাশের জালে শট মারেন। অরেলিয়াঁ চুয়ামেনি একবার হেডে, একবার শটে গোলের কাছাকাছি গিয়েও লক্ষ্যভ্রষ্ট হন। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রও বক্সে বিপদ তৈরি করেছিলেন, কিন্তু এরিক গার্সিয়ার স্লাইডিং ইন্টারসেপশন বার্সাকে বাঁচায়। প্রথমার্ধে রিয়ালের শট বেশি থাকলেও গোলের সামনে ধার ছিল না। দ্বিতীয়ার্ধে রিয়াল কিছুটা বেশি আগ্রাসী হয়। ৬৩ মিনিটে জুড বেলিংহাম বল জালে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু বিল্ডআপে অফসাইড থাকায় গোলটি বাতিল হয়। সেটিই ছিল রিয়ালের সবচেয়ে বড় মুহূর্ত। তার বাইরে বার্সা গোলরক্ষক জোয়ান গার্সিয়াকে খুব বেশি পরীক্ষায় ফেলতে পারেনি আলভারো আরবেলোয়ার দল। বার্সারও সুযোগ ছিল ব্যবধান বাড়ানোর। ৫৭ মিনিটে তোরেস রিয়াল রক্ষণ ভেদ করে শট নেন, কোর্তোয়া পা বাড়িয়ে সেটি ঠেকান। ৮৩ মিনিটে বদলি রবার্ট লেভানডফস্কির জোরালো শটও ঠেকান রিয়াল গোলরক্ষক। তবু ২-০ স্কোরলাইন ধরে রাখতেই বেশি মনোযোগী ছিল বার্সা। ম্যাচে উত্তাপও কম ছিল না। রাউল আসেনসিওর ফাউলের পর দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি হয়। আসেনসিও ও ওলমো দুজনই হলুদ কার্ড দেখেন। পরে ট্রেন্ট আলেক্সান্ডার-আর্নল্ড ও রাফিনিয়াও হলুদ কার্ড পান। এল ক্লাসিকোর স্বাভাবিক স্নায়ুযুদ্ধ ছিল, কিন্তু স্কোরবোর্ডে বার্সার নিয়ন্ত্রণ কখনো সত্যিকারের ঝুঁকিতে পড়েনি। রিয়ালের জন্য এই হার মৌসুমের অস্থিরতার আরেকটি প্রতীক। ড্রেসিংরুমের টানাপোড়েন, ভালভার্দে-চুয়ামেনি বিতর্ক, এমবাপ্পেকে ঘিরে সমর্থকদের ক্ষোভ, সব মিলিয়ে ক্লাবটি আগেই চাপে ছিল। মাঠেও সেই অনিশ্চয়তার ছাপ স্পষ্ট। আক্রমণে সংযোগ কম, পজিশনে অস্পষ্টতা বেশি, আর বড় ম্যাচে প্রয়োজনীয় ক্লিনিক্যাল ফিনিশিংয়ের অভাব। এই জয়ে লা লিগার ২৯তম শিরোপা নিশ্চিত করল বার্সেলোনা। হাতে এখনো তিন ম্যাচ। শিরোপা আগেই নির্ধারিত হয়ে যাওয়ায় বাকি ম্যাচগুলো বার্সার জন্য হয়ে গেল উৎসবের মিছিল। অন্যদিকে রিয়ালের এখন লক্ষ্য দ্বিতীয় স্থান নিশ্চিত করা। কিন্তু চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর মাঠে নয়, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর সামনে শিরোপা হারানোর এই রাত রিয়ালের মৌসুমের হতাশাকে আরও গভীর করল।
রিয়ালের সামনেই বার্সেলোনার শিরোপা উৎসব
শেষ মুহূর্তের নাটকে ওয়েস্ট হামকে হারিয়ে শিরোপার আরও কাছে আর্সেনাল
প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা দৌড়ে এমন ম্যাচই অনেক সময় মৌসুমের গল্প বদলে দেয়। লন্ডন স্টেডিয়ামে আর্সেনালের সামনে ছিল ফাঁদ, চাপ, স্নায়ুর পরীক্ষা। একদিকে ২২ বছর পর লিগ শিরোপার স্বপ্ন, অন্যদিকে অবনমন বাঁচানোর মরিয়া লড়াইয়ে থাকা ওয়েস্ট হাম। শেষ পর্যন্ত সেই চাপের ম্যাচে লিয়ান্দ্রো ট্রসার্ডের দেরিতে করা গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতে শিরোপার আরও কাছে চলে গেল মিকেল আর্তেতার দল। ম্যাচের ৮৩ মিনিটে মার্টিন ওডেগার্ডের পাস থেকে নিচু শটে গোল করেন ট্রসার্ড। সেই গোলেই উল্লাসে ফেটে পড়ে আর্সেনাল সমর্থকেরা। তবে জয় নিশ্চিত হয়েছে আরও বড় নাটক পেরিয়ে। যোগ করা সময়ে ওয়েস্ট হাম বদলি ফরোয়ার্ড ক্যালাম উইলসন বল জালে পাঠিয়েছিলেন। লন্ডন স্টেডিয়াম তখন প্রায় বিস্ফোরিত। কিন্তু দীর্ঘ ভিএআর পরীক্ষার পর বিল্ডআপে আর্সেনাল গোলকিপার ডেভিড রায়ার ওপর ফাউলের কারণে গোলটি বাতিল করেন রেফারি ক্রিস কাভানাহ। এই সিদ্ধান্তই ম্যাচের সবচেয়ে বড় মুহূর্ত। স্কাই স্পোর্টসের বিশ্লেষক গ্যারি নেভিল ঘটনাটিকে প্রিমিয়ার লিগ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভিএআর সিদ্ধান্ত বলেও উল্লেখ করেছেন। কারণ, এই এক সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু একটি ম্যাচে সীমাবদ্ধ নয়। একদিকে আর্সেনালের শিরোপা দৌড়, অন্যদিকে ওয়েস্ট হামের টিকে থাকার লড়াই, দুটির ওপরই এর বড় প্রভাব পড়তে পারে। জয়ের পর ৩৬ ম্যাচে আর্সেনালের পয়েন্ট ৭৯। এক ম্যাচ কম খেলা ম্যানচেস্টার সিটির পয়েন্ট ৭৪। অর্থাৎ লিগের শেষ দুই ম্যাচ জিতলেই ২২ বছর পর প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা নিশ্চিত করবে আর্সেনাল। তাদের বাকি দুই ম্যাচ বার্নলির বিপক্ষে ঘরের মাঠে এবং শেষ দিনে ক্রিস্টাল প্যালেসের মাঠে। ওয়েস্ট হামের জন্য হারটি আরও কষ্টের। পুরো ম্যাচে লড়াই করেছে তারা, শেষ দিকে সমতাও প্রায় পেয়েই গিয়েছিল। কিন্তু ভিএআর তাদের আনন্দ কেড়ে নেয়। এই হারের পর অবনমন শঙ্কা আরও ঘনীভূত হলো। টটেনহাম যদি সোমবার লিডস ইউনাইটেডকে হারায়, তাহলে শেষ দুই ম্যাচ বাকি থাকতে নিরাপদ অবস্থান থেকে চার পয়েন্ট দূরে পড়ে যেতে পারে ওয়েস্ট হাম। ম্যাচ শেষে ওয়েস্ট হাম অধিনায়ক জ্যারড বোয়েন হতাশা লুকাননি। তিনি বলেন, ‘এটা বড় ধাক্কা। আমরা ভেবেছিলাম ম্যাচে ফিরতে অনেক ভালো করেছি, কিন্তু সেটি আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হলো। কাজটা কঠিন হবে। তবে এই ক্লাবে আমরা কখনো ‘অসম্ভব’ বলি না।’ আর্সেনালের শুরুটা ছিল দাপুটে। প্রথম ২০ মিনিটে ওয়েস্ট হামকে প্রায় নিজেদের অর্ধে আটকে রাখে তারা। ট্রসার্ড দুবার গোলের কাছাকাছি গিয়েছিলেন। প্রথমবার তাকে ঠেকান ওয়েস্ট হাম গোলকিপার মাডস হারমানসেন, এরপর তার আরেক প্রচেষ্টা লাগে পোস্টে। রিকার্দো কালাফিওরির শটও গোললাইন থেকে ফিরিয়ে দেন কনস্তানতিনোস মাভ্রোপানোস। তবে প্রথমার্ধের শেষ দিকে ওয়েস্ট হামও সুযোগ তৈরি করে। ভ্যালেন্তিন কাস্তেয়ানোসের হেড ফুল স্ট্রেচে ঠেকান রায়া। সেই সেভ আর্সেনালকে ম্যাচে রাখে। প্রথমার্ধেই ধাক্কা খায় আর্সেনাল। চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন রাইটব্যাক বেন হোয়াইট। কিছু সময় ডেকলান রাইস সেখানে দায়িত্ব নিলেও বিরতির পর রদবদল আনেন আরতেতা। ক্রিসথিয়ান মসকেরা রাইটব্যাকে নামেন, কালাফিওরি উঠে যান, মাইলস লুইস-স্কেলি মিডফিল্ড থেকে লেফটব্যাকে চলে যান। এই বদলের পর আর্সেনাল আগের ছন্দ আর পুরোপুরি ফিরে পায়নি। ওয়েস্ট হাম দ্বিতীয়ার্ধে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। মাতেয়ুস ফের্নান্দেস এক বড় সুযোগ পান। পাবলোর সঙ্গে ওয়ান-টু খেলে প্রায় গোলের মুখে পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু রায়া রিফ্লেক্স সেভে আর্সেনালকে আবারও বাঁচান। তারপরই আসে ম্যাচের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। বদলি হয়ে নামা ওডেগার্ড শান্ত মাথায় পাস দেন ট্রসার্ডকে। বেলজিয়ান ফরোয়ার্ড নিচু শটে বল জালে পাঠান। শিরোপা দৌড়ে হয়তো এই গোলের মূল্য মৌসুম শেষে আরও বড় হয়ে উঠতে পারে। আর্তেতা ম্যাচ শেষে রেফারির সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছেন। তার ভাষায়, ‘আজ বুঝলাম রেফারির কাজ কত কঠিন ও কত বড়। খুব কঠিন পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য রেফারিকে অভিনন্দন। এটা এমন এক মুহূর্ত ছিল, যা দুই বড় ক্লাবের ইতিহাস ও গতিপথ বদলে দিতে পারত।’ চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে ওঠার পর একই সপ্তাহে প্রিমিয়ার লিগেও এমন জয় আর্সেনালের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়াবে। কিন্তু আরতেতা জানেন, এখনো কাজ শেষ হয়নি। শেষ দুই ম্যাচে ভুল করলে সিটি সুযোগ নেবে। আর ভুল না করলে, ২০০৪ সালের পর প্রথমবার প্রিমিয়ার লিগ ট্রফি উঠতে পারে আর্সেনালের হাতে।
শেষ মুহূর্তের নাটকে ওয়েস্ট হামকে হারিয়ে শিরোপার আরও কাছে আর্সেনাল
বিশ্বকাপে অংশ নিতে ৭ শর্ত দিলেন ইরানের ফুটবলপ্রধান
বিশ্বকাপ শুরু হতে বাকি ৩২ দিন। মাঠের প্রস্তুতির সঙ্গে সঙ্গে এবার ইরানের বিশ্বকাপ যাত্রা ঘিরে বাড়ছে কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক জটিলতাও। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় হতে যাওয়া ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার আগে সাতটি শর্তের কথা জানিয়েছেন ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহদি তাজ। ইরানের স্পোর্টস চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাজ বলেছেন, জাতীয় দলের খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ, সাংবাদিক ও সমর্থকদের জন্য ভিসা, নিরাপত্তা ও সম্মানের নিশ্চয়তা থাকতে হবে। বিশেষ করে যাদের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির সঙ্গে অতীত সম্পর্ক আছে বলে যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডা প্রশ্ন তুলতে পারে, তাদের ভিসা জটিলতা ছাড়া পাওয়া জরুরি বলে মনে করছেন তিনি। এর আগে রয়টার্স জানিয়েছিল, বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে আইআরজিসি নিয়ে কোনো অপমানজনক পরিস্থিতি তৈরি হবে না, এমন নিশ্চয়তা ফিফার কাছে চাইছিলেন তাজ। তাজের দেওয়া শর্তের প্রথমটি হলো, ইরানের সব খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফকে কোনো জটিলতা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ভিসা দিতে হবে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, মেহদি তারেমি ও এহসান হাজসাফির মতো যারা বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার অংশ হিসেবে আইআরজিসিতে ছিলেন, তাদের ভিসা নিয়েও নিশ্চয়তা থাকতে হবে। দ্বিতীয় শর্ত, ভিসা পাওয়ার পর যাত্রাপথে খেলোয়াড় বা স্টাফদের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত জিজ্ঞাসাবাদ বা হয়রানির মুখে পড়তে হবে না। তাজের দাবি, দলকে এমন নিশ্চয়তা দিতে হবে, যাতে কানাডার ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়। তৃতীয় শর্ত সাংবাদিক ও সমর্থকদের নিয়ে। ইরানি সাংবাদিক এবং ম্যাচ দেখতে যাওয়া সমর্থকদের জন্য ভিসা ইস্যুর একটি পরিষ্কার প্রক্রিয়া থাকতে হবে। তাজ মনে করেন, বিশ্বকাপের মতো আসরে জাতীয় দলের সঙ্গে সংবাদমাধ্যম ও সমর্থকদের উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। চতুর্থ শর্ত নিরাপত্তা। যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষকে বিমানবন্দর, হোটেল, প্রধান সড়ক ও স্টেডিয়ামে সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তা দিতে হবে। ইরান দলের সফর, অনুশীলন, ম্যাচ এবং সমর্থকদের চলাচল যেন কোনো ধরনের ঝুঁকিতে না পড়ে, সেটিই এই শর্তের মূল কথা। পঞ্চম শর্ত পতাকা নিয়ে। ইরানের ম্যাচে দুই দলের সমর্থকেরা যেন শুধু নিজেদের সরকারি জাতীয় পতাকা নিয়ে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করেন, এমন দাবি করেছেন তাজ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের সরকারি পতাকা ছাড়া অন্য কোনো ইরান-সংশ্লিষ্ট পতাকা স্টেডিয়ামে অনুমতি পাওয়া উচিত নয়। ষষ্ঠ শর্ত জাতীয় সংগীত নিয়ে। ইরানের জাতীয় সংগীত প্রতিটি ম্যাচে সঠিকভাবে এবং কোনো ধরনের বিঘ্ন ছাড়াই বাজাতে হবে। তাজের মতে, জাতীয় প্রতীক ও আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে কোনো ভুল বা ব্যত্যয় গ্রহণযোগ্য হবে না। সপ্তম শর্ত সংবাদ সম্মেলন ঘিরে। তাজ বলেছেন, সাংবাদিকদের প্রশ্ন কেবল ম্যাচ ও ফুটবল-সংক্রান্ত টেকনিক্যাল বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। রাজনৈতিক প্রশ্ন বা বিতর্কিত প্রসঙ্গ সংবাদ সম্মেলনে না আসুক, সেটিই তার চাওয়া। এই শর্তগুলোর পেছনে আছে সাম্প্রতিক কানাডা-ঘটনার প্রেক্ষাপট। গত সপ্তাহে ফিফা কংগ্রেসে যোগ দিতে ভ্যাঙ্কুভার যাওয়ার পথে ইরান ফুটবল ফেডারেশনের প্রতিনিধি দল কানাডা সীমান্তে জটিলতায় পড়ে। পরে কানাডার অভিবাসনমন্ত্রী জানান, আইআরজিসির সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগে তাজের ভিসা মাঝপথেই বাতিল করা হয়েছিল। কানাডা ২০২৪ সালে আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে, যুক্তরাষ্ট্র এটি করেছিল ২০১৯ সালে। এরপর ফিফা মহাসচিব মাতিয়াস গ্রাফস্ট্রম ইরান ফেডারেশনকে চিঠি দিয়ে ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং বিশ্বকাপ প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনার জন্য ২০ মে জুরিখে বৈঠকের আমন্ত্রণ জানান। রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাজ ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গেও বৈঠকে এসব নিশ্চয়তা চাইতে পারেন। ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো এর আগে বলেছেন, ইরান ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নেবে এবং যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাচও খেলবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ইরানি খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণে ওয়াশিংটনের আপত্তি নেই, কিন্তু আইআরজিসির সঙ্গে সম্পর্ক আছে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দেওয়া হবে না। ইরানের অংশগ্রহণ ঘিরে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের কারণে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের ওপর হামলার পর দেশটির শীর্ষ লিগও স্থগিত আছে। ঘরোয়া ফুটবলাররা তেহরানে ক্যাম্পে অনুশীলন চালিয়ে গেলেও মাঠের প্রস্তুতির চেয়ে এখন বড় হয়ে উঠছে ভিসা, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক নিশ্চয়তার প্রশ্ন।
বিশ্বকাপে অংশ নিতে ৭ শর্ত দিলেন ইরানের ফুটবলপ্রধান
আনচেলত্তির ব্রাজিল দলে নেইমারকে দেখতে চান মেসি
বার্সেলোনার সেই দিনগুলো অনেক পেছনে। পিএসজির অধ্যায়ও শেষ। এখন লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনার অধিনায়ক, নেইমার ফিরেছেন সান্তোসে, আর সামনে আরেকটি বিশ্বকাপ। তবু বন্ধুত্বের জায়গাটা বদলায়নি। ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে নেইমারকে নিয়ে কথা উঠতেই মেসি জানালেন, ব্রাজিল দলে তাকে দেখতে পারলে খুশি হবেন। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় ১১ জুন শুরু হবে বিশ্বকাপ। তার আগে ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি নেইমারকে দলে নেবেন কি না, সেটি নিয়ে আলোচনা চলছে। চোট, ফিটনেস ও দীর্ঘদিন জাতীয় দলের বাইরে থাকা, সব মিলিয়ে নেইমারের বিশ্বকাপ ভবিষ্যৎ এখনও নিশ্চিত নয়। তবে মেসির চোখে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে সেরা খেলোয়াড়দের থাকা উচিত, আর নেইমার তাদের একজন। ‘লো দেল পোয়ো’ অনুষ্ঠানে মেসি বলেছেন, ‘আমি নিরপেক্ষ হতে পারি না, নেইমার আমার বন্ধু। আমি চাই সে বিশ্বকাপে থাকুক এবং তার সঙ্গে অনেক ভালো কিছু ঘটুক, কারণ মানুষ হিসেবেও সে এটা প্রাপ্য। আশা করি সে সেখানে থাকতে পারবে।’ মেসি ও নেইমারের সম্পর্ক শুধু মাঠের নয়। বার্সেলোনায় তারা লুইস সুয়ারেজকে সঙ্গে নিয়ে গড়েছিলেন সময়ের অন্যতম ভয়ংকর আক্রমণভাগ। পরে পিএসজিতেও একসঙ্গে খেলেছেন। সেই বন্ধুত্বের কারণেই মেসি নিজেই মেনে নিচ্ছেন, নেইমারকে নিয়ে তার মূল্যায়ন পুরোপুরি নিরপেক্ষ নয়। তবে বন্ধুত্বের বাইরে গিয়ে মেসির যুক্তিও পরিষ্কার। তার মতে, বিশ্বকাপ এমন মঞ্চ যেখানে সেরা খেলোয়াড়দের থাকা উচিত। নেইমার পুরো ফিট কি না, ফর্মের কোন জায়গায় আছেন, এসব প্রশ্ন থাকলেও তার মান ও প্রভাব নিয়ে মেসির সন্দেহ নেই। মেসির ভাষায়, ‘বিশ্বকাপে আমরা সেরা খেলোয়াড়দেরই দেখতে চাই। নেইমার যে অবস্থাতেই থাকুক, সে সবসময় তাদের একজন। ব্রাজিলের জন্য, ফুটবলের জন্য সে যা প্রতিনিধিত্ব করে, সেই কারণে বিশ্বকাপে তাকে পাওয়া দারুণ ব্যাপার হবে।’ নেইমারের সাম্প্রতিক সময়টা সহজ যায়নি। বাঁ হাঁটুর চোট তাকে দীর্ঘদিন ভুগিয়েছে। ব্রাজিলের হয়ে সর্বশেষ খেলেছেন ২০২৩ সালের অক্টোবরে, দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইয়ে উরুগুয়ের বিপক্ষে। সেই ম্যাচে ৪৫ মিনিট খেলেছিলেন তিনি। এরপর জাতীয় দলের জার্সিতে আর দেখা যায়নি তাকে। তবে সান্তোসে ফেরার পর ধীরে ধীরে ছন্দে ফিরছেন ৩৪ বছর বয়সি ফরোয়ার্ড। মৌসুমের কঠিন শুরুর পর এখন নিয়মিত খেলার সময় পাচ্ছেন। শেষ ১০ ম্যাচে তার গোল ৫টি, সঙ্গে ২টি অ্যাসিস্ট। নেইমারকে নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অবশ্য আনচেলত্তির। ব্রাজিল কোচ এখনও তার বিশ্বকাপ দলে নেইমারের জায়গা নিশ্চিত করেননি। তবে তিনি আগেই বলেছেন, নেইমার যদি শতভাগ ফিট হয়ে ফেরেন, তাহলে জাতীয় দলে খেলতে পারবেন। আনচেলত্তির কথায়, তিনি সবচেয়ে ফিট খেলোয়াড়দেরই ডাকবেন। ২০২৬ বিশ্বকাপ মেসির নিজের জন্যও বিশেষ হতে পারে। তিনি এখনও অংশ নেওয়ার ঘোষণা আনুষ্ঠানিকভাবে দেননি, তবে টুর্নামেন্টের সময় তার বয়স হবে ৩৯। অন্যদিকে নেইমারের সামনে প্রশ্ন, তিনি কি চোট কাটিয়ে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দলে ফিরতে পারবেন?  
আনচেলত্তির ব্রাজিল দলে নেইমারকে দেখতে চান মেসি
বাবাকে হারানোর দিনেই বার্সাকে শিরোপা জেতালেন ফ্লিক
বাবাকে হারানোর দিনেই বার্সাকে শিরোপা জেতালেন ফ্লিক
এক রাতের মধ্যে একজন মানুষের জীবনে কত রকম অনুভূতি যে জমা হতে পারে, হান্সি ফ্লিকের চোখ যেন তার উত্তর দিয়ে দিল। ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোক, ক্যাম্প ন্যুর নীরব শ্রদ্ধা, এল ক্লাসিকোর চাপ, আর শেষ পর্যন্ত লা লিগা শিরোপার উৎসব, সবকিছু মিলিয়ে বার্সেলোনা কোচের জন্য রাতটা হয়ে থাকল জীবনের সবচেয়ে আবেগময় দিনগুলোর একটি। রোববার (১০ মে) রাতে রিয়াল মাদ্রিদকে ২-০ গোলে হারিয়ে লা লিগা শিরোপা নিশ্চিত করেছে বার্সেলোনা। এটি কাতালান ক্লাবটির ইতিহাসের ২৯তম লিগ শিরোপা। তবে ম্যাচের ফলের বাইরেও রাতটার বড় গল্প ছিলেন ফ্লিক। ম্যাচের আগের রাতেই মারা যান তার বাবা। সেই ব্যক্তিগত শোক নিয়েই দর্শকপূর্ণ ক্যাম্প ন্যুতে ডাগআউটে দাঁড়ান জার্মান কোচ। কিক অফের আগে ফ্লিকের বাবার স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করে পুরো স্টেডিয়াম। সেই মুহূর্তে সম্প্রচার ক্যামেরায় দেখা যায়, চোখের জল ধরে রাখতে পারছেন না ফ্লিক। পাশে ছিলেন তার কোচিং স্টাফ ও খেলোয়াড়েরা। তারা তাকে সান্ত্বনা দেন। সেই নীরবতা থেকেই যেন রাতের আবেগের শুরু। মাঠে অবশ্য বার্সেলোনা কোচের দল তাকে ঠিক সেই উত্তরই দিয়েছে, যা এমন রাতে একজন কোচ তার খেলোয়াড়দের কাছ থেকে চাইতে পারেন। শুরু থেকেই আগ্রাসী, আত্মবিশ্বাসী ও পরিষ্কার পরিকল্পনার ফুটবল খেলেছে বার্সা। প্রথমার্ধেই ম্যাচের ভাগ্য লিখে দেয় তারা। মার্কাস রাশফোর্ডের দুর্দান্ত ফ্রি-কিকের পর ফেরান তোরেসের গোল, ২০ মিনিটের মধ্যেই ২-০ এগিয়ে যায় স্বাগতিকরা। এরপর আর রিয়াল মাদ্রিদকে ম্যাচে ফেরার সুযোগ দেয়নি ফ্লিকের দল। এই জয়ে তিন ম্যাচ হাতে রেখেই শিরোপা নিশ্চিত করে বার্সা। আরও বিশেষ ব্যাপার, শিরোপাটা এসেছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদকে হারিয়ে। ক্যাম্প ন্যুর সমর্থকদের সামনে এর চেয়ে মধুর দৃশ্য আর কী হতে পারত! শিরোপা উৎসবে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন ফ্লিক। স্বভাবতই খুব বেশি কথা বলেননি। কিন্তু তার কণ্ঠে আবেগ ছিল স্পষ্ট। ফ্লিক বলেন, ‘ম্যাচটা কঠিন ছিল। এই দিনটা আমি কখনো ভুলব না। দলকে ধন্যবাদ জানাতে চাই, ধন্যবাদ জানাতে চাই সবাইকে যারা আমাদের সমর্থন করেছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এমন একটা ভালো দল পেয়ে আমি খুব গর্বিত। সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিটি ম্যাচে লড়াই করার যে দৃঢ়তা তোমরা দেখিয়েছ, তার জন্য ধন্যবাদ। আমি সত্যিই এটা মূল্য দিই। আমার দল অসাধারণ, আমি আনন্দিত। খেলোয়াড়দের নিয়ে আমি খুব গর্বিত। সমর্থকদের সঙ্গে এখানে থাকা, এল ক্লাসিকোতে রিয়াল মাদ্রিদকে হারানো, এটা রোমাঞ্চকর। এখন আমার মনে হয়, আমাদের উদ্‌যাপন করা উচিত।’ এই শিরোপা ফ্লিকের জন্য শুধু একটি ট্রফি নয়, বার্সেলোনার সঙ্গে তার সম্পর্কেরও বড় সিলমোহর। মৌসুমজুড়ে তার দল খেলেছে ঝুঁকিপূর্ণ, আক্রমণাত্মক, অনেক সময় স্নায়ু পরীক্ষা নেওয়া ফুটবল। সব সময় নিখুঁত ছিল না, কিন্তু কখনো একঘেয়ে ছিল না। বার্সা সমর্থকেরা সেই সাহসী ফুটবলকে গ্রহণ করেছে, আর শেষ পর্যন্ত সেটিই এনে দিল লা লিগা। রিয়ালের বিপক্ষে এই জয় তাই সংখ্যার হিসাব ছাড়িয়ে গেছে। ২-০ স্কোরলাইন, ২৯তম লিগ শিরোপা, তিন ম্যাচ হাতে রেখে চ্যাম্পিয়ন হওয়া, এসবই বড়। কিন্তু রাতটির আসল ছবি হয়তো অন্যখানে, নীরবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে চোখ মুছছেন ফ্লিক, এরপর কয়েক ঘণ্টা পর সেই মানুষটিকেই আকাশে ছুড়ে দিচ্ছেন তাঁর খেলোয়াড়েরা।
রিয়ালের সামনেই বার্সেলোনার শিরোপা উৎসব
রিয়ালের সামনেই বার্সেলোনার শিরোপা উৎসব
শিরোপা জয়ের এর চেয়ে মধুর মঞ্চ আর কী হতে পারত স্প্যানিশ জায়ান্ট বার্সেলোনার জন্য! ক্যাম্প ন্যু, সামনে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদ, আর হিসাবটা সহজ, হার এড়ালেই লা লিগা নিজেদের। কিন্তু হান্সি ফ্লিকের দল শুধু প্রয়োজন মেটায়নি, শিরোপা উৎসবের দিনটাকে এল ক্লাসিকো জয়ের রঙে আরও উজ্জ্বল করেছে। ক্যাম্প ন্যুতে রিয়াল মাদ্রিদকে ২-০ গোলে হারিয়ে লা লিগার শিরোপা নিশ্চিত করেছে বার্সেলোনা।  প্রথমার্ধের ২০ মিনিটের মধ্যেই ম্যাচের ভাগ্য প্রায় লিখে ফেলেন মার্কাস রাশফোর্ড ও ফেরান তোরেস। নবম মিনিটে রাশফোর্ডের দুর্দান্ত ফ্রি-কিক, ১৮ মিনিটে তোরেসের ঠান্ডা মাথার ফিনিশ, এই দুই গোলেই রিয়ালকে হারিয়ে নিজেদের ইতিহাসে ২৯তম লা লিগা শিরোপা জিতল কাতালানরা। বার্সেলোনার জন্য জয়টা ছিল প্রতীকীও। পুরো মৌসুমে ঘরের মাঠে দাপট দেখানো দলটি লিগে নিজেদের মাঠে ১৮ ম্যাচের ১৮টিই জিতেছে। সেই নিখুঁত হোম রেকর্ডের শেষ বড় ছবিটা হলো রিয়াল মাদ্রিদের সামনে ট্রফি জয়। লিগে টানা ১০ ম্যাচ জিতল ফ্লিকের দল, যা তার অধীনে বার্সার সেরা ধারাবাহিকতা। ম্যাচের শুরু থেকেই বার্সার আক্রমণে ছিল ধার। অষ্টম মিনিটে বক্সের ঠিক বাইরে বিপজ্জনক জায়গায় ফ্রি-কিক পায় তারা। বলের সামনে দাঁড়ান রাশফোর্ড। কোর্তোয়ার নাগালের বাইরে, দেয়ালের ওপর দিয়ে, ক্রসবারের নিচে নিখুঁত বাঁকানো শটে বল জালে পাঠান ইংলিশ ফরোয়ার্ড। এল ক্লাসিকোতে বার্সার জার্সিতে এমন ফ্রি-কিক গোলের স্মৃতি খুব বেশি নেই। এমনকি একবিংশ শতকে রিয়ালের বিপক্ষে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে এটি বার্সার তৃতীয় ফ্রি-কিক গোল, আগেরটি করেছিলেন লিওনেল মেসি, ২০১২ সালে। রিয়াল সেই ধাক্কা সামলানোর আগেই দ্বিতীয় গোল। ১৮ মিনিটে বাম দিক থেকে ফেরমিন লোপেসের চিপ করা বল বক্সে পান দানি ওলমো। তিনি ব্যাকহিলে বল নামিয়ে দেন তোরেসের সামনে। তোরেস এক টাচ নিয়ে কোর্তোয়ার পাশ দিয়ে বল জালে পাঠান। ২০ মিনিটের মধ্যেই দুই শটে দুই গোল, বার্সেলোনার ক্লিনিক্যাল শুরুতে তখন ক্যাম্প ন্যুতে শিরোপা উৎসবের আবহ। রিয়াল সুযোগ পায়নি, তা নয়। গনসালো গার্সিয়া বক্সে ঢুকে পাশের জালে শট মারেন। অরেলিয়াঁ চুয়ামেনি একবার হেডে, একবার শটে গোলের কাছাকাছি গিয়েও লক্ষ্যভ্রষ্ট হন। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রও বক্সে বিপদ তৈরি করেছিলেন, কিন্তু এরিক গার্সিয়ার স্লাইডিং ইন্টারসেপশন বার্সাকে বাঁচায়। প্রথমার্ধে রিয়ালের শট বেশি থাকলেও গোলের সামনে ধার ছিল না। দ্বিতীয়ার্ধে রিয়াল কিছুটা বেশি আগ্রাসী হয়। ৬৩ মিনিটে জুড বেলিংহাম বল জালে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু বিল্ডআপে অফসাইড থাকায় গোলটি বাতিল হয়। সেটিই ছিল রিয়ালের সবচেয়ে বড় মুহূর্ত। তার বাইরে বার্সা গোলরক্ষক জোয়ান গার্সিয়াকে খুব বেশি পরীক্ষায় ফেলতে পারেনি আলভারো আরবেলোয়ার দল। বার্সারও সুযোগ ছিল ব্যবধান বাড়ানোর। ৫৭ মিনিটে তোরেস রিয়াল রক্ষণ ভেদ করে শট নেন, কোর্তোয়া পা বাড়িয়ে সেটি ঠেকান। ৮৩ মিনিটে বদলি রবার্ট লেভানডফস্কির জোরালো শটও ঠেকান রিয়াল গোলরক্ষক। তবু ২-০ স্কোরলাইন ধরে রাখতেই বেশি মনোযোগী ছিল বার্সা। ম্যাচে উত্তাপও কম ছিল না। রাউল আসেনসিওর ফাউলের পর দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি হয়। আসেনসিও ও ওলমো দুজনই হলুদ কার্ড দেখেন। পরে ট্রেন্ট আলেক্সান্ডার-আর্নল্ড ও রাফিনিয়াও হলুদ কার্ড পান। এল ক্লাসিকোর স্বাভাবিক স্নায়ুযুদ্ধ ছিল, কিন্তু স্কোরবোর্ডে বার্সার নিয়ন্ত্রণ কখনো সত্যিকারের ঝুঁকিতে পড়েনি। রিয়ালের জন্য এই হার মৌসুমের অস্থিরতার আরেকটি প্রতীক। ড্রেসিংরুমের টানাপোড়েন, ভালভার্দে-চুয়ামেনি বিতর্ক, এমবাপ্পেকে ঘিরে সমর্থকদের ক্ষোভ, সব মিলিয়ে ক্লাবটি আগেই চাপে ছিল। মাঠেও সেই অনিশ্চয়তার ছাপ স্পষ্ট। আক্রমণে সংযোগ কম, পজিশনে অস্পষ্টতা বেশি, আর বড় ম্যাচে প্রয়োজনীয় ক্লিনিক্যাল ফিনিশিংয়ের অভাব। এই জয়ে লা লিগার ২৯তম শিরোপা নিশ্চিত করল বার্সেলোনা। হাতে এখনো তিন ম্যাচ। শিরোপা আগেই নির্ধারিত হয়ে যাওয়ায় বাকি ম্যাচগুলো বার্সার জন্য হয়ে গেল উৎসবের মিছিল। অন্যদিকে রিয়ালের এখন লক্ষ্য দ্বিতীয় স্থান নিশ্চিত করা। কিন্তু চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর মাঠে নয়, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর সামনে শিরোপা হারানোর এই রাত রিয়ালের মৌসুমের হতাশাকে আরও গভীর করল।
শেষ মুহূর্তের নাটকে ওয়েস্ট হামকে হারিয়ে শিরোপার আরও কাছে আর্সেনাল
শেষ মুহূর্তের নাটকে ওয়েস্ট হামকে হারিয়ে শিরোপার আরও কাছে আর্সেনাল
প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা দৌড়ে এমন ম্যাচই অনেক সময় মৌসুমের গল্প বদলে দেয়। লন্ডন স্টেডিয়ামে আর্সেনালের সামনে ছিল ফাঁদ, চাপ, স্নায়ুর পরীক্ষা। একদিকে ২২ বছর পর লিগ শিরোপার স্বপ্ন, অন্যদিকে অবনমন বাঁচানোর মরিয়া লড়াইয়ে থাকা ওয়েস্ট হাম। শেষ পর্যন্ত সেই চাপের ম্যাচে লিয়ান্দ্রো ট্রসার্ডের দেরিতে করা গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতে শিরোপার আরও কাছে চলে গেল মিকেল আর্তেতার দল। ম্যাচের ৮৩ মিনিটে মার্টিন ওডেগার্ডের পাস থেকে নিচু শটে গোল করেন ট্রসার্ড। সেই গোলেই উল্লাসে ফেটে পড়ে আর্সেনাল সমর্থকেরা। তবে জয় নিশ্চিত হয়েছে আরও বড় নাটক পেরিয়ে। যোগ করা সময়ে ওয়েস্ট হাম বদলি ফরোয়ার্ড ক্যালাম উইলসন বল জালে পাঠিয়েছিলেন। লন্ডন স্টেডিয়াম তখন প্রায় বিস্ফোরিত। কিন্তু দীর্ঘ ভিএআর পরীক্ষার পর বিল্ডআপে আর্সেনাল গোলকিপার ডেভিড রায়ার ওপর ফাউলের কারণে গোলটি বাতিল করেন রেফারি ক্রিস কাভানাহ। এই সিদ্ধান্তই ম্যাচের সবচেয়ে বড় মুহূর্ত। স্কাই স্পোর্টসের বিশ্লেষক গ্যারি নেভিল ঘটনাটিকে প্রিমিয়ার লিগ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভিএআর সিদ্ধান্ত বলেও উল্লেখ করেছেন। কারণ, এই এক সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু একটি ম্যাচে সীমাবদ্ধ নয়। একদিকে আর্সেনালের শিরোপা দৌড়, অন্যদিকে ওয়েস্ট হামের টিকে থাকার লড়াই, দুটির ওপরই এর বড় প্রভাব পড়তে পারে। জয়ের পর ৩৬ ম্যাচে আর্সেনালের পয়েন্ট ৭৯। এক ম্যাচ কম খেলা ম্যানচেস্টার সিটির পয়েন্ট ৭৪। অর্থাৎ লিগের শেষ দুই ম্যাচ জিতলেই ২২ বছর পর প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা নিশ্চিত করবে আর্সেনাল। তাদের বাকি দুই ম্যাচ বার্নলির বিপক্ষে ঘরের মাঠে এবং শেষ দিনে ক্রিস্টাল প্যালেসের মাঠে। ওয়েস্ট হামের জন্য হারটি আরও কষ্টের। পুরো ম্যাচে লড়াই করেছে তারা, শেষ দিকে সমতাও প্রায় পেয়েই গিয়েছিল। কিন্তু ভিএআর তাদের আনন্দ কেড়ে নেয়। এই হারের পর অবনমন শঙ্কা আরও ঘনীভূত হলো। টটেনহাম যদি সোমবার লিডস ইউনাইটেডকে হারায়, তাহলে শেষ দুই ম্যাচ বাকি থাকতে নিরাপদ অবস্থান থেকে চার পয়েন্ট দূরে পড়ে যেতে পারে ওয়েস্ট হাম। ম্যাচ শেষে ওয়েস্ট হাম অধিনায়ক জ্যারড বোয়েন হতাশা লুকাননি। তিনি বলেন, ‘এটা বড় ধাক্কা। আমরা ভেবেছিলাম ম্যাচে ফিরতে অনেক ভালো করেছি, কিন্তু সেটি আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হলো। কাজটা কঠিন হবে। তবে এই ক্লাবে আমরা কখনো ‘অসম্ভব’ বলি না।’ আর্সেনালের শুরুটা ছিল দাপুটে। প্রথম ২০ মিনিটে ওয়েস্ট হামকে প্রায় নিজেদের অর্ধে আটকে রাখে তারা। ট্রসার্ড দুবার গোলের কাছাকাছি গিয়েছিলেন। প্রথমবার তাকে ঠেকান ওয়েস্ট হাম গোলকিপার মাডস হারমানসেন, এরপর তার আরেক প্রচেষ্টা লাগে পোস্টে। রিকার্দো কালাফিওরির শটও গোললাইন থেকে ফিরিয়ে দেন কনস্তানতিনোস মাভ্রোপানোস। তবে প্রথমার্ধের শেষ দিকে ওয়েস্ট হামও সুযোগ তৈরি করে। ভ্যালেন্তিন কাস্তেয়ানোসের হেড ফুল স্ট্রেচে ঠেকান রায়া। সেই সেভ আর্সেনালকে ম্যাচে রাখে। প্রথমার্ধেই ধাক্কা খায় আর্সেনাল। চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন রাইটব্যাক বেন হোয়াইট। কিছু সময় ডেকলান রাইস সেখানে দায়িত্ব নিলেও বিরতির পর রদবদল আনেন আরতেতা। ক্রিসথিয়ান মসকেরা রাইটব্যাকে নামেন, কালাফিওরি উঠে যান, মাইলস লুইস-স্কেলি মিডফিল্ড থেকে লেফটব্যাকে চলে যান। এই বদলের পর আর্সেনাল আগের ছন্দ আর পুরোপুরি ফিরে পায়নি। ওয়েস্ট হাম দ্বিতীয়ার্ধে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। মাতেয়ুস ফের্নান্দেস এক বড় সুযোগ পান। পাবলোর সঙ্গে ওয়ান-টু খেলে প্রায় গোলের মুখে পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু রায়া রিফ্লেক্স সেভে আর্সেনালকে আবারও বাঁচান। তারপরই আসে ম্যাচের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। বদলি হয়ে নামা ওডেগার্ড শান্ত মাথায় পাস দেন ট্রসার্ডকে। বেলজিয়ান ফরোয়ার্ড নিচু শটে বল জালে পাঠান। শিরোপা দৌড়ে হয়তো এই গোলের মূল্য মৌসুম শেষে আরও বড় হয়ে উঠতে পারে। আর্তেতা ম্যাচ শেষে রেফারির সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছেন। তার ভাষায়, ‘আজ বুঝলাম রেফারির কাজ কত কঠিন ও কত বড়। খুব কঠিন পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য রেফারিকে অভিনন্দন। এটা এমন এক মুহূর্ত ছিল, যা দুই বড় ক্লাবের ইতিহাস ও গতিপথ বদলে দিতে পারত।’ চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে ওঠার পর একই সপ্তাহে প্রিমিয়ার লিগেও এমন জয় আর্সেনালের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়াবে। কিন্তু আরতেতা জানেন, এখনো কাজ শেষ হয়নি। শেষ দুই ম্যাচে ভুল করলে সিটি সুযোগ নেবে। আর ভুল না করলে, ২০০৪ সালের পর প্রথমবার প্রিমিয়ার লিগ ট্রফি উঠতে পারে আর্সেনালের হাতে।
বিশ্বকাপে অংশ নিতে ৭ শর্ত দিলেন ইরানের ফুটবলপ্রধান
বিশ্বকাপে অংশ নিতে ৭ শর্ত দিলেন ইরানের ফুটবলপ্রধান
বিশ্বকাপ শুরু হতে বাকি ৩২ দিন। মাঠের প্রস্তুতির সঙ্গে সঙ্গে এবার ইরানের বিশ্বকাপ যাত্রা ঘিরে বাড়ছে কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক জটিলতাও। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় হতে যাওয়া ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার আগে সাতটি শর্তের কথা জানিয়েছেন ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহদি তাজ। ইরানের স্পোর্টস চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাজ বলেছেন, জাতীয় দলের খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ, সাংবাদিক ও সমর্থকদের জন্য ভিসা, নিরাপত্তা ও সম্মানের নিশ্চয়তা থাকতে হবে। বিশেষ করে যাদের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির সঙ্গে অতীত সম্পর্ক আছে বলে যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডা প্রশ্ন তুলতে পারে, তাদের ভিসা জটিলতা ছাড়া পাওয়া জরুরি বলে মনে করছেন তিনি। এর আগে রয়টার্স জানিয়েছিল, বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে আইআরজিসি নিয়ে কোনো অপমানজনক পরিস্থিতি তৈরি হবে না, এমন নিশ্চয়তা ফিফার কাছে চাইছিলেন তাজ। তাজের দেওয়া শর্তের প্রথমটি হলো, ইরানের সব খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফকে কোনো জটিলতা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ভিসা দিতে হবে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, মেহদি তারেমি ও এহসান হাজসাফির মতো যারা বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার অংশ হিসেবে আইআরজিসিতে ছিলেন, তাদের ভিসা নিয়েও নিশ্চয়তা থাকতে হবে। দ্বিতীয় শর্ত, ভিসা পাওয়ার পর যাত্রাপথে খেলোয়াড় বা স্টাফদের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত জিজ্ঞাসাবাদ বা হয়রানির মুখে পড়তে হবে না। তাজের দাবি, দলকে এমন নিশ্চয়তা দিতে হবে, যাতে কানাডার ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়। তৃতীয় শর্ত সাংবাদিক ও সমর্থকদের নিয়ে। ইরানি সাংবাদিক এবং ম্যাচ দেখতে যাওয়া সমর্থকদের জন্য ভিসা ইস্যুর একটি পরিষ্কার প্রক্রিয়া থাকতে হবে। তাজ মনে করেন, বিশ্বকাপের মতো আসরে জাতীয় দলের সঙ্গে সংবাদমাধ্যম ও সমর্থকদের উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। চতুর্থ শর্ত নিরাপত্তা। যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষকে বিমানবন্দর, হোটেল, প্রধান সড়ক ও স্টেডিয়ামে সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তা দিতে হবে। ইরান দলের সফর, অনুশীলন, ম্যাচ এবং সমর্থকদের চলাচল যেন কোনো ধরনের ঝুঁকিতে না পড়ে, সেটিই এই শর্তের মূল কথা। পঞ্চম শর্ত পতাকা নিয়ে। ইরানের ম্যাচে দুই দলের সমর্থকেরা যেন শুধু নিজেদের সরকারি জাতীয় পতাকা নিয়ে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করেন, এমন দাবি করেছেন তাজ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের সরকারি পতাকা ছাড়া অন্য কোনো ইরান-সংশ্লিষ্ট পতাকা স্টেডিয়ামে অনুমতি পাওয়া উচিত নয়। ষষ্ঠ শর্ত জাতীয় সংগীত নিয়ে। ইরানের জাতীয় সংগীত প্রতিটি ম্যাচে সঠিকভাবে এবং কোনো ধরনের বিঘ্ন ছাড়াই বাজাতে হবে। তাজের মতে, জাতীয় প্রতীক ও আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে কোনো ভুল বা ব্যত্যয় গ্রহণযোগ্য হবে না। সপ্তম শর্ত সংবাদ সম্মেলন ঘিরে। তাজ বলেছেন, সাংবাদিকদের প্রশ্ন কেবল ম্যাচ ও ফুটবল-সংক্রান্ত টেকনিক্যাল বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। রাজনৈতিক প্রশ্ন বা বিতর্কিত প্রসঙ্গ সংবাদ সম্মেলনে না আসুক, সেটিই তার চাওয়া। এই শর্তগুলোর পেছনে আছে সাম্প্রতিক কানাডা-ঘটনার প্রেক্ষাপট। গত সপ্তাহে ফিফা কংগ্রেসে যোগ দিতে ভ্যাঙ্কুভার যাওয়ার পথে ইরান ফুটবল ফেডারেশনের প্রতিনিধি দল কানাডা সীমান্তে জটিলতায় পড়ে। পরে কানাডার অভিবাসনমন্ত্রী জানান, আইআরজিসির সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগে তাজের ভিসা মাঝপথেই বাতিল করা হয়েছিল। কানাডা ২০২৪ সালে আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে, যুক্তরাষ্ট্র এটি করেছিল ২০১৯ সালে। এরপর ফিফা মহাসচিব মাতিয়াস গ্রাফস্ট্রম ইরান ফেডারেশনকে চিঠি দিয়ে ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং বিশ্বকাপ প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনার জন্য ২০ মে জুরিখে বৈঠকের আমন্ত্রণ জানান। রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাজ ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গেও বৈঠকে এসব নিশ্চয়তা চাইতে পারেন। ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো এর আগে বলেছেন, ইরান ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নেবে এবং যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাচও খেলবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ইরানি খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণে ওয়াশিংটনের আপত্তি নেই, কিন্তু আইআরজিসির সঙ্গে সম্পর্ক আছে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দেওয়া হবে না। ইরানের অংশগ্রহণ ঘিরে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের কারণে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের ওপর হামলার পর দেশটির শীর্ষ লিগও স্থগিত আছে। ঘরোয়া ফুটবলাররা তেহরানে ক্যাম্পে অনুশীলন চালিয়ে গেলেও মাঠের প্রস্তুতির চেয়ে এখন বড় হয়ে উঠছে ভিসা, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক নিশ্চয়তার প্রশ্ন।