বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর ফিফা বিশ্বকাপের কাউন্টডাউন এগিয়ে চলেছে। আর ৪০ দিনের অপেক্ষা তারপরই উত্তর আমেরিকার তিন দেশে শুরু হচ্ছে ফুটবলের মহোৎসব। মেক্সিকো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডায় হতে যাওয়া ৪৮ দলের লড়াই নিয়ে এশিয়া পোস্টের বিশেষ আয়োজন ‘৪৮ দিনে ৪৮ দল’-এর আজকের পর্বে থাকছে মিশর, এমন একটি দল যাদের ইতিহাস আছে, মহাদেশীয় সাফল্য আছে, আছে মোহাম্মদ সালাহর মতো বিশ্বতারকা। কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে এখনো একটি জয়ের অপেক্ষা তাদের শেষ হয়নি।
দল পরিচিতি

আফ্রিকান ফুটবলে মিশর মানেই ঐতিহ্য। আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল তারা। সাতবার মহাদেশীয় শিরোপা জেতা এই দলকে আফ্রিকায় আলাদা মর্যাদা দেওয়া হয়।
কিন্তু বিশ্বকাপের গল্পটা মিশরের জন্য একেবারেই ভিন্ন। আফ্রিকায় তারা যতটা সফল, বিশ্বকাপে ততটাই ব্যর্থ। ১৯৩৪ সালে প্রথম আফ্রিকান ও আরব দল হিসেবে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া মিশর এখনও মূল পর্বে কোনো ম্যাচ জিততে পারেনি।
এই বাস্তবতাই ২০২৬ বিশ্বকাপে তাদের গল্পকে আলাদা করে। এবার তারা শুধু অংশ নিতে যাচ্ছে না, যাচ্ছে বহু বছরের অপেক্ষা ভাঙার লক্ষ্য নিয়ে।
কোচ হোসাম হাসানের অধীনে দলটি নতুন আত্মবিশ্বাস পেয়েছে। মিশরের ফুটবল ইতিহাসে কিংবদন্তি এই সাবেক স্ট্রাইকার নিজে ১৯৯০ বিশ্বকাপে খেলেছেন। এখন তার সামনে দায়িত্ব, সালাহ-মারমুশদের নিয়ে বিশ্বকাপে মিশরের গল্প নতুন করে লেখা।
বিশ্বকাপে ইতিহাস
মিশরের বিশ্বকাপ ইতিহাস খুব দীর্ঘ নয়, কিন্তু গুরুত্ব অনেক। ১৯৩৪ সালে তারা প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলেছিল। সেটিই ছিল কোনো আফ্রিকান ও আরব দেশের প্রথম বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ।

এরপর দীর্ঘ অপেক্ষা। ১৯৩৪ থেকে ১৯৯০, মাঝখানে ৫৬ বছরের বেশি বিরতি। ১৯৯০ সালে আবার বিশ্বকাপে ফিরে তারা আয়ারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে ড্র করলেও ইংল্যান্ডের কাছে হেরে গ্রুপ পর্বেই বিদায় নেয়।
২০১৮ সালে সালাহকে নিয়ে অনেক আশা ছিল। কিন্তু রাশিয়ার বিশ্বকাপে তিন ম্যাচের তিনটিতেই হারতে হয় মিশরকে। উরুগুয়ে, রাশিয়া ও সৌদি আরবের বিপক্ষে হার দিয়ে শেষ হয় সেই অভিযান।

এবার ২০২৬ সালে মিশর ফিরছে আবার। ইতিহাস বলছে, তারা এখনও বিশ্বকাপে জয়হীন। আর সেটিই এবার সবচেয়ে বড় প্রেরণা।
বিশ্বকাপে মিশরের পারফরম্যান্স

যেভাবে বিশ্বকাপে ফারাওরা
২০২৬ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে মিশর ছিল দাপুটে। সিএএফ গ্রুপ ‘এ’-তে অপরাজিত থেকে শীর্ষে শেষ করে তারা বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে।

আট জয় ও দুই ড্র নিয়ে বাছাইপর্ব শেষ করা দলটি শুধু ফলের দিক থেকেই নয়, পরিসংখ্যানেও ছিল শক্তিশালী। পুরো বাছাইপর্বে তারা ২০ গোল করে, আর হজম করে মাত্র ২ গোল।
এই পারফরম্যান্স দেখিয়েছে, মিশর শুধু সালাহ নির্ভর দল নয়। রক্ষণ, মাঝমাঠ ও আক্রমণ, সব জায়গাতেই তারা আগের চেয়ে বেশি ভারসাম্যপূর্ণ।
বিশ্বকাপ গ্রুপ ও প্রতিপক্ষ
এবারের বিশ্বকাপে মিশর রয়েছে গ্রুপ ‘জি’-তে। তাদের সঙ্গে আছে বেলজিয়াম, নিউজিল্যান্ড ও ইরান।
বেলজিয়াম এই গ্রুপের সবচেয়ে শক্তিশালী দল। ইরান শারীরিকভাবে কঠিন এবং সংগঠিত, আর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি মিশরের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
মিশরের প্রথম লক্ষ্য হবে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম জয় পাওয়া। এরপরই আসবে নকআউটের হিসাব।
বিশ্বকাপের সম্ভাব্য স্কোয়াড
আসুন এবার সম্ভাব্য স্কোয়াড নিয়ে কথা বলি। গোলপোস্টে মিশরের হাতে অভিজ্ঞতা
আছে। মোহাম্মদ এল শেনাওয়ি এখনো বড় ম্যাচের নির্ভরতার নাম। তার সঙ্গে আছেন মোস্তফা শোবেইর, এল মাহদি সোলিমান ও মোহাম্মদ আলা। শেনাওয়ির অভিজ্ঞতা বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে মিশরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।

ডিফেন্সে মিশরের মূল ভরসা মোহাম্মদ আবদেলমোনেম। নিসে খেলা এই ডিফেন্ডার বাছাইপর্বে শক্ত রক্ষণভাগের অন্যতম মুখ ছিলেন। তার সঙ্গে হোসাম আবদেলমাগুইদ, রামি রাবিয়া, ইয়াসের ইব্রাহিম, মোহাম্মদ হানি ও আহমেদ আবু এল ফুতুহ ডিফেন্সে ভারসাম্য আনেন। আহমেদ হেগাজির অভিজ্ঞতাও বড় ম্যাচে কাজে আসতে পারে।
মিডফিল্ডে ইমাম আশুর, হামদি ফাথি ও মারওয়ান আতিয়ার হাতে ফুটবল মাঠের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখলের মিশন থাকে। তাদের সঙ্গে মোহনাদ লাশিন, আহমেদ নাবিল কোকা, মাহমুদ সাবের ও মোহাম্মদ লাশনিন শেহাতার মতো খেলোয়াড়রা ভালো বিকল্প তৈরি করেন। এই মাঝমাঠের কাজ হবে সালাহ-মারমুশদের জন্য জায়গা তৈরি করা এবং রক্ষণকে সুরক্ষা দেওয়া।
আক্রমণভাগে মিশরের শক্তি সবচেয়ে বেশি। মোহাম্মদ সালাহ এই দলের মুখ, নেতা এবং সবচেয়ে বড় ভরসা। তার সঙ্গে আছেন ওমর মারমুশ, ত্রেজেগে, মোস্তফা মোহামেদ, জিজো, ইব্রাহিম আদেল ও হাইসেম হাসান। সালাহর অভিজ্ঞতা, মারমুশের গতি আর মোস্তফা মোহামেদের শারীরিক উপস্থিতি মিশরকে আক্রমণে বৈচিত্র্য দিচ্ছে।
এই স্কোয়াডে বড় তারকা খুব বেশি নেই, কিন্তু সালাহকে ঘিরে তৈরি হওয়া আক্রমণ এবং শক্ত রক্ষণভাগ মিশরকে বিপজ্জনক করে তুলতে পারে।
বি.দ্র: এই স্কোয়াডটি মিশরের সাম্প্রতিক দল, খেলোয়াড়দের ক্লাব ফর্ম, ফিটনেস অবস্থা এবং সম্ভাব্য নির্বাচনের ভিত্তিতে তৈরি। বিশ্বকাপের চূড়ান্ত স্কোয়াড আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত এতে পরিবর্তন আসতে পারে।
শক্তিমত্তা
মিশরের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের আক্রমণভাগ। সালাহ এখনো এমন একজন খেলোয়াড়, যিনি এক মুহূর্তেই ম্যাচ বদলে দিতে পারেন।

তার পাশে ওমর মারমুশ থাকায় আক্রমণে গতি ও সরাসরি খেলার ক্ষমতা বাড়ে। মোস্তফা মোহামেদ বক্সে শারীরিক উপস্থিতি দেন, আর ত্রেজেগে বড় ম্যাচের অভিজ্ঞতা নিয়ে আসবেন।
রক্ষণেও মিশর শক্তিশালী। বাছাইপর্বে মাত্র দুই গোল হজম করাই তার প্রমাণ।
দুর্বলতা
বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে মিশরের অভিজ্ঞতা খুব ভালো নয়। এখনো জয় না পাওয়া মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।
আরেকটি প্রশ্ন হলো, দলটি সালাহর ওপর কতটা নির্ভর করবে। সালাহকে যদি প্রতিপক্ষ আটকাতে পারে, তাহলে অন্যদের এগিয়ে আসতে হবে।
কোচের কৌশল
হোসাম হাসান বাস্তববাদী ফুটবলে বিশ্বাসী । মিশরের শক্তি হলো দ্রুত আক্রমণ, উইং ব্যবহার এবং রক্ষণ থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসা।

৪-২-৩-১ বা ৪-৩-৩ ফরমেশনে মিশরকে দেখা যেতে পারে। মাঝমাঠে ভারসাম্য রেখে সালাহ ও মারমুশকে দ্রুত আক্রমণে ব্যবহার করাই হতে পারে মূল পরিকল্পনা।
মিশরের হয়ে যারা পার্থক্য গড়ে দিবে
মোহাম্মদ সালাহ এই দলের সবচেয়ে বড় নাম। বাছাইপর্বে গোল করে, নেতৃত্ব দিয়ে তিনি আবারও দেখিয়েছেন, মিশর এখনো তার দিকেই তাকিয়ে থাকে।

ওমর মারমুশ আক্রমণে গতি ও অনিশ্চয়তা যোগ করেন। তার ক্লাব ফুটবলের অভিজ্ঞতা মিশরের জন্য বড় সম্পদ।
মোস্তফা মোহামেদ বক্সে শারীরিক উপস্থিতি এবং অ্যারিয়াল থ্রেট এনে দিবেন।
মোহাম্মদ আবদেলমোনেম ডিফেন্সে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুখ। বিশ্বকাপে মিশর টিকে থাকতে চাইলে তার রক্ষণ নেতৃত্ব বড় ভূমিকা রাখবে।
প্রেডিকশন
মিশরের গ্রুপ কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। বেলজিয়াম এগিয়ে থাকবে, তবে নিউজিল্যান্ড ও ইরানের বিপক্ষে পয়েন্ট তোলার সুযোগ আছে।
আমাদের ধারণা, মিশর এই বিশ্বকাপে তাদের প্রথম জয়ের দেখা পেতে পারে। নকআউটে ওঠা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। গ্রুপে দ্বিতীয় বা সেরা তৃতীয় দলের লড়াইয়ে থাকতে হলে প্রথম দুই ম্যাচ থেকেই পয়েন্ট তুলতে হবে।
মিশরের ইতিহাস আছে, তারকা আছে, আফ্রিকান ফুটবলে সাফল্য আছে। কিন্তু বিশ্বকাপে এখনো জয় নেই।
২০২৬ বিশ্বকাপ তাই সালাহদের জন্য শুধু আরেকটি টুর্নামেন্ট নয়। এটি বহু বছরের অপেক্ষা শেষ করার সুযোগ।
প্রশ্ন একটাই, সালাহ-মারমুশদের মিশর কি এবার বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম জয় তুলে নতুন ইতিহাস লিখবে?




