বিশ্বকাপের কাউন্টডাউন এগিয়ে চলেছে। আর ৪১ দিনের অপেক্ষা তারপরই শুরু হচ্ছে ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ । ফুটবল বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া ৪৮ দল নিয়ে এশিয়া পোস্টের বিশেষ আয়োজন ‘৪৮ দিনে ৪৮ দল’-এর আজকের পর্বে থাকছে দক্ষিণ আফ্রিকা, এমন একটি দল যারা ১৬ বছর পর ফিরছে বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে।
দল পরিচিতি

দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবল গল্পটা অন্যরকম। ‘বাফানা বাফানা’ নামে পরিচিত এই দল ২০১০ সালে বিশ্বকাপ আয়োজন করে ইতিহাস গড়েছিল। ভুভুজেলার শব্দ, সিফিওয়ে শাবালালার সেই উদ্বোধনী গোল, আর পুরো আফ্রিকার আবেগ, সব মিলিয়ে সেই বিশ্বকাপ এখন ফুটবল ইতিহাসের অমর এক অংশ । সেই বিশ্বকাপে শাকিরার ‘ওয়াকা ওয়াকা’ এখনো ফুটবল ভক্তদের কানে বাজে।
কিন্তু আয়োজক হিসেবে সেই উপস্থিতির পর দীর্ঘ সময় বিশ্বকাপের বাইরে ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। ২০২৬ তাই তাদের জন্য শুধু আরেকটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি ফিরে আসার গল্পও।
কোচ হুগো ব্রোসের অধীনে দলটি এখন বেশি সংগঠিত, শৃঙ্খল এবং বাস্তববাদী। আগের মতো শুধু ব্যক্তিগত নৈপুণ্য নয়, এখন তারা দলগত কাঠামো ও পরিশ্রমের ওপরই বেশি নির্ভর করে।
বিশ্বকাপে ইতিহাস
দক্ষিণ আফ্রিকা এখন পর্যন্ত মোট তিনবার বিশ্বকাপ খেলেছে। ১৯৯৮, ২০০২ এবং ২০১০ সালে। ২০২৬ হবে তাদের চতুর্থ বিশ্বকাপ।

১৯৯৮ সালে ফ্রান্স বিশ্বকাপে অভিষেক। ডেনমার্ক ও সৌদি আরবের সঙ্গে ড্র করলেও ফ্রান্সের কাছে বড় হারে গ্রুপ পর্বেই বিদায় নেয় তারা।
২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপে প্রথম বিশ্বকাপ জয় পায় দক্ষিণ আফ্রিকা, স্লোভেনিয়াকে ১-০ গোলে হারিয়ে। তবুও গোল ব্যবধানে পিছিয়ে থেকে নকআউটে ওঠা হয়নি।

২০১০ সালে নিজেদের মাটিতে মেক্সিকোর সঙ্গে ১-১ ড্র, উরুগুয়ের কাছে ০-৩ হার এবং ফ্রান্সকে ২-১ গোলে হারিয়েও শেষ ষোলোতে ওঠা হয়নি। ইতিহাসে প্রথম আয়োজক দেশ হিসেবে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল তাদের।
বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার পারফরম্যান্স

যেভাবে বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকা
দক্ষিণ আফ্রিকার ২০২৬ বিশ্বকাপে ওঠার গল্প সহজ ছিল না। বাছাইপর্বে তারা এক পর্যায়ে তিন পয়েন্ট হারায়, কারণ লেসোথোর বিপক্ষে ম্যাচে নিষিদ্ধ খেলোয়াড় তেবোহো মোকোয়েনাকে খেলানোয় ফিফা সেই ম্যাচটি ৩-০ ব্যবধানে লেসোথোর পক্ষে দেয়।

তারপরও শেষ দিনে রুয়ান্ডাকে ৩-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপ ‘সি’-র শীর্ষে থেকে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করে দক্ষিণ আফ্রিকা। তাদের সাহায্য করে বেনিনের পয়েন্ট হারানোও। এই জয়ে ২০১০ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপে ফিরছে বাফানা বাফানা।
বিশ্বকাপ গ্রুপ ও প্রতিপক্ষ
এবারের বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকা রয়েছে গ্রুপ ‘এ’-তে। তাদের সঙ্গে আছে মেক্সিকো, দক্ষিণ কোরিয়া ও চেক রিপাবলিক। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেই মেক্সিকোর মুখোমুখি হবে দক্ষিণ আফ্রিকা, ঠিক ২০১০ সালের সেই স্মৃতি ফিরিয়ে এনে। সেই বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা-মেক্সিকো।
গ্রুপটি কঠিন। মেক্সিকো স্বাগতিক সুবিধা পাবে, দক্ষিণ কোরিয়া দ্রুতগতির এবং সংগঠিত আর এশিয়ার বড় পরাশক্তি। অন্যদিকে চেক রিপাবলিক ইউরোপীয় ফুটবলের শারীরিক ও ট্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় ফেলবে বাফানা বাফানাদের।
সম্ভাব্য বিশ্বকাপ স্কোয়াড
আসুন এবার নজর দেওয়া যাক ‘বাফানা বাফানা’ সম্ভাব্য বিশ্বকাপ স্কোয়াড নিয়ে। গোলপোস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে বড় ভরসা অধিনায়ক রনওয়েন উইলিয়ামস। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পেনাল্টি সেভ ও বড় ম্যাচে দৃঢ়তার কারণে তিনি আফ্রিকার অন্যতম সেরা গোলরক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার সঙ্গে ব্যাকআপ হিসেবে থাকতে পারেন রেনালদো লেনার ও রিকার্ডো গস।
ডিফেন্সে খুলিশো মুদাউ, অউব্রে মোডিবা, মবেকেজেলি মবোকাজি, সিয়াবোঙ্গা এনগেজানা, নকোসিনাথি সিবিসি, ইমে ওকন, গ্রান্ট কেকানা ও থাবাং মাতুলুডির মতো খেলোয়াড়রা আছেন। এনগেজানা চোট কাটিয়ে ফিরেছেন, ফিট থাকলে তিনি আবারও শুরুর একাদশের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নিতে পারেন।

মিডফিল্ডে তেবোহো মোকোয়েনা এই দলের হৃদস্পন্দন। তার পাশে স্পেফেলো সিথোলে, থালেন্তে মবাথা, থেম্বা জওয়ানে, জেডেন অ্যাডামস ও বাথুসি আউবাস দলকে ভারসাম্য এনে দিবেন। বয়স বাড়লেও জওয়ানের অভিজ্ঞতা টুর্নামেন্টের মতো মঞ্চে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
আক্রমণে লাইল ফস্টার, পার্সি টাউ, অসউইন আপোলিস, রেলেবোহিলে মোফোকেং, ইকরাম রেইনার্স, বঙোকুহলে হলংওয়ানে, এভিডেন্স মাকগোপা, থাপেলো মাসেকো ও এলিয়াস মোকওয়ানার মতো অপশন আছে। পার্সি টাউ অভিজ্ঞতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, আর মোফোকেং ও আপোলিস সাম্প্রতিক ফর্মে জায়গা প্রায় পাকা করে ফেলেছেন।
এই স্কোয়াডের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো দলগত বোঝাপড়া। ঘরোয়া লিগের দল মেমেলোদি সানডাউন্স ও অরলান্ডো পাইরেটসের অনেক খেলোয়াড় থাকায় জাতীয় দলে খেলোয়াড়দের মধ্যে ক্লাব পর্যায়ের রসায়ন দেখা যায়।
** এটি পুরোপুরি সম্ভাব্য স্কোয়াড। ইনজুরি ও অন্যান্য কারণে এটি পরিবর্তন হতে পারে তবে কোচ হুগো ব্রোসের সাম্প্রতিক মন্তব্য এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সাম্প্রতিক ম্যাচের সমন্বয়ে এই সম্ভাব্য স্কোয়াড তৈরি করা।
শক্তিমত্তা
দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের সংগঠিত দলগত খেলা। হুগো ব্রোসের অধীনে তারা এখন আগের চেয়ে বেশি শৃঙ্খল।
রনওয়েন উইলিয়ামস গোলপোস্টে বড় ভরসা তাদের জন্য। মাঝমাঠে মোকোয়েনা খেলার ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করবেন। আর ফরোয়ার্ড লাইল ফস্টার ও মোফোকেংদের গতি প্রতিপক্ষকে সমস্যায় ফেলতে পারে।
দুর্বলতা
বিশ্বকাপ মঞ্চে অভিজ্ঞতার অভাব বড় প্রশ্ন। এই স্কোয়াডের অনেক খেলোয়াড় প্রথমবার এমন বড় টুর্নামেন্টে খেলবেন।

আরেকটি সমস্যা হতে পারে গোল করার ধারাবাহিকতা। সুযোগ তৈরি হলেও বড় দলের বিপক্ষে তা কাজে লাগানো কঠিন হবে।
কোচের কৌশল

হুগো ব্রোস সাধারণত ৪-২-৩-১ বা ৪-৩-৩ কাঠামোতে দল সাজাতে পছন্দ করেন। তার ফুটবল বাস্তববাদী, কম ঝুঁকির এবং সংগঠিত।
মাঝমাঠে শক্ত ব্লক তৈরি করে দ্রুত আক্রমণে ওঠা, সেটিই হতে পারে দক্ষিণ আফ্রিকার মূল পরিকল্পনা। মেক্সিকোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই তারা হয়তো খুব হিসেবি ফুটবল খেলবে।
দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে যারা পার্থক্য গড়ে দিবে
রনওয়েন উইলিয়ামস এই দলের অধিনায়ক ও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মুখ। বড় ম্যাচে তার সেভই দক্ষিণ আফ্রিকার আশা বাঁচিয়ে রাখতে পারে।

তেবোহো মোকোয়েনা মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রক। লং রেঞ্জ শট ও পাসিংয়ের জন্য তিনি আলাদা।
লাইল ফস্টার আক্রমণে প্রধান ভরসা। তার শারীরিকতা ও গতি প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে চাপে ফেলতে পারে।
পার্সি টাউ অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে গুরুত্বপূর্ণ। টুর্নামেন্টের চাপ সামলাতে তার মতো খেলোয়াড় দরকার।
রেলেবোহিলে মোফোকেং তরুণ, কিন্তু বড় মঞ্চে চমক দেখানোর ক্ষমতা রাখেন।
প্রেডিকশন
দক্ষিণ আফ্রিকা গ্রুপ ‘এ’-তে আন্ডারডগ হিসেবেই নামবে। মেক্সিকো ও দক্ষিণ কোরিয়া কাগজে এগিয়ে, চেক রিপাবলিকও কঠিন প্রতিপক্ষ। তবে উদ্বোধনী ম্যাচে যদি তারা মেক্সিকোর কাছ থেকে পয়েন্ট নিতে পারে, তাহলে গ্রুপের হিসাব বদলে যেতে পারে। কিন্তু এশিয়া পোস্টের বিশ্লেষণ বাফানা বাফানা গ্রুপ পর্ব পেরোতে পারবে না। তবে ২০১০ সালের মতো এবারও তারা এক বা দুই ম্যাচে বড় চমক দেখাতে পারে।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্বকাপ গল্পে আবেগ আছে, স্মৃতি আছে, অপূর্ণতাও আছে।
২০১০ সালে তারা বিশ্বকে স্বাগত জানিয়েছিল। ২০২৬ সালে তারা ফিরছে নিজেদের জায়গা আদায় করে।




