ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় আসর ফিফা বিশ্বকাপের ২৩তম আসরের কাউন্টডাউন এগিয়ে চলেছে। আর ৪৩ দিনের অপেক্ষা তারপরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় মাঠে গড়াবে ৪৮ দলের এই আসর।
এশিয়া পোস্টের বিশেষ আয়োজন ‘৪৮ দিনে ৪৮ দল’-এর আজকের পর্বে থাকছে সুইডেন। ইউরোপের এই দলটি এবার বিশ্বকাপে এসেছে অদ্ভুত এক পথ ধরে।
দল পরিচিতি

সুইডেন ইউরোপিয়ান ফুটবলের পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী নাম। বিশ্বকাপের ইতিহাসে তাদের সাফল্যও কম নয়। একসময় তারা ফাইনাল খেলেছে, তৃতীয় হয়েছে, বড় দলগুলোর বিপক্ষে চোখে চোখ রেখে লড়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই ধারাবাহিকতা হারিয়ে ফেলেছিল দলটি।
২০২২ বিশ্বকাপে সুইডেন খেলতে পারেনি। ২০২৬ বাছাইপর্বেও শুরুটা ছিল হতাশাজনক। গ্রুপে কোনো ম্যাচ না জিতে তলানিতে শেষ করেছিল তারা। সাধারণ নিয়মে এই জায়গা থেকে বিশ্বকাপে যাওয়ার কথা নয়।
কিন্তু এখানেই সুইডেনের গল্পটা আলাদা। নেশনস লিগের সাফল্য তাদের প্লে-অফে সুযোগ এনে দেয়। আর সেই সুযোগ ধরে বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে গ্রাহাম পটারের দল।
বিশ্বকাপে সুইডেনের ইতিহাস
সুইডেনের বিশ্বকাপ ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। ১৯৫৮ সালে নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেছিল তারা। সেই ফাইনালে পেলের ব্রাজিলের কাছে হেরে রানার্সআপ হওয়াই এখন পর্যন্ত তাদের সেরা সাফল্য।

এর বাইরে ১৯৫০ ও ১৯৯৪ সালে তৃতীয় হয়েছে সুইডেন। ১৯৩৮ সালে হয়েছিল চতুর্থ। অর্থাৎ বিশ্বকাপের সেরা চারে চারবার জায়গা করে নেওয়া দল তারা।

সাম্প্রতিক সময়ে ২০০২ ও ২০০৬ সালে শেষ ষোলো, ২০১৮ সালে কোয়ার্টার ফাইনাল, এরপর ২০২২ বিশ্বকাপ মিস। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপে ফেরা তাদের জন্য এক ধরনের পুনরুদ্ধারও।
বিশ্বকাপে সুইডেনের পারফরম্যান্স

যেভাবে বিশ্বকাপে
সুইডেনের ২০২৬ বিশ্বকাপে ওঠার পথ ছিল একেবারে নাটকীয়। উয়েফার মূল বাছাইপর্বে তারা তাদের গ্রুপে কোনো জয়ই পায়নি। চার হার ও এক ড্র নিয়ে তারা কার্যত ছিটকে পড়েছিল।
তবে ২০২৪-২৫ নেশনস লিগে গ্রুপ জেতার কারণে প্লে-অফে সুযোগ পায় তারা। সেই সুযোগটিই বদলে দেয় পুরো গল্প। প্লে-অফ সেমিফাইনালে ইউক্রেনকে হারানোর পর ফাইনালে পোল্যান্ডকে ৩-২ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করে সুইডেন। শেষ দিকে জয়সূচক গোল করেন ভিক্টর জিওকেরেস।

এভাবে বাছাইপর্বে ব্যর্থ হয়েও নেশনস লিগের পথ ধরে বিশ্বকাপে ওঠা সুইডেনের গল্পটা একারণে অন্য সবার থেকে আলাদা।
বিশ্বকাপ গ্রুপ ও প্রতিপক্ষ
এবারের বিশ্বকাপে সুইডেন রয়েছে গ্রুপ ‘এফ’-এ। তাদের সঙ্গে আছে নেদারল্যান্ডস, জাপান এবং তিউনিসিয়া। ফিফার সূচি অনুযায়ী সুইডেনের প্রথম ম্যাচ তিউনিসিয়ার বিপক্ষে, এরপর নেদারল্যান্ডস ও জাপানের মুখোমুখি হবে তারা।
গ্রুপটি সহজ নয়। নেদারল্যান্ডস শক্তিশালী ও অভিজ্ঞ, জাপান দ্রুতগতির ও সংগঠিত, আর তিউনিসিয়া শারীরিকভাবে কঠিন প্রতিপক্ষ। সুইডেনকে নকআউটে যেতে হলে শুরু থেকেই পয়েন্ট তুলতে হবে।
বর্তমান স্কোয়াড
আসুন এবার নজর দেওয়া যাক স্ক্যান্ডেনিভিয়ান এই দেশটির বর্তমান স্কোয়াড নিয়ে। গোলপোস্টে সুইডেনের হাতে আছে অভিজ্ঞতা ও তরুণ বিকল্পের মিশেল। ক্রিস্টোফার নর্ডফেল্ট অভিজ্ঞ নাম, তার সঙ্গে আছেন নোয়েল টর্নকভিস্ট ও সু।

ডিফেন্সে ভিক্টর লিন্ডেলফ এখনো সবচেয়ে পরিচিত মুখ। তার সঙ্গে কার্ল স্টারফেল্ট, গ্যাব্রিয়েল গুডমুন্ডসন, ড্যানিয়েল স্ভেনসন, গুস্তাফ লাগেরবিয়েলকে ও ভিক্টর এরিকসনের মতো খেলোয়াড়রা সবকিছু বাজি রেখে লড়বেন। এই ডিফেন্সকে গ্রুপ পর্বে বড় পরীক্ষা দিতে হবে, কারণ নেদারল্যান্ডস ও জাপানের আক্রমণ দুটোই ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবে।
মিডফিল্ডে সুইডেনের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। লুকাস বের্গভাল, হুগো লারসন ও ইয়াসিন আয়ারি তরুণ হলেও ইউরোপিয়ান ফুটবলে নিজেদের পরিচিত করছেন। তাদের সঙ্গে আছেন ম্যাটিয়াস স্ভানবার্গ, জেসপার কার্লস্ট্রোম, এরিক স্মিথ, উইলিয়ট স্ভেদবার্গ ও বেসফোর্ট জেনেলির মতো অপশন। গ্রাহাম পটারের জন্য এই মাঝমাঠই হতে পারে কৌশল বদলের জায়গা।
আক্রমণে সুইডেনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র আর্সেনালের ভিক্টর জিওকেরেস। প্লে-অফে তার গোলই দলকে বিশ্বকাপে তুলেছে। তার সঙ্গে অ্যান্থনি এলাঙ্গা, বার্সেলোনার রুনি বার্ডঘজি শক্ত ত্রয়ী। বেঞ্জামিন নিগ্রেন ও গুস্তাফ নিলসনের মতো খেলোয়াড়রা আক্রমণে গতি ও বৈচিত্র্য এনে দিবেন।
এই লাইনেই আছে আরেকটি বড় নাম, আলেকজান্ডার ইসাক। চলতি মৌসুমেই ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের রেকর্ড ট্রান্সফারে তিনি লিভারপুলে যোগ দেন। ইউরোপের শীর্ষ লিগে নিজেকে প্রমাণ করা এই ফরোয়ার্ড সুইডেনের সবচেয়ে টেকনিক্যাল ও বহুমুখী আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের একজন। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে তিনি অটোমেটিক চয়েজ নন, তবুও বড় ম্যাচে তার উপস্থিতি আলাদা মাত্রা যোগ করতে পারে।
এই স্কোয়াডে বড় তারকা কম, কিন্তু আক্রমণে গতি, মাঝমাঠে শক্তি আর সামনের লাইনে একাধিক অপশন থাকায় সুইডেনকে পুরোপুরি অবহেলা করার সুযোগ নেই।
শক্তিমত্তা
সুইডেনের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের দ্রুত ট্রানজিশন ও শারীরিক উপস্থিতি। জিওকেরেসের মতো স্ট্রাইকার থাকলে সরাসরি ফুটবলও কার্যকর হতে পারে।
এলাঙ্গা ও বার্ডঘজির গতি প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে চাপে রাখতে পারে। মাঝমাঠে বের্গভাল ও লারসনের মতো তরুণরা যদি নিজেদের ছন্দ খুঁজে পায়, সুইডেন আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।

দুর্বলতা
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ধারাবাহিকতা। মূল বাছাইপর্বে কোনো ম্যাচ না জেতা দলটির দুর্বলতা সবার চোখেই ধরা দিবে।
ডিফেন্সেও অনিশ্চয়তা আছে। বড় দলের বিপক্ষে দীর্ঘ সময় চাপ সামলাতে হলে তাদের অনেক বেশি সংগঠিত থাকতে হবে।
কোচের কৌশল

গ্রাহাম পটার সাধারণত বল দখল, পজিশনাল শেপ এবং নমনীয় কৌশলে বিশ্বাসী। তবে বিশ্বকাপে এই সুইডেনকে খুব বাস্তববাদীভাবে খেলতে হতে পারে।
নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে রক্ষণ ঠিক রাখা, জাপানের বিপক্ষে ট্রানজিশন সামলানো, আর তিউনিসিয়ার বিপক্ষে তিন পয়েন্টের জন্য ঝুঁকি নেওয়া, এই তিন পরীক্ষাই পটারের সামনে থাকবে।
সুইডেনের হয়ে যারা পার্থক্য গড়ে দিবে
ভিক্টর জিওকেরেস এই দলের সবচেয়ে বড় ভরসা। প্লে-অফে তার গোলই সুইডেনকে বিশ্বকাপে ফিরিয়েছে।
অ্যান্থনি এলাঙ্গা গতি দিয়ে ম্যাচ বদলে দিতে পারেন। লুকাস বের্গভাল মাঝমাঠে ভবিষ্যতের মুখ, এই উঠতি তারকা বিশ্বকাপেই বড় ভূমিকা পেতে পারেন।

ভিক্টর লিন্ডেলফ ডিফেন্সে অভিজ্ঞতার জায়গা ধরে রাখবেন।
রুনি বার্ডঘজি তরুণ হলেও বড় ম্যাচে চমক দেখানোর ক্ষমতা রাখেন।
প্রেডিকশন
সুইডেন এই গ্রুপে ফেভারিট নয়। নেদারল্যান্ডস ও জাপান কাগজে এগিয়ে। তিউনিসিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি তাই তাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
আমাদের ধারণা, সুইডেন গ্রুপে তৃতীয় হওয়ার লড়াই করবে। সেরা তৃতীয় দলের একটি হয়ে নকআউটে ওঠার সুযোগ থাকলেও সেটি নির্ভর করবে প্রথম ম্যাচের ফলের ওপর।
সুইডেনের গল্পটা এবার অদ্ভুত, কিন্তু আকর্ষণীয়।
যে দলটির আসার কথা ছিল না, তারাই এখন বিশ্বকাপের মঞ্চে।
প্রশ্ন একটাই, জিওকেরেস-পটারের সুইডেন কি শুধু ফিরে আসার গল্প লিখবে, নাকি বিশ্বকাপেও চমক দেখাবে?




