বিশ্ব ফুটবলের মহাযজ্ঞ ফিফা বিশ্বকাপের কাউন্টডাউন এগিয়ে চলেছে। আর ৪৫ দিনের অপেক্ষা এরপরই সোনালী ট্রফির লড়াইয়ে নামবে ৪৮ দল। বিশ্বকাপ নিয়ে এশিয়া পোস্টের বিশেষ আয়োজন ‘৪৮ দিনে ৪৮ দল’-এর আজকের পর্বে থাকছে সুইজারল্যান্ড, এমন একটি দল যারা হয়তো খুব আলোচনায় থাকে না তবে বড় মঞ্চে নিয়মিতই নিজেদের জায়গা তৈরি করে নেয়।
দল পরিচিতি
-17773725538310.webp)
ইউরোপের ফুটবল মানচিত্রে সুইজারল্যান্ড হয়তো সবচেয়ে আলোচিত নাম নয়, কিন্তু সবচেয়ে ধারাবাহিক দলগুলোর একটি।
আয়তনে ছোট, জনসংখ্যাও সীমিত। তবুও ছবির মতো সুন্দর এই দেশটি বড় টুর্নামেন্টে এমনভাবে উঠে আসে, যেন তাদের উপস্থিতি অবধারিত।
ফুটবল দল হিসেবে সুইসদের শক্তি তাদের শৃঙ্খলায়। তারা খুব কম ভুল করে, নিজেদের দলীয় কাঠামো ঠিক রাখে এবং প্রতিপক্ষকে সহজে সুযোগ দেয় না।
কোচ মুরাত ইয়াকিনের এই দলটা তারকা নির্ভর নয়, বরং সিস্টেম নির্ভর। আর এই কারণেই তারা বারবার বড় দলের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে ওঠে।
বিশ্বকাপে ইতিহাস
সুইজারল্যান্ডের বিশ্বকাপ ইতিহাস অনেক পুরোনো, কিন্তু তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাদের ধারাবাহিকতায়।
‘নাতি’ ডাকনামের দলটি ১২বার বিশ্বকাপ খেলে তিনবার কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে—১৯৩৪, ১৯৩৮ এবং ১৯৫৪ সালে। যদিও সেটিই এখনো তাদের সেরা সাফল্য, তবুও সাম্প্রতিক সময়ে তারা নিয়মিত নকআউট পর্বে খেলছে।

১৯৯৪ সালের পর থেকে ছয়টি বিশ্বকাপের মধ্যে পাঁচবার শেষ ষোলোতে উঠেছে সুইসরা।
বিশেষ করে ২০০৬ বিশ্বকাপে তারা তৈরি করে এক অনন্য রেকর্ড একটিও গোল না খেয়েই টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেওয়া একমাত্র দল। টাইব্রেকারে হেরে গেলেও সেই ডিফেন্সিভ দৃঢ়তা আজও আলাদা করে আলোচনায় আসে।

বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ডের পারফরম্যান্স
| বছর | আয়োজক দেশ | ফলাফল |
|---|---|---|
| ১৯৩৪ | ইতালি | কোয়ার্টার ফাইনাল |
| ১৯৩৮ | ফ্রান্স | কোয়ার্টার ফাইনাল |
| ১৯৫৪ | সুইজারল্যান্ড | কোয়ার্টার ফাইনাল |
| ১৯৯৪ | যুক্তরাষ্ট্র | শেষ ষোলো |
| ২০০৬ | জার্মানি | শেষ ষোলো |
| ২০১০ | দক্ষিণ আফ্রিকা | গ্রুপ পর্ব |
| ২০১৪ | ব্রাজিল | শেষ ষোলো |
| ২০১৮ | রাশিয়া | শেষ ষোলো |
| ২০২২ | কাতার | শেষ ষোলো |
যেভাবে বিশ্বকাপে সুইসরা
২০২৬ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে সুইজারল্যান্ড বেশ সহজেই পার করেছে। গ্রুপে অপরাজিত থেকে তারা সরাসরি জায়গা নিশ্চিত করে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে হওয়া এই ৪৮ দলের আসরে।
বিশ্বকাপ গ্রুপ ও প্রতিপক্ষ
সুইজারল্যান্ড রয়েছে গ্রুপ ‘সি’-তে। তাদের সঙ্গে আছে কাতার, কানাডা এবং চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালিকে বাদ করা বসনিয়া এন্ড হার্জেগোভেনিয়া।
গ্রুপটিতে কানাডা ঘরের মাঠের সুবিধা পাবে, কাতার টেকনিক্যাল ফুটবল খেলতে পারে, আর বসনিয়াও স্বাভাবিকভাবেই সহজ হবে না।
তাই এই গ্রুপে সুইজারল্যান্ডের জন্য প্রতিটি ম্যাচই গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান স্কোয়াড
আসুন এবার বর্তমান স্কোয়াড নিয়ে কথা বলি। গোলপোস্টে ইয়ান সোমার এখনও প্রথম পছন্দ। গ্রেগর কোবেল ডেপুটি, তার সঙ্গে আছেন ইভন মভোগো ও মারভিন কেলার।

ডিফেন্সে ইন্টার মিলানের ম্যানুয়েল আকানজির হাতে নেতৃত্ব থাকবে। তার সঙ্গে এলভেদি, আমেন্দা, জাকুয়েজের মতো খেলোয়াড়রা শক্ত ভিত তৈরি করবে। ফুলব্যাকে রদ্রিগেজ ও ভিডমার অভিজ্ঞতার জায়গায় অপরিবর্তিত।
মিডফিল্ডে অধিনায়ক গ্রানিত জাকা এই দলের কেন্দ্রবিন্দু। তার সঙ্গে জাকারিয়া, ফ্রয়লার, সো ও মানজাম্বির মতো খেলোয়াড়রা ভালো ভারসাম্যই তৈরি করেন।
আক্রমণে এমবলো প্রধান ভরসা। তার সঙ্গে এনদোয়ে, ভার্গাস ও ওকাফরের মতো দ্রুতগতির উইঙ্গাররা দলটিকে দারুণ এক অ্যাটাকিং ইউনিট হিসেবে কাজ করায়।
এই স্কোয়াডে হয়তো বড় সুপারস্টার নেই, কিন্তু প্রতিটি পজিশনে লড়াই করার মতো ফুটবলার আছে।
শক্তিমত্তা
সুইজারল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের সংগঠিত খেলা। ডিফেন্স থেকে মিডফিল্ড—সব জায়গায় একটি নির্দিষ্ট কাঠামো বজায় থাকে এবং তাদের এই কাঠামো শত আক্রমণের মাঝেও টিকে থাকার জন্য তৈরি।
দুর্বলতা
সুইসদের সবচেয়ে বড় সমস্যা গোল করার ধারাবাহিকতা। সুযোগ তৈরি করলেও শেষ পর্যন্ত তা কাজে লাগাতে পারে না অনেক সময়।
কোচের কৌশল

মুরাত ইয়াকিন ভারসাম্যপূর্ণ ফুটবলে বিশ্বাসী। ৪-৩-৩ বা ৩-৪-২-১ ফরমেশনে দল সাজিয়ে প্রতিপক্ষ অনুযায়ী কৌশল বদলান।
সুইজারল্যান্ডের হয়ে যারা পার্থক্য গড়ে দিবে
-17773142386100.webp)
গ্রানিত জাকা এই দলের নেতৃত্বের কেন্দ্রে। সান্ডারল্যান্ডের এই মিডফিল্ডার নিজের দিনে যেকোন মিডফিল্ড কন্ট্রোল করতে পারেন। ডিফেন্সে অভিজ্ঞ সেনানী ম্যানুয়েল আকানজির উপর ভরসা রাখাই যায়। আর আক্রমণে এমবলো প্রধান ভরসা। সেই সাথে এনদোয়ে ও ভার্গাস তাদের আনপ্রেডিক্টেবিলিটি দিয়ে ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারে।
প্রেডিকশন
সুইজারল্যান্ডকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। গ্রুপ পর্ব পেরোনো সম্ভব। কিন্তু আসল প্রশ্ন, তারা কি শেষ ষোলো পেরোতে পারবে? এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস থেকে আমাদের প্রেডিকশন তারা আবারও নকআউটে উঠবে। এরপরের পথ নির্ভর করবে প্রতিপক্ষ এবং কৌশলের ওপর।
সুইজারল্যান্ডের গল্পটা শান্ত, কিন্তু ধারাবাহিক।
তারা খুব বেশি শিরোনামে থাকে না, কিন্তু টুর্নামেন্টের শেষদিকে প্রায়ই দেখা যায়।
প্রশ্ন একটাই এবার কি সুইসদের পুরোনো গল্প বদলাবে? শেষ ষোলো পেরিয়ে কি তারা নতুন ইতিহাস লিখবে?




