বিশ্বকাপের কাউন্টডাউন চলেছে। আর ৪৬ দিনের অপেক্ষা তারপরই শুরু হবে এক সোনালী ট্রফির জন্য ৪৮ দলের যুদ্ধ। এবারের বিশ্বকাপে খেলা দলগুলোকে নিয়ে এশিয়া পোস্টের বিশেষ আয়োজন ‘৪৮ দিনে ৪৮ দল’-এর আজকের পর্বে থাকছে এশিয়ার পরাশক্তি জাপান। যারা এখন আর শুধু এশিয়ার প্রতিনিধি নয়, বিশ্বকাপের বড় মঞ্চে নিয়মিত চমক দেখানো এক শক্তিশালী প্রতিপক্ষ।
দল পরিচিতি

জাপানকে বলা হয় সামুরাই ব্লু। নামের মতোই তাদের ফুটবলেও আছে শৃঙ্খলা, গতি এবং লড়াইয়ের মানসিকতা। ১৯৯৮ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার পর থেকে তারা ধীরে ধীরে নিজেদের বদলে ফেলেছে। একসময় যারা বিশ্বকাপের নতুন মুখ ছিল, এখন তারাই বড় দলগুলোর বিপক্ষে ভয়ডরহীন ফুটবল খেলে।
কোচ হাজিমে মোরিয়াসুর অধীনে জাপান পেয়েছে স্থিরতা। দীর্ঘ সময় ধরে একই কোচের অধীনে খেলার সুবিধা হলো, দলের কাঠামো পরিষ্কার থাকে। খেলোয়াড়রা জানে কখন প্রেস করতে হবে, কখন নিচে নামতে হবে, আর কখন দ্রুত আক্রমণে উঠতে হবে।
জাপানের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে মানসিকতায়। আগে তারা ভালো খেলত, কিন্তু বড় ম্যাচে শেষ পর্যন্ত থেমে যেত। এখন তারা শুধু ভালো খেলে না, জিততেও জানে। ২০২২ বিশ্বকাপে জার্মানি ও স্পেনকে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়া তারই প্রমাণ।
বিশ্বকাপে জাপানের ইতিহাস
জাপানের বিশ্বকাপ ইতিহাস খুব পুরোনো নয়, কিন্তু ধারাবাহিকতায় ভরা। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্স বিশ্বকাপে অভিষেকের পর থেকে তারা টানা আটটি বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে। এশিয়ান ফুটবলের জন্য এটি বড় অর্জন।

এখন পর্যন্ত চারবার শেষ ষোলোতে উঠেছে জাপান। ২০০২ সালে ঘরের মাঠে প্রথমবার নকআউটে যাওয়া, ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় শেষ ষোলো, ২০১৮ সালে কলম্বিয়াকে হারিয়ে নকআউট, আর ২০২২ সালে জার্মানি ও স্পেনকে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়া, প্রতিটি অধ্যায়ই আলাদা।

তবে একটা জায়গায় জাপানের গল্প বারবার থেমে গেছে। শেষ ষোলো।
২০১০ সালে প্যারাগুয়ের কাছে টাইব্রেকারে হার, ২০১৮ সালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের ধাক্কা, ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে পেনাল্টিতে বিদায়। ভালো খেলার পরও শেষ আটে যেতে না পারার আক্ষেপটা তাই এখন বড় হয়ে উঠেছে।
২০২৬ বিশ্বকাপে জাপানের লক্ষ্য শুধু নকআউটে ওঠা নয়। লক্ষ্য সেই পুরনো বাধা ভাঙা।
বিশ্বকাপে জাপানের পারফরম্যান্স
| বছর | আয়োজক দেশ | ফলাফল |
|---|---|---|
| ১৯৯৮ | ফ্রান্স | গ্রুপ পর্ব |
| ২০০২ | জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া | শেষ ষোলো |
| ২০০৬ | জার্মানি | গ্রুপ পর্ব |
| ২০১০ | দক্ষিণ আফ্রিকা | শেষ ষোলো |
| ২০১৪ | ব্রাজিল | গ্রুপ পর্ব |
| ২০১৮ | রাশিয়া | শেষ ষোলো |
| ২০২২ | কাতার | শেষ ষোলো |
| ২০২৬ | কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র | বাছাইপর্ব পেরিয়ে অংশগ্রহণ |
যেভাবে বিশ্বকাপে
২০২৬ বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত করা প্রথম দলগুলোর একটি ছিল জাপান। তিন আয়োজক দেশের বাইরে প্রথম দল হিসেবে তারা বিশ্বকাপের টিকিট পায়। এশিয়ান বাছাইপর্বে বাহরাইনের বিপক্ষে জয় তাদের জায়গা নিশ্চিত করে।
জাপানের এই যোগ্যতা অর্জন শুধু দ্রুত ছিল না, ছিল দাপুটেও। বাছাইপর্বে জাপান দেখিয়েছে, তারা এখন এশিয়ার সবচেয়ে সংগঠিত এবং কার্যকর দলগুলোর একটি।
বিশ্বকাপ গ্রুপ ও প্রতিপক্ষ
এবারের বিশ্বকাপে জাপান রয়েছে গ্রুপ ‘এফ’-এ। তাদের সঙ্গে আছে নেদারল্যান্ডস, সুইডেন এবং তিউনিসিয়া।
গ্রুপটি সহজ নয়। নেদারল্যান্ডস ঐতিহ্য ও শক্তির দল। সুইডেন এসেছে অদ্ভুত পথে, কিন্তু স্কোয়াডে আছে ইউরোপের বড় লিগে খেলা ফুটবলার। তিউনিসিয়া শারীরিকভাবে শক্তিশালী এবং রক্ষণে কঠিন।
জাপানের জন্য প্রতিটি ম্যাচই হবে আলাদা পরীক্ষা। তবে ২০২২ বিশ্বকাপের পর তাদের আর কাউকে ভয় পাওয়ার কথা নয়।
বর্তমান স্কোয়াড
জাপানের বর্তমান স্কোয়াডে গোলপোস্টে সবচেয়ে এগিয়ে জিয়ন সুজুকি। পার্মার এই তরুণ গোলরক্ষক শুইচি গন্দার অবসরের পর থেকে নিয়মিত জায়গা করে নিয়েছেন। তার সঙ্গে ব্যাকআপ হিসেবে থাকতে পারেন কেইসুকে ওসাকো ও কোসেই তানি।

ডিফেন্সে জাপান এবার তুলনামূলকভাবে তরুণ এবং কিছুটা অনভিজ্ঞ দল নিয়ে যেতে পারে। কোকি মাচিদা বেলজিয়ামে ভালো খেলে হফেনহাইমে জায়গা করেছেন। বায়ার্ন মিউনিখের হিরোকি ইতো বড় নাম, যদিও চোটের কারণে তার ছন্দ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। কো ইটাকুরা, তসুয়োশি ওয়াতানাবে, শোগো তানিগুচি, ইউকিনারি সুগাওয়ারা, সেয়া মাইকুমা কিংবা দাইকি হাশিওকার মতো নামগুলো মোরিয়াসুর হাতে বিকল্প বাড়াচ্ছে। এই ডিফেন্সে সম্ভাবনা আছে, কিন্তু বিশ্বকাপের চাপ সামলানোই হবে আসল পরীক্ষা।
মিডফিল্ডে জাপান অনেক বেশি শক্তিশালী এবং অভিজ্ঞ। লিভারপুলের ওয়াতারু এন্দো এই দলের মাঝমাঠের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নামগুলোর একটি। দাইচি কামাদা আরেক বড় নাম, আও তানাকা দলটিতে ভারসাম্য নিয়ে আসেন। হিদেমাসা মরিতা, রেও হাতাতে, কাইশু সানো, ইয়ুইতো সুজুকি, জোয়েল ফুজিতা কিংবা কোদাই সানোর মতো খেলোয়াড়রাও ছেড়ে কথা বলবেন না। অভিজ্ঞতা আর তরুণ শক্তির এই মিশেল জাপানকে মাঝমাঠে শক্তিশালী করে তুলেছে।
আক্রমণভাগেই জাপান সবচেয়ে বিপজ্জনক। ব্রাইটনের কাওরু মিতোমা এবং রিয়াল সোসিয়েদাদের তাকেফুসা কুবো একা ম্যাচের চিত্র বদলে দিতে পারেন। দুই প্রান্ত থেকে তাদের গতি, ড্রিবলিং ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা প্রতিপক্ষের জন্য বড় সমস্যা। এছাড়াও রিতসু দোয়ান, কেইতো নাকামুরা, আয়াসে উয়েদা, দাইজেন মায়েদা, ইউকি ওহাশি, শুতো মাচিনোদের উপস্থিতি আক্রমণভাগকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। বিশেষ করে কেইতো নাকামুরা জাতীয় দলের হয়ে ধারাবাহিক গোল করে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
এই স্কোয়াডের দিকে তাকালে পরিষ্কার বোঝা যায়, জাপান এখন আর শুধু শৃঙ্খলাবদ্ধ দল নয়। তাদের হাতে আছে ইউরোপে খেলা, বড় ম্যাচে অভ্যস্ত, ম্যাচ বদলে দেওয়ার মতো খেলোয়াড়।
শক্তিমত্তা
জাপানের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের গতি এবং সংগঠিত ফুটবল। বল হারানোর পর দ্রুত প্রেস, বল পেলে দ্রুত ট্রানজিশন, আর উইং দিয়ে আক্রমণ, এই তিন জিনিস তাদের খেলায় নিয়মিত দেখা যায়।
মিতোমা, কুবো, দোয়ানদের মতো খেলোয়াড় থাকায় জাপান যে কোনো ডিফেন্সকে চাপে ফেলতে পারে। মাঝমাঠে এন্দো ও তানাকার উপস্থিতি দলকে ভারসাম্য দেয়।
দুর্বলতা
জাপানের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ডিফেন্স। অভিজ্ঞতা থাকলেও ব্যাকলাইনে কিছু অনিশ্চয়তা আছে। বড় মঞ্চে শারীরিকভাবে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে তারা চাপে পড়তে পারে।
আরেকটি প্রশ্ন শেষ ষোলোর মানসিক বাধা। ভালো খেলেও বারবার সেখানে থেমে যাওয়া দলটির জন্য এবার মানসিক পরীক্ষাও হবে।
কোচের কৌশল

হাজিমে মোরিয়াসু নমনীয় কৌশলে বিশ্বাসী। তিনি ৩-৪-৩ ফরমেশনে দল সাজাতে পারেন, আবার ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী ৪-২-৩-১ বা ৪-৩-৩ আকারেও দলকে বদলে দেন।
তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো প্রতিপক্ষ অনুযায়ী পরিকল্পনা বদলানো। ২০২২ বিশ্বকাপে জার্মানি ও স্পেনের বিপক্ষে সেই বাস্তববাদী কৌশলই জাপানকে বড় জয় এনে দিয়েছিল।
জাপানের হয়ে যারা পার্থক্য গড়ে দিবে
কাওরু মিতোমা এই দলের সবচেয়ে বিপজ্জনক আক্রমণাত্মক অস্ত্র। একা ডিফেন্ডার কাটিয়ে জায়গা তৈরি করার ক্ষমতা তার আছে।
-17772247855020.webp)
তাকেফুসা কুবো সৃজনশীলতা, ড্রিবলিং এবং ফাইনাল থার্ডে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ওয়াতারু এন্দো মাঝমাঠে ভারসাম্য ও নেতৃত্ব দেন। বড় ম্যাচে তার অভিজ্ঞতা জাপানের জন্য জরুরি।
রিতসু দোয়ান বড় মুহূর্তে গোল করার ক্ষমতা রাখেন, যা ২০২২ বিশ্বকাপেই দেখা গেছে।
জিয়ন সুজুকির ওপরও থাকবে বড় দায়িত্ব। তরুণ হলেও বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে গোলপোস্টের স্থিরতা জাপানের জন্য বড় ব্যাপার।
প্রেডিকশন
জাপান এই গ্রুপে এখন আর আন্ডারডগ নয়। নেদারল্যান্ডস গ্রুপের সবচেয়ে শক্তিশালী দল হলেও সুইডেন ও তিউনিসিয়ার বিপক্ষে জাপানের ভালো সুযোগ আছে।
আমাদের ধারণা, জাপান গ্রুপ পর্ব পেরোবে। তারা দ্বিতীয় হয়েও যেতে পারে, আবার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে গ্রুপের শীর্ষস্থান নিয়েও লড়াই করতে পারে।
আসল প্রশ্ন নকআউটে। শেষ ষোলোর বাধা ভাঙতে পারলে এই দলটি কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত যেতে পারে।
জাপানের গল্প এখন শুধু উন্নতির নয়, অপেক্ষারও।
শেষ ষোলোর দরজায় তারা বারবার কড়া নেড়েছে। এবার সেই দরজা ভাঙার সময় কি এসেছে?
সামুরাই ব্লু কি এবার নিজেদের ইতিহাসের সেরা বিশ্বকাপ উপহার দেবে?




