ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় আসর ফিফা বিশ্বকাপের ২৩তম আসরের কাউন্টডাউন এগিয়ে চলেছে। আর ৪৭ দিনের অপেক্ষা তারপরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় মাঠে গড়াবে ৪৮ দলের এই আসর।
এশিয়া পোস্টের বিশেষ আয়োজন ‘৪৮ দিনে ৪৮ দল’ এর আজকের পর্বে থাকছে ক্রোয়েশিয়া, এমন একটি দল যারা বারবার বড় মঞ্চে প্রমাণ করেছে—দেশের আয়তন নয়, মানসিকতাই বড়।
দল পরিচিতি

ইউরোপের ফুটবল মানচিত্রের দেশ অনেক তবে এর মধ্যে ক্রোয়েশিয়া একটু ব্যতিক্রম। আয়তনে ছোট, জনসংখ্যা মাত্র ৪০ লাখের একটু বেশি। কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে এই দলটির উপস্থিতি সবসময়ই বড়।
ফিফা র্যাংকিংয়ে ১১ নম্বরে থাকা ক্রোয়াটদের জন্য বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে খেলা সবসময়ই তাদের মানসিকতার অংশ । এটি এমন একটি সংস্কৃতি, যেখানে প্রতিটি প্রজন্ম বড় মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার জন্য প্রস্তুত থাকে।
লুকা মদ্রিচ, ইভান পেরিসিচ কিংবা নতুন প্রজন্মের গভার্দিওল—নাম বদলেছে, কিন্তু পরিচয় বদলায়নি। চাপের মুহূর্তে শান্ত থাকা, ম্যাচের গতি নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করা এবং শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়া এই তিন জিনিসই ক্রোয়েশিয়াকে আলাদা করে।
কোচ জ্লাতকো দালিচ এই দলটিকে শুধু সংগঠিত করেননি, তিনি তাদের বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন যে বড় দলের বিপক্ষে খেলাটা শুধু সম্ভব নয়, জেতাটাও সম্ভব।
বিশ্বকাপে ইতিহাস
ক্রোয়েশিয়ার বিশ্বকাপ ইতিহাস সংখ্যায় ছোট, কিন্তু প্রভাবের দিক থেকে বিশাল।
মাত্র ছয়বার অংশ নিয়ে তারা তিনবার পৌঁছেছে সেমিফাইনাল বা তার ওপরে। ১৯৯৮ সালে প্রথম অংশ নিয়েই তৃতীয় হওয়া ছিল এক বিস্ময়। এরপর ২০১৮ সালে ফাইনালে ওঠা, যেখানে তারা ফ্রান্সের কাছে হারলেও পুরো টুর্নামেন্টে লড়াইয়ের মানসিকতা দিয়ে বিশ্বকে মুগ্ধ করে।

বিশেষ করে ২০১৮ সালের সেই যাত্রা এখনো আলাদা করে দাঁড়িয়ে আছে। ডেনমার্ক, রাশিয়া এবং ইংল্যান্ড টানা তিনটি নকআউট ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে জিতে ফাইনালে ওঠা শুধু পারফরম্যান্স নয়, এটি ছিল সহনশীলতা এবং মানসিক শক্তির এক অসাধারণ উদাহরণ।
২০২২ বিশ্বকাপেও তারা থামেনি। ব্রাজিলকে বিদায় করে আবারও সেমিফাইনালে পৌঁছায় এবং শেষ পর্যন্ত তৃতীয় হয়।
বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার পারফরম্যান্স
| বছর | আয়োজক দেশ | ফলাফল |
|---|---|---|
| ১৯৯৮ | ফ্রান্স | তৃতীয় |
| ২০০২ | দক্ষিণ কোরিয়া/জাপান | গ্রুপ পর্ব |
| ২০০৬ | জার্মানি | গ্রুপ পর্ব |
| ২০১৪ | ব্রাজিল | গ্রুপ পর্ব |
| ২০১৮ | রাশিয়া | রানার্সআপ |
| ২০২২ | কাতার | তৃতীয় |
ফুটবল বিশ্বে অনেক বড় দেশ আছে, কিন্তু ধারাবাহিকভাবে বড় মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার ক্ষমতা খুব কম দলেরই আছে। ক্রোয়েশিয়া খুব ভালো ভাবেই সেই বিরল তালিকায় রয়েছে।
যেভাবে এবারের বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়া
২০২৬ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে ক্রোয়েশিয়া ছিল ধারাবাহিক। গ্রুপ পর্বে শুধু একটি ম্যাচ ড্র করে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই জায়গা নিশ্চিত করে মদ্রিচ-বুদিমিররা।
বিশ্বকাপ গ্রুপ ও প্রতিপক্ষ
এবারের বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়া রয়েছে গ্রুপ ‘এল’-এ। তাদের সঙ্গে আছে ইংল্যান্ড, ঘানা এবং পানামা।
গ্রুপটি সহজ নয়। ইংল্যান্ড শক্তিশালী, ঘানা শারীরিকভাবে চ্যালেঞ্জিং, আর পানামাও অবহেলার নয়। এই গ্রুপে প্রতিটি ম্যাচই হবে পরীক্ষার।
বর্তমান স্কোয়াড
আসুন এবার ক্রোয়াটদের বর্তমান স্কোয়াড নিয়ে কথা বলা যাক। কোচ জ্লাতকো দালিচের এই দলে গোলরক্ষক হিসেবে আছেন তিনজন। দমিনিক লিভাকোভিচ এখনো প্রথম পছন্দ, তার সঙ্গে আছেন কার্লো লেটিকা ও ইভর পান্দুর।
ডিফেন্সে অভিজ্ঞতা ও নতুন প্রতিভার মিশেল। জোসিপ শুতালো, দুজে কালেতা-কার, মারিন পংরাচিচ ও মার্টিন এরলিচ নিয়মিত অপশন। জোসিপ স্তানিসিচের বহুমুখিতা দালিচের জন্য বড় সুবিধা। তরুণ লুকা ভুসকোভিচও ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছেন।

মিডফিল্ডেই ক্রোয়েশিয়ার আসল শক্তি। ৪০ বছর বয়সেও লুকা মদ্রিচ এই দলের ছন্দ ঠিক করেন। তার সঙ্গে মারিও পাশালিচ, লোভ্রো মায়ের, লুকা সুচিচ ও নিকোলা ভ্লাসিচের মতো খেলোয়াড়রা ভারসাম্য এনে দেন। নতুন প্রজন্মের বাতুরিনা ও পেতার সুচিচ ধীরে ধীরে দায়িত্ব নিচ্ছেন।
আক্রমণে বড় সুপারস্টার না থাকলেও দলগত সমন্বয়ই তাদের ভরসা। আন্দ্রেই ক্রামারিচ এখনো গুরুত্বপূর্ণ নাম, তার সঙ্গে আছেন বুদিমির, পেতার মুসা ও ইগর মাতানোভিচ। অভিজ্ঞতা ও কার্যকারিতার মিশেল এই ফরোয়ার্ড লাইনটিকে বানিয়েছে কার্যকর।
শক্তিমত্তা
ক্রোয়েশিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি স্বাভাবিক ভাবেই তাদের মিডফিল্ড। বল ধরে রাখা, ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করা—এই জায়গায় তারা অসাধারণ।
আরেকটি বড় দিক তাদের মানসিক দৃঢ়তা। নকআউট ম্যাচে চাপের মুহূর্তে তারা ভেঙে পড়ে না।
দুর্বলতা
আক্রমণে ধারাবাহিক গোলদাতার অভাব তাদের বড় সমস্যা।
এছাড়া দলের মূল ভরসা মদ্রিচ এখন ক্যারিয়ারের শেষ দিকে। তার ওপর নির্ভরতা কতটা কার্যকর থাকবে, সেটিও বড় প্রশ্ন।
কোচের কৌশল
জ্লাতকো দালিচ সাধারণত ৪-৩-৩ বা ৪-২-৩-১ ফরমেশনে দল সাজান। তার কৌশল ধৈর্য ধরে খেলা গড়ে তোলা এবং প্রতিপক্ষের ভুলের সুযোগ নেওয়া।
ক্রোয়েশিয়ার হয়ে যারা পার্থক্য গড়ে দিবে
লুকা মদ্রিচ এখনো এই দলের প্রাণ। ম্যাচের ছন্দ নিয়ন্ত্রণে তার প্রভাব অপরিসীম। বয়স ৪০ হলেও এখনো দলের মূল ভরসা তিনি।
-17771385853040.webp)
ইভান পেরিসিচও বড় ম্যাচের খেলোয়াড়। গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সামনে এগিয়ে আসার অভ্যাস তার পুরনো।
গোলপোস্টের নিচে লিভাকোভিচ বড় ম্যাচে নির্ভরতার নাম। বিশেষ করে ২২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে তার পারফরম্যান্স এখনও ফুটবল ভক্তদের চোখে বাসে।
নতুন প্রজন্মের মধ্যে ম্যানসিটির জোসকো গভার্দিওল ভবিষ্যতের বড় নেতা হিসেবে উঠে আসছেন।
প্রেডিকশন
ক্রোয়েশিয়াকে কখনোই কাগজে-কলমে বিচার করা যায় না। তারা ফেভারিট না হলেও বড় মঞ্চে নিজেদের জায়গা তৈরি করে নেয়।
গ্রুপ পর্ব পেরোনো তাদের জন্য সম্ভব। এরপর নকআউট পর্বে তারা আবারও কঠিন প্রতিপক্ষ হয়ে উঠবে। এশিয়া পোস্ট স্পোর্টসের প্রেডিকশন , ক্রোয়েশিয়া অন্তত কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত যাবে। তবে তাদের ইতিহাস বলে, সুযোগ পেলে তারা আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারে।
ক্রোয়েশিয়ার গল্পটা সবসময়ই একই।
বড় নাম কম, কিন্তু বড় মঞ্চে তারা ছোট হয়ে যায় না।
প্রশ্ন একটাই লুকা মদ্রিচের শেষ বিশ্বকাপে কেমন করবে ক্রোয়াটরা?




