আর মাত্র ৪৮ দিনের অপেক্ষা। এরপরই শুরু হচ্ছে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় আসর ফিফা বিশ্বকাপ। প্রথমবারের মতো ৪৮ দলের এই টুর্নামেন্ট বসছে মেক্সিকো, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে। ফুটবলের এই মহাযজ্ঞ নিয়ে এশিয়া পোস্টের বিশেষ আয়োজন ‘৪৮ দিনে ৪৮ দল’-এর আজকের পর্বে থাকছে ফ্রান্স, এমন একটি দল যারা গত এক দশক ধরে বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে নিজেদের অবস্থান নিয়মিতই ধরে রেখেছে।
দল পরিচিতি
ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি ফ্রান্স বর্তমানে শুধু নামেই নয়, স্কোয়াডের গভীরতা ও ধারাবাহিক পারফরম্যান্সেও সেরা দলগুলোর একটি। কোচ দিদিয়ের দেশম এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দলটির দায়িত্বে আছেন এবং তার অধীনেই ফ্রান্স হয়ে উঠেছে একটি সুসংগঠিত ইউনিট।
এবারের বিশ্বকাপে ফ্রান্স রয়েছে গ্রুপ ‘আই’-তে। তাদের সঙ্গে আছে সেনেগাল, নরওয়ে ও ইরাক। এই গ্রুপে ফ্রান্সকে স্পষ্ট ফেভারিট ধরাই হচ্ছে।
বিশ্বকাপে ইতিহাস
বিশ্বকাপে ফ্রান্সের ইতিহাস সমৃদ্ধ। ১৯৯৮ সালে নিজেদের মাটিতে প্রথমবার শিরোপা জেতার পর ২০১৮ সালে আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় তারা।
২০০৬ ও ২০২২ সালে রানার্সআপ হওয়ার পাশাপাশি একাধিকবার শেষ চারে পৌঁছেছে ফ্রান্স। তবে ২০০২ সালের মতো হতাশার ঘটনাও আছে, যখন ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হয়েও গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছিল।
বর্তমান স্কোয়াড
দিদিয়ের দেশমের স্কোয়াড দেখলে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি চোখে পড়ে, সেটি হলো স্কোয়াড ডেপথ। গোলপোস্টে মাইক মেইনিয়ান এখন নির্ভরতার নাম, তার সঙ্গে আছেন লুকাস শেভালিয়ের ও ব্রাইস সাম্বার মতো বিকল্প।
ডিফেন্সে দেশমের জন্য বেছে নেওয়ার মতো অপশন এত বেশি যে চূড়ান্ত একাদশ নির্ধারণ করাই কঠিন হয়ে পড়ে। সালিবা, উপামেকানো, কোনাতে, কুন্দে বা থিও হার্নান্দেজ প্রায় প্রতিটি পজিশনেই বিশ্বমানের ফুটবলার। তরুণদের মধ্যে মালো গুস্তো বা লেনি ইয়োরোর মতো নামও উঠে আসছে।
মিডফিল্ডেও একই চিত্র। তচুয়ামেনি ও কামাভিঙ্গা নিয়মিত মুখ হলেও অলিসে, শেরকি, জাইরে-এমেরি কিংবা কান্তের মতো খেলোয়াড়রা প্রতিযোগিতাটা আরও কঠিন করে তুলেছেন।
আক্রমণভাগে ফ্রান্স সম্ভবত সবচেয়ে ভয়ংকর। কিলিয়ান এমবাপ্পেকে ঘিরে ডেম্বেলে, দেজিরে দুয়ে, বারকোলা কিংবা থুরামের মতো খেলোয়াড়রা যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের চিত্র বদলে দিতে পারে। এই দলটির বেঞ্চ শক্তিও অনেক দলের প্রথম একাদশের চেয়ে এগিয়ে।
শক্তিমত্তা
ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের আক্রমণের বৈচিত্র্য। উইং থেকে গতি, মাঝখান দিয়ে সৃজনশীলতা এবং সামনে ক্লিনিক্যাল ফিনিশিং সবকিছুই আছে।
মিডফিল্ডে তারা শারীরিক ও টেকনিক্যাল দুই দিক থেকেই শক্তিশালী। ফলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা তাদের জন্য তুলনামূলক সহজ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বড় ম্যাচে জেতার অভ্যাস। এই মানসিকতা অনেক সময় ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দেয়।
দুর্বলতা
ডিফেন্সে মাঝে মাঝে মনোযোগের ঘাটতি দেখা যায়, বিশেষ করে সেট পিসে। নকআউট ম্যাচে এই ছোট ভুলগুলো বড় সমস্যায় পরিণত হতে পারে।
এ ছাড়া অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস কখনো কখনো তাদের খেলায় প্রভাব ফেলে।
কোচের কৌশল
দিদিয়ের দেশম সাধারণত ৪-২-৩-১ ফরমেশনে দল সাজান। তচুয়ামেনি ও কামাভিঙ্গা মাঝমাঠে ভারসাম্য রাখেন, আর সামনে দ্রুত আক্রমণ গড়ে তোলা হয়।
বর্তমান স্কোয়াডের আক্রমণ শক্তি বিবেচনায় এবারের বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে আরও আক্রমণাত্মক রূপে দেখা যেতে পারে।
সম্ভাব্য একাদশ
ফরমেশন: ৪-২-৩-১
মেইনিয়ান;
কুন্দে, উপামেকানো, সালিবা, থিও হার্নান্দেজ;
তচুয়ামেনি, কামাভিঙ্গা;
ডেম্বেলে, অলিসে, চেরকি;
এমবাপ্পে
স্টার খেলোয়াড়
কিলিয়ান এমবাপ্পে নিঃসন্দেহে এই দলের সবচেয়ে বড় তারকা। বিশ্বকাপ ফাইনালে হ্যাটট্রিক করার পর তার ওপর প্রত্যাশা আরও বেড়েছে।
ওসমানে ডেম্বেলে তার গতি ও ড্রিবলিং দিয়ে যেকোনো ডিফেন্স ভেঙে দিতে পারেন।
আর মিডফিল্ডে চলতি মৌসুমে ইউরোপ কাঁপানো মাইকেল অলিসে সৃজনশীলতার মূল উৎস হয়ে উঠতে পারেন।
পূর্বাভাস
ফ্রান্স এবারের বিশ্বকাপে শিরোপার অন্যতম দাবিদার। গ্রুপ পর্ব পেরোনো তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ নয়। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী চললে তারা সহজেই সেমিফাইনালে পৌঁছাতে পারে। এমনকি শিরোপা জয়ের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ফ্রান্সের এই দলটিতে সবকিছুই আছে তারকা, গভীরতা, অভিজ্ঞতা এবং মানসিক শক্তি। এখন প্রশ্ন একটাই, তারা কি আবারও শিরোপা জিতবে, নাকি ছোট ভুলই বড় স্বপ্ন থামিয়ে দেবে?




