বিশ্বকাপে অংশ নিতে ৭ শর্ত দিলেন ইরানের ফুটবলপ্রধান
বিশ্বকাপ শুরু হতে বাকি ৩২ দিন। মাঠের প্রস্তুতির সঙ্গে সঙ্গে এবার ইরানের বিশ্বকাপ যাত্রা ঘিরে বাড়ছে কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক জটিলতাও। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় হতে যাওয়া ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার আগে সাতটি শর্তের কথা জানিয়েছেন ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহদি তাজ।
ইরানের স্পোর্টস চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাজ বলেছেন, জাতীয় দলের খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ, সাংবাদিক ও সমর্থকদের জন্য ভিসা, নিরাপত্তা ও সম্মানের নিশ্চয়তা থাকতে হবে। বিশেষ করে যাদের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির সঙ্গে অতীত সম্পর্ক আছে বলে যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডা প্রশ্ন তুলতে পারে, তাদের ভিসা জটিলতা ছাড়া পাওয়া জরুরি বলে মনে করছেন তিনি। এর আগে রয়টার্স জানিয়েছিল, বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে আইআরজিসি নিয়ে কোনো অপমানজনক পরিস্থিতি তৈরি হবে না, এমন নিশ্চয়তা ফিফার কাছে চাইছিলেন তাজ।
তাজের দেওয়া শর্তের প্রথমটি হলো, ইরানের সব খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফকে কোনো জটিলতা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ভিসা দিতে হবে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, মেহদি তারেমি ও এহসান হাজসাফির মতো যারা বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার অংশ হিসেবে আইআরজিসিতে ছিলেন, তাদের ভিসা নিয়েও নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
দ্বিতীয় শর্ত, ভিসা পাওয়ার পর যাত্রাপথে খেলোয়াড় বা স্টাফদের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত জিজ্ঞাসাবাদ বা হয়রানির মুখে পড়তে হবে না। তাজের দাবি, দলকে এমন নিশ্চয়তা দিতে হবে, যাতে কানাডার ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়।
তৃতীয় শর্ত সাংবাদিক ও সমর্থকদের নিয়ে। ইরানি সাংবাদিক এবং ম্যাচ দেখতে যাওয়া সমর্থকদের জন্য ভিসা ইস্যুর একটি পরিষ্কার প্রক্রিয়া থাকতে হবে। তাজ মনে করেন, বিশ্বকাপের মতো আসরে জাতীয় দলের সঙ্গে সংবাদমাধ্যম ও সমর্থকদের উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ।
চতুর্থ শর্ত নিরাপত্তা। যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষকে বিমানবন্দর, হোটেল, প্রধান সড়ক ও স্টেডিয়ামে সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তা দিতে হবে। ইরান দলের সফর, অনুশীলন, ম্যাচ এবং সমর্থকদের চলাচল যেন কোনো ধরনের ঝুঁকিতে না পড়ে, সেটিই এই শর্তের মূল কথা।
পঞ্চম শর্ত পতাকা নিয়ে। ইরানের ম্যাচে দুই দলের সমর্থকেরা যেন শুধু নিজেদের সরকারি জাতীয় পতাকা নিয়ে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করেন, এমন দাবি করেছেন তাজ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের সরকারি পতাকা ছাড়া অন্য কোনো ইরান-সংশ্লিষ্ট পতাকা স্টেডিয়ামে অনুমতি পাওয়া উচিত নয়।
ষষ্ঠ শর্ত জাতীয় সংগীত নিয়ে। ইরানের জাতীয় সংগীত প্রতিটি ম্যাচে সঠিকভাবে এবং কোনো ধরনের বিঘ্ন ছাড়াই বাজাতে হবে। তাজের মতে, জাতীয় প্রতীক ও আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে কোনো ভুল বা ব্যত্যয় গ্রহণযোগ্য হবে না।
সপ্তম শর্ত সংবাদ সম্মেলন ঘিরে। তাজ বলেছেন, সাংবাদিকদের প্রশ্ন কেবল ম্যাচ ও ফুটবল-সংক্রান্ত টেকনিক্যাল বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। রাজনৈতিক প্রশ্ন বা বিতর্কিত প্রসঙ্গ সংবাদ সম্মেলনে না আসুক, সেটিই তার চাওয়া।
এই শর্তগুলোর পেছনে আছে সাম্প্রতিক কানাডা-ঘটনার প্রেক্ষাপট। গত সপ্তাহে ফিফা কংগ্রেসে যোগ দিতে ভ্যাঙ্কুভার যাওয়ার পথে ইরান ফুটবল ফেডারেশনের প্রতিনিধি দল কানাডা সীমান্তে জটিলতায় পড়ে। পরে কানাডার অভিবাসনমন্ত্রী জানান, আইআরজিসির সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগে তাজের ভিসা মাঝপথেই বাতিল করা হয়েছিল। কানাডা ২০২৪ সালে আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে, যুক্তরাষ্ট্র এটি করেছিল ২০১৯ সালে।
এরপর ফিফা মহাসচিব মাতিয়াস গ্রাফস্ট্রম ইরান ফেডারেশনকে চিঠি দিয়ে ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং বিশ্বকাপ প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনার জন্য ২০ মে জুরিখে বৈঠকের আমন্ত্রণ জানান। রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাজ ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গেও বৈঠকে এসব নিশ্চয়তা চাইতে পারেন।
ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো এর আগে বলেছেন, ইরান ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নেবে এবং যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাচও খেলবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ইরানি খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণে ওয়াশিংটনের আপত্তি নেই, কিন্তু আইআরজিসির সঙ্গে সম্পর্ক আছে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দেওয়া হবে না।
ইরানের অংশগ্রহণ ঘিরে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের কারণে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের ওপর হামলার পর দেশটির শীর্ষ লিগও স্থগিত আছে। ঘরোয়া ফুটবলাররা তেহরানে ক্যাম্পে অনুশীলন চালিয়ে গেলেও মাঠের প্রস্তুতির চেয়ে এখন বড় হয়ে উঠছে ভিসা, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক নিশ্চয়তার প্রশ্ন।