ঢাকা শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
নির্বাচন সর্বশেষ
Live Icon ●LIVE

নগরবাসীর জন্য ১৭০ ‘নগর স্বাস্থ্য নীড়’ স্থাপন করবে সরকার

এশিয়া পোস্ট প্রতিবেদক

  ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ১৯:৫৯
ছবি : সংগৃহীত

গ্রামাঞ্চলের মতো শহরাঞ্চলে সরকারি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যাপ্ত নয়। ফলে অসুস্থ হলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় শহরের মানুষকে এখনও ভরসা করতে হয় বেসরকারি হাসপাতালের ওপর; যা অনেকের জন্য ব্যয়বহুল। এই বাস্তবতার বদল আনতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

পরিবর্তন অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

২০২৮ সালের মাঝামাঝি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শহরের মানুষের জন্য সহজপ্রাপ্য ও সমন্বিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে নেওয়া হয়েছে বড় একটি প্রকল্প। প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় ঢাকাসহ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে স্থাপন করা হবে ১৭০টি ‘নগর স্বাস্থ্য নীড়’ বা সিটি হেলথ সেন্টার।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ‘নগরবাসীর জন্য সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সম্প্রসারণ’ শীর্ষক প্রস্তাবিত প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

জানা গেছে, আগামী সোমবার (৬ এপ্রিল) অনুষ্ঠেয় একনেক সভায় অনুমোদন পেতে যাচ্ছে আলোচ্য প্রকল্পটি। একনেক সভার কার্যতালিকায় না থাকলেও বিশেষ প্রয়োজনে সরাসরি একনেক সভার টেবিলে উপস্থাপন করা হবে বলে পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে।

নগরবাসীর জন্য সহজপ্রাপ্য ও সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে নেওয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১৫৭ কোটি ৬ লাখ টাকা। এরমধ্যে সরকারি তহবিল থেকে আসবে ২০৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা, আর বাকি ৯৪৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা আসবে বৈদেশিক ঋণ হিসেবে, যার বেশির ভাগ দেবে বিশ্বব্যাংক। একনেকে অনুমোদন পেলে তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পটি ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য শহরের মানুষকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। প্রকল্পের আওতায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৭০টি ‘নগর স্বাস্থ্য নীড়’ বা সিটি হেলথ সেন্টার স্থাপন করা হবে। আগামী তিন বছরের মধ্যে হেলথ সেন্টারগুলো স্থাপন করা হবে। হেলথ সেন্টারগুলো হবে শহরের মানুষদের নিকটতম স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, যেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা, পুষ্টি পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা একসঙ্গে পাওয়া যাবে।

স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোয় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসছে সেবার সময়সূচিতে। আলোচ্য প্রকল্পের আওতায় স্থাপনা করা প্রতিটি কেন্দ্র দুই শিফটে চালু থাকবে। অর্থাৎ সকাল ও বিকেল মানুষ চিকিৎসা নিতে পারবেন। দুই শিফটে চালু থাকায় যারা দিনভর কাজ করেন, তারা সন্ধ্যার দিকে এসেও চিকিৎসা নিতে পারবেন। এ লক্ষ্যে প্রতিটি নগর স্বাস্থ্য নীড়ে দুই শিফটে সেবা পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত মানবসম্পদ নিয়োগ করা হবে, যা নগর স্বাস্থ্যসেবায় বড় স্বস্তি এনে দিতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রামাঞ্চলে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে সুসংগঠিত হলেও শহরাঞ্চলে তেমন কোনো সমমানের ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। অসুস্থ হলে শহরের মানুষকে এখনো ভরসা করতে হয় সীমিত সরকারি সেবা কিংবা ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতালের ওপর। এ ছাড়া সরকারি আউটডোর ও টারশিয়ারি হাসপাতালের বহির্বিভাগে সেবা সাধারণত শুধু সকালে পাওয়া যায়। ফলে কর্মজীবী মানুষ, গৃহিণী বা দিনমজুরদের জন্য চিকিৎসা নেওয়া অনেক সময়ই কঠিন হয়ে পড়ে। এই বাস্তবতা বদলাতেই নগরবাসীর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে এই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে, যাতে কমপক্ষে ৮০ শতাংশ প্রয়োজনীয় ওষুধ সব সময় পাওয়া যায়। পাশাপাশি আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হবে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যসেবাকে আধুনিক ও কার্যকর করতে ডিজিটাল ব্যবস্থাও যুক্ত করা হবে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের (ডিএইচআইএস-২) মাধ্যমে রোগীর ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড সংরক্ষণ করা হবে, যাতে রোগীর পূর্ব ইতিহাস সহজে জানা যাবে এবং নির্ভুলভাবে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘হাব-স্পোক’ মডেল। প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, শহরাঞ্চলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে ‘হাব-স্পোক’ নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হবে, যার মাধ্যমে নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি কেন্দ্রগুলো সংযুক্ত থাকবে। ফলে কোনো রোগীকে যদি উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার্ড করতে হয়, তা দ্রুত করা যাবে। এতে যেমন সময় বাঁচবে, রোগীর ভোগান্তিও কমবে। শুধু চিকিৎসা নয়, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার মাধ্যমে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে দ্রুতগতির নগরায়ন আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করেছে। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ওপর নগরবাসীর অতিরিক্ত নির্ভরতা একটি বড় সমস্যা। আমাদের লক্ষ্য সরকারি পর্যায়ে কার্যকর ও মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডে নগর স্বাস্থ্য নীড় স্থাপন করা হবে, যেখানে দুই শিফটে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া যাবে। এতে শহরের দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত নাগরিকরা তাদের নিকটতম কেন্দ্র থেকে সেবা নিতে পারবেন। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ ও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার মানও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

সংশ্লিষ্ট বিশষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত নগরায়ণের এই সময়ে স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজন। সেই প্রয়োজন পূরণের পথে এই প্রকল্প একটি বড় পদক্ষেপ হতে পারে। তবে বর্তমান বস্তবতাও মাথায় রাখতে হবে। বর্তমানে পরিচালিত নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর বেহাল অবস্থা। পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও ল্যাব সুবিধা না থাকায় রোগীরা কার্যত প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

নতুন প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় নতুন স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো যেন আগের নগর স্থাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর মতো না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও ওষুধসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় শুধু অবকাঠামো হবে, কিন্তু নগরবাসী সেবা পাবেন না। নগরের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী ও সম্প্রসারণ করার পাশাপাশি সমন্বিত পরিকল্পনা, অনলাইন রেফারেল, বাজেট ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই।

গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পরিচালনা করলেও শহরাঞ্চলে স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে থাকে। এই দ্বৈত কাঠামোর কারণে সেবা প্রদানে সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়। তাই আলোচ্য প্রকল্পের ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন এবং অনুমোদনের আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তজুড়ে দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। অনুমোদনের শর্ত হিসেবে স্থানীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করতে বলেছে। এই সমঝোতা ছাড়া প্রকল্পটি টেকসইভাবে চালানো সম্ভব হবে না বলে মনে করছে কমিশন।

তবে প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে একটি শর্ত দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। স্থানীয় সরকার বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করতে হবে।

কমিশনের মতামত অনুযায়ী, এই সমঝোতা ছাড়া প্রকল্পের কার্যক্রম টেকসইভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরে শর্তে প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে। যদিও পিইসি সভার সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্থানীয় সরকার বিভাগ বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়নি।

পরিকল্পনা কমিশন-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রস্তাবিত প্রকল্পটি নগরবাসীর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে আলোচ্য প্রকল্পের কার্যক্রম টেকসই ও ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা প্রয়োজন। তাই সমঝোতা স্বাক্ষরের শর্তে প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে। সমঝোতা ছাড়া প্রকল্পের কার্যক্রম টেকসইভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

স্নায়ুরোগে ভোগা তানিয়ার সাফল্য, ঝুঁকি কাটিয়ে হয়েছেন মা
জটিল স্নায়ুরোগ মায়াস্থেনিয়া গ্রাভিসে আক্রান্ত হন তানিয়া খাতুন। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। ভর্তি করানো হয় হাসপাতালে। চিকিৎসকরা তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেন। দেওয়া হয় লাইফ সাপোর্ট। ধীরে-ধীরে অবস্থার উন্নতি হয়। চিকিৎসকরা পরামর্শ দেন– ঝুঁকি থাকায় সহজে গর্ভধারণ করতে পারবেন না তানিয়া। তবে ঝুঁকি কাটিয়ে সেই তানিয়া হয়েছেন কন্যাসন্তানের মা। সোমবার (৪ মে) দুপুরের দিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে তিনি চিকিৎসাধীন। আগের দিন রোববার (৩ মে) হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, তানিয়াকে লাইফ সাপোর্টে রেখে চিকিৎসা দিতে হয়েছিল। তিনি ঝুঁকি কাটিয়ে নিরাপদে সন্তান প্রসব করেছেন–এটা উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে নবজাতককে আইসিইউতে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। মা ও সন্তান দুজনের শারীরিক অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে। স্ত্রীর পাশে অবস্থান করছিলেন তানিয়ার স্বামী জেবর আলী। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, বিয়ের এক বছর পর প্রথম কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। ২০২২ সালে তানিয়া অসুস্থ হয়ে পড়তে শুরু করে। রোগ শনাক্ত হওয়ার পর সমন্বিত চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠে। এবার দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দিতে সক্ষম হয়। চিকিৎসকরা জানান, তানিয়াকে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার চোখের পাতা ঝুলে পড়া, কথা বলতে অসুবিধা এবং তীব্র শ্বাসকষ্টের লক্ষণ দেখা দেয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার শরীরে মায়াস্থেনিয়া গ্রাভিস শনাক্ত হয়; যা একটি দীর্ঘমেয়াদি অটোইমিউন রোগ এবং এতে পেশি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় ২৫ জানুয়ারি তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয় এবং লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয়। প্রায় ২১ দিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পাশাপাশি আড়াই মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। উচ্চমূল্যের চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে চিকিৎসকরা প্লাজমা এক্সচেঞ্জ পদ্ধতি প্রয়োগ করেন। পাঁচ দফায় রক্তরস পরিবর্তনের মাধ্যমে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি ঘটে। চিকিৎসার প্রায় ১০ দিনের মাথায় লাইফ সাপোর্ট খুলে নেওয়া সম্ভব হয় এবং ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন তানিয়া। সুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসকরা ভবিষ্যতে গর্ভধারণ না করার পরামর্শ দিলেও ২০২৫ সালের অক্টোবরে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হন। ঝুঁকি বিবেচনায় গর্ভপাতের পরামর্শ দেওয়া হলেও তানিয়া ও পরিবার সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। এরপর নিউরোমেডিসিন, গাইনি, মেডিসিন ও আইসিইউ বিভাগের সমন্বয়ে তার গর্ভকালীন চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ চলে। নিয়মিত চেকআপের মাধ্যমে তার শারীরিক অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এ বিষয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, এ ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত নারীর নিরাপদ প্রসব অত্যন্ত বিরল। তানিয়ার ঘটনা চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
স্নায়ুরোগে ভোগা তানিয়ার সাফল্য, ঝুঁকি কাটিয়ে হয়েছেন মা
হামের উপসর্গ নিয়ে প্রাণ গেল আরও ৪ শিশুর
সারা দেশে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। প্রতিদিনই নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে অনেক শিশু। মৃত্যুর হারও বাড়ছে। হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও চার শিশু প্রাণ হারিয়েছে। এ সময় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ২৮৫ শিশু। শুক্রবার (১ মে) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুম থেকে দেওয়া প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সর্বশেষ এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় ১১৫ শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১৪৬। অধিদপ্তর আরও জানিয়েছে, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৪৯ জনের। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ২৩১ জনের। হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ায় গত ৫ এপ্রিল থেকে শুরু হয় ঝুঁকিপূর্ণ ৩০ উপজেলায় জরুরি টিকাদান। এরপর ১২ এপ্রিল থেকে দেওয়া হয় ঢাকার দুই সিটি, বরিশাল ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন এলাকায়। পরে ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে হামের টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়। এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন গতকাল বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) জানিয়েছেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে শতভাগ শিশুকে হামের টিকার আওতায় আনা সম্ভব হবে।
হামের উপসর্গ নিয়ে প্রাণ গেল আরও ৪ শিশুর
সামাজিক আক্রমণে চিকিৎসা থেকে সরে যায় এইডস রোগীরা
সামাজিকভাবে আক্রমণের বা স্টিগমার শিকার হয়ে এইচআইভি/এইডস রোগীরা চিকিৎসা থেকে দূরে থাকেন বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এটিকে জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি বলেও মনে করছেন তারা। বুধবার (২৯ এপ্রিল) রাজধানীর বিএমএ ভবনে আয়োজিত এক কর্মশালায় এসব বক্তারা এসব কথা বলেন। এইডস হেলথকেয়ার ফাউন্ডেশনের (এএইচএফ) সহযোগিতায় বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএইচআরএফ) এ কর্মশালার আয়োজন করে। বিএইচআরএফের সভাপতি প্রতীক ইজাজের সভাপতিত্বে কর্মশালায় স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভ। বিশেষ অতিথি ও মূল আলোচক ছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী। বাংলাদেশের এইডস পরিস্থিতি, সংকট ও উত্তরণ নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এএইচএফের কান্ট্রি ডিরেক্টর আকতার জাহান শিল্পী। এ ছাড়া এইডস রিপোর্টিং, চ্যালেজ্ঞ ও সমাধান নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কালবেলার স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক রাশেদ রাব্বি। কর্মশালায় জানানো হয়, ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশে প্রথম এইচআইভিতে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। এরপর থেকে প্রতিবছর ১০, ২০, ১০০ বা ২০০ জন করে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে। ২০২৫ সালে নতুন রোগী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৯১ জনে। আক্রান্তদের বেশির ভাগ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও সিলেটের বাসিন্দা। এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়ে প্রথম এক রোগী মারা যায় ২০০০ সালে। আর ২০২৫ সালে এই রোগে মৃতের সংখ্যা ২৫৪, যা আগের বছরে থেকে কিছু কম। এইডস/এসটিডি কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, দেশে পুরুষ সমকামী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণের হার ২০১৭ সালে ছিল শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২০ সালে তা বেড়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে এই হার আরও বেড়ে প্রায় ৩৪ শতাংশে পৌঁছেছে। কর্মশালায় বক্তরা বলেন, এইচআইভি নিয়ন্ত্রণে পরীক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি, চিকিৎসা সহজলভ্য করা এবং সামাজিক কুসংস্কার দূর করা জরুরি। একই সঙ্গে বিদেশফেরত শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়। তারা আরও বলেন, দেশের ৪১টি জেলায় এখনো এইচআইভি/এইডস পরীক্ষার সুযোগ নেই। ফলে বহু মানুষ রোগ শনাক্তের বাইরে থেকে যাচ্ছেন। সরকারি ও বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী, মোট সংক্রমিতদের প্রায় ১৮ শতাংশ এখনো শনাক্ত হয়নি। আর শনাক্তদের মধ্যে প্রায় ২৬ শতাংশ চিকিৎসার আওতার বাইরে রয়েছেন। আকতার জাহান শিল্পী জানান, দেশে অনুমিত এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তি ১৭ হাজার ৪৮০। এর মধ্যে শনাক্ত হয়েছে ১৪ হাজার ৩১৩ জন। সংক্রমণের হার দশমিক ০১ শতাংশ। শনাক্ত রোগীদের মধ্যে ৮ হাজার ৫৭৫ চিকিৎসার আওতায় এসেছেন। যা মোট শনাক্তের ৭৪ শতাংশ।  তিনি আরও জানান, আক্রান্তদের ৩৪ শতাংশ পুরুষ সমকামী ও ১৪ শতাংশ পুরুষ যৌনকর্মী। এ ছাড়া প্রবাসী ১২ শতাংশ, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ১১ শতাংশ, শিরায় মাদকগ্রহণকারী ৬ শতাংশ, নারী যৌনকর্মী ও হিজড়া ১ শতাংশ করে। এ ছাড়া ২২ শতাংশ অন্যান্য মানুষ। আকতার জাহান শিল্পী বলেন, আক্রান্তদের বয়সভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৬২ দশমিক ৬১ শতাংশ ২৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী ২১ দশমিক ০৫ শতাংশ। ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শূন্য দশমিক ৬৯ শতাংশ। ৫ বছরের কম বয়সে আক্রান্ত ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। সাংবাদিক রাশেদ রাব্বি তার উপস্থাপনায় বলেন, দেশে এইডসের ক্ষেত্রে একসময় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছিল শিরায় মাদক গ্রহণকারী, প্রবাসী শ্রমিক, নারী যৌনকর্মী, পুরুষ যৌনকর্মী ও হিজড়া জনগোষ্ঠীর মানুষ। ২০২০ সালের পর থেকে দেখা গেছে, সমকামী জনগোষ্ঠীর মধ্যে আক্রান্তের হার বাড়তে শুরু করে এখন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এসেছে। দ্বিতীয় সবোর্চ্চ হলো প্রবাসী শ্রমিক। এইচআইভি এইডস নিয়ন্ত্রণে আমাদের বিদেশ থেকে ফেরার সময় শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা জরুরি। ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সামাজিকভাবে আক্রমণ বা স্টিগমা করা হলে তারা চিকিৎসা থেকে দূরে সরে যায়। এতে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি আরও বাড়ে। তিনি বলেন, স্টিগমা ও বৈষম্য মানুষকে ‘আন্ডারগ্রাউন্ডে’ ঠেলে দেয়, ফলে তারা চিকিৎসা নিতে ভয় পায়। কোনো রোগীকে তার রোগের কারণে চিহ্নিত বা ‘ট্যাগিং’ করা হলো স্টিগমা। কোনো ব্যক্তিকে তার অসুস্থতার (যেমন এইচআইভি বা হেপাটাইটিস বি) কারণে রাজনৈতিক অধিকার বা চাকরি থেকে বঞ্চিত করা বা ছাঁটাই করা মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বৈষম্যের অন্তর্ভুক্ত। এইচআইভি এখন আর নিশ্চিত মৃত্যু নয় জানিয়ে ডা. সাইফুল্লাহ মুন্সী বলেন, ১৯৮৪ সালে শনাক্ত হওয়া রোগীও এখন সুস্থভাবে বেঁচে আছেন। সঠিক চিকিৎসায় এটি এখন ডায়াবেটিসের মতোই নিয়ন্ত্রণযোগ্য। বর্তমানে এমন ইনজেকশনও বের হয়েছে, যা বছরে একবার নিলেই সারা বছর ভালো থাকা যায়।
সামাজিক আক্রমণে চিকিৎসা থেকে সরে যায় এইডস রোগীরা
টিকা সংকটের তথ্য প্রকাশ হওয়ায় শাস্তির মুখে কর্মকর্তা 
দেশে হামের উচ্চ প্রকোপের মাঝেই সংকট দেখা দিয়েছে আরেক মরণব্যাধি জলাতঙ্কের ভ্যাকসিনের। এছাড়া রয়েছে শিশুদের যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, ধনুষ্টংকারসহ অন্তত পাঁচটি টিকার স্বল্পতা। এসব টিকা পেতে প্রতিনিয়ত হাসপাতালে ভিড় বাড়ছে রোগী ও স্বজনদের। ফলে মানুষের আগ্রহের কারণে টিকার সরববরাহ নিয়ে খোঁজ রাখছেন সংবাদকর্মীরা। সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) কর্মকর্তা ও হাসপাতালের সংশ্লিষ্টরাও এ নিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। জানাতে হয় টিকার বাস্তব চিত্র। তবে এতে করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রীর তোপের মুখে পড়ছেন কর্মকর্তারা। গণমাধ্যমে টিকার সংকটের তথ্য দেওয়ায় অন্তত দুজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ মুন্সীগঞ্জ ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আহাম্মদ কবীরকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। গত শুক্রবার হাসপাতালটিতে পরিদর্শনে গিয়ে এ ঘোষণা দেন মন্ত্রী। জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নিয়ে ‘ভুল তথ্য’ ছড়ানোর অভিযোগে ওই কর্মকর্তাকে এ শাস্তি দেওয়া হয়। এর আগে জলাতঙ্কের টিকার সংকট নিয়ে বিবিসি বাংলায় কথা বলেছিলেন ডা. আহাম্মদ কবীর। বিবিসির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, মুন্সিগঞ্জ ২৫০ বিশিষ্ট হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ৩০ জন ব্যক্তি কুকুর অথবা বিড়ালের কামড় খেয়ে টিকা নিতে আসেন। কিন্তু টিকা স্বল্পতার কারণে অনেককে ফিরে যেতে হয়। বিশেষ করে বিড়ালের ক্ষেত্রে কোনো টিকাই দেওয়া হয় না। ইপিআই থেকে টিকা না দেওয়া এবং অর্থের অভাবে নিজস্ব তহবিল থেকে কিনতে না পারায় এমন সংকট।  ওই সাক্ষাৎকারে আহম্মাদ কবীর বলেন, ভ্যাকসিন সংকটের কারণে সবাইকে দেওয়া যাচ্ছে না। আমাদের অন্য ফান্ডে যে সামান্য কিছু টাকা বেঁচে গেছে, সেটা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। ১২০টা ভ্যাকসিন কিনলে আমার লক্ষ্য থাকে এক মাস চালানো। যদি সবাইকে দেই তাহলে সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। বাকি দিনগুলোতে কেউ পাবে না।  তিনি বলেন, ‘আমরা এখন টিকার রেশনিং করছি। যাদের জরুরি প্রয়োজন এবং খুবই দরিদ্র, শুধু তাদের বিনামূল্যে দিচ্ছি। যাদের কেনার সামর্থ্য আছে কিংবা বিড়াল বাসায় পালে তাদেরকে কিনে দিতে বলছি।’ বিবিসি বাংলায় এমন বক্তব্য দেওয়ার পর ওই কর্মকর্তাকে সরানোর নির্দেশ দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।  এর আগেও একই রকমের ঘটনা ঘটেছে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে টিকা সংকট নিয়ে চলতি মাসের শুরু থেকে সংবাদমাধ্যমে একের পর এক খবর প্রকাশিত হতে থাকে। যা নিয়ে চরম সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার। এসব সংবাদে ইপিআইয়ের মুখপাত্র হিসেবে বক্তব্য দিতে হয়েছে উপ-পরিচালক ডা. শাহরিয়ার সাজ্জাদকে। পরে গত ১৬ এপ্রিল এই কর্মকর্তাকে ইপিআই থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে তাকে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সংযুক্ত রাখা হয়েছে।  উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী নন শাস্তির মুখে পড়া স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। শনিবার রাতে অনেক চেষ্টার পর কথা হয় ডা. শাহরিয়ার সাজ্জাদের সঙ্গে। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘এককভাবে ওই কারণে নাকি আরও কোনো কারণে করেছে জানি না।’ এর বেশি কিছু বলতে রাজি হননি তিনি। সংবাদমাধ্যমে তথ্য দেওয়ায় এমন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এমন সিদ্ধান্তে সরকারের কঠোর সমালোচনা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, এভাবে শাস্তি দিলে কেউ আর সঠিক তথ্য দেবে না। আর মাঠ পর্যায়ের সংকটের চিত্র না পেলে সরকারের পুরো কর্মসূচি ব্যর্থ হবে।  স্বাস্থ্যমন্ত্রী যখন ডা. আহাম্মদ কবীরকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন, তখন তার সঙ্গে ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস। এ সম্পর্কে জানতে মহাপরিচালকের মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘শুধু সংবাদমাধ্যমে তথ্য দেওয়ায় এমন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে মনে হয় না। যদিও সংবাদমাধ্যমে তাই এসেছে।’ তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বোচ্চ কর্তা স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি যখন কোনো নির্দেশনা দেন সেটির বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই অধিদপ্তরের। এমনকি ঘটনা প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছে, আসলেই তিনি ভুল তথ্য দিয়েছেন কিনা; তা যাচাইয়েরও সুযোগ নেই। কারণ, সরাসরি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’ এই কর্মকর্তা বলেন, ‘সাধারণত এসব ঘটনায় অধস্তনদের নোট নিতে বলা হয়, খতিয়ে দেখে সত্যতা পেলে তখন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু এখানে অধিদপ্তরের করার কিছু নেই।’ তথ্য দিয়ে কর্মকর্তাদের শাস্তির মুখে পড়া নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কঠোর সমালোচনা করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবু জামিল ফয়সাল। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ে যারা আছেন বিশেষ করে হাসপাতালের প্রধান, তাদের কাছে সবসময় আসল চিত্র থাকে। সঠিক তথ্য পেলে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়। এখন সংবাদমাধ্যমে সেই তথ্য দিয়ে যদি কর্মকর্তারা শাস্তির মুখে পড়েন, প্রত্যাহার বা ওএসডি হোন সেটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’ এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘কোনো রোগী ভ্যাকসিন না পেলে হাসপাতালের যিনি দায়িত্বে থাকেন তার কাছেই যান, মন্ত্রীর কাছে নয়। এ ধরনের পদক্ষেপে চাকরি হারানোর ভয়ে প্রতিষ্ঠানের কেউ আর সত্য তথ্য দিতে চাইবেন না। ফলে কোথায় টিকার ঘাটতি, জনবলের সমস্যা, ব্যবস্থাপনায় জটিলতা—এগুলো সামনে আসবে না। আর না এলে চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কর্মসূচিতে।’ তিনি বলেন, ‘মন্ত্রীর উচিত ছিল সবকিছু শোনা। এরপর সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া যে, অমুক প্রতিষ্ঠানের সংকটের কথা বলেছে। প্রকৃত অবস্থা কী খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা। তা না করে সরিয়ে দিলে যে লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে, তা অর্জন হবে না।’  সম্প্রতি একাধিক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী দাবি করেন, হাম, রুবেলা ও জলাতঙ্কসহ কোনো টিকার সংকট নেই। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে এর বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। সংকটের বিষয়টি ইপিআইও স্বীকার করছে। জলাতঙ্কের টিকা মূলত দেওয়া হয় কুকুর কিংবা বিড়ালের কামড় বা আঁচড় খেলে। এজন্য এআরভি বা অ্যান্টি র‌্যাবিস ভ্যাকসিন এবং আরআইজি বা র‌্যাবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন নামে দুটি ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। এর মধ্যে কামড় একটু বেশ ক্ষতিকর হলে দেওয়া হয় আরআইজি ভ্যাকসিন। দেশের হাসপাতালগুলোতে সংকট দেখা দিয়েছে এ ভ্যাকসিনের।  রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এ ভ্যাকসিনের সরবরাহ শতভাগ থাকলেও উল্টো চিত্র ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোতে। মূলত কেন্দ্রীয়ভাবে মজুত না থাকায় এমন জটিলতা বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। নিউমোনিয়া, যক্ষ্মাসহ শিশুদের জন্য নির্ধারিত টিকার পাঁচটিরও কেন্দ্রীয় মজুত শূন্য। ইপিআই-এর মাধ্যমে ৯টি টিকার মাধ্যমে ১২টি রোগ প্রতিরোধ করা হয়। শিশুদের জন্য নির্ধারিত সাতটি টিকার মধ্যে রয়েছে—নিউমোনিয়া প্রতিরোধে পিসিভি, যক্ষ্মার জন্য বিসিজি, পোলিওর নির্মূলে ওপিভি ও আইপিভি, টাইফয়েডের জন্য টিসিভি, হাম ও রুবেলা প্রতিরোধে এমআর এবং পাঁচটি রোগ (ধনুষ্টংকার, হুপিংকাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ডিপথেরিয়া ও হেপাটাইটিস-বি) প্রতিরোধে দেওয়া হয় পেন্টা টিকা। এছাড়া কিশোরীদের জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধে এইচপিভি এবং ১৫ থেকে ৪৯ বছরের নারীদের ধনুষ্টংকার ও ডিপথেরিয়া সুরক্ষায় টিডি টিকা দেওয়া হয়। ইপিআই সূত্রে জানা গেছে, শিশুদের সাতটি টিকার মধ্যে আইপিভি ও টিসিভি থাকলেও বর্তমানে মজুত শূন্য রয়েছে—যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, হাম-রুবেলা ও পেন্টা টিকার। বর্তমানে হাম-রুবেলার গণটিকা কর্মসূচি চলছে বিশেষভাবে কেনা টিকায়। যেখানে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী যেকোনো শিশু টিকা নিতে পারছে। টিকা ক্যাম্পেইনের মাঝেও থেমে নেই হামের সংক্রমণ। এমনকি প্রতিদিনই প্রাণহানি ঘটছে।  স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে শনিবার (২৫ এপ্রিল) সকাল ৮টা পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৩৫ হাজার ৬৭ জনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তাদের ৯০ ভাগই শিশু। সংখ্যায় কম হলেও আক্রান্তদের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্করাও রয়েছেন।
টিকা সংকটের তথ্য প্রকাশ হওয়ায় শাস্তির মুখে কর্মকর্তা 
হাম ও উপসর্গ নিয়ে আরও ৭ জনের মৃত্যু
দেশজুড়ে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতির মধ্যেই গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চারজন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত ছিলেন এবং বাকি তিনজন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন। শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, সংক্রমণের তীব্রতা বাড়ার অন্যতম কারণ হাসপাতালের ভেতরে ও বাইরে পর্যাপ্ত আইসোলেশন বা পৃথক রাখার ব্যবস্থার অভাব। আক্রান্ত শিশুদের মাধ্যমেই এই রোগ অন্যদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে হাসপাতালে শয্যা-সংকটের কারণে আক্রান্ত শিশুদের সাধারণ রোগীদের কাছাকাছি থাকতে হচ্ছে, যা নতুন করে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত আইসোলেশন নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ১৫ মার্চ থেকে ২৪ এপ্রিল সকাল ৮টা পর্যন্ত মোট সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৫৫৯-এ। এর মধ্যে চার হাজার ২৩১ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে। এ পর্যন্ত সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মিলিয়ে ১৯ হাজার ৭০৫ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আর ১৬ হাজার ৫২৭ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ৪২ জন মারা গেছেন। আর হামের উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ১৯৮ জন। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে নতুন করে এক হাজার ২১৫ জন সন্দেহভাজন হামরোগী শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের বড় একটি অংশই শিশু। হাসপাতালগুলোয় ক্রমাগত রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। সময়মতো টিকা না নেওয়া এবং আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসায় এই প্রাদুর্ভাব দীর্ঘায়িত হচ্ছে। শিশুদের জ্বর ও শরীরে লালচে দানা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে এবং অন্যদের থেকে আলাদা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
হাম ও উপসর্গ নিয়ে আরও ৭ জনের মৃত্যু
স্নায়ুরোগে ভোগা তানিয়ার সাফল্য, ঝুঁকি কাটিয়ে হয়েছেন মা
স্নায়ুরোগে ভোগা তানিয়ার সাফল্য, ঝুঁকি কাটিয়ে হয়েছেন মা
জটিল স্নায়ুরোগ মায়াস্থেনিয়া গ্রাভিসে আক্রান্ত হন তানিয়া খাতুন। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। ভর্তি করানো হয় হাসপাতালে। চিকিৎসকরা তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেন। দেওয়া হয় লাইফ সাপোর্ট। ধীরে-ধীরে অবস্থার উন্নতি হয়। চিকিৎসকরা পরামর্শ দেন– ঝুঁকি থাকায় সহজে গর্ভধারণ করতে পারবেন না তানিয়া। তবে ঝুঁকি কাটিয়ে সেই তানিয়া হয়েছেন কন্যাসন্তানের মা। সোমবার (৪ মে) দুপুরের দিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে তিনি চিকিৎসাধীন। আগের দিন রোববার (৩ মে) হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, তানিয়াকে লাইফ সাপোর্টে রেখে চিকিৎসা দিতে হয়েছিল। তিনি ঝুঁকি কাটিয়ে নিরাপদে সন্তান প্রসব করেছেন–এটা উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে নবজাতককে আইসিইউতে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। মা ও সন্তান দুজনের শারীরিক অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে। স্ত্রীর পাশে অবস্থান করছিলেন তানিয়ার স্বামী জেবর আলী। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, বিয়ের এক বছর পর প্রথম কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। ২০২২ সালে তানিয়া অসুস্থ হয়ে পড়তে শুরু করে। রোগ শনাক্ত হওয়ার পর সমন্বিত চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠে। এবার দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দিতে সক্ষম হয়। চিকিৎসকরা জানান, তানিয়াকে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার চোখের পাতা ঝুলে পড়া, কথা বলতে অসুবিধা এবং তীব্র শ্বাসকষ্টের লক্ষণ দেখা দেয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার শরীরে মায়াস্থেনিয়া গ্রাভিস শনাক্ত হয়; যা একটি দীর্ঘমেয়াদি অটোইমিউন রোগ এবং এতে পেশি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় ২৫ জানুয়ারি তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয় এবং লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয়। প্রায় ২১ দিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পাশাপাশি আড়াই মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। উচ্চমূল্যের চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে চিকিৎসকরা প্লাজমা এক্সচেঞ্জ পদ্ধতি প্রয়োগ করেন। পাঁচ দফায় রক্তরস পরিবর্তনের মাধ্যমে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি ঘটে। চিকিৎসার প্রায় ১০ দিনের মাথায় লাইফ সাপোর্ট খুলে নেওয়া সম্ভব হয় এবং ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন তানিয়া। সুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসকরা ভবিষ্যতে গর্ভধারণ না করার পরামর্শ দিলেও ২০২৫ সালের অক্টোবরে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হন। ঝুঁকি বিবেচনায় গর্ভপাতের পরামর্শ দেওয়া হলেও তানিয়া ও পরিবার সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। এরপর নিউরোমেডিসিন, গাইনি, মেডিসিন ও আইসিইউ বিভাগের সমন্বয়ে তার গর্ভকালীন চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ চলে। নিয়মিত চেকআপের মাধ্যমে তার শারীরিক অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এ বিষয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, এ ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত নারীর নিরাপদ প্রসব অত্যন্ত বিরল। তানিয়ার ঘটনা চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
হামের উপসর্গ নিয়ে প্রাণ গেল আরও ৪ শিশুর
হামের উপসর্গ নিয়ে প্রাণ গেল আরও ৪ শিশুর
সারা দেশে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। প্রতিদিনই নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে অনেক শিশু। মৃত্যুর হারও বাড়ছে। হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও চার শিশু প্রাণ হারিয়েছে। এ সময় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ২৮৫ শিশু। শুক্রবার (১ মে) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুম থেকে দেওয়া প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সর্বশেষ এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় ১১৫ শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১৪৬। অধিদপ্তর আরও জানিয়েছে, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৪৯ জনের। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ২৩১ জনের। হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ায় গত ৫ এপ্রিল থেকে শুরু হয় ঝুঁকিপূর্ণ ৩০ উপজেলায় জরুরি টিকাদান। এরপর ১২ এপ্রিল থেকে দেওয়া হয় ঢাকার দুই সিটি, বরিশাল ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন এলাকায়। পরে ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে হামের টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়। এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন গতকাল বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) জানিয়েছেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে শতভাগ শিশুকে হামের টিকার আওতায় আনা সম্ভব হবে।
সামাজিক আক্রমণে চিকিৎসা থেকে সরে যায় এইডস রোগীরা
সামাজিক আক্রমণে চিকিৎসা থেকে সরে যায় এইডস রোগীরা
সামাজিকভাবে আক্রমণের বা স্টিগমার শিকার হয়ে এইচআইভি/এইডস রোগীরা চিকিৎসা থেকে দূরে থাকেন বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এটিকে জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি বলেও মনে করছেন তারা। বুধবার (২৯ এপ্রিল) রাজধানীর বিএমএ ভবনে আয়োজিত এক কর্মশালায় এসব বক্তারা এসব কথা বলেন। এইডস হেলথকেয়ার ফাউন্ডেশনের (এএইচএফ) সহযোগিতায় বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএইচআরএফ) এ কর্মশালার আয়োজন করে। বিএইচআরএফের সভাপতি প্রতীক ইজাজের সভাপতিত্বে কর্মশালায় স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভ। বিশেষ অতিথি ও মূল আলোচক ছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী। বাংলাদেশের এইডস পরিস্থিতি, সংকট ও উত্তরণ নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এএইচএফের কান্ট্রি ডিরেক্টর আকতার জাহান শিল্পী। এ ছাড়া এইডস রিপোর্টিং, চ্যালেজ্ঞ ও সমাধান নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কালবেলার স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক রাশেদ রাব্বি। কর্মশালায় জানানো হয়, ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশে প্রথম এইচআইভিতে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। এরপর থেকে প্রতিবছর ১০, ২০, ১০০ বা ২০০ জন করে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে। ২০২৫ সালে নতুন রোগী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৯১ জনে। আক্রান্তদের বেশির ভাগ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও সিলেটের বাসিন্দা। এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়ে প্রথম এক রোগী মারা যায় ২০০০ সালে। আর ২০২৫ সালে এই রোগে মৃতের সংখ্যা ২৫৪, যা আগের বছরে থেকে কিছু কম। এইডস/এসটিডি কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, দেশে পুরুষ সমকামী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণের হার ২০১৭ সালে ছিল শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২০ সালে তা বেড়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে এই হার আরও বেড়ে প্রায় ৩৪ শতাংশে পৌঁছেছে। কর্মশালায় বক্তরা বলেন, এইচআইভি নিয়ন্ত্রণে পরীক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি, চিকিৎসা সহজলভ্য করা এবং সামাজিক কুসংস্কার দূর করা জরুরি। একই সঙ্গে বিদেশফেরত শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়। তারা আরও বলেন, দেশের ৪১টি জেলায় এখনো এইচআইভি/এইডস পরীক্ষার সুযোগ নেই। ফলে বহু মানুষ রোগ শনাক্তের বাইরে থেকে যাচ্ছেন। সরকারি ও বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী, মোট সংক্রমিতদের প্রায় ১৮ শতাংশ এখনো শনাক্ত হয়নি। আর শনাক্তদের মধ্যে প্রায় ২৬ শতাংশ চিকিৎসার আওতার বাইরে রয়েছেন। আকতার জাহান শিল্পী জানান, দেশে অনুমিত এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তি ১৭ হাজার ৪৮০। এর মধ্যে শনাক্ত হয়েছে ১৪ হাজার ৩১৩ জন। সংক্রমণের হার দশমিক ০১ শতাংশ। শনাক্ত রোগীদের মধ্যে ৮ হাজার ৫৭৫ চিকিৎসার আওতায় এসেছেন। যা মোট শনাক্তের ৭৪ শতাংশ।  তিনি আরও জানান, আক্রান্তদের ৩৪ শতাংশ পুরুষ সমকামী ও ১৪ শতাংশ পুরুষ যৌনকর্মী। এ ছাড়া প্রবাসী ১২ শতাংশ, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ১১ শতাংশ, শিরায় মাদকগ্রহণকারী ৬ শতাংশ, নারী যৌনকর্মী ও হিজড়া ১ শতাংশ করে। এ ছাড়া ২২ শতাংশ অন্যান্য মানুষ। আকতার জাহান শিল্পী বলেন, আক্রান্তদের বয়সভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৬২ দশমিক ৬১ শতাংশ ২৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী ২১ দশমিক ০৫ শতাংশ। ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শূন্য দশমিক ৬৯ শতাংশ। ৫ বছরের কম বয়সে আক্রান্ত ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। সাংবাদিক রাশেদ রাব্বি তার উপস্থাপনায় বলেন, দেশে এইডসের ক্ষেত্রে একসময় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছিল শিরায় মাদক গ্রহণকারী, প্রবাসী শ্রমিক, নারী যৌনকর্মী, পুরুষ যৌনকর্মী ও হিজড়া জনগোষ্ঠীর মানুষ। ২০২০ সালের পর থেকে দেখা গেছে, সমকামী জনগোষ্ঠীর মধ্যে আক্রান্তের হার বাড়তে শুরু করে এখন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এসেছে। দ্বিতীয় সবোর্চ্চ হলো প্রবাসী শ্রমিক। এইচআইভি এইডস নিয়ন্ত্রণে আমাদের বিদেশ থেকে ফেরার সময় শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা জরুরি। ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সামাজিকভাবে আক্রমণ বা স্টিগমা করা হলে তারা চিকিৎসা থেকে দূরে সরে যায়। এতে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি আরও বাড়ে। তিনি বলেন, স্টিগমা ও বৈষম্য মানুষকে ‘আন্ডারগ্রাউন্ডে’ ঠেলে দেয়, ফলে তারা চিকিৎসা নিতে ভয় পায়। কোনো রোগীকে তার রোগের কারণে চিহ্নিত বা ‘ট্যাগিং’ করা হলো স্টিগমা। কোনো ব্যক্তিকে তার অসুস্থতার (যেমন এইচআইভি বা হেপাটাইটিস বি) কারণে রাজনৈতিক অধিকার বা চাকরি থেকে বঞ্চিত করা বা ছাঁটাই করা মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বৈষম্যের অন্তর্ভুক্ত। এইচআইভি এখন আর নিশ্চিত মৃত্যু নয় জানিয়ে ডা. সাইফুল্লাহ মুন্সী বলেন, ১৯৮৪ সালে শনাক্ত হওয়া রোগীও এখন সুস্থভাবে বেঁচে আছেন। সঠিক চিকিৎসায় এটি এখন ডায়াবেটিসের মতোই নিয়ন্ত্রণযোগ্য। বর্তমানে এমন ইনজেকশনও বের হয়েছে, যা বছরে একবার নিলেই সারা বছর ভালো থাকা যায়।
টিকা সংকটের তথ্য প্রকাশ হওয়ায় শাস্তির মুখে কর্মকর্তা 
টিকা সংকটের তথ্য প্রকাশ হওয়ায় শাস্তির মুখে কর্মকর্তা 
দেশে হামের উচ্চ প্রকোপের মাঝেই সংকট দেখা দিয়েছে আরেক মরণব্যাধি জলাতঙ্কের ভ্যাকসিনের। এছাড়া রয়েছে শিশুদের যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, ধনুষ্টংকারসহ অন্তত পাঁচটি টিকার স্বল্পতা। এসব টিকা পেতে প্রতিনিয়ত হাসপাতালে ভিড় বাড়ছে রোগী ও স্বজনদের। ফলে মানুষের আগ্রহের কারণে টিকার সরববরাহ নিয়ে খোঁজ রাখছেন সংবাদকর্মীরা। সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) কর্মকর্তা ও হাসপাতালের সংশ্লিষ্টরাও এ নিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। জানাতে হয় টিকার বাস্তব চিত্র। তবে এতে করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রীর তোপের মুখে পড়ছেন কর্মকর্তারা। গণমাধ্যমে টিকার সংকটের তথ্য দেওয়ায় অন্তত দুজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ মুন্সীগঞ্জ ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আহাম্মদ কবীরকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। গত শুক্রবার হাসপাতালটিতে পরিদর্শনে গিয়ে এ ঘোষণা দেন মন্ত্রী। জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নিয়ে ‘ভুল তথ্য’ ছড়ানোর অভিযোগে ওই কর্মকর্তাকে এ শাস্তি দেওয়া হয়। এর আগে জলাতঙ্কের টিকার সংকট নিয়ে বিবিসি বাংলায় কথা বলেছিলেন ডা. আহাম্মদ কবীর। বিবিসির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, মুন্সিগঞ্জ ২৫০ বিশিষ্ট হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ৩০ জন ব্যক্তি কুকুর অথবা বিড়ালের কামড় খেয়ে টিকা নিতে আসেন। কিন্তু টিকা স্বল্পতার কারণে অনেককে ফিরে যেতে হয়। বিশেষ করে বিড়ালের ক্ষেত্রে কোনো টিকাই দেওয়া হয় না। ইপিআই থেকে টিকা না দেওয়া এবং অর্থের অভাবে নিজস্ব তহবিল থেকে কিনতে না পারায় এমন সংকট।  ওই সাক্ষাৎকারে আহম্মাদ কবীর বলেন, ভ্যাকসিন সংকটের কারণে সবাইকে দেওয়া যাচ্ছে না। আমাদের অন্য ফান্ডে যে সামান্য কিছু টাকা বেঁচে গেছে, সেটা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। ১২০টা ভ্যাকসিন কিনলে আমার লক্ষ্য থাকে এক মাস চালানো। যদি সবাইকে দেই তাহলে সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। বাকি দিনগুলোতে কেউ পাবে না।  তিনি বলেন, ‘আমরা এখন টিকার রেশনিং করছি। যাদের জরুরি প্রয়োজন এবং খুবই দরিদ্র, শুধু তাদের বিনামূল্যে দিচ্ছি। যাদের কেনার সামর্থ্য আছে কিংবা বিড়াল বাসায় পালে তাদেরকে কিনে দিতে বলছি।’ বিবিসি বাংলায় এমন বক্তব্য দেওয়ার পর ওই কর্মকর্তাকে সরানোর নির্দেশ দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।  এর আগেও একই রকমের ঘটনা ঘটেছে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে টিকা সংকট নিয়ে চলতি মাসের শুরু থেকে সংবাদমাধ্যমে একের পর এক খবর প্রকাশিত হতে থাকে। যা নিয়ে চরম সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার। এসব সংবাদে ইপিআইয়ের মুখপাত্র হিসেবে বক্তব্য দিতে হয়েছে উপ-পরিচালক ডা. শাহরিয়ার সাজ্জাদকে। পরে গত ১৬ এপ্রিল এই কর্মকর্তাকে ইপিআই থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে তাকে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সংযুক্ত রাখা হয়েছে।  উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী নন শাস্তির মুখে পড়া স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। শনিবার রাতে অনেক চেষ্টার পর কথা হয় ডা. শাহরিয়ার সাজ্জাদের সঙ্গে। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘এককভাবে ওই কারণে নাকি আরও কোনো কারণে করেছে জানি না।’ এর বেশি কিছু বলতে রাজি হননি তিনি। সংবাদমাধ্যমে তথ্য দেওয়ায় এমন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এমন সিদ্ধান্তে সরকারের কঠোর সমালোচনা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, এভাবে শাস্তি দিলে কেউ আর সঠিক তথ্য দেবে না। আর মাঠ পর্যায়ের সংকটের চিত্র না পেলে সরকারের পুরো কর্মসূচি ব্যর্থ হবে।  স্বাস্থ্যমন্ত্রী যখন ডা. আহাম্মদ কবীরকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন, তখন তার সঙ্গে ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস। এ সম্পর্কে জানতে মহাপরিচালকের মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘শুধু সংবাদমাধ্যমে তথ্য দেওয়ায় এমন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে মনে হয় না। যদিও সংবাদমাধ্যমে তাই এসেছে।’ তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বোচ্চ কর্তা স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি যখন কোনো নির্দেশনা দেন সেটির বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই অধিদপ্তরের। এমনকি ঘটনা প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছে, আসলেই তিনি ভুল তথ্য দিয়েছেন কিনা; তা যাচাইয়েরও সুযোগ নেই। কারণ, সরাসরি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’ এই কর্মকর্তা বলেন, ‘সাধারণত এসব ঘটনায় অধস্তনদের নোট নিতে বলা হয়, খতিয়ে দেখে সত্যতা পেলে তখন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু এখানে অধিদপ্তরের করার কিছু নেই।’ তথ্য দিয়ে কর্মকর্তাদের শাস্তির মুখে পড়া নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কঠোর সমালোচনা করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবু জামিল ফয়সাল। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ে যারা আছেন বিশেষ করে হাসপাতালের প্রধান, তাদের কাছে সবসময় আসল চিত্র থাকে। সঠিক তথ্য পেলে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়। এখন সংবাদমাধ্যমে সেই তথ্য দিয়ে যদি কর্মকর্তারা শাস্তির মুখে পড়েন, প্রত্যাহার বা ওএসডি হোন সেটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’ এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘কোনো রোগী ভ্যাকসিন না পেলে হাসপাতালের যিনি দায়িত্বে থাকেন তার কাছেই যান, মন্ত্রীর কাছে নয়। এ ধরনের পদক্ষেপে চাকরি হারানোর ভয়ে প্রতিষ্ঠানের কেউ আর সত্য তথ্য দিতে চাইবেন না। ফলে কোথায় টিকার ঘাটতি, জনবলের সমস্যা, ব্যবস্থাপনায় জটিলতা—এগুলো সামনে আসবে না। আর না এলে চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কর্মসূচিতে।’ তিনি বলেন, ‘মন্ত্রীর উচিত ছিল সবকিছু শোনা। এরপর সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া যে, অমুক প্রতিষ্ঠানের সংকটের কথা বলেছে। প্রকৃত অবস্থা কী খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা। তা না করে সরিয়ে দিলে যে লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে, তা অর্জন হবে না।’  সম্প্রতি একাধিক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী দাবি করেন, হাম, রুবেলা ও জলাতঙ্কসহ কোনো টিকার সংকট নেই। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে এর বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। সংকটের বিষয়টি ইপিআইও স্বীকার করছে। জলাতঙ্কের টিকা মূলত দেওয়া হয় কুকুর কিংবা বিড়ালের কামড় বা আঁচড় খেলে। এজন্য এআরভি বা অ্যান্টি র‌্যাবিস ভ্যাকসিন এবং আরআইজি বা র‌্যাবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন নামে দুটি ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। এর মধ্যে কামড় একটু বেশ ক্ষতিকর হলে দেওয়া হয় আরআইজি ভ্যাকসিন। দেশের হাসপাতালগুলোতে সংকট দেখা দিয়েছে এ ভ্যাকসিনের।  রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এ ভ্যাকসিনের সরবরাহ শতভাগ থাকলেও উল্টো চিত্র ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোতে। মূলত কেন্দ্রীয়ভাবে মজুত না থাকায় এমন জটিলতা বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। নিউমোনিয়া, যক্ষ্মাসহ শিশুদের জন্য নির্ধারিত টিকার পাঁচটিরও কেন্দ্রীয় মজুত শূন্য। ইপিআই-এর মাধ্যমে ৯টি টিকার মাধ্যমে ১২টি রোগ প্রতিরোধ করা হয়। শিশুদের জন্য নির্ধারিত সাতটি টিকার মধ্যে রয়েছে—নিউমোনিয়া প্রতিরোধে পিসিভি, যক্ষ্মার জন্য বিসিজি, পোলিওর নির্মূলে ওপিভি ও আইপিভি, টাইফয়েডের জন্য টিসিভি, হাম ও রুবেলা প্রতিরোধে এমআর এবং পাঁচটি রোগ (ধনুষ্টংকার, হুপিংকাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ডিপথেরিয়া ও হেপাটাইটিস-বি) প্রতিরোধে দেওয়া হয় পেন্টা টিকা। এছাড়া কিশোরীদের জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধে এইচপিভি এবং ১৫ থেকে ৪৯ বছরের নারীদের ধনুষ্টংকার ও ডিপথেরিয়া সুরক্ষায় টিডি টিকা দেওয়া হয়। ইপিআই সূত্রে জানা গেছে, শিশুদের সাতটি টিকার মধ্যে আইপিভি ও টিসিভি থাকলেও বর্তমানে মজুত শূন্য রয়েছে—যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, হাম-রুবেলা ও পেন্টা টিকার। বর্তমানে হাম-রুবেলার গণটিকা কর্মসূচি চলছে বিশেষভাবে কেনা টিকায়। যেখানে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী যেকোনো শিশু টিকা নিতে পারছে। টিকা ক্যাম্পেইনের মাঝেও থেমে নেই হামের সংক্রমণ। এমনকি প্রতিদিনই প্রাণহানি ঘটছে।  স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে শনিবার (২৫ এপ্রিল) সকাল ৮টা পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৩৫ হাজার ৬৭ জনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তাদের ৯০ ভাগই শিশু। সংখ্যায় কম হলেও আক্রান্তদের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্করাও রয়েছেন।