সামাজিকভাবে আক্রমণের বা স্টিগমার শিকার হয়ে এইচআইভি/এইডস রোগীরা চিকিৎসা থেকে দূরে থাকেন বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এটিকে জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি বলেও মনে করছেন তারা।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) রাজধানীর বিএমএ ভবনে আয়োজিত এক কর্মশালায় এসব বক্তারা এসব কথা বলেন। এইডস হেলথকেয়ার ফাউন্ডেশনের (এএইচএফ) সহযোগিতায় বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএইচআরএফ) এ কর্মশালার আয়োজন করে।
বিএইচআরএফের সভাপতি প্রতীক ইজাজের সভাপতিত্বে কর্মশালায় স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভ। বিশেষ অতিথি ও মূল আলোচক ছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী।
বাংলাদেশের এইডস পরিস্থিতি, সংকট ও উত্তরণ নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এএইচএফের কান্ট্রি ডিরেক্টর আকতার জাহান শিল্পী। এ ছাড়া এইডস রিপোর্টিং, চ্যালেজ্ঞ ও সমাধান নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কালবেলার স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক রাশেদ রাব্বি।
কর্মশালায় জানানো হয়, ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশে প্রথম এইচআইভিতে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। এরপর থেকে প্রতিবছর ১০, ২০, ১০০ বা ২০০ জন করে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে। ২০২৫ সালে নতুন রোগী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৯১ জনে। আক্রান্তদের বেশির ভাগ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও সিলেটের বাসিন্দা।
এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়ে প্রথম এক রোগী মারা যায় ২০০০ সালে। আর ২০২৫ সালে এই রোগে মৃতের সংখ্যা ২৫৪, যা আগের বছরে থেকে কিছু কম।
এইডস/এসটিডি কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, দেশে পুরুষ সমকামী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণের হার ২০১৭ সালে ছিল শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২০ সালে তা বেড়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে এই হার আরও বেড়ে প্রায় ৩৪ শতাংশে পৌঁছেছে।
কর্মশালায় বক্তরা বলেন, এইচআইভি নিয়ন্ত্রণে পরীক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি, চিকিৎসা সহজলভ্য করা এবং সামাজিক কুসংস্কার দূর করা জরুরি। একই সঙ্গে বিদেশফেরত শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়।
তারা আরও বলেন, দেশের ৪১টি জেলায় এখনো এইচআইভি/এইডস পরীক্ষার সুযোগ নেই। ফলে বহু মানুষ রোগ শনাক্তের বাইরে থেকে যাচ্ছেন। সরকারি ও বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী, মোট সংক্রমিতদের প্রায় ১৮ শতাংশ এখনো শনাক্ত হয়নি। আর শনাক্তদের মধ্যে প্রায় ২৬ শতাংশ চিকিৎসার আওতার বাইরে রয়েছেন।
আকতার জাহান শিল্পী জানান, দেশে অনুমিত এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তি ১৭ হাজার ৪৮০। এর মধ্যে শনাক্ত হয়েছে ১৪ হাজার ৩১৩ জন। সংক্রমণের হার দশমিক ০১ শতাংশ। শনাক্ত রোগীদের মধ্যে ৮ হাজার ৫৭৫ চিকিৎসার আওতায় এসেছেন। যা মোট শনাক্তের ৭৪ শতাংশ।
তিনি আরও জানান, আক্রান্তদের ৩৪ শতাংশ পুরুষ সমকামী ও ১৪ শতাংশ পুরুষ যৌনকর্মী। এ ছাড়া প্রবাসী ১২ শতাংশ, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ১১ শতাংশ, শিরায় মাদকগ্রহণকারী ৬ শতাংশ, নারী যৌনকর্মী ও হিজড়া ১ শতাংশ করে। এ ছাড়া ২২ শতাংশ অন্যান্য মানুষ।
আকতার জাহান শিল্পী বলেন, আক্রান্তদের বয়সভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৬২ দশমিক ৬১ শতাংশ ২৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী ২১ দশমিক ০৫ শতাংশ। ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শূন্য দশমিক ৬৯ শতাংশ। ৫ বছরের কম বয়সে আক্রান্ত ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
সাংবাদিক রাশেদ রাব্বি তার উপস্থাপনায় বলেন, দেশে এইডসের ক্ষেত্রে একসময় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছিল শিরায় মাদক গ্রহণকারী, প্রবাসী শ্রমিক, নারী যৌনকর্মী, পুরুষ যৌনকর্মী ও হিজড়া জনগোষ্ঠীর মানুষ।
২০২০ সালের পর থেকে দেখা গেছে, সমকামী জনগোষ্ঠীর মধ্যে আক্রান্তের হার বাড়তে শুরু করে এখন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এসেছে। দ্বিতীয় সবোর্চ্চ হলো প্রবাসী শ্রমিক। এইচআইভি এইডস নিয়ন্ত্রণে আমাদের বিদেশ থেকে ফেরার সময় শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা জরুরি।
ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সামাজিকভাবে আক্রমণ বা স্টিগমা করা হলে তারা চিকিৎসা থেকে দূরে সরে যায়। এতে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি আরও বাড়ে।
তিনি বলেন, স্টিগমা ও বৈষম্য মানুষকে ‘আন্ডারগ্রাউন্ডে’ ঠেলে দেয়, ফলে তারা চিকিৎসা নিতে ভয় পায়। কোনো রোগীকে তার রোগের কারণে চিহ্নিত বা ‘ট্যাগিং’ করা হলো স্টিগমা। কোনো ব্যক্তিকে তার অসুস্থতার (যেমন এইচআইভি বা হেপাটাইটিস বি) কারণে রাজনৈতিক অধিকার বা চাকরি থেকে বঞ্চিত করা বা ছাঁটাই করা মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বৈষম্যের অন্তর্ভুক্ত।
এইচআইভি এখন আর নিশ্চিত মৃত্যু নয় জানিয়ে ডা. সাইফুল্লাহ মুন্সী বলেন, ১৯৮৪ সালে শনাক্ত হওয়া রোগীও এখন সুস্থভাবে বেঁচে আছেন। সঠিক চিকিৎসায় এটি এখন ডায়াবেটিসের মতোই নিয়ন্ত্রণযোগ্য। বর্তমানে এমন ইনজেকশনও বের হয়েছে, যা বছরে একবার নিলেই সারা বছর ভালো থাকা যায়।




