মেক্সিকোর পশ্চিমাঞ্চলে এক ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে নিহত হয়েছেন কুখ্যাত মাদক সম্রাট নেমেসিও ওসেগুয়েরা সার্ভান্তেস; যিনি ‘এল মেনচো’ নামে পরিচিত। রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) জালিস্কো অঙ্গরাজ্যে পরিচালিত এই অভিযানে তাকে হত্যা করে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী।
যুক্তরাষ্ট্রের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় থাকা এল মেনচোর অবস্থান একটি ঘনিষ্ঠ সহযোগীর মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্য পেয়ে নিরাপত্তা বাহিনী টাপালপায় নামের পাহাড়ি এলাকায় তাকে ঘিরে ফেলে। ওইদিন ভোরের আগে অভিযান শুরু হলে কয়েক ঘণ্টা ধরে গোলাগুলি চলে এবং এর জেরে বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
এই অভিযানকে গত এক দশকে সংগঠিত অপরাধের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে কুখ্যাত মাদক সম্রাট জোয়াকিন গুজমান ওরফে ‘এল চ্যাপো’ পুনরায় গ্রেপ্তার হওয়াকে বড় সাফল্য হিসেবে ধরা হয়েছিল।
কে ছিলেন ‘এল মেনচো’?
৫৯ বছর বয়সি এল মেনচো একসময় পুলিশ সদস্য ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। তিনি পশ্চিম মেক্সিকোর মিচোয়াকান অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দা। প্রায় তিন দশক ধরে বিশাল অপরাধ সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন।
১৯৯০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে হেরোইন পাচারের দায়ে দণ্ডিত হয়ে কারাভোগ করেন। পরে মেক্সিকোতে ফিরে এসে দ্রুত মাদক জগতের শীর্ষে উঠে আসেন।
২০০৯ সালের দিকে তিনি জালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেল (সিজেএনজি) প্রতিষ্ঠা করেন, যা অল্প সময়েই মেক্সিকোর অন্যতম শক্তিশালী ও সহিংস সংগঠনে পরিণত হয়।
এই সংগঠন যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন, মেথঅ্যামফেটামিন ও ফেন্টানিল পাচার করত এবং অবৈধভাবে অভিবাসীদের উত্তর দিকে পাচার করত। সামরিক কৌশল, ড্রোন ও বিস্ফোরক ব্যবহারের মতো আধুনিক পদ্ধতির জন্যও তারা কুখ্যাত ছিল।
কীভাবে পরিচালিত হয় অভিযান?
ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখে নতুন গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর মেক্সিকোর নিরাপত্তা বাহিনী টাপালপায় এল মেনচোর অবস্থান ঘিরে ফেলে। ২২ ফেব্রুয়ারি ভোরে বিশেষ বাহিনী, ন্যাশনাল গার্ড ও সামরিক হেলিকপ্টার দিয়ে পুরো এলাকা ঘিরে অভিযান শুরু হয়।
সেনারা এগিয়ে গেলে সংগঠনের সশস্ত্র সদস্যরা গুলি চালায়। পাল্টা গুলিতে বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজন সদস্য নিহত হয়। এরপর এল মেনচো ও তার সহযোগীরা কাছের একটি জঙ্গলের কেবিনে আশ্রয় নিলে আবারও গোলাগুলি শুরু হয়।
অবশেষে আহত অবস্থায় এল মেনচোকে দুই দেহরক্ষীসহ উদ্ধার করা হয়। তাকে হেলিকপ্টারে করে হাসপাতালে নেওয়ার সময় তার মৃত্যু হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক গোয়েন্দা টাস্কফোর্সও এই অভিযানে সহায়তা করেছে বলে জানা গেছে।
অভিযানের পর কী ঘটেছে?
এল মেনচোর মৃত্যুর পরপরই ওই সংগঠনের পক্ষ থেকে পাল্টা সহিংসতা শুরু হয়। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ‘এল তুলি’ জালিস্কোতে সমন্বিত হামলার নেতৃত্ব দেন বলে জানায় দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
তিনি সড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও সরকারি স্থাপনায় হামলার নির্দেশ দেন এবং সেনা সদস্যদের হত্যার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেন। পরে নিরাপত্তা বাহিনী তাকে এল গ্রুলো এলাকায় খুঁজে পায়। পরে পালানোর চেষ্টা করলে সংঘর্ষে তিনিও নিহত হন।
সহিংসতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে। সংগঠনের সদস্যরা গাড়িতে আগুন দেয়, মহাসড়ক অবরোধ করে। জনপ্রিয় পর্যটন শহর পুয়ের্তো ভাল্লার্তা-তে ফ্লাইট বাতিল করা হয়। বিভিন্ন স্কুল-কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয় এবং বাসিন্দাদের ঘরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।
সোমবার পর্যন্ত সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন সন্দেহভাজন কার্টেল সদস্য, ২৫ জন ন্যাশনাল গার্ড সদস্য ও একজন বেসামরিক নিহত হয়েছেন বলে জানায় কর্তৃপক্ষ। সাতটি অঙ্গরাজ্যে ৭০ জনের বেশি সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং শুধু রোববারেই অন্তত ৮৫টি সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে।
সূত্র: আলজাজিরা




