
বিশ্বকাপের দিন গুনছে ফুটবল দুনিয়া। আর মাত্র ৩৩ দিন পর শুরু হবে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ। কিন্তু বাংলাদেশি দর্শকদের জন্য এখনো পরিষ্কার নয়, ঘরে বসে টিভি বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তারা টুর্নামেন্টটি দেখতে পারবেন কি না। ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের করা প্রতিবেদন অনুযায়ী গতকাল (৮ মে) পর্যন্ত বাংলাদেশে কোনো সম্প্রচারকারী বিশ্বকাপের সম্প্রচারস্বত্ব নিশ্চিত করতে পারেনি।
চড়া মূল্য, সীমিত বিজ্ঞাপন আয়ের সুযোগ এবং বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী অস্বস্তিকর ম্যাচ সূচি, সব মিলিয়ে দেশের সম্প্রচারমাধ্যমগুলো এখনো বিশ্বকাপ সম্প্রচারে এগিয়ে আসেনি। বাংলাদেশে ২০২৬ বিশ্বকাপের মিডিয়া স্বত্ব পেয়েছে সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্প্রিংবক পিটিই লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির দাবিকৃত অর্থই এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ টেলিভিশনের কাছে ১ কোটি ২৩ লাখ মার্কিন ডলার দাবি করেছে স্প্রিংবক। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১৫০ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। এর সঙ্গে প্রযোজ্য কর, অগ্রিম আয়কর ও ভ্যাট যোগ হলে মোট খরচ প্রায় ২০০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন।
প্রস্তাবিত প্যাকেজে টেলিভিশন, রেডিও, মোবাইল ও ইন্টারনেট স্বত্ব অন্তর্ভুক্ত। এতে ১০৪টি ম্যাচের সরাসরি সম্প্রচার ও হাইলাইটস, উদ্বোধনী এবং সমাপনী অনুষ্ঠানও আছে। শর্ত অনুযায়ী, মোট অর্থের ৫০ শতাংশ ১০ মের মধ্যে এবং বাকি অর্থ ১০ জুনের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।
সরকারি পর্যায়ে এখনই স্বত্ব কেনার আগ্রহ নেই বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি এবং আগের সম্প্রচার চুক্তি ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগের কারণে সরকার সতর্ক অবস্থানে আছে বলে জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, আগেরবার যে অর্থ ব্যয় করা হয়েছিল, তার এক দশমাংশও উঠে আসেনি বলে মনে হচ্ছে। দর্শকদের জন্য সরকারি চ্যানেলে বিশ্বকাপ দেখানো গেলে ভালো হতো, তবে দেশের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার এখন বিষয়টি নিয়ে ভাবছে না। তবে বেসরকারি কেউ আগ্রহ দেখালে পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে সরকার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে বাংলাদেশে সম্প্রচারের চিত্র ছিল ভিন্ন। তখন রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভি টেরেস্ট্রিয়াল স্বত্ব নেয়। টি স্পোর্টস ও জিটিভি স্যাটেলাইট স্বত্ব পায়। ডিজিটাল স্ট্রিমিং স্বত্ব ছিল টফির হাতে। ফলে বাংলাদেশের দর্শকরা সব ৬৪টি ম্যাচ সরাসরি দেখতে পেরেছিলেন।
এবার পরিস্থিতি জটিল। জানা গেছে, টি স্পোর্টস, স্টার নিউজ ও একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক কম দামে সম্প্রচারস্বত্ব নিতে আগ্রহ দেখিয়েছিল। কিন্তু স্প্রিংবক এখনো তাদের দাবিকৃত মূল্য কমাতে রাজি হয়নি। বেসরকারি সম্প্রচারমাধ্যমগুলোর মতে, বাংলাদেশের বাজারের তুলনায় এই দাম টেকসই নয়, বিশেষ করে বিটিভি খরচ ভাগ না করলে।
ম্যাচের সময়সূচিও বিজ্ঞাপন বিক্রির ক্ষেত্রে বড় সমস্যা। ২০২৬ বিশ্বকাপের ১০৪ ম্যাচের মধ্যে ৫২টি ম্যাচ বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টার আগে শেষ হবে, বাকি ৫২টি শুরু হবে ভোর ৪টার পর। এই সময়ে ম্যাচ সম্প্রচার করলে বিজ্ঞাপন থেকে বড় অঙ্কের অর্থ তুলে আনা কঠিন হবে বলে মনে করছেন সম্প্রচারসংশ্লিষ্টরা।
বিটিভির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এ বছরের বিশ্বকাপ নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। স্প্রিংবক প্রথমে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে। পরে বিষয়টি বিটিভির কাছে যায়। গত মাসে বিটিভি দাম জানতে স্প্রিংবকের সঙ্গে যোগাযোগ করে। পাশাপাশি ফিফার কাছেও বিনা মূল্যে ফিড পাওয়ার আশা নিয়ে যোগাযোগ করা হয়েছিল, তবে এখনও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর ফিফা যে দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু করেছিল, তাতে বিটিভি বা বাংলাদেশ সরকার অংশ নেয়নি। অংশ নিলে হয়তো কম দামে স্বত্ব পাওয়া যেত।
বাংলাদেশের মতো সম্প্রচারস্বত্ব জটিলতায় পড়েছে ভারত ও চীনও। রয়টার্সের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের সম্প্রচারস্বত্বের জন্য রিলায়েন্স-ডিজনি যৌথ উদ্যোগ প্রায় ২ কোটি মার্কিন ডলার প্রস্তাব করেছিল, যা ফিফার প্রত্যাশিত দামের চেয়ে কম। সনি কোনো প্রস্তাবই দেয়নি। চীনেও এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সম্প্রচারকারী ঘোষণা করা হয়নি।
২০২৬ বিশ্বকাপ শুরু হবে ১১ জুন। হাতে সময় কম। সম্প্রচারস্বত্ব চূড়ান্ত করা, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি নেওয়া, বিজ্ঞাপন বিক্রি করা, সবকিছুর জন্যই দ্রুত সিদ্ধান্ত দরকার। কিন্তু এখনো কোনো সমাধান না হওয়ায় বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের সামনে বড় প্রশ্ন, ৪৮ দলের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ তারা ঘরে বসে দেখতে পারবেন তো?




