
মিরপুরের বাংলাদেশ-পাকিস্তান প্রথম টেস্টের প্রথম দিন শেষে বেশ ভালো অবস্থানে স্বাগতিক বাংলাদেশ। সকালে টসে হেরে ব্যাটিংয়ে প্রথম ঘণ্টার আগেই দুই ওপেনার ফিরে গেলে বাংলাদেশর সাবধানী শুরু পরিণত হয় চাপে। দিনের শেষে স্কোরবোর্ড অবশ্য অন্য গল্প বলছে।
৮৫ ওভার শেষে বাংলাদেশের রান ৪ উইকেটে ৩০১। শুরুতে ৩১ রানে ২ উইকেট হারানো দলটির জন্য এটি স্বস্তির দিনই বলতে হবে। শান্ত সেঞ্চুরি করেছেন, মুমিনুল হক সেঞ্চুরি থেকে ৯ রান দূরে থেমেছেন, আর শেষ বিকেলে মুশফিকুর রহিম ও লিটন দাস দিন শেষ করে ফিরেছেন ড্রেসিংরুমে। স্টাম্পসের সময় মুশফিক ৪৮ ও লিটন ৮ রানে অপরাজিত।
বাংলাদেশের দিনের ভিত গড়ে দেন নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুমিনুল। দুই ওপেনারের বিদায়ের পর তাদের ১৭০ রানের জুটি পাকিস্তানের সকালের সাফল্যকে অনেকটাই মুছে দেয়। শান্ত ছিলেন বেশি ইতিবাচক, মুমিনুল ছিলেন বেশি ধৈর্যশীল। দুজনের ব্যাটিংয়ের ধরন আলাদা হলেও লক্ষ্য ছিল এক, নতুন বলে তৈরি হওয়া চাপকে লম্বা ইনিংসে বদলে দেওয়া।
শান্ত সেটি করেছেন অধিনায়কের মতোই। মোহাম্মদ আব্বাসের বলে কভার দিয়ে চার মেরে ১২৯ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন তিনি। এটি তার টেস্ট ক্যারিয়ারের নবম শতক, পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম। এর আগে এই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে টেস্টে তার কোনো ফিফটিও ছিল না। সেঞ্চুরির পর গ্যালারির গর্জন, ড্রেসিংরুমের করতালি আর শান্তর উচ্ছ্বাস, সব মিলিয়ে মুহূর্তটা ছিল দিনের সবচেয়ে উজ্জ্বল ছবি।
তবে ক্রিকেট কখনো কখনো আনন্দকে খুব দ্রুত আক্ষেপে বদলে দেয়। সেঞ্চুরির পরের বলেই আব্বাসের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে ফেরেন শান্ত। ১২ চার ও ২ ছক্কায় ১০১ রানের ইনিংস শেষ হয় ১২৯ বলে। বাংলাদেশের স্কোর তখন ২০১/৩।
শান্ত ফেরার পর ইনিংসের ভার আরও বেশি করে চলে আসে মুমিনুলের ওপর। তার ব্যাটিংয়ে ছিল পুরোনো দিনের টেস্ট মেজাজ। অফ স্টাম্পের বাইরের বল ছেড়েছেন, শরীরের কাছে খেলেছেন, অযথা শট খেলেননি। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত পাকিস্তানের পেস, স্পিন, গরম, সবকিছুর সঙ্গে লড়াই করে যখন সেঞ্চুরির খুব কাছে পৌঁছে গেছেন, তখনই এলো দিনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ।
৭৪তম ওভারে নোমান আলীর দ্রুতগতির বল স্কিড করে নিচু থাকে। মুমিনুল ব্যাকফুটে গিয়ে আড়াআড়ি ব্যাটে সামলাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বল গিয়ে লাগে প্যাডে। আম্পায়ার আউট দিলে সঙ্গে সঙ্গেই রিভিউ নেন তিনি। আল্ট্রা এজে ব্যাটের ছোঁয়া মেলেনি, বল ট্র্যাকিংয়ে দেখা যায় বল লাগত মিডল-লেগ স্টাম্পে। ২০০ বলে ১০ চারে ৯১ রানে শেষ হয় তার ইনিংস।
মুমিনুলের আউটের সময় বাংলাদেশের রান ২৭৭/৪। পাকিস্তান তখন মনে করতেই পারে, শেষ সেশনের শেষ ভাগে আরও এক-দুটি উইকেট পেলে দিনটার রং কিছুটা বদলে দেওয়া যাবে। বিশেষ করে দ্বিতীয় নতুন বল হাতে পাওয়ার পর শাহিন-আব্বাসরা নতুন করে চাপ তৈরির সুযোগ পেয়েছিলেন।
কিন্তু মুশফিক ও লিটন সেটি হতে দেননি। মুশফিক শুরুতে সময় নিয়েছেন, পরে সুযোগ পেলে চার মেরেছেন। আব্বাসের বল দেরিতে খেলে স্লিপ-গালির ফাঁক দিয়ে চার, হাসান আলীর বলে এজ হলেও সীমানা, সব মিলিয়ে তার ইনিংসে ছিল অভিজ্ঞতার ছাপ। দিন শেষে তিনি ৪৮ রানে অপরাজিত, আর বাংলাদেশের স্কোর ৩০০ পেরিয়ে গেছে।
লিটনের কাজ ছিল শেষ বিকেলটা পেরিয়ে যাওয়া। নতুন বলের সময় সেটিই করেছেন তিনি। ৩৫ বল খেলে ৮ রানে অপরাজিত থেকেছেন। খুব চোখে পড়ার মতো রান নয়, কিন্তু দিনের শেষ আধঘণ্টায় উইকেট না হারানোই ছিল তখন বাংলাদেশের সবচেয়ে জরুরি কাজ।
পাকিস্তানের জন্য দিনটি মিশ্র। শুরুটা তারা চেয়েছিল এমনই, দুই ওপেনারকে দ্রুত ফিরিয়ে। শাহিন জয়কে ফেরান, হাসান আলী তুলে নেন সাদমানকে। পরে আব্বাস শান্তকে ফিরিয়ে কিছুটা স্বস্তি দেন, নোমান আলী মুমিনুলের বড় ইনিংস থামান। কিন্তু ৩১/২ থেকে ৩০১/৪, এই হিসাব বলছে দিনের বড় অংশে নিয়ন্ত্রণ ছিল বাংলাদেশের।
ফিল্ডিং ও শৃঙ্খলার জায়গায় পাকিস্তানের আক্ষেপও থাকবে। নোমান আলীর একাধিক নো-বল, রিজওয়ানের কিছু বাই, পুরোনো বলে ধার কমে যাওয়া, সব মিলিয়ে তারা যে চাপ তৈরি করেছিল, সেটি ধরে রাখতে পারেনি। দ্বিতীয় নতুন বল নিয়েও দিনের শেষে আর উইকেট আসেনি।
প্রথম দিনের শেষে স্বাগতিকদের ড্রেসিংরুমে স্বস্তি থাকার কথা। সবুজ উইকেটে টসে হেরে ব্যাটিং, ৩১/২ থেকে শান্তর সেঞ্চুরি, মুমিনুলের ৯১, শেষে মুশফিকের অপরাজিত ৪৮। মিরপুর টেস্টের প্রথম দিনটা তাই বাংলাদেশেরই।




