
মিরপুরের সকালটা ছিল পাকিস্তানের পেসারদের। ঘাসঢাকা উইকেট, নতুন বলে সুইং-সিম, সঙ্গে শাহিন শাহ আফ্রিদি, মোহাম্মদ আব্বাস ও হাসান আলীর নিরন্তর পরীক্ষা। টসে হেরে ব্যাটিংয়ে নামা বাংলাদেশও দ্রুত হারিয়ে ফেলে দুই ওপেনারকে। ৩১ রানে ২ উইকেট, সবুজ উইকেটে তখন চাপটা ভালোভাবেই বাংলাদেশ ড্রেসিংরুমে।
সেখান থেকেই নাজমুল হোসেন শান্তর ব্যাটে ম্যাচের গল্প বদলাতে শুরু করে। অধিনায়কসুলভ স্থিরতা, সুযোগের বল পেলে আক্রমণ, আর মুমিনুল হকের সঙ্গে লম্বা জুটি, সব মিলিয়ে মিরপুরে পাকিস্তানের বিপক্ষে দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরি তুলে নিলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক।
মোহাম্মদ আব্বাসের বলে কভার দিয়ে চার মেরে তিন অঙ্কে পৌঁছান শান্ত। সেঞ্চুরির পর মিরপুরের গ্যালারিতে ওঠে গর্জন, ড্রেসিংরুম থেকে আসে করতালি। শান্ত নিজেও উচ্ছ্বাস লুকাননি, দৌড়ে নন-স্ট্রাইকার প্রান্তে গিয়ে লাফিয়ে উদ্যাপন করেন। এটি তার টেস্ট ক্যারিয়ারের নবম সেঞ্চুরি, পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম। এর আগে এই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে টেস্টে তার কোনো ফিফটিও ছিল না।
শান্ত সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন ১২৯ বলে। তখন বাংলাদেশের রান ৫২.১ ওভারে ২ উইকেটে ২০১। তার নামের পাশে ১২ চার ও ২ ছক্কা। অন্য প্রান্তে মুমিনুল হকও ৬৪ রানে অপরাজিত। দুজনের জুটি তখন ১৭০ রানে পৌঁছে গেছে, যা সকালবেলার চাপকে অনেকটাই পেছনে ঠেলে দিয়েছে। অবশ্য সেঞ্চুরি করার পরের বলেই বিদায় নিয়েছেন শান্ত স্কোর তখন ২০১/৩।
এর আগে দিনের শুরুতে পাকিস্তানের সিদ্ধান্ত ছিল প্রত্যাশিতই। টসে জিতে আগে ফিল্ডিং নেন শান মাসুদ। পিচে ঘাস ছিল, নতুন বলে মুভমেন্টও মিলছিল। শাহিন শুরু থেকেই বাংলাদেশ ওপেনারদের পরীক্ষা নেন। ইনিংসের প্রথম বলেই চার মেরে শুরু করেছিলেন মাহমুদুল হাসান জয়, কিন্তু বেশিক্ষণ থাকতে পারেননি। সপ্তম ওভারে শাহিনের আউটসুইংয়ে খোঁচা দিয়ে রিজওয়ানের হাতে ধরা পড়েন তিনি।
এরপর হাসান আলী আক্রমণে এসে নিজের প্রথম বলেই সাদমান ইসলামকে ফেরান। শর্ট অব লেংথ থেকে সামান্য বাইরে যাওয়া বলে স্লিপে ক্যাচ দেন সাদমান। তখন বাংলাদেশ ৩১/২। পরিস্থিতি এমনই ছিল, যেখানে আরেকটি উইকেট পড়লে পাকিস্তান সকালটা পুরোপুরি নিজেদের করে নিতে পারত।
কিন্তু শান্ত ও মুমিনুল সেটি হতে দেননি। শুরুতে দুজনেই ঝুঁকি কমিয়েছেন। আব্বাসের অফ স্টাম্পের বাইরের লাইন, শাহিনের আউটসুইং, হাসানের শর্ট বল, সবকিছু সামলে তারা ধীরে ধীরে ইনিংস গড়েছেন। এরপর বল একটু পুরোনো হতেই স্কোরবোর্ডে রানও বাড়তে থাকে।
শান্তর ইনিংসে সবচেয়ে বড় ব্যাপার ছিল তার নিয়ন্ত্রণ। তিনি কখনো খোলসে ঢোকেননি, আবার অকারণ ঝুঁকিও নেননি। হাসান আলীকে পুল করে চার, শাহিনকে ড্রাইভ, সালমান আগার ছোট বলে ছক্কা, আর আব্বাসকে কভার দিয়ে সেঞ্চুরির চার, সব মিলিয়ে ইনিংসটি ছিল আত্মবিশ্বাসের পরিষ্কার ঘোষণা।
মুমিনুলও অন্য প্রান্তে শান্তকে দারুণ সঙ্গ দিয়েছেন। লাঞ্চের সময় ৩১ রানে থাকা বাঁহাতি ব্যাটসম্যান দ্বিতীয় সেশনেও ধৈর্য ধরে এগিয়েছেন। তাঁর ইনিংসের সৌন্দর্য ছিল পুরোনো মুমিনুলের মতোই, শরীরের কাছে বল খেলা, অফ স্টাম্প ভালোভাবে বোঝা, আর সুযোগ পেলে কভার ড্রাইভে রান তোলা।
বাংলাদেশের জন্য এই জুটির গুরুত্ব শুধু স্কোরবোর্ডে নয়। ম্যাচের আগের দিন শান্ত বলেছিলেন, প্রথম ইনিংসে বড় রান করতে চায় বাংলাদেশ। ৮০ ওভার লাগুক বা ১২০, লক্ষ্য ৪০০-এর কাছাকাছি যাওয়া। নিজের সেঞ্চুরি দিয়ে সেই কথার প্রথম বাস্তব ভিত্তি তৈরি করলেন অধিনায়ক নিজেই।




