
সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন এমন অনেক দম্পতির কাছেই একটি সাধারণ প্রশ্ন হলো, খাবার কি সত্যিই সন্তান ধারণের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে? ইন্টারনেটে এ নিয়ে নানা ধরনের পরামর্শ, ডায়েট ও সাপ্লিমেন্টের প্রচার দেখা যায়। কেউ বলেন, নির্দিষ্ট খাবার খেলে দ্রুত গর্ভধারণ সম্ভব, আবার কেউ বিশেষ ডায়েটকে ‘ফার্টিলিটি ডায়েট’ হিসেবে প্রচার করেন।
তবে চিকিৎসক ও গবেষকদের মতে, বিষয়টি এতটা সহজ নয়। কোনো একক খাবার বা সাপ্লিমেন্ট হঠাৎ করে সন্তান ধারণ নিশ্চিত করতে পারে না। তবে সঠিক পুষ্টি ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস নারী ও পুরুষ উভয়ের প্রজননক্ষমতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
গর্ভধারণের আগে ও গর্ভাবস্থায় ফলিক অ্যাসিড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পুষ্টি উপাদান। এটি শিশুর মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের কিছু জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধে সাহায্য করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক নারী গর্ভধারণের শুরুতে বুঝতেই পারেন না যে তারা অন্তঃসত্ত্বা। তাই সন্তান নেওয়ার বয়সি নারীদের প্রতিদিন ৪০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক অ্যাসিড গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়।
অনেক দেশে সিরিয়ালসহ বিভিন্ন খাবারে ফলিক অ্যাসিড যোগ করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের উদ্যোগ বিশ্বজুড়ে স্পাইনা বিফিডা ও মস্তিষ্কজনিত জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সাহায্য করেছে।
কিছু গবেষণায় আরও দেখা গেছে, গর্ভধারণের চেষ্টা করছেন এমন নারীদের ক্ষেত্রে ফলিক অ্যাসিড সাপ্লিমেন্ট গর্ভধারণের সম্ভাবনাও বাড়াতে পারে। তবে এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে বহু দম্পতি দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও সন্তান নিতে পারেন না। এর পেছনে নারী ও পুরুষ উভয়েরই বিভিন্ন শারীরিক কারণ থাকতে পারে।
নারীদের ক্ষেত্রে ডিম্বাশয় থেকে সুস্থ ডিম্বাণু তৈরি না হওয়া, ফ্যালোপিয়ান টিউব ব্লক থাকা বা নিষিক্ত ডিম্বাণু জরায়ুতে ঠিকমতো স্থাপন না হওয়া বড় কারণ হতে পারে।
অন্যদিকে পুরুষদের ক্ষেত্রে শুক্রাণুর গুণগতমান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুক্রাণুর সংখ্যা, গতি, আকার ও কার্যকারিতা কমে গেলে সন্তান ধারণে সমস্যা হতে পারে। দূষণ, ধূমপান, মানসিক চাপ ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসও এর জন্য দায়ী হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক সময় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরও বন্ধ্যাত্বের সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না।
দীর্ঘদিন ধরে প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনায় নারীদের খাদ্যাভ্যাস বেশি গুরুত্ব পেলেও এখন গবেষকরা পুরুষের খাদ্যাভ্যাসের দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন।
২০১৫ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আইভিএফ চিকিৎসা নিচ্ছেন এমন দম্পতিদের মধ্যে পুরুষদের মাংস খাওয়ার ধরন গর্ভধারণের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষণায় দেখা যায়, যারা বেশি পরিমাণে প্রক্রিয়াজাত মাংস যেমন সসেজ বা বেকন খেতেন, তাদের ক্ষেত্রে গর্ভধারণের হার কম ছিল। অন্যদিকে মুরগির মাংসের মতো তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর প্রোটিন উৎস ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
যেসব পুরুষ খুব কম প্রক্রিয়াজাত মাংস খেতেন, তাদের সঙ্গীর গর্ভধারণের সম্ভাবনা ছিল বেশি।
গবেষকরা বলছেন, গর্ভাবস্থায় অপুষ্টি শিশুর ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নেদারল্যান্ডসে ঘটে যাওয়া ডাচ হাঙ্গার উইন্টার নিয়ে গবেষণা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যুদ্ধের কারণে খাদ্য সংকটে অন্তঃসত্ত্বা নারীরা খুব কম খাবার খেয়ে বেঁচে ছিলেন। সেই সময়ে গর্ভে থাকা শিশুদের পরবর্তী জীবনে স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও মানসিক রোগের ঝুঁকি বেশি দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্তান ধারণের জন্য কোনো ম্যাজিক খাবার নেই। তবে সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত পুষ্টি, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নারী ও পুরুষ উভয়ের প্রজননস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
সবজি, ফল, পূর্ণ শস্য, স্বাস্থ্যকর চর্বি ও ভালো মানের প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি কমানোও গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষকরা বলছেন, সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে শুধু নারীর নয়, পুরুষের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনেও সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
সূত্র: বিবিসি




