
হার্ট প্রতি মিনিটে কতবার স্পন্দন করছে, সেটি আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু হৃদস্পন্দনের মাঝের সময়ও যে গুরুত্বপূর্ণ, তা অনেকেরই অজানা। এই ছোট ছোট সময়ের পার্থক্যকেই বলা হয় হার্ট রেট ভ্যারিয়েবিলিটি বা এইচআরভি। এখন চিকিৎসক ও গবেষকরা বলছেন, এই মাপ শুধু হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যেরই নয়, মানসিক চাপ, ঘুম, ফিটনেস এমনকি বয়স বাড়ার গতিও বুঝতে সাহায্য করতে পারে।
লন্ডনের স্বাস্থ্য প্রযুক্তি খাতের কর্মী আর্টেম কিরিলভ আগে নিয়মিত শরীরচর্চা করলেও বিশ্রামের গুরুত্ব খুব একটা দিতেন না। ক্লান্ত লাগলেও জিম মিস করতেন না। পরে তিনি স্মার্টওয়াচে এইচআরভি ট্র্যাক করা শুরু করেন। তখন তিনি বুঝতে পারেন, শরীর কখন বিশ্রাম চাইছে আর কখন বাড়তি চাপ নিতে পারবে। এখন তিনি বলেন, এই তথ্য তাকে নিজের শরীরের সঙ্গে আরও ভারসাম্যপূর্ণ থাকতে সাহায্য করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সুস্থ হৃদস্পন্দন পুরোপুরি যন্ত্রের মতো একঘেয়ে হয় না। প্রতিটি স্পন্দনের মাঝে মিলিসেকেন্ডের ছোট ছোট পার্থক্য থাকে। এই পার্থক্য যত স্বাভাবিক ও নমনীয় হয়, ততই ভালো বলে ধরা হয়। নিউইয়র্কের মাউন্ট সিনাই ফাস্টার হার্ট হাসপাতালের পরিচালক ডা. দীপক ভাট জানান, হৃদস্পন্দনের এই ওঠানামা শরীরের স্নায়ুতন্ত্র কতটা ভালোভাবে কাজ করছে, সেটিরও ইঙ্গিত দেয়।
যখন মানুষ চাপের মধ্যে থাকে বা শরীরকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়, তখন শরীরের “ফাইট অর ফ্লাইট” সিস্টেম সক্রিয় হয়। এতে হৃদস্পন্দন দ্রুত ও স্থির হয়ে যায়, ফলে এইচআরভি কমে যায়। আবার শরীর যখন স্বস্তিতে থাকে, তখন হৃদস্পন্দনে স্বাভাবিক ওঠানামা ফিরে আসে। তাই সাধারণভাবে বেশি এইচআরভি মানে শরীর চাপ থেকে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারছে।
গবেষক ডেনিস লারসন বলেন, যাদের শরীর চাপের সঙ্গে ভালোভাবে মানিয়ে নিতে পারে, তাদের এইচআরভি সাধারণত ভালো থাকে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা ক্লান্তির মধ্যে থাকলে এইচআরভি কমে যেতে পারে।
শুধু শারীরিক নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গেও এর সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, উদ্বেগ, হতাশা, পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার বা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত অনেক মানুষের এইচআরভি স্বাভাবিকের তুলনায় কম হতে পারে। কারণ দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ শরীরকে সবসময় সতর্ক অবস্থায় রাখে।
ফিটনেস জগতেও এইচআরভি এখন বেশ জনপ্রিয়। অনেক ক্রীড়াবিদ বা নিয়মিত শরীরচর্চাকারী এটি দেখে বুঝতে চেষ্টা করেন শরীর ঠিকভাবে রিকভারি করছে কি না। যদি কঠিন ব্যায়ামের পরও কয়েকদিন এইচআরভি কম থাকে, তাহলে সেটি বিশ্রামের সংকেত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ভালো ঘুম, নিয়মিত ব্যায়াম, কম মানসিক চাপ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এইচআরভি উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে। ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস নেওয়ার অভ্যাসও এতে উপকারী হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মনোবিজ্ঞানী টিম হারজগ বলেন, প্রতিদিন কিছু সময় ধীরে ও সচেতনভাবে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস শরীরকে শান্ত করতে সাহায্য করে এবং স্নায়ুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।
তবে চিকিৎসকরা এটিও মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, এইচআরভি একা কোনো রোগ নির্ণয়ের উপায় নয়। এটি একটি সহায়ক সূচক মাত্র। ডা. দীপক ভাটের মতে, হার্ট রেট, রক্তচাপ, ওজন ও কোলেস্টেরলের মতো সাধারণ স্বাস্থ্য সূচকগুলোর গুরুত্ব এখনও সবচেয়ে বেশি।
তবুও গবেষকদের ধারণা, ভবিষ্যতে এইচআরভি মানুষের সামগ্রিক স্বাস্থ্য বোঝার আরও গুরুত্বপূর্ণ উপায় হয়ে উঠতে পারে। কারণ এটি শরীর ও মনের চাপের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য দেয়, যা আগে সহজে বোঝা যেত না।
সূত্র: বিবিসি




