
গাজীপুরে কারখানাগুলোয় গ্যাস সংকট থাকায় মারাত্মকভাবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর পাশাপাশি বেড়েছে লোডশেডিং। জেলার তিন শতাধিক ডাইং কারখানাসহ বেশিরভাগ কারখানা গ্যাস ও বিদ্যুৎনির্ভর। তীব্র গ্যাস সংকট ও লোডশেডিংয়ের কারণে বিপাকে কারখানার মালিকরা। ফলে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহারে খরচ বাড়ায় উৎপাদন খরচ বাড়ছে। কমছে উৎপাদন সক্ষমতা। এমন পরিস্থিতিতে কারখানা সচল রাখা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন মালিকরা। গ্যাস সংকটের কথা স্বীকার করে তিতাস কর্তৃপক্ষ বলছে, সংকট নিরসনে তারা কাজ করছেন।
জানা গেছে, গাজীপুরের শিল্পকারখানার বেশিরভাগ তৈরি পোশাক শিল্প। এ ছাড়া ওষুধ, চামড়া, সিরামিকের কারখানা রয়েছে। শিল্প পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, গাজীপুরে মোট তৈরি পোশাক কারখানার সংখ্যা ২ হাজার ১৭৬টি। নিবন্ধনবিহীন কারখানাসহ সব মিলিয়ে গাজীপুরে পাঁচ হাজারের মতো ছোট-বড় কারখানা আছে। যার বেশিরভাগই গ্যাসের ওপর নির্ভর।
এসব কারখানার মধ্যে ডাইং কারখানার প্রধান যন্ত্রাংশ বয়লার সচল রাখার জন্য যেখানে ন্যূনতম ৩ পিএসআই (প্রেশার পার স্কয়ার ইঞ্চি) গ্যাসের সরবরাহ দরকার, সেখানে পাওয়া যাচ্ছে শূন্য দশমিক ৫ থেকে ১ পিএসআই। এই মাত্রায় গ্যাস সরবরাহে কারখানার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ উৎপাদন প্রক্রিয়া সচল রাখা যায়। এমন পরিস্থিতিতে অধিকাংশ সময় বসে থাকতে হচ্ছে শ্রমিকদের। এ ছাড়া ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের অবস্থাও খারাপ।
ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, বেশ কিছুদিন ধরে গ্যাস পাইপলাইনে চাপ কমে গেছে। গ্যাসের চাপ যেখানে থাকার কথা ছিল ১৫ পিএসআই, সেখানে পাওয়া যাচ্ছে ১ পিএসআইয়ের নিচে। এ ছাড়া দিনে অন্তত ৫ থেকে ৬ বার লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানাগুলোর সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ পাচ্ছে না শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এ অবস্থায় সময়মতো পণ্য সরবরাহের পাশাপাশি শ্রমিকদের বেতন-ভাতা সময়মতো পরিশোধ করা নিয়ে দুশ্চিন্তার কথা জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
সাদমা গ্রুপের পরিচালক মো. সোহেল রানা বলেন, গ্যাস সংকট জেলার প্রায় সব কারখানায় রয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে সামনে ঈদে শ্রমিকদের বেতন দেওয়া কঠিন হয়ে যাবে। সময়মতো বিদেশি শিপমেন্ট পাঠাতে না পারলে অর্ডার ঝুঁকিতে পড়বে।
ইয়ন নিট কম্পোজিট কারখানার চেয়ারম্যান মাসুদ হাসান বলেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ৩০ শতাংশ উৎপাদন কমে গেছে, খরচ বেড়ে গেছে ৪০ ভাগ। এমনিতে বৈশ্বিক যুদ্ধাবস্থা ও নানা কারণে দেশের শিল্পকারখানার অবস্থা ভালো নয়। এখন ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে নিজেদের সঙ্গে নিজেদের যুদ্ধ করতে হচ্ছে।
ম্যাট অটোমেশন কারখানার উদ্যোক্তা আহমেদ টিপু বলেন, দিনে ৫ থেকে ৬ বার লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন কমে গেছে। সময়মতো পণ্য দিতে পারছি না। এ অবস্থায় সৌর বিদ্যুৎ স্থাপনে সরকার প্রণোদনা দিলে লোডশেডিংয়ের সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডেও চাপ অনেকটা কমে যেত।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সদস্য সালাউদ্দিন চৌধুরী বলেন, গ্যাস সংকট, মূল্যবৃদ্ধিসহ নানামুখী প্রতিকূলতার কারণে তৈরি পোশাক শিল্প জটিল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কয়েক বছরে নানা কারণে অনেক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। গ্যাস সংকটের কারণে অনেক কারখানার উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পথে। অনেকে বিকল্প উপায়ে বেশি খরচ করে ডিজেল জেনারেটরে উৎপাদন চালু রাখলেও রপ্তানিতে তারা নানা জটিলতার মুখে পড়ছেন। এ অবস্থায় কারখানা বাঁচাতে দ্রুত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট দূর করার জন্য সরকারের কাছে আহ্বান জানান তিনি।
গ্যাস সংকটের কথা স্বীকার করে গাজীপুর তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির আঞ্চলিক বিক্রয় বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. সুরুয আলম বলেন, গাজীপুরে বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা আছে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট, কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে অনেক জায়গায় গ্যাসের চাপ কম রয়েছে। সংকট নিরসনে সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে, গ্যাস লাইনে সরবরাহ বাড়লে এ সমস্যার সমাধান হবে।
গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার আবুল বাশার আজাদ বলেন, কড্ডা গ্রিডে সমস্যা থাকায় জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহে কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। তবে আগামী মাসে এ সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।



