তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট ওপেক ও ওপেক প্লাস থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)।
শুক্রবার (১ মে) থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। উৎপাদন নীতি, বর্তমান সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি পরিকল্পনা নিয়ে দীর্ঘ পর্যালোচনার পর এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটি।
ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে চলমান অবরোধের কারণে যখন বিশ্বজুড়ে তেলের দাম আকাশচুম্বী, ঠিক সেই মুহূর্তে আমিরাতের এই সিদ্ধান্ত বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে।
এই জোট কেন গুরুত্বপূর্ণ এবং কেনইবা এই জোট থেকে হঠাৎ বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল আরব আমিরাত। এই প্রতিবেদনে তা তুলে ধরা হলো-
ওপেক কী?
অরগানাইজেশন অব পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিস (ওপেক)-এর বিশ্বজুড়ে তেলের দামের ওপর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। এই জোটের সদস্য দেশগুলো সম্মিলিতভাবে বিশ্বের তেল ও জ্বালানির একটি বড় অংশ উৎপাদন করে বলে তারা এই প্রভাব খাটাতে পারে। জোটটির বিরুদ্ধে তেলের দাম কারসাজি করার অভিযোগ উঠলেও ওপেক তা অস্বীকার করে।
ওপেকের নির্ধারিত লক্ষ্য হলো: সদস্য দেশগুলোর পেট্রোলিয়াম নীতিগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও ঐক্য বজায় রাখা এবং তেলের বাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, যাতে গ্রাহকরা সাশ্রয়ী ও নিয়মিত জ্বালানি পায়। এছাড়া উৎপাদনকারী দেশগুলোর নির্দিষ্ট আয় এবং বিনিয়োগকারীদের ন্যায্য লভ্যাংশ নিশ্চিত করা এই জোটের লক্ষ্য।
১৯৬০ সালে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব এবং ভেনিজুয়েলাকে নিয়ে এই জোট গঠিত হয়। ২০১৬ সালে সংস্থাটি বেশ কিছু অ-সদস্য দেশকে নিয়ে ‘ওপেক প্লাস’ জোট গঠন করে।
আরব আমিরাত কেন ওপেক ছাড়ছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ওপেকের বেঁধে দেওয়া উৎপাদন সীমা বা কোটা থেকে বেরিয়ে আসতে আমিরাত এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইউকে ট্রেডিং ব্রোকার পেপারস্টোন-এর সিনিয়র রিসার্চ স্ট্র্যাটেজিস্ট মাইকেল ব্রাউন বলেন, আরব আমিরাত ওপেকের দেওয়া লক্ষ্যমাত্রায় খুবই সীমাবদ্ধ বোধ করছিল। এই জোট থেকে বেরিয়ে আসায় তারা আরও বেশি তেল সরবরাহ করতে স্বাধীন হবে।
ব্রাউন বলেন, বর্তমানে দেশটি দৈনিক ৩০ থেকে ৩৫ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করলেও ২০২৭ সালের মধ্যে তা ৫০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করতে চায়। ওপেকের সদস্য থাকলে চাইলেই উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়, কারণ তাতে বাজারের ভারসাম্যের দোহাই দিয়ে বাধা দেয় সংস্থাটি।
আমিরাত মনে করছে, বিশ্ব যখন দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে, তখন মাটির নিচের তেলের মজুত এখন বিক্রি না করলে ভবিষ্যতে লভ্যাংশ হারানোর ভয় আছে।
আমিরাত কেন উৎপাদন বাড়াতে চাইছে?
আমিরাত কেন এখন বেশি তেল উৎপাদন করতে চায়, তা নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে। বার্তা সংস্থা এপির বিজনেস রাইটার ডেভিড ম্যাকহিউ বলেন, বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন আগামী কয়েক বছরের মধ্যে তেলের ব্যবহার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যাবে। ‘কারণ বিশ্ব এখন কার্বন নিঃসরণমুক্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে।’
এর অর্থ হলো, মাটির নিচে থাকা তেলের দাম ভবিষ্যতের তুলনায় আজ বেশি হতে পারে। আর তাই এখন উৎপাদন কমিয়ে রাখার অর্থ হলো লভ্যাংশ হারানো।
তেলের দামের ওপর কী প্রভাব পড়বে?
বিশ্লেষকরা স্বল্প মেয়াদে তেলের দামে কোনো বড় পরিবর্তনের আশা করছেন না। ব্রাউন বলেন, এটি নিকট ভবিষ্যতের চিত্রে কোনো পরিবর্তন আনবে না। কারণ হরমুজ প্রণালির অবরোধ এখনও বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহে প্রভাব ফেলছে।
তবে তিনি মনে করেন, এটি ইরান যুদ্ধের আগের দামে ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় এবং বিশ্ববাজারে ভারসাম্য ফেরাতে সাহায্য করবে। আরব আমিরাত থেকে প্রচুর পরিমাণ তেল বাজারে আসায় এই প্রক্রিয়াটি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক দ্রুত হতে পারে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানির দাম কমবে বলে আশা তৈরি হয়েছে।
ওপেক জোটের দেশগুলো কী পরিমাণ তেল উৎপাদন করে?
রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৭০-এর দশকে এই গোষ্ঠীটি বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের ৫০ শতাংশেরও বেশি উৎপাদন করত। পরবর্তী দশকগুলোতে এই সংখ্যাটি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশে নেমে এসেছিল। তবে ২০১৬ সালে ওপেক আরও কিছু দেশের সঙ্গে ওপেক প্লাস জোট গঠন করার পর এই হার আবারও বৃদ্ধি পায়।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)-এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী উৎপাদিত তেল ও তরল জ্বালানির প্রায় ৫০ শতাংশই ছিল ওপেকের নিয়ন্ত্রণে। তবে বর্তমানে এই হার কমছে বলে মনে হচ্ছে। গত মার্চ তেকে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক মাসের মাথায় এই হার প্রায় ৪৪ শতাংশে নেমে এসেছে। ওপেকের মোট উৎপাদনে আরব আমিরাতের সুনির্দিষ্ট অবদান ঠিক কত তা স্পষ্ট নয়, তবে ধারণা করা হয় তারা ওপেকের সরবরাহে অন্যতম অংশীদার।
ওপেককে কেন কার্টেল বলা হয়?
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও সংবাদমাধ্যমগুলো প্রায়ই ওপেককে ‘কার্টেল’ বা একটি সিন্ডিকেট হিসেবে বর্ণনা করে। এপি ওপেককে বিশ্বের সবচেয়ে বিশিষ্ট কার্টেল বলে অভিহিত করে থাকে। তাদের অন্য একটি প্রতিবেদনে ওপেককে বোঝাতে ছয়বার এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।
অবৈধ মাদক ব্যবসার প্রসঙ্গে আমরা সাধারণত কার্টেল শব্দটি শুনা যায়। শব্দটির সাধারণ অর্থ হলো একদল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যারা একসঙ্গে কাজ করে। ম্যাককুয়ারি ডিকশনারি অনুযায়ী এর সংজ্ঞা হলো- একটি যোগসাজশপূর্ণ সিন্ডিকেট বা ট্রাস্ট যা সাধারণত ব্যবসার কোনো ক্ষেত্রে দাম এবং উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করার জন্য গঠিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান দ্য মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক অর্থনীতিবিদ ওপেককে একটি কার্টেল হিসেবে দেখেন। কারণ ওপেক মূলত তেলের উৎপাদন ও সরবরাহে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে রাখার একটি কৌশল হিসেবে কাজ করে। নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা না করে জোটবদ্ধভাবে মুনাফা বাড়ানো এই সিন্ডিকেটের মূল কাজ।
যদিও ওপেক সরাসরি এই অভিযোগ স্বীকার করে না, তবে তাদের কার্যক্রম বাজারের স্বাভাবিক নিয়মকে বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।
ওপেক জোটভুক্ত সদস্য দেশ কোনগুলো?
ওপেকের ওয়েবসাইট অনুযায়ী বর্তমান সদস্য দেশগুলো হলো: আলজেরিয়া, কঙ্গো, নিরক্ষীয় গিনি, গ্যাবন, ইরান, ইরাক, কুয়েত, লিবিয়া, নাইজেরিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ভেনেজুয়েলা।
সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, শুক্রবার (১ মে) থেকে ওপেক থেকে নিজেদের সদস্যপদ ত্যাগের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তেল রপ্তানিকারী সব দেশই ওপেকের সদস্য নয়। সংস্থাটি জানায়, যেসব দেশের পর্যাপ্ত পরিমাণ অপরিশোধিত তেল রপ্তানির সক্ষমতা রয়েছে তারা সদস্যপদের জন্য আবেদন করতে পারে। তবে তাদের স্বার্থ বর্তমান সদস্যদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে এবং অধিকাংশ সদস্যের সম্মতিতে তাদের গ্রহণ করা হবে।
২০১৬ সালে গঠিত ‘ওপেক প্লাস’ জোটে রয়েছে: আজারবাইজান, বাহরাইন, ব্রুনাই, ব্রাজিল, কাজাখস্তান, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, ওমান, সুদান, দক্ষিণ সুদান এবং রাশিয়া।
অন্য যেসব দেশ ওপেক ছেড়েছে
আরব আমিরাতের আগেও অনেক দেশ ওপেক ছেড়েছে। দেশগুলো হলো:
অ্যাঙ্গোলা: ২০২৪ সালে সদস্যপদ প্রত্যাহার করে।
ইকুয়েডর: ১৯৯২ সালে সদস্যপদ স্থগিত করে, ২০০৭ সালে পুনরায় যোগ দেয় এবং ২০২০ সালে আবারও প্রত্যাহার করে নেয় দেশটি।
ইন্দোনেশিয়া: ২০০৯ সালে সদস্যপদ স্থগিত করে, ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে পুনরায় যোগ দেয় এবং ওই বছরের নভেম্বরে আবারও সদস্যপদ প্রত্যাহার করে নেয়।
কাতার: ২০১৯ সালে সদস্যপদ প্রত্যাহার করে।
গ্যাবন: ১৯৯৫ সালে ওপেক ছাড়ে, তবে ২০১৬ সালে পুনরায় যোগ দেয় এবং বর্তমানেও সদস্য হিসেবে রয়েছে।




