তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট ওপেক ও ওপেক প্লাস থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। আগামী ১ মে থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।
দেশটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, উৎপাদন নীতি, বর্তমান সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি পরিকল্পনা নিয়ে দীর্ঘ পর্যালোচনার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এটি আমিরাতের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ও অর্থনৈতিক লক্ষ্য। বিশেষ করে নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনার জন্য এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
গালফ নিউজ জানিয়েছে, জাতীয় স্বার্থ ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের চাহিদা পূরণে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে ইউএই সরকার।
এ ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো, যখন আরব উপসাগরীয় অঞ্চল ও হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব ফেলছে। তবে আমিরাতের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদা বাড়তেই থাকবে।
আমিরাত জানিয়েছে, একটি স্থিতিশীল জ্বালানি ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন নমনীয়, নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী সরবরাহ ব্যবস্থা। সে লক্ষ্যেই উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে এবং পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে বিনিয়োগ জোরদার করেছে। আর এতে স্থিতিশীলতা, সাশ্রয় ও টেকসই উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ওপেকের সঙ্গে আমিরাতের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। আবুধাবি ১৯৬৭ সালে সংগঠনটিতে যোগ দেয়, যা ১৯৭১ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত রাষ্ট্র গঠনের আগের ঘটনা। এরপর থেকে বৈশ্বিক তেলবাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে দেশটি। দেশটি বেরিয়ে যাওয়ার পর তেল রপ্তানিকারক এই জোটে সদস্য সংখ্যা দাঁড়াবে ১১-তে।
তবে নতুন সিদ্ধান্তকে আমিরাত ‘নীতিগত পরিবর্তন’ হিসেবে দেখছে। দেশটির মতে, এতে বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত খাপ খাওয়ানো সহজ হবে। একই সঙ্গে দায়িত্বশীলভাবে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতায় অবদান রাখাও সম্ভব হবে।
দেশটি নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে কম খরচে উৎপাদিত এবং তুলনামূলকভাবে কম-কার্বন নির্গমনকারী তেলের নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হিসেবে উল্লেখ করেছে। ভবিষ্যতেও এই ভূমিকা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে তারা।
ওপেক ছাড়ার পরও বাজারের চাহিদা ও পরিস্থিতি বিবেচনায় ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে আমিরাত। পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা রক্ষায় দায়িত্বশীল আচরণ বজায় রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, এই সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক বাজারে স্থিতিশীলতার প্রতি আমিরাতের প্রতিশ্রুতি পরিবর্তন করে না; বরং পরিবর্তিত বাস্তবতায় দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ায়।
ওপেক ও ওপেক প্লাস জোটের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আমিরাত বলেছে, পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে তারা এই সংগঠনের সঙ্গে কাজ করেছে এবং বৈশ্বিক স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। তবে এখন সময় এসেছে জাতীয় অগ্রাধিকার, বিনিয়োগকারী, গ্রাহক ও অংশীদারদের স্বার্থকে সামনে রেখে নতুন পথে এগোনোর।
আমিরাত আরও জানিয়েছে, ভবিষ্যতেও তাদের জ্বালানি নীতি বাজারের ভারসাম্য, বৈশ্বিক সরবরাহ-চাহিদা এবং দায়িত্বশীলতার ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। একই সঙ্গে তেল, গ্যাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও স্বল্প-কার্বন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ অব্যাহত রেখে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি রূপান্তরে ভূমিকা রাখবে দেশটি।
উল্লেখ্য ইরানের হুমকি ও জাহাজে হামলার কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস রপ্তানি জটিলতার মুখে পড়েছে। ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত এই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালি দিয়ে সাধারণত বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই ওপেকের সমালোচনা করে আসছেন। তার অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র যখন উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, তখন তারা উল্টো উচ্চ তেলের দাম নির্ধারণ করে সুবিধা নিচ্ছে।
আরব আমিরাতের এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ইস্যুও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইরানের ধারাবাহিক হামলার মুখে নিজেদের যথেষ্ট সুরক্ষা না পাওয়ার অভিযোগ তুলে অন্যান্য আরব দেশগুলোর ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে আরব আমিরাত।
সোমবার গালফ ইনফ্লুয়েন্সার্স ফোরামে বক্তব্য দিতে গিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ বলেন, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলো লজিস্টিক সহায়তা দিলেও রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থান ছিল ঐতিহাসিকভাবে দুর্বল।
তিনি বলেন, আরব লীগের এমন দুর্বল অবস্থান প্রত্যাশিত হলেও জিসিসির কাছ থেকে এমন প্রতিক্রিয়া আশা করেননি, যা আমাকে বিস্মিত করেছে।
এমএসটি ফাইন্যান্সিয়ালের জ্বালানি গবেষণা প্রধান সল কাভোনিক বলেন, এটি মূলত ওপেকের শেষ হওয়ার শুরু।
তার মতে, সংযুক্ত আরব আমিরাত বেরিয়ে যাওয়ায় ওপেক তাদের উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ১৫ শতাংশ হারাবে। এছাড়া দেশটি ছিল এই জোটের অন্যতম অনুগত সদস্য।
ওপেকের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, আরব আমিরাত বছরে ২৯ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করে। অন্যদিকে, ওপেকের অঘোষিত নেতা সৌদি আরব উৎপাদন করে ৯০ লাখ ব্যারেল তেল।
সল কাভোনিক বলেন, ওপেক জোটকে টিকিয়ে রাখতে এখন সৌদি আরবকে বেশ বেগ পেতে হবে। জোটের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণের মূল দায়ভার এখন এককভাবে তাদের ওপরই বর্তাবে।
তিনি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের পথ ধরে অন্য সদস্যরাও এই জোট থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এবং তেলের বাজারে এক আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
১৯৬০ সালে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও ভেনিজুয়েলা এই পাঁচটি দেশের হাত ধরে ওপেক গঠিত হয়েছিল। সদস্য দেশগুলোর জন্য স্থিতিশীল আয় নিশ্চিত করতে তেল উৎপাদন সমন্বয় করাই ছিল এই জোটের মূল লক্ষ্য।
বিগত বছরগুলোতে এই জোটের সদস্য সংখ্যা বারবার পরিবর্তিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা পাঁচ সদস্য ছাড়াও বর্তমানে এই জোটে আলজেরিয়া, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি, গ্যাবন, লিবিয়া, নাইজেরিয়া ও কঙ্গো প্রজাতন্ত্র অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।


-1778455118-16678_1778455263.webp)

