যুদ্ধ যখন শুরু হচ্ছিল ঠিক তখনই যুদ্ধের গতিপ্রকৃতির ওপর ভর করে জমে উঠে ভয়াবহ এক জুয়ার আসর। একদিকে বোমার আঘাতে পুড়ছিল মধ্যপ্রাচ্য, অন্যদিকে বিলিয়ন ডলারের মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছল এক শ্রেণির অদৃশ্য ব্যবসায়ী। অবাক করা হলেও এ খবর সত্যি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর এই তথ্য সামনে এসেছে। এতে দেখা যায়, ইরান যুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে এ পর্যন্ত ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলারেরও বেশি অর্থের বাজি ধরা হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যৌথ হামলা চালায়। এতে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ নিহত হন শীর্ষ স্থানীয় অর্ধশতাধিক নেতা। ৫০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলা এ যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্বের জ্বালানি বাজারে তৈরি হয়েছে চরম অস্থিরতা। এই টালমাটাল পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়েছে অদৃশ্য বিনিয়োগকারীরা।
গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে দেখা যায়, যুদ্ধ শুরুর আগেরদিন (২৭ ফেব্রয়ারি) ইরানে হামলার অনুমানের ওপর ভিত্তি করে ১৬টি পৃথক বাজি ধরা হয়। যেখানে প্রত্যেক বাজিতে ১ লাখ ডলার করে মুনাফা জিতে নেয় বিনিয়োগকারীরা।
পরদিন (২৮ ফেব্রুয়ারি) যৌথ হামলায় খামেনি নিহতের ঠিক আগমুহূর্তে আরেহ দফা বাজি ধরা হয়। এই বাজি ছিল মূলত খামেনি শাসনের ক্ষমতাচ্যুতির ওপর ভবিষ্যদ্বাণী করে, যেখানে সাড়ে ৫ লাখ ডলারের বেশি আয় হয়।
এরপর গত ৭ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ঘোষণার আভাস দেন। এই ঘোষণার ঠিক আগে ব্যবসায়ীরা তেলের দাম কমার উপর ৯৫ কোটি ডলার বাজি ধরেন। আশ্চর্যজনকভাবে ঘোষণার পর তেলের দাম ঠিক সেভাবেই কমে যায়।
এই বাজি এবং অন্যান্য সময়োপযোগী লেনদেন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধের মূল ঘটনাগুলোর সঠিক পূর্বাভাস দিতে সক্ষম হয়েছে। আইনপ্রণেতা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের নিখুঁত পূর্বাভাস সাধারণ বিচার-বিশ্লেষণে অসম্ভব। তাদের ধারণা, যুদ্ধের ময়দানের বা উচ্চপর্যায়ের কোনো গোপন তথ্য আগেভাগেই ফাঁস হয়েছে, যাকে অর্থনীতির ভাষায় ‘ইনসাইডার ট্রেডিং’ বলা হয়। বিশ্বের বৃহত্তম বিকেন্দ্রীকৃত ক্রিপ্টোকারেন্সি-ভিত্তিক পূর্বাভাস বাজার ‘পলিমার্কেট’ ও ‘কালশি’র মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে এখন গোপন সংবাদের ওপর ভিত্তি করে বাজি ধরা সহজ হয়ে যাওয়ায় এটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
আগে যেখানে বাজি ধরা খেলাধুলার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা সংবাদ জগতের বিভিন্ন ঘটনার ওপর চুক্তিতে রূপ নিয়েছে।
গার্ডিয়ান বলছে, মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যরা এবং বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এই সন্দেহজনক লেনদেনগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছেন। তবে প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ এখানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ বিষয়ে কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জশুয়া মিটস বলেন, ‘আমাদের সমস্যা আইনের অভাব নয়, বরং সেটি প্রয়োগ করার সক্ষমতায়। প্রযুক্তি যেখানে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে পুরনো পদ্ধতিতে এই ধরণের আন্তর্জাতিক বাজি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’
পলিমার্কেটের মতো অনলাইন বেটিং প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রসারের ফলে এখন কার্যত যে কোনো সংবাদের ওপর বাজি ধরা সম্ভব হচ্ছে। এ ছাড়া তেল ফিউচারের মতো কমোডিটি ডেরিভেটিভ কেনাও এখন আগের চেয়ে সহজ। ব্যবসায়ীরা ব্যবসার চেয়ে এখন ভবিষ্যতে তেলের দাম কত হবে তা নিয়ে জুয়া খেলায় বেশি আগ্রহী হচ্ছেন।
সঠিক সময়ে নিখুঁত বাজি
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা চালানোর ঠিক আগের দিন (২৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে পলিমার্কেটে প্রায় ১৫০টি অ্যাকাউন্ট থেকে একটি বাজি ধরা হয়। তাদের বাজি ছিল— ‘পরদিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা করবে।’
নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই বাজির পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৫৫ হাজার ডলার। এই বাজিতে ১৬টি অ্যাকাউন্ট থেকে প্রত্যেকে ১ লাখ ডলারের বেশি মুনাফা পেয়েছে।
কিছুক্ষেণ পর ‘পাবলিক সিটিজেন’ নামক একটি ভোক্তা অধিকার সংস্থার পক্ষ থেকে কমোডিটি ফিউচার ট্রেডিং কমিশনে (সিএফটিসি) একটি অভিযোগ করা হয়। সেখানে বলা হয়, ম্যাগামাইম্যন (Magamyman) নামের এক বেনামী পলিমার্কেট ব্যবহারকারী আয়াতুল্লাহ খামেনির ক্ষমতাচ্যুতির ওপর বাজি ধরে ৫ লাখ ৫৩ হাজার ডলারেরও বেশি হাতিয়ে নিয়েছে। বাজিটি ধরা হয়েছিল ইসরায়েলি বিমান হামলায় খামেনির নিহত হওয়ার ঠিক কয়েক মিনিট বা কয়েক ঘণ্টা আগে।
অভিযোগে একটি ক্রিপ্টো-অ্যানালিটিক্স ফার্মের বরাত দিয়ে জানানো হয়, খামেনির মৃত্যুর পর পলিমার্কেট থেকে ৬ জন ‘সন্দেহভাজন ইনসাইডার’ মোট ১ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার আয় করেছেন।
একই ধরণের নিখুঁত বাজি দেখা যায় ৭ এপ্রিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ পোস্টে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে অন্তত ৫০টি পলিমার্কেট অ্যাকাউন্ট বাজি ধরা হয়। যেখানে অনুমাণ করা হয়, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হতে যাচ্ছে’। এর আগে ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি খুলে না দেয় তবে ‘আজ রাতে একটি সভ্যতা শেষ হয়ে যাবে’।
ব্যবসায়ীরা শুধু পলিমার্কেটেই সক্রিয় ছিলেন না; তেলের বাজারেও একই ধরনের তৎপরতা দেখা গেছে।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, ২৩ মার্চ ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আলোচনা ‘ফলপ্রসূ’ হচ্ছে বলে জানানোর মাত্র ১৫ মিনিট আগে ব্যবসায়ীরা তেলের বাজারে ৫৮০ মিলিয়ন ডলার বাজি ধরেন। ট্রাম্পের ঘোষণার পর দেখা যায়, তেলের দাম হু হু করে নেমে গেছে। এ ছাড়া ৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগেও ব্যবসায়ীরা তেলের দাম কমার ওপর ৯৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেন।
ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালোফোর্নিয়ার (ইউসিএলএ) আইনের অধ্যাপক অ্যান্ড্রু ভারস্টাইন বলেন, ‘এই লেনদেনগুলো অবৈধ ছিল কি না তা সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত না। যে কেউ ভাগ্যবান হতে পারেন, আবার কারও কাছে আইনি তথ্যও থাকতে পারে। তবে এই লেনদেনগুলোর মধ্যে এমন কিছু সন্দেহজনক বিষয় রয়েছে, যা স্বাভাবিকভাবেই তদন্তের দাবি রাখে।’
পর্দার আড়ালে কি বিশাল কোনো সিন্ডিকেট?
যুদ্ধ আর আন্তর্জাতিক তেলের বাজার ঘিরে চলা কোটি কোটি ডলারের রহস্যময় বাজি এখন এক চরম অরাজকতার দিকে মোড় নিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে আমেরিকার সেই আদিম যুগের বিশৃঙ্খল ‘ওয়াইল্ড ওয়েস্ট’ বা উন্মুক্ত জঙ্গলের সঙ্গে তুলনা করছেন। যেখানে কোনো নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা ছিল না।
ভোক্তা অধিকার সংস্থা পাবলিক সিটিজেনের কর্মকর্তা ক্রেগ হোলম্যান অভিযোগ করেছেন, বাজির অবিশ্বাস্য সময় এবং অর্থের পরিমাণ প্রমাণ করে যে, এটি নিছক ভাগ্য নয়। কারও কাছে অবশ্যই নিশ্চিত গোপন তথ্য ছিল, যার ওপর ভিত্তি করে তারা এই বিশাল ঝুঁকি নিয়েছে এবং কোটি কোটি ডলার পকেটে পুরেছে।
সিএফটিসিতে পাঁচজন কমিশনার থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে আছেন মাত্র একজন। তিনি মাইকেল সেলিগ। ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে ২০২৫ সালে নিয়োগ দিয়েছিলেন। সেলিগ বাজির বাজারগুলোর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ায় তদন্ত কতটুকু নিরপেক্ষ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। যদিও সেলিগ প্রকাশ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে, তবে নতুন কোনো কঠোর নিয়ম করার ক্ষেত্রে তিনি আপাতত অপারগতা জানিয়েছেন।
কালশি এবং পলিমার্কেট এখন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে মামলার মুখে পড়েছে। নেভাদায় কালশি নিষিদ্ধ হয়েছে এবং অ্যারিজোনায় তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এদিকে হোয়াইট হাউস থেকে জানানো হয়েছে, সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগ ভিত্তিহীন। মুখপাত্র ডেভিস ইঙ্গল বলেন, সরকারি তথ্য ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার সুযোগ নেই এবং উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া প্রশাসনের দিকে আঙুল তোলা দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ।
রয়টার্স ও ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৩ মার্চ এবং ৭ এপ্রিলের তেলের বাজারে অস্বাভাবিক লেনদেনের বিষয়ে গোপনে তদন্ত শুরু হয়েছে। পুরো বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির চেয়েও এক বিশাল আর্থিক কেলেঙ্কারির দিকে মোড় নিচ্ছে কি না, তা সময়ের ব্যবধানেই বোঝা যাবে।
ঝুঁকিপূর্ণ বাজি
অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যে বাজির হিড়িক পড়েছে, তা এখন আর কেবল জুয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একে এখন জাতীয় নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। গোপন সামরিক তথ্য ফাঁস করে একদল অসাধু চক্র তেলের বাজার এবং বাজির বাজার থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি ডলার।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জশুয়া মিটস এবং গবেষকরা গত মাসে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যকার প্রায় ২ লাখ সন্দেহভাজন ডিজিটাল ওয়ালেট পরীক্ষা করেছেন। তারা দেখেছেন, এই সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু বাজিকর বা বিনিয়োগকারী প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে সফল হয়েছেন। তারা ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর গ্রেপ্তার থেকে শুরু করে সংগীতশিল্পী টেইলর সুইফটের বাগদান—এমন সব ঘটনায় বাজি ধরে প্রায় ১৪৩ মিলিয়ন ডলার আয় করেছেন।
গবেষকদের মতে, এই লেনদেনগুলো ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিচয় গোপন রেখে করা হয় বলে অপরাধীদের ধরা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
সাধারণত শেয়ার বাজারের কারচুপি নিয়ে কঠোর আইন থাকলেও কমোডিটি ফিউচার বা সংবাদের ওপর ভিত্তি করে ধরা বাজির ক্ষেত্রে আইন এখনও বেশ দুর্বল।
অধ্যাপক ভারস্টাইন সতর্ক করে বলেছেন, ‘শেয়ার বাজারের তুলনায় এখানে ঝুঁকি বেশি। কারণ এখানে সরকারের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার সুযোগ থাকে। যদি যুদ্ধের সিদ্ধান্ত কোনো বাজির ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়, তবে সেটি পুরো বিশ্বের অর্থনীতির জন্য কাল হতে পারে।’
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মার্কিন কংগ্রেসে একটি নতুন বিল উত্থাপন করা হয়েছে। এই আইন পাস হলে সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা তাদের কর্মীদের জন্য রাজনৈতিক বা সামরিক ঘটনায় বাজি ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হবে। তবে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে না থাকায় এই নিষেধাজ্ঞা কতটুকু কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।




