পাতিস্তানে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর হরমুজ প্রণালিতে ইরানি জাহাজ ও বন্দরগুলোর ওপর শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই অবরোধ শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) চতুর্থ দিনে পদার্পন করায় অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে তেহরানে।
তবে যুক্তকরাষ্ট্রভিত্তিক ম্যাগাজিন টাইম দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের এই অবরোধ চীনের চন্য আশীর্বাদ হতে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেছে। সাময়িকীটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের হরমুজ অবরোধকে বেইজিংয়ের জন্য ‘উপহার’ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে তাইওয়ান প্রণালির ওপর চীনের সার্বভৌমত্ব ধরে রাখার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের এই অবরোধ একটি শক্তিশালী উদাহরণ হিসেবে কাজ করবে।
ইরানের আয়ের প্রধান উৎস তেল রপ্তানি। গত বছর দেশটি তেল রপ্তানির মাধ্যমে প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে, যা জিডিপির প্রায় ১৩ শতাংশ। তবে এই অবরোধ ইরানি তেলের ক্রেতাদেরও চাপে ফেলেছে, বিশেষ করে চীনকে।
সম্প্রতি ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ সমুদ্রজাত অপরিশোধিত তেল কিনেছে চীন। শুধু গত বছরই ৫০ কোটিরও বেশি ব্যারেল তেল ইরান থেকে আমদানি করেছে চীন। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) বেইজিংয়ে আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স খালেদ বিন মোহামেদের সঙ্গে আলাপকালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সতর্ক করে বলেছেন, ‘বিশ্বকে পুনরায় জঙ্গলের আইন বা জোর যার মুলুক তার—এমন পরিস্থিতিতে ফিরে যেতে দেওয়া ঠিক হবে না।’
টাইমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের জন্য জ্বালানির এই ঘাটতি সমস্যার কারণ হলেও ওয়াশিংটনের সামুদ্রিক আইনের যথেচ্ছা লঙ্ঘন বেইজিংয়ের জন্য অন্যান্য দিক থেকে সুবিধাজনক হতে পারে। কারণ, চীনও চায় তাইওয়ানের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব ধরে রাখতে। আর তা সম্ভব সমুদ্রে আইন লঙ্ঘন কারা এবং জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দেওয়ার মাধ্যমে।
ট্রাম্প ইরানি বন্দরে এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের দবি করা টোল প্রদানকারী জাহাজগুলোকে একতরফাভাবে বাধা দিচ্ছেন, তা সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের শামিল। এখানে প্রতিষ্ঠিত আইনের চেয়ে ট্রাম্প জাতীয় নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এর প্রেক্ষিতে ধারণা করা হচ্ছে, জ্বালানি সংকটের চেয়েও বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন ইউনাইটেড নেশনস কনভেনশন অন দ্য ল অব দ্য সি (ইউএনসিএলওএস)। ১৯৯৪ সালে প্রবর্তিত এই আইন ৩৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী, যুদ্ধের সময়ও হরমুজ প্রণালির মতো আন্তর্জাতিক জলপথগুলোতে জাহাজ চলাচলে কোনো ধরনের বাধা দেওয়া যাবে না। যুক্তরাষ্ট্র এ আইন বাস্তবায়নে স্বাক্ষর না করলেও তা আন্তর্জাতিক আইন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে চীন স্বাক্ষর করেছে, তবে নিজস্ব সুবিধামতো কিছু ব্যাখ্যা যুক্ত করেছে।
কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে যেভাবে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে এই পথ অবরোধ করছে, তা সমুদ্রের উন্মুক্ত বাণিজ্যের নীতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এতে করে ধারণা করা হচ্ছে, চীনও দক্ষিণ চীন সাগর এবং তাইওয়ান প্রণালিতে তাদের কর্তৃত্ব ধরে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে উদাহরণ হিসেবে দাঁড় করাতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার ডিফেন্স ফোর্স একাডেমির ইমেরিটাস অধ্যাপক কার্লাইল থায়ের টাইমকে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান আচরণ চীনকে যুক্তি দেওয়ার সুযোগ করে দেবে। তারা তাইওয়ান প্রণালিকে কোনো আন্তর্জাতিক জলপথ নয়, বরং চীনের নিজস্ব এলাকা হিসেবে দাবি করতেই পারে।
দীর্ঘদিন ধরে চীন দাবি করে আসছে, তাইওয়ান প্রণালি তাদের জলসীমা। বেইজিং এই প্রণালিতে নিজেদের অবরোধ প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি করছে। গত ২৯ ডিসেম্বর তারা তাইওয়ানের চারপাশে ২০০টিরও বেশি বিমান এবং অসংখ্য নৌযান নিয়ে বড় ধরনের সামরিক মহড়া চালিয়েছে। ৩৭০টিরও বেশি যুদ্ধজাহাজ নিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম নৌবাহিনী ছাড়াও চীনের প্রায় ২ লাখ মাছ ধরার নৌকার একটি ছায়া নৌবাহিনী রয়েছে।
এখন বিপদ হলো, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরান সংকটের ওপর ভিত্তি করে হরমুজের মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথ নিয়ন্ত্রণের দাবি করে, তবে চীনও তাইওয়ান প্রণালিতে একই অধিকার দাবি করতে পারে। পরাশক্তিগুলো যদি জাতিসংঘের ম্যান্ডেট ছাড়াই প্রণালি অবরোধের নতুন ‘প্রথা’ তৈরি করে, তবে চীনও তাইওয়ানের বিরুদ্ধে এটিকে বৈধ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের নীতি মূলত আন্তর্জাতিক মহলে যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করছে। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ওরিয়ানা স্কাইলার মাস্ত্রো বলেন, ‘যখন আপনার কোনো বৈধ যুক্তি থাকে না, তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।’ সম্প্রতি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়া এর একটি বড় প্রমাণ।
গত এক বছরে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলা, কিউবা এবং এখন ইরানের বিরুদ্ধে একতরফাভাবে অবরোধের নির্দেশ দিয়েছেন। মাস্ত্রোর মতে, ট্রাম্পের এসব পদক্ষেপের কারণে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা দুর্বল হচ্ছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে এই অবরোধ সফল বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে পাকিস্তানে প্রথম দফার শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর গত মঙ্গলবার ট্রাম্প আবারও ইরানের সঙ্গে আলোচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এ আলোচনা সফল হলেও এ যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রকে দীর্ঘমেয়াদি মাশুল দিতে হতে পারে।
থায়ের বলেন, ট্রাম্প যে পদক্ষেপগুলো নিচ্ছেন তার সবই সেই অর্থে চীনকে সহায়তা করছে। এখন পর্যন্ত এই অঞ্চলে চীনের একগুঁয়েমি এবং আগ্রাসনই ছিল আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু। এখন চীন উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়ে বলতে পারবে, ‘আমরা আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখছি, তবে আমরা দাদাগিরির বিরুদ্ধে।’




