যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ আজ ৫০ দিনে গড়িয়েছে। এর মধ্যে বিশ্বের জ্বালানি বাজার নজিরবিহীন এক সংকটের মুখে পড়েছে। জ্বলানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি অবরোধের কারণে বিশ্ববাজার থেকে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের অপরিশোধিত তেল হারিয়ে গেছে। মূলত সরবরাহ বন্ধ থাকায় এই তেল উৎপাদন করা সম্ভব হয়নি।
বাজার বিশ্লেষক এবং বার্তা সংস্থা রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই জ্বালানি বিপর্যয়ের রেশ টানতে হবে আগামী কয়েক বছর।
শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) লেবাননে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি চলাকালীন হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খোলা থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘছি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধ শেষ করতে ইরান শিগগিরই চুক্তিতে আসবে, যদিও এর সময়সীমা এখনও অস্পষ্ট।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ হামলার পর থেকে মূলত এ সংকট শুরু হয়। এরপর থেকে বিশ্ববাজার থেকে ৫০ কোটি (৫০০ মিলিয়ন) ব্যারেলেরও বেশি অপরিশোধিত তেল ও অন্যনান্য জ্বালানি ছিটকে গেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশ্লেষক সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে জ্বালানি সরবরাহের বড় ধরনের এই সংকটের ঘটনা বিরল।
তেল সংকট কোথায় কীভাবে প্রভাব ফেলেছে
এই বিশাল পরিমাণ তেলের ঘাটতি কতটা ভয়াবহ, তা বোঝা যায় উড ম্যাকেঞ্জির একটি পরিসংখ্যানে। সংস্থাটির বরাতে সংবাদমাধ্যম দ্য ইকোনমিকস টাইমসের এক প্রতিবেদনে ধারবাহিক প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে, এই পরিমাণ তেল দিয়ে সারা বিশ্বের বিমান চলাচল টানা ১০ সপ্তাহ চালানো সম্ভব ছিল অথবা পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে ৫ দিন সচল রাখা যেত।
রয়টার্সের অনুসন্ধ্যান অনুযায়ী, বাজারে উধাও হয়ে যাওয়া এই তেল যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় এক মাসের চাহিদা বা সমগ্র ইউরোপের এক মাসেরও বেশি সময়ের চাহিদার সমান।
২০২১ অর্থবছর থেকে বার্ষিক প্রায় ৮০ মিলিয়ন ব্যারেল ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রায় ছয় বছরের জ্বালানি খরচ।
২০২১ অর্থবছরের ৮০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ব্যবহারের হিসেব অনুযায়ী, এটি মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রায় ছয় বছরের জ্বালানি ব্যবহারের সমান। এ ছাড়া সমপরিমাণ তেল দিয়ে বিশ্বের আন্তর্জাতিক শিপিং শিল্পকে প্রায় চার মাস চালানো সম্ভব।
ক্ষতির মুখে আরব দেশগুলো
যুদ্ধের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলো। কেপলার-এর তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত ও আমিরাতের মতো দেশগুলো দৈনিক প্রায় ৮০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন হারিয়েছে, এই হিসাব বিশ্বের দুটি বৃহত্তম তেল কোম্পানি এক্সন মবিল এবং শেভরনের সম্মিলিত উৎপাদনের প্রায় সমান।
উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে জেট ফুয়েল বা বিমান জ্বালানির রপ্তানিও। ফেব্রুয়ারিতে যেখানে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৯ দশমিক ৬ মিলিয়ন ব্যারেল, মার্চ ও এপ্রিল মিলিয়ে তা মাত্র ৪ দশমিক ১ মিলিয়নে নেমে এসেছে।
রয়টার্সের হিসেবে, এই পরিমাণ জ্বালানি দিয়ে নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দর এবং লন্ডন হিথ্রোর মধ্যে প্রায় ২০ হাজার রাউন্ড ট্রিপ ফ্লাইট চালানো সম্ভব।
কেপলারের সিনিয়র ক্রুড অ্যানালিস্ট জোহানেস রাউবল বলেছেন, সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে অপরিশোধিত তেলের দাম গড়ে প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার হওয়ায়, এই হারিয়ে যাওয়া তেলের মূল্য প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার। এই হিসাব জার্মানির বার্ষিক জিডিপির ১ শতাংশ বা লাটভিয়া ও এস্তোনিয়ার মতো ছোট দেশগুলোর মোট জিডিপির সমান।
সংকট কাটতে সময় লাগতে পারে কয়েক বছর
যদিও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার কথা বলেছেন, তবুও উৎপাদন ও সরবরাহ স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কেপলার-এর মতে, এপ্রিলে বিশ্বব্যাপী অনশোর অপরিশোধিত তেলের মজুদ প্রায় ৪৫ মিলিয়ন ব্যারেল কমেছে। মার্চ মাসের শেষ থেকে উৎপাদনের ঘাটতি প্রতিদিন প্রায় ১২ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছেছে। কুয়েত এবং ইরাকের বড় তেলের খনিগুলো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে চার থেকে পাঁচ মাস সময় নিতে পারে। কাতার ও অন্যান্য অঞ্চলের অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণে জ্বালানি উৎপাদন সম্পূর্ণ পুনরুদ্ধারে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।


-1778455118-16678_1778455263.webp)

