ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এমনকি চলমান যুদ্ধ থেকে দেশকে পুনরুদ্ধার করা যেন জটিল ও কষ্টদায়ক হয়, সেজন্য ইরানের একগুচ্ছ লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে রেখেছে ওই দুই দেশ। আর লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে হরমুজ প্রণালির নিকটে খারগ দ্বীপ শীর্ষ তালিকায় রয়েছে।
সোমবার (৬ এপ্রিল) এক ইসরায়েলি কর্মকর্তার বরাতে এই তথ্য জানিয়েছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।
ওই কর্মকর্তা জানান, চলতি সপ্তাহে ইরানের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলা চালাতে চায় ইসরায়েল। এ জন্য ওয়াশিংটনের ‘গ্রিন সিগন্যালের’ অপেক্ষায় রয়েছে তারা। সফলভাবে হামলা চালাতে সক্ষম হলে বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশটির অর্থনীতি রীতিমতো পঙ্গু হয়ে যাবে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) প্রধান অর্থনৈতিক অঞ্চল খারগ দ্বীপ লক্ষ্যবস্তুর এই তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পারমাণবিক কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন ও মার্কিন ঘোষিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থনের কারণে দীর্ঘদিনের পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ফলে ইতোমধ্যে ইরানের অর্থনীতি মন্দাবস্থা। নাগরিকদের মতে, এই যুদ্ধ অর্থনীতিকে নতুন করে নিম্নস্তরে নামিয়ে এনেছে। বোমা হামলার পর কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে খাদ্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। বেকারত্ব বেড়েছে।
ইরানের অর্থনীতির ভিত্তিমূলে আঘাত হানার অর্থ হবে পাঁচ সপ্তাহ ধরে চলা যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি। এই হামলার লক্ষ্য হরমুজ প্রণালি অবরোধ করে তেহরান যে অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করেছে, তা থেকে দেশটিকে সরে আসতে বাধ্য করা। এই সরু প্রণালি দিয়েই বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ হয়। প্রণালিটি খুলে দেওয়ার জন্য মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
এই যুদ্ধ থেকে ইরান কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উপসাগরীয় অন্যান্য দেশগুলো যখন পারছে না, তখন উচ্চমূল্যে নিজেদের তেল রপ্তানি অব্যাহত রাখছে তেহরান। মার্কিন প্রশাসনের দেওয়া তেল রপ্তানি ছাড়ের ফলে ভারত বহু বছর পর প্রথমবারের মতো ইরান থেকে তেল কেনার সুযোগ পেয়েছে। এবং হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য টোল আদায়ের সুযোগ।
তবে যুদ্ধের কারণে ইরানের অর্থনীতিতে যে ক্ষতি হয়েছে, সে তুলনায় এই সুবিধাগুলো নগণ্য বলে মনে করছেন তেল আবিবভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের ইরান প্রোগ্রামের পরিচালক রাজ জিম্মত। তার মতে, ইরান আপাতত আরও অর্থনৈতিক দুর্ভোগের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত বলেই মনে হচ্ছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র জ্বালানি-বহির্ভূত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা জোরদার করেছে। এর মধ্যে ইরানের বৃহত্তম ইস্পাত, পেট্রোকেমিক্যাল কারাখানা ও বি-১ নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুতে হামলা চালিয়েছে।
ইসরায়েলের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও বর্তমানে উপদেষ্টা গোষ্ঠী মাইন্ড ইসরায়েলের সহ-সভাপতি আভনার গোলভ বলেন, তারা (ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র) ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আমরা এ ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর। আপনারা যদি যুদ্ধ শেষ করতে রাজি না হন, তাহলে আপনাদের অর্থনীতিকে এ জন্য চরম মূল্য দিতে হবে।
দুবাইভিত্তিক পরামর্শক সংস্থা কামার এনার্জির প্রধান নির্বাহী রবিন মিলস বলেছেন, ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিলেও, পেট্রোকেমিক্যাল ও অন্যান্য জ্বালানি স্থাপনাগুলো গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে পারস্য উপসাগর থেকে কিছুই বের হতে পারবে না। তার মতে, এমনকি যদি আমরা স্বাভাবিক পরিবহনে ফিরেও যাই, উপসাগর থেকে সংগৃহীত দৈনিক ৫০ লাখ ব্যারেল পরিশোধিত কাঁচামালের কিছু অংশ কয়েক মাস, এমনকি তারও বেশি সময়ের জন্য হারিয়ে যাবে।
এদিকে নিজেদের অবকাঠামোর ওপর হামলার প্রতিশোধ নিতে বাহরাইন ও আবুধাবিতে পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনা, কুয়েতের তেল, পানি পরিশোধন ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে ইরান। রোববার ইরান দক্ষিণ ইসরায়েলের নিওত হোভাব শিল্পাঞ্চলে হামলা চালায়। সেখানে বেশ কয়েকটি কারখানা রয়েছে। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এর কয়েকদিন আগে হাইফায় অবস্থিত ইসরায়েলের বৃহত্তম তেল শোধনাগারটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সেখানে উৎপাদন বন্ধ হয়নি।
ট্রাম্পের হুমকির পর রোববার এক্সে দেওয়া পোস্টে ইরানের সংসদীয় স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ লিখেছেন, ‘আপনার বেপরোয়া পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিটি পরিবারের জন্য এক জীবন্ত নরকের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলটি পুড়ে যাবে। কারণ, আপনি নেতানিয়াহুর নির্দেশ অনুসরণ করার ব্যাপারে জেদ ধরেছেন।’


-1778455118-16678_1778455263.webp)

