নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, ফরএভার কেমিক্যাল নামে পরিচিত পিএফএএস রাসায়নিকের প্রভাবে ৫০ থেকে ৬৫ বছর বয়সি পুরুষদের জৈবিক বার্ধক্য নারীদের তুলনায় দ্রুত বাড়তে পারে।
পিএফএএসের পূর্ণ নাম পারফ্লুরোঅ্যালকাইল ও পলিফ্লুরোঅ্যালকাইল সাবস্ট্যান্সেস। এগুলোকে ফরএভার কেমিক্যাল বলা হয়, কারণ এগুলো প্রাকৃতিকভাবে পরিবেশে মিশে যেতে অনেক বছর লাগে। ন্যাশনাল অ্যাকাডেমিস অব সায়েন্সেস, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড মেডিসিনের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৯৮ শতাংশ মানুষের রক্তে কোনো না কোনো ধরনের পিএফএএস পাওয়া যায়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, এপিজেনেটিক এজিং বা জৈবিক বার্ধক্য পুরুষদের ক্ষেত্রে বেশি এগিয়েছে। জৈবিক বয়স মানে শরীরের কোষ ও টিস্যুর প্রকৃত অবস্থা, যা সবসময় ক্যালেন্ডারের বয়সের সঙ্গে মেলে না।
গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক শাংহাই জিয়াও টং ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের অধ্যাপক লি শিয়াংওয়েই জানান, ৫০ থেকে ৬৫ বছর বয়সি পুরুষদের মধ্যে পিএফএএসের সংস্পর্শ ও দ্রুত জৈবিক বার্ধক্যের সম্পর্ক সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। কম বয়সি বা ৬৫ বছরের বেশি বয়সিদের ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক ততটা স্পষ্ট নয়। নারীদের মধ্যেও কিছু সম্পর্ক পাওয়া গেছে, তবে তা তুলনামূলকভাবে দুর্বল।
গবেষণার বাইরে থাকা বিশেষজ্ঞ জেন মুন্ক বলেন, হরমোন নিয়ন্ত্রণকারী অন্তঃস্রাবী ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলে এমন রাসায়নিকের ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক পার্থক্য দেখা যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
গবেষণায় ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, পুরুষদের শরীরে পিএফএএস জমে গেলে টেস্টোস্টেরন কমে যেতে পারে, শুক্রাণুর গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং অণ্ডকোষ ও কিডনি ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
আগের গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভধারণ, স্তন্যদান ও মাসিকের মাধ্যমে নারীরা কিছু পিএফএএস তুলনামূলক দ্রুত শরীর থেকে বের করে দিতে পারেন। তবে মেনোপজের পর নারী ও পুরুষের মধ্যে পিএফএএস জমার পার্থক্য কমে আসে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এই গবেষণা কারণ ও ফলাফলের সরাসরি প্রমাণ নয়। এটি কেবল একটি বৈজ্ঞানিক ধাঁধার অংশ, যা ভবিষ্যৎ গবেষণার ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে শিল্পখাতের সংগঠন আমেরিকান কেমিক্যাল কাউন্সিল জানিয়েছে, গবেষণাটি সীমিত নমুনার ওপর এবং পুরোনো তথ্য ব্যবহার করে করা হয়েছে। তাদের দাবি, এটি পিএফএএস বার্ধক্য ঘটায় এমন সরাসরি প্রমাণ দেয় না।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বার্ধক্য গবেষণা (Frontiers in Aging) সাময়িকীতে। এতে ১৯৯৯ ও ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত ন্যাশনাল হেলথ অ্যান্ড নিউট্রিশন এক্সামিনেশন সার্ভের ৩২৬ জন বয়স্ক নারী ও পুরুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।
অংশগ্রহণকারীদের রক্তে ১১ ধরনের পিএফএএস পরীক্ষা করা হয়। পাশাপাশি ডিএনএ মিথাইলোম নামে পরিচিত এপিজেনেটিক সূচক বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন জৈবিক ঘড়ির মাধ্যমে শরীরের বার্ধক্য নির্ণয় করা হয়।
গবেষণায় বিশেষভাবে দুটি কম আলোচিত রাসায়নিকের নাম উঠে এসেছে: পিএফএনএ ও পিএফওএসএ। ৫০ থেকে ৬৪ বছর বয়সি পুরুষদের ক্ষেত্রে এই দুই রাসায়নিকের উচ্চমাত্রা দ্রুত জৈবিক বার্ধক্যের শক্ত পূর্বাভাসক হিসেবে দেখা গেছে। নারীদের ক্ষেত্রে এমন স্পষ্ট সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
১৯৫০-এর দশক থেকে ননস্টিক পাত্র, তেল ও পানি প্রতিরোধী কাপড়, খাদ্য মোড়ক এবং তাপমাত্রা সহনশীল পণ্য তৈরিতে পিএফএএস ব্যবহার হচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় ক্যানসার, বন্ধ্যাত্ব, উচ্চ কোলেস্টেরল, হরমোনের সমস্যা, লিভারের ক্ষতি, স্থূলতা ও থাইরয়েড রোগের সঙ্গে এসব রাসায়নিকের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
পারফ্লুরোঅকটেন সালফোনিক অ্যাসিড বা পিএফওএস, পারফ্লুরোঅকটানোইক অ্যাসিড বা পিএফওএ এবং পিএফএইচএক্সএসের মতো কিছু পুরোনো পিএফএএস এতটাই ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচিত যে ২০০১ সালের Stockholm Convention on Persistent Organic Pollutants চুক্তির আওতায় বিশ্বব্যাপী এগুলো কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে সই করলেও তা অনুমোদন করেনি।
গবেষকরা বলছেন, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। পিএফএএসের সংস্পর্শ পুরোপুরি এড়ানো বাস্তবসম্মত নয়, কারণ এগুলো পরিবেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে। তবে সম্ভব হলে স্বীকৃত পানি ফিল্টার ব্যবহার, স্থানীয় পানির মানসংক্রান্ত নির্দেশনা মেনে চলা এবং তেল বা দাগ প্রতিরোধী উপকরণের ব্যবহার কমানো যেতে পারে।
একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা জোর দিচ্ছেন, বড় মাত্রায় ঝুঁকি কমাতে হলে সরকারি নীতিমালা, কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ পরিষ্কার রাখার উদ্যোগই সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
সূত্র : সিএনএন




