একসময় দিনের শেষে ঘুম মানেই ছিল পুরো শরীরের বিশ্রাম। কাজ শেষ, আলো নিভে গেছে, আর তারপর গভীর একটা ঘুম। কিন্তু এখন! অনেকের জন্য বাস্তবতা ভিন্ন। রাত আসে, শরীর বিছানায় যায়, কিন্তু ঘুম আসে হালকাভাবে বা আসে না বললেই চলে। সকালে উঠেও আগের দিনের সেই ক্লান্তি থেকেই যায়।
গবেষকরা বলছেন, সমস্যাটা শুধু কত ঘণ্টা ঘুমাচ্ছেন তা নয়, বরং কেমন ঘুম হচ্ছে সেটিই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই হয়তো নিয়মিত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা বিছানায় কাটাচ্ছেন, কিন্তু শরীর সেই সময়টুকুতে পুরোপুরি নিজেকে পুনরুদ্ধার করতে পারছে না। বিশেষ করে গভীর ঘুম বা স্লো-ওয়েভ স্লিপ কমে যাচ্ছে, যা শরীরের কোষ মেরামত এবং শক্তি পুনরুদ্ধারের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয়।
এই পরিস্থিতিকে অনেকেই নিজের অভ্যাসের সমস্যা বলে মনে করেন। যেমন বেশি মোবাইল ব্যবহার বা ঠিকমতো বিশ্রাম না নেওয়া। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি এর চেয়ে অনেক বেশি জটিল। দিনের কাজ শেষ হলেও আমাদের মস্তিষ্ক অনেক সময় সেটি বুঝতে পারে না। শরীর তখনো সতর্ক অবস্থায় থাকে, যেন কোনো কাজ বাকি আছে।
ঘুমের জন্য শরীরে কিছু স্বাভাবিক পরিবর্তন দরকার। যেমন কর্টিসল হরমোন কমে আসা, স্নায়ুতন্ত্রের শান্ত হওয়া এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি রাতের মোডে চলে যাওয়া। কিন্তু আধুনিক জীবনের চাপ, বিশেষ করে ডিজিটাল ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহার, এই প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে।
স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অনলাইন কাজ আমাদের মস্তিষ্ককে সারাক্ষণ সক্রিয় রাখে। আমরা হয়তো ফোন বন্ধ করেছি, কিন্তু মস্তিষ্ক তখনো সেই উত্তেজনা বা প্রত্যাশার মধ্যে থাকে। ফলে শরীর বিশ্রামে গেলেও মস্তিষ্ক পুরোপুরি শান্ত হতে পারে না।
গবেষণায় দেখা যায়, যারা বেশি সময় স্মার্টফোন ব্যবহার করেন, তাদের ঘুমের মান তুলনামূলকভাবে খারাপ হয়। এমনকি তারা নির্দিষ্ট সময় ঘুমানোর চেষ্টা করলেও মানসিক চাপ ও অস্থিরতা ঘুমকে প্রভাবিত করে।
এছাড়া আধুনিক জীবনের আরেকটি বড় সমস্যা হলো অনিয়মিত সময়সূচি। অনেকেই সপ্তাহের দিন ও ছুটির দিনে আলাদা সময়ে ঘুমান এবং জাগেন। এতে শরীরের স্বাভাবিক ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদম বিঘ্নিত হয়। ফলে ঠিক সময়েও ঘুমাতে গেলেও শরীর প্রস্তুত থাকে না।
ঘুমের মান নির্ভর করে শুধু সময়ের ওপর নয়, বরং সময়ের সঠিকতা এবং ধারাবাহিকতার ওপরও। ভুল সময়ে ঘুমালে সেটি হালকা হয় এবং শরীর ঠিকভাবে বিশ্রাম পায় না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আলো। রাতে কৃত্রিম আলো, বিশেষ করে স্ক্রিনের আলো, শুধু ঘুমের সময় পিছিয়ে দেয় না, বরং মস্তিষ্ককে সতর্ক রাখে। এতে কর্টিসল কমতে দেরি হয় এবং ঘুমের গভীরতা কমে যায়।
এই কারণেই অনেক সময় দেখা যায়, কেউ ৮ ঘণ্টা ঘুমিয়েও সকালে সতেজ বোধ করেন না। কারণ তার ঘুমের গভীরতা এবং গুণগতমান ঠিক ছিল না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সমস্যা থেকে বের হতে হলে শুধু ঘুমের সময় বাড়ালেই হবে না। বরং দিনের শেষে শরীর ও মস্তিষ্ককে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে যে এখন বিশ্রামের সময়। নিয়মিত একই সময়ে ঘুমানো ও জাগা, রাতে আলো কমানো, এবং ঘুমানোর আগে ধীরে ধীরে কাজ থেকে নিজেকে আলাদা করা- এসব অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ।
দিনের শেষে ছোট ছোট কিছু অভ্যাস, যেমন লাইট কমিয়ে দেওয়া, মোবাইল থেকে দূরে থাকা বা নির্দিষ্ট একটি রুটিন অনুসরণ করা, মস্তিষ্ককে সংকেত দেয় যে দিনের কাজ শেষ। তখন শরীর ধীরে ধীরে শান্ত হয় এবং ঘুম গভীর হতে পারে।
সব মিলিয়ে, এখন আর শুধু ৮ ঘণ্টা ঘুমই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সঠিক সময়ে, সঠিক পরিবেশে এবং মানসম্পন্ন ঘুম। তাহলেই সত্যিকারের বিশ্রাম পাওয়া সম্ভব।
সূত্র : ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক




