পুরুষদের স্বাস্থ্যের অনেক বিষয় রয়েছে, যেগুলো নিয়ে আমরা খুব বেশি আলোচনা করি না। বিশেষ করে প্রস্টেট স্বাস্থ্য এমন একটি বিষয়, যা অনেক সময়ই অবহেলিত থেকে যায়। অথচ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই গ্রন্থি ঘিরে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই আগে থেকেই সচেতন হওয়া জরুরি।
প্রস্টেট হলো একটি ছোট গ্রন্থি, যা মূত্রথলির নিচে এবং পায়ুর সামনের দিকে থাকে। এটি পুরুষদের প্রজনন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রস্টেটে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে প্রস্টেট ক্যানসার, প্রস্টেট বড় হয়ে যাওয়া যাকে চিকিৎসা ভাষায় বিপিএইচ (BPH) বলা হয় এবং প্রস্টেটের সংক্রমণ যা প্রস্টেটেটাইটিস (Prostatitis) নামে পরিচিত।
দুঃখজনকভাবে অনেক পুরুষ এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন। কেউ কেউ ভয় পান পরীক্ষা করাতে। কিন্তু নিয়মিত পরীক্ষা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে সমস্যা ধরা পড়লে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে বড় ধরনের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। সময়মতো প্রস্টেট চেক করানো অনেক ক্ষেত্রে জীবন রক্ষা করতে পারে।
তাই লজ্জা বা ভয় না পেয়ে নিজের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে সচেতন হওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা পুরুষদের সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রোস্টেট পরীক্ষা হলো এমন একটি স্ক্রিনিং পদ্ধতি, যার মাধ্যমে প্রোস্টেট ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ খোঁজা হয়। সাধারণভাবে ৫০ বছর বয়স থেকে পুরুষদের নিয়মিত প্রোস্টেট পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে কারও ঝুঁকি বেশি থাকলে ৪৫ বছর বা তারও আগে স্ক্রিনিং শুরু করার প্রয়োজন হতে পারে।
প্রোস্টেট পরীক্ষা ক্যানসার আছে কি না তা নিশ্চিতভাবে জানায় না। কিন্তু ফল অস্বাভাবিক হলে চিকিৎসক সাধারণত আরও নির্ভুল পরীক্ষা, যেমন প্রোস্টেট বায়োপসি করার পরামর্শ দেন।
সাধারণত প্রোস্টেট পরীক্ষা দুই অংশে হয়।
পিএসএ রক্ত পরীক্ষা
এটি রক্তে প্রোস্টেট স্পেসিফিক অ্যান্টিজেন বা পিএসএর মাত্রা মাপা হয়। পিএসএ বেশি হলে ক্যানসারসহ বিভিন্ন সমস্যা থাকার ইঙ্গিত দিতে পারে।
ডিজিটাল রেকটাল এক্সাম বা ডিআরই
এই পরীক্ষায় চিকিৎসক হাতে গ্লাভস পরে আঙুলের মাধ্যমে মলদ্বার দিয়ে প্রোস্টেট গ্রন্থির আকার, প্রান্ত ও পৃষ্ঠ স্পর্শ করে দেখেন। এতে কোনো অস্বাভাবিকতা আছে কি না তা বোঝার চেষ্টা করা হয়।
গড় ঝুঁকিতে থাকা পুরুষদের জন্য ৫০ বছর বয়স থেকে প্রোস্টেট পরীক্ষা শুরু করা উচিত। সাধারণত প্রতি ২ থেকে ৪ বছর পরপর পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
৪০ থেকে ৪৫ বছর বয়সেই স্ক্রিনিং শুরু করার পরামর্শ দেওয়া হয়। ঝুঁকি বাড়াতে পারে এমন বিষয়গুলো হলো:
- পরিবারে প্রোস্টেট ক্যানসারের ইতিহাস
- আফ্রিকান বংশোদ্ভূত বা কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ
- নির্দিষ্ট জিনগত পরিবর্তন
- কম বয়সে নিকট আত্মীয়ের মধ্যে ক্যানসার ধরা পড়া
প্রাথমিক পর্যায়ে প্রোস্টেট ক্যানসারে কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে। তবে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—
- প্রস্রাবে কষ্ট হওয়া
- ঘন ঘন প্রস্রাবের প্রয়োজন
- প্রস্রাব বা বীর্যপাতের সময় ব্যথা
- মূত্রথলি পুরোপুরি খালি না হওয়া
- প্রস্রাব বা বীর্যে রক্ত দেখা
এগুলো সবসময় ক্যানসারের লক্ষণ নয়, তবে অবহেলা করা উচিত নয়।
প্রোস্টেট ক্যানসার পুরুষদের মধ্যে অন্যতম সাধারণ ক্যানসার। তবে শুরুতেই শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসা সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা American Cancer Society-এর তথ্য অনুযায়ী, ক্যানসার যদি শুধু প্রোস্টেট গ্রন্থির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে পাঁচ বছর বেঁচে থাকার হার ৯৯ শতাংশেরও বেশি।
নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে ক্যানসার ছাড়াও অন্যান্য সমস্যা যেমন বিনাইন প্রোস্টেটিক হাইপারপ্লাসিয়া বা বড় হয়ে যাওয়া প্রোস্টেট প্রাথমিক পর্যায়েই ধরা পড়ে। এতে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও কার্যকর চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ বাড়ে।
৪০ থেকে ৪৫ বছর : যাদের ঝুঁকি বেশি, তারা এই বয়সে স্ক্রিনিং শুরু করতে পারেন। পরিবারের একাধিক সদস্য কম বয়সে আক্রান্ত হলে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।
৫০ থেকে ৬৯ বছর : এই বয়সে নিয়মিত স্ক্রিনিং সবচেয়ে বেশি উপকার দেয়। আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রতি ২ থেকে ৪ বছর পরপর পরীক্ষা করা যেতে পারে।
৭০ বছর বা তার বেশি : সাধারণভাবে ৭০ বছরের পর নিয়মিত স্ক্রিনিং সুপারিশ করা হয় না, বিশেষ করে যাদের গড় আয়ু ১০ বছরের কম হতে পারে। তবে শারীরিকভাবে সুস্থ ও সক্রিয় ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
বাংলাদেশে পুরুষদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিয়ে সচেতনতা তুলনামূলক কম। অনেকেই লজ্জা বা ভয় থেকে প্রোস্টেট পরীক্ষা এড়িয়ে যান। কিন্তু মনে রাখতে হবে, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে প্রোস্টেট ক্যানসার সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বয়স ও ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে সময়মতো স্ক্রিনিং করানোই হতে পারে দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
সূত্র : ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক, ইউনিভার্সিটি হেল্থ




