
নিষিদ্ধ ঘোষণার পর দীর্ঘদিন প্রকাশ্য কার্যক্রম থেকে দূরে থাকা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) শাখা নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসে এবার নতুন করে সংগঠিত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গভীর রাতে রাবির ১১টি আবাসিক হলে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা কেন্দ্র করে এই তৎপরতা স্পষ্ট হয়েছে।
সোমবার (৪ মে) রাতে সংগঠনটির রাবি শাখার সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বাবু ও সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লাহ-হিল-গালিবের স্বাক্ষরে এই কমিটির তালিকা প্রকাশ করা হয়। ঘোষিত তালিকায় প্রতিটি হলে শুধু সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, আগামী এক বছরের জন্য এই কমিটি কার্যকর থাকবে।
রাবি ক্যাম্পাসে মোট ছেলেদের ১১টি এবং মেয়েদের ছয়টি হল থাকলেও ঘোষিত কমিটি শুধু ছেলেদের হলগুলো নিয়েই করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর নাম পরিবর্তন হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল থেকে বিজয়-২৪ হলে রূপান্তরিত হলেও ঘোষণায় পুরোনো নাম ‘বঙ্গবন্ধু হল’ ব্যবহার করা হয়েছে। ওই হলে তানভির আহমেদকে সভাপতি এবং তামিম হাসানকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রাখা হয়েছে।
অন্যান্য হলগুলোর মধ্যে শের-ই বাংলা ফজলুল হক হলে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে যথাক্রমে শুভ্র দেব সাহা ও মোবাশ্বির রায়হান রাফির নাম রয়েছে। শাহমখদুম হলে এলাহি শেখ ও এহসান আহমেদ আকাশ, নবাব আব্দুল লতিফ হলে মাসুদুর রহমান ও আব্দুল জলিল চৌধুরী, সৈয়দ আমির আলী হলে গোলাম কিবরিয়া ও মশিউর রহমান মিহাদ, শহীদ হবিবুর রহমান হলে রাইসুল ইসলাম আকাশ ও সোহান হাসান, মতিহার হলে ডালিম মির্জা ও আব্দুল্লাহ শোয়াইব, মাদার বখ্স হলে শামীম সিকদার ও ফজলে রাব্বী, জিয়া হলে মাজেদুল ইসলাম মৃদুল ও তানজিল হাসান সুমন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলে কামরুল হাসান ও মোস্তাফিজুর রহমান তুষার এবং শহীদ শামসুজ্জোহা হলে রাহাত হাসান খান রাহাত ও আব্দুল্লাহ আল আজমীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
আত্মগোপনে নেতৃত্ব, দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাবি শাখা নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সভাপতি বাবু ও সাধারণ সম্পাদক গালিব এই দুই শীর্ষ নেতাই দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে রয়েছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে জুলাই আগস্টের একাধিক মামলা চলমান। এমন পরিস্থিতিতে তাদের স্বাক্ষরে কমিটি ঘোষণাকে ‘রিমোট কন্ট্রোল নেতৃত্ব’ হিসেবে দেখছেন অনেকে, যেখানে সরাসরি মাঠপর্যায়ে উপস্থিত না থেকেও সংগঠন পরিচালনার চেষ্টা করা হচ্ছে। যাদের নিয়ে কমিটি, তারাও ক্যাম্পাসে অনুপস্থিত।
ঘোষিত কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের বড় অংশই বর্তমানে ক্যাম্পাসে অবস্থান করছেন না। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, অনেকেই পূর্বে শৃঙ্খলাভঙ্গ, সহিংসতা বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বহিষ্কার কিংবা আইনি প্রক্রিয়ার মুখে পড়ে আছেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এই কমিটির মধ্য দিয়ে নতুন করে রাবি শাখা নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে নিষিদ্ধ সংগঠন নেতাকর্মীরা।
যে কারণে হলভিত্তিক কমিটি ঘোষণা
নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ দীর্ঘদিন ক্যাম্পাসের বাইরে থাকায় তাদের স্বাভাবিক সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। হলভিত্তিক কমিটি ঘোষণা করে তারা মূল ইউনিটগুলো পুনরায় সক্রিয় বা অন্তত কাগজে-কলমে সচল রাখার চেষ্টা করছে এবং কর্মীদের মনোবল চাঙা করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ১১টি হলে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের একযোগে কমিটি ঘোষণাকে অনেকেই সাংগঠনিক পুনর্গঠনের প্রথম ধাপ হিসেবে দেখছেন। যদিও এই উদ্যোগ এখনো বাস্তব উপস্থিতির চেয়ে বেশি প্রতীকী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শীর্ষ দুই পদে কমিটি কেন
রাবি নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের প্রতিটি হলে কেবল সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্ধারণ করা হয়েছে, পূর্ণাঙ্গ কমিটি নয়। এতে ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটি এখনও পূর্ণমাত্রায় সক্রিয় হওয়ার মতো অবস্থায় নেই বরং ধাপে ধাপে কাঠামো গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
মাঠে নয়, সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয়
২০২৪ সালের ১৬ জুলাইয়ের পর ক্যাম্পাস থেকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ পালিয়ে যাওয়ার পর সংগঠনটির কার্যক্রম মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। নিষিদ্ধ সংগঠনটির হল শাখা নতুন কমিটি ঘোষণার ক্ষেত্রেও একই মাধ্যম ব্যবহার করা হয়েছে। মূলত, নিষিদ্ধ সংগঠনটির ডিজিটাল সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করার প্রচেষ্টা, যার মাধ্যমে সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং ভবিষ্যতে সুযোগ তৈরি হলে দ্রুত সক্রিয় হওয়া সম্ভব হতে পারে।
সক্রিয়তা নাকি অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এই কমিটি ঘোষণার মাধ্যমে সংগঠনটি মূলত নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার বার্তা দিতে চাচ্ছে। অন্যদিকে, আরেকটি অংশ এটিকে ভবিষ্যৎ সক্রিয়তার প্রস্তুতি হিসেবে দেখছেন। তবে বাস্তবতা হলো, ক্যাম্পাসে সরাসরি উপস্থিতি, ছাত্রসমর্থন এবং প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়া কোনো সংগঠনের কার্যকর প্রভাব বিস্তার করা কঠিন। সেই হিসেবে রাবিতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বর্তমান তৎপরতা শুধুই কাগজে কলমে ও সামাজিক মাধ্যমে সীমাবদ্ধ।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে দেখছে। রাবি উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘নিষিদ্ধ কোনো সংগঠন ক্যাম্পাসে বা অনলাইনে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করলে নজরদারিতে রাখা হবে। প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’




