প্রতিষ্ঠার পর নতুন করে কোনো আবাসিক হল নির্মাণ না করায় প্রতিষ্ঠার ১৭ বছর পরেও আবাসন সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি)। ফলে তীব্র আবাসন সংকটে ভুগছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ৭ হাজার ৪৩০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে তিনটি আবাসিক হলে আবাসিক সুবিধা পাচ্ছেন ৮৩০ শিক্ষার্থী, যার মধ্যে 'বিজয় ২৪ হলে থাকেন ২৪০ শিক্ষার্থী, শহীদ মুখতার ইলাহী হলে ২৪০ শিক্ষার্থী এবং শহীদ ফেলানী হলে ৩৫০ শিক্ষার্থী। অবশিষ্ট ৬ হাজার ৬০০ শিক্ষার্থী মেস বা বাসা ভাড়া নিয়ে তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়টির আবাসিক হলের সিট সংখ্যা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়টিতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর মাত্র ১১ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা পেয়ে থাকেন, যা প্রতি ৯ জন শিক্ষার্থীর জন্য ১টি সিট।
বিশ্ববিদ্যালয়টির অনেক শিক্ষার্থীর কাছে আবাসিক হলে ওঠার স্বপ্ন যেন স্বপ্নই থেকে যায়। ছাত্রজীবন শেষ হয়ে গেলেও আবাসিক হলে থাকার সুযোগ পান না তারা। আবাসিক হলে শিক্ষার্থীরা সিট না পাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে মেস ও বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে হয় তাদের। খরচ বাঁচাতে মেসে গাদাগাদি করে থাকেন অনেক শিক্ষার্থীই। এতে বাড়ছে শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্যঝুঁকি।
আবার অনেকেই বাড়ি থেকে নিয়মিত ক্লাস করতে আসেন ক্যাম্পাসে। এতে তারা নিয়মিত যাতায়াতের ভোগান্তির শিকার হন। আবাসিক হলে সিট না পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে যে নারী শিক্ষার্থীরা বাসা বা মেসে থাকছে তারা নিয়মিতই নানাভাবে শারীরিক ও মানসিক হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে সুবিধা না পেয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতি মাসে গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। সেই টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছেন শিক্ষার্থী ও শিক্ষার্থীর পরিবার।
ভোগান্তির কথা জানিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের ১৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী হুমাইরা আনিসা বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিন ধরে চলমান আবাসন সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও সেই অনুপাতে আবাসিক সুবিধা সম্প্রসারিত হয়নি। ফলে আমরা বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী হলে আসন না পেয়ে বাইরে উচ্চ ভাড়ায় অনিরাপদ পরিবেশে থাকতে বাধ্য হচ্ছি। তাই শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম, নিরাপত্তা ও মানসিক স্বস্তি নিশ্চিত করতে দ্রুত নতুন আবাসিক হল নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান হলসমূহের আসনসংখ্যা বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি।’
মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী ইউনুস রাতুল বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সংকটের শেষ নেই! অনেকে হয়তো বলবেন একটা বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ণাঙ্গভাবে গড়ে উঠতে সময়ে প্রশ্নটা হচ্ছে সেই সময়টা কত? প্রতিষ্ঠার ১৮তম বছর পূর্ণ হতে চলছে আমাদের প্রাণের বিদ্যাপীঠ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। অথচ দুঃখের বিষয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর নতুন করে আর গড়ে ওঠেনি আবাসিক হল, নতুন একাডেমিক ভবন, মিলনায়তন। স্বাধীনতা স্মারকের কাজটাও অসম্পূর্ণই রয়ে গেছে। বর্তমান সময়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে আমাদের সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিড়ম্বনার শেষ নেই।’
তিনি আরও জানান, মেস খরচও হুহু করে বাড়ছে; যা একজন মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীর জন্য বেশ কষ্ট সাধ্যও বটে। একমাত্র আবাসিক সংকট নিরসন করে এই কষ্ট লাঘব করা যেতে পারে।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ইয়ামিন বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে তীব্র আবাসন সংকট রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অল্প কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থী আবাসন সুবিধা পাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করার পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। আমরা চাই আগামী ছয় মাসের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হোক। আবাসিক সুবিধা না থাকার কারণে শিক্ষার্থীদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয়। মেসে থাকলে নারী শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকেন।আমাদের দাবি হচ্ছে আগামী ছয় মাসে পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করতে হবে।’
এ ছাড়া বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবিরের সভাপতি সুমন সরকার বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শিক্ষার্থীরা আবাসন সংকটে ভুগছে। যদি এই সংকট না থাকত, তবে বিশেষ করে দরিদ্র ও অসহায় শিক্ষার্থীদের জন্য তা অনেক সহায়ক হতো। আমাদের জন্য দুঃখজনক যে নির্মাণাধীন হলটির নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করা হোক। আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই আবাসন সংকটের দিকে গুরুত্বসহকারে নজর দিক এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুক।
বেরোবি উপাচার্য প্রফেসর ড. শওকাত আলী এশিয়া পোস্টকে বলেন, আবাসন সংকট এই বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের অন্যতম সমস্যা। তবে আমরা এই সংকট দ্রুত কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি। আগামী রোববার বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ হাজার ৯০ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের প্রজেক্ট জমা দেওয়া হবে। আমরা আশা করছি, আগামী একনেক সভায় আমাদের মেগা প্রকল্পের বাজেট পাস হলে আগামী জুলাইয়ে কাজ শুরু হতে পারে। এ ছাড়া দীর্ঘদিন নির্মাণকাজ বন্ধ থাকা আমাদের ১০ তলাবিশিষ্ট ছাত্রী হলের ৫ তলার নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু করা হয়েছে। সেই হলের নির্মাণকাজ শেষ হলে ছাত্রীদের একটি বড় অংশ আবাসিক সুবিধা পাবেন।




