রাজধানীসহ পুরো দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর গলি কিংবা সড়কে দিন দিন বাড়ছে অবৈধ অটোরিকশার দৌরাত্ম্য। দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে যাত্রীদের কাছেও পছন্দের বাহন এটি। কিন্তু সড়কে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির পেছনে এই অবৈধ অটোরিকশার প্রভাব ব্যাপক। এ ছাড়া দুর্ঘটনার বড় অংশজুড়ে রয়েছে মোটরসাইকেল। বেপরোয়া গতি ও অতিরিক্ত আরোহী নিয়ে ভ্রমণ করার কারণে সারা দেশে এ দুর্ঘটনার হার অনেক বেশি।
এবার ঈদুল ফিতরের ছুটিতে এসব যানবাহনের দুর্ঘটনার হার বেড়েছে। ঈদের দিন (২১ মার্চ) থেকে আজ সোমবার (২৩ মার্চ) পর্যন্ত আহত ৬৮৭ জন জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর) পঙ্গু হাসপাতালে এসেছেন চিকিৎসা নিতে। এর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে ৪২৮ জন। যাদের বেশির ভাগই অটোরিকশার সঙ্গে সংঘর্ষে আহত।
সরেজমিনে রাজধানীর পঙ্গু (নিটোর) হাসপাতালে গেলে দেখা যায়, ২৬ নম্বর বেডে চিকিৎসা নিচ্ছেন শিকদার ইউসুফ (২০)। মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে তার বুড়ো আঙুল পুরো কেটে পড়ে গেছে।
ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে আসা ইউসুফ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ঈদের দিন অটোরিকশা ধাক্কা দিয়েছে। কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ সামনে এসে পড়ে। অটোরিকশার কারণেই আমার এ অবস্থা।’

শিশু নুসাইবার বয়স আট বছর। নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকার কুশিয়ারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে সে। মৃত মোক্কারমের একমাত্র কন্যা নুসাইবা ঈদের দিন বড় ভাই ও মায়ের সঙ্গে অটোরিকশায় করে ঘুরতে বেরিয়েছিল। হঠাৎ অন্য একটি অটোরিকশার সঙ্গে সংঘর্ষে নুসাইবার ডান পায়ের ছোট আঙুল ছিলে যায়। সেও পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে।
ঈদের নামাজ আদায় করে বাইক নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছিলেন মোহাম্মদ রাজু (২২)। হঠাৎ উল্টো দিক থেকে অটোরিকশা তার সামনে এসে পড়লে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে যান। তার পায়ের ওপর দিয়ে চলে যায় অটোরিকশা। এতে ডান পায়ের হাড় ভেঙে যায়। পরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ওই স্থানে রড লাগানো হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলা থেকে এসে ভর্তি হয়েছেন তিনি।
বিজয় ইসলাম (২১) ঈদের দিন মোটরসাইকেল নিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চলাচল করছিলেন। ফাঁকা সড়কে মোটরসাইকেলের গতি ছিল অনেক বেশি। হঠাৎ একটি অটোরিকশা মোড় (ইউটার্ন) নিতে যায়। কিন্তু গতির কারণে তিনি বাইক নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। পরে তার পা ভেঙে যায়।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থেকে আসা বিজয় ইসলাম বলেন, ‘অটোরিকশা কোনো কারণ ছাড়াই ডানে মোড় নিয়েছে। আমার বাইকের গতি অনেক বেশি ছিল, তাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। পরে সড়কের আইল্যান্ডে বাইক ধাক্কা লেগে আমার পা ভেঙে যায়।’

নতুন মোটরসাইকেল নিয়ে বান্ধবীর সঙ্গে বের হয়েছিলেন এক তরুণ (২১)। তার মোটরসাইকেলের গতি বেশি ছিল। হঠাৎ সামনে পড়ে অটোরিকশা। এ সময় মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ করলে তার বান্ধবী সড়কে ছিটকে পড়েন। আর অটোরিকশার ওপর আছড়ে পড়েন তরুণ। এতে তরুণের হাত-পা ভাঙার পাশাপাশি ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি কেটে পড়ে গেছে। অন্যদিকে তরুণীর ডান পায়ের হাড় ভেঙে যায়। লক্ষ্মীপুর থেকে আসা তরুণ এখন পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি আর তরুণী বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছেন।
পঙ্গু হাসপাতালের যুগ্ম পরিচালক ডা. মো. মোজাফফর হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ঈদের দিন থেকে আজ পর্যন্ত নিটোরে রোগী এসেছে ৬৮৭ জন। এর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগী ৪২৮ জন। যাদের মধ্যে অনেকেই অটোরিকশার সংঘর্ষে আহত। যদিও আমরা সেই সংখ্যা আলাদাভাবে নির্বাচন করিনি। আর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়ে এসেছেন ১৯৩ জন। এখনো হাসপাতালে ভর্তি আছে ২৪১ জন।
তিনি আরও বলেন, তাদের মধ্যে অনেকের অবস্থাই গুরুতর। অনেকের পা কেটে ফেলতে হয়েছে। এমন অনেক তরুণ আছেন, যারা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। রয়েছে শিশু ও তরুণ-তরুণী।
পরামর্শ দিয়ে ডা. মো. মোজাফফর হোসেন বলেন, ঈদের আনন্দ উদযাপন করতে গিয়ে নিজের জীবন বিপন্ন করবেন না। ফাঁকা সড়ক পেলেই গতি বাড়িয়ে মোটরসাইকেল চালাবেন না। মাথা ঠান্ডা রেখে সাবধানতার সাথে চলাচল করুণ।'




