ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
নির্বাচন সর্বশেষ
Live Icon ●LIVE

হাজিদের তালবিয়ায় মুখরিত মক্কা

মাহদি হাসান

  ২৩ মে ২০২৫, ০০:০০

পবিত্র হজে লাখো হাজির কণ্ঠে মুখরিত ধ্বনি ‘তালবিয়া’ নামে পরিচিত। তালবিয়া হচ্ছে—‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নিয়মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাকা’, অর্থ: ‘আমি উপস্থিত হে আল্লাহ! আমি উপস্থিত, আমি উপস্থিত, আপনার কোনো শরিক নাই, আমি উপস্থিত; নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা ও সকল নিয়ামত আপনারই, আর রাজত্বও আপনার; আপনার কোনো শরিক নাই।’ হজের সময় এই তালবিয়া পাঠ করা জরুরি। তালবিয়া মুখে উচ্চারণ করে পড়া শর্ত। মুখে না বলে যদি কেউ অন্তরে (মনে মনে) বলে, তবে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। বোবা হলে যদি সম্ভব হয় তবে তালবিয়া পড়ার অনুকরণে ঠোঁট ও জিহ্বা নাড়াবে। তালবিয়া একবার পড়া শর্ত, তিনবার করে পড়া মুস্তাহাব। তালবিয়া পড়ার মধ্যে কথা বলবে না, তবে সালামের উত্তর দিতে পারবে। অবশ্য তালবিয়া পাঠকারীকে সালাম দেয়া মাকরুহ। এ ছাড়া তালবিয়ার ওই শব্দগুলোই পড়া সুন্নত, কিন্তু কেউ যদি ইহরামের নিয়তের পর তালবিয়া না পড়ে আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, অথবা অন্য কোনো জিকির পড়ে, তবে তা তালবিয়ার স্থলাভিষিক্ত হয়ে যাবে এবং এর দ্বারাও তার ইহরাম পূর্ণ হয়ে যাবে। কিন্তু যদি ইহরামের নিয়তের পর তালবিয়া অথবা অন্য কোনো জিকির না পড়ে মিকাত অতিক্রম করে, তবে তার ওপর দম ওয়াজিব হবে।

পরিবর্তন অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

পুরুষের জন্য তালবিয়া উচ্চৈঃস্বরে পড়া মুস্তাহাব। কিন্তু আওয়াজ বেশি উচ্চ করবে না এবং চিৎকার করেও বলবে না। এত উচ্চ আওয়াজে পড়া নিষেধ, যার দ্বারা নিজের বা অন্যের কিংবা ঘুমন্ত ব্যক্তির কষ্ট হয়, অথবা নামাজি ও তাওয়াফকারীর মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটে। এ ছাড়া কয়েকজন মিলে সুর ধরে একসঙ্গে তালবিয়া না পড়ে প্রত্যেকেই ভিন্ন ভিন্নভাবে তালবিয়া পড়বে। মহিলাদের জন্য উচ্চ আওয়াজে তালবিয়া পড়া নিষেধ। কাজেই মহিলারা অনুচ্চ আওয়াজে তালবিয়া পড়বে, যেন পরপুরুষের কানে আওয়াজ না পৌঁছে। তালবিয়া তিনবার করে পড়া মুস্তাহাব। তালবিয়া অধিক পরিমাণে পড়া এবং যখনই পড়বে তিনবার করে পড়া মুস্তাহাব। সফরের সময় অধিক পরিমাণে তালবিয়া পড়বেন। বিশেষত ফরজ নামাজের পর, সকালে, সন্ধ্যায়, ঘুমানোর সময়, ঘুম থেকে জেগে, বাইরে যাওয়ার সময়, ভেতরে প্রবেশের সময়, কারও সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে, গাড়িতে ওঠার সময়, গাড়ি থেকে নামার সময়, ওপরে ওঠার সময় ও ওপর থেকে নামার সময় তালবিয়া পড়া মুস্তাহাব।

হাদিস শরিফে বর্ণিত তালবিয়ার শব্দগুলো থেকে কোনো শব্দ কম করা মাকরুহ, অবশ্য ওই শব্দগুলোর শেষে কিছু শব্দ বাড়িয়ে বলা যেতে পারে, তবে হাদিসে বর্ণিত ওই শব্দগুলোর মাঝে কোনো শব্দ বাড়ানো ঠিক নয়। ওমরাহর মধ্যে তাওয়াফের জন্য ‘ইসতিলাম’ অর্থাৎ হাজরে আস্তয়াদে চুমু দেওয়া বা ইশারা করার পূর্ব পর্যন্ত তালবিয়া পড়া যায়। ইসতিলাম শুরুর আগেই তালবিয়া পড়া বন্ধ করতে হবে। আর হজের মধ্যে ১০ জিলহজ রামি বা কংকর নিক্ষেপের আগেই তালবিয়া পড়া বন্ধ করে দিতে হবে। অবশ্য যদি কেউ সূর্যাস্ত পর্যন্ত রামি না করে, তবে সূর্যাস্তের পর আর তালবিয়া পড়বে না। আর যদি কেউ ইহরামের পর বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ওমরাহ বা হজের উদ্দেশ্যে যেতে না পারে, তবে সে তার পক্ষ থেকে হারামের সীমানার ভেতরে ‘হাদি’ বা পশু জবাই করা পর্যন্ত তালবিয়া পড়তে পারবে, পশু জবাই হলেই তালবিয়া পড়া বন্ধ করে দিতে হবে।

লেখক: মাদ্রাসা শিক্ষক

ক্ষুধা ও মৃত্যুর নগরী গাজা
ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী ছোট গাজা শহরে ক্ষুধা ও মৃত্যু ছাড়া আর কিছু নেই। সকাল থেকে সন্ধ্যা এবং সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত গাজা শহরের মানুষ দেখে শুধু ক্ষুধা ও মৃত্যু। দেখে বোমার লেলিহান শিখা ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী, মানুষের প্রবাহিত রক্ত ও ক্ষুধার যন্ত্রণায় শুকিয়ে যাওয়া শরীরের খুলি। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, গাজা এই মুহূর্তে আধুনিক যুগের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। কারণ অবরোধ এখনো চলমান, পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও খাদ্যসহায়তা ঢুকতে পারছে না এবং উদ্বাস্তুদের অবস্থানেও বেসামরিক জনগণের ওপর হামলা অব্যাহত রয়েছে।গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ১৮ মার্চ থেকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজা উপত্যকার ওপর নতুন করে আগ্রাসন শুরু করার পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার ফিলিস্তিনি শহীদ হয়েছে এবং সাড়ে নয় হাজার আহত হয়েছে। ২০ মার্চ মন্ত্রণালয় আরও জানায়, এ সময়ের মধ্যে ইসরায়েলি বিমান হামলা লক্ষ্যবস্তু করেছে স্কুলগুলোকে, যেখানে উদ্বাস্তুরা আশ্রয় নিয়েছিল; জাতিসংঘের ‘ইউএনআরডব্লিউএ’ সংস্থার শরণার্থী কেন্দ্র ও জনবহুল আবাসিক এলাকাগুলোকেও। এসব হামলায় ভয়াবহ গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, বিশেষ করে গাজা শহর ও মধ্যাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া আগ্রাসনের পর থেকে এখন পর্যন্ত শহীদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৪ হাজার এবং আহতের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার জন। মন্ত্রণালয় আরও জানায়, বর্তমানে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে নিখোঁজ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের অনেকেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে শহীদ হয়েছে আর বাকিদের খবর পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না; কারণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এবং বহু বিপর্যস্ত এলাকায় পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন। সীমিত সম্পদের মধ্যেই কাজ করে চলেছে সিভিল ডিফেন্স ও অ্যাম্বুলেন্স টিমগুলো—চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, পুরো গাজা উপত্যকার অধিকাংশ এলাকায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে এবং ৮০ শতাংশেরও বেশি হাসপাতাল সেবার বাইরে চলে গেছে। ৬৪ দিন ধরে চলা লাগাতার বোমাবর্ষণ ও ধ্বংসযজ্ঞে সাধারণ মানুষের ওপর চালানো অপরাধের ভয়াবহতা তুলে ধরে গাজার সাংবাদিক ও কবি নুর আল-আসির লিখেছেন—দুঃখ, অনাহার ও জবরদস্তি নির্বাসনের ক্লান্তি তাকে বিদায়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছে, কিন্তু তার আগে তিনি বিশ্ববাসীর কাছে আহ্বান জানাচ্ছেন গাজার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর। নুর আরও লিখেছেন, আজ গাজা শুধু বোমা ও গুলির দ্বারা নয়, ক্ষুধার দ্বারাও অবরুদ্ধ। ইসরায়েল যখন থেকে গাজার ভেতরে মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা দেয়, তখন থেকেই তার ক্ষীণ জীবনের আশাটুকুও একে একে নিঃশেষ হতে থাকে। এখানে মানুষ আবর্জনার স্তূপের মধ্যে ঘুমায়; নেই পরিষ্কার পানি, নেই কার্যকর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা বা ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধিও। ফলে রোগ ছড়াচ্ছে, ক্ষুধায় জর্জরিত শিশুরা মারা যাচ্ছে ডায়রিয়া, হেপাটাইটিস-এ এবং চর্মরোগে। নুর আল-আসির বলেন, সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির পতনের পর থেকে তিনি আরও কঠোর পরিশ্রম করছেন, চূড়ান্ত প্রতীকূল পরিস্থিতিতেও তিনি প্রতিবেদন তৈরি করতে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। প্রায়ই তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে কিংবা ঠান্ডা বাতাসে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, সেসব পরিবারের সাক্ষাৎকার নিতে, যাদের পৃথিবী সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে। নুর জানিয়েছেন, মেয়াদোত্তীর্ণ টিনজাত খাবার খাওয়ার ফলে তার হজমপ্রণালিতে সমস্যা হয়েছে। চিকিৎসক তার পায়ের তীব্র ব্যথার কারণ হিসেবে ‘সিডিমেন্টেশন রেট বেড়ে যাওয়া’কে দায়ী করেছেন, যা দাঁড়িয়ে থাকা, অপুষ্টি ও চিকিৎসাহীনতার ফলে বেড়েছে। কারণ এখানে ওষুধ ও ভিটামিনেরও অভাব; অর্থাৎ আরোগ্য হওয়া কার্যত অসম্ভব। প্রতিদিনই ইসরায়েল গাজা ত্যাগে বাধ্য করছে। তারা চায় গাজার মানুষ নিজের ভিটেমাটি, স্বপ্ন, শিকড় ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের অতীত আশ্রয় ভুলে যাক। এখন এমন অবস্থায় পৌঁছেছি যে, অনেকে ফিলিস্তিনের কথা ভাবলেই মনে পড়ে ক্ষুধার যন্ত্রণা, দুর্ভিক্ষ, জানাজার মিছিল আর অপমান। গাজার মানুষের অভিজ্ঞতা শুধু মানবিক বিপর্যয় নয়, বরং এটি একবিংশ শতাব্দীর মানুষের তৈরি ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এবং প্রকাশ্যে দিনের আলোয় সংঘটিত নিষ্ঠুর গণহত্যা। * আলজাজিরা আরবি অবলম্বনে
ক্ষুধা ও মৃত্যুর নগরী গাজা
মাতৃত্বের মর্যাদা ও পুরস্কার
ইসলামে মায়ের প্রতি ঘোষণা করা হয়েছে বিশেষ মর্যাদা ও পুরস্কার। মাসের পর মাস সন্তান বহন, ধৈর্য, সন্তান প্রসব, স্তন্যদানসহ অসহনীয় কিছু কষ্ট বহন করতে হয় নারীদের। পৃথিবীর সৃষ্টিলগ্ন থেকে যুগে যুগে নারীরা মধুর এ কষ্ট স্বীকার করে দায়িত্ব পালন করে আসছে। ভবিষ্যতেও তাদের এ দায়িত্ব পালন করতে হবে। এটি আল্লাহতায়ালা প্রদত্ত জীবন বিধান। গর্ভধারণ এবং দীর্ঘ দশ মাস দশ দিন গর্ভের কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতাসম্পন্ন হিসেবে আল্লাহতায়ালা নারী জাতিকে সৃষ্টি করেছেন। এভাবে সৃষ্টিগতভাবে নারীর দৈহিক গঠনে জুড়ে আছে গর্ভধারণক্ষমতা। গর্ভধারণক্ষমতা শুধু নারীদের মধ্যে সীমাবব্ধ নয়, বরং পশুপাখি, কীটপতঙ্গ, প্রাণিকুলের সর্বত্রে আল্লাহর এ বিধান কার্যকর রয়েছে। গর্ভধারণের কঠিন দায়িত্ব পালনের কারণে নারীরা মাতৃত্বের মহা মর্যাদায় সমাসীন হয়েছে। মায়ের মর্যাদা সন্তানের কাছে পিতার তুলনায় তিনগুণ বেশি বলার এটাই অন্যতম কারণ। মাতৃত্বের বিশেষ ফজিলত ও মর্যাদা সম্পর্কে হাদিসে বিস্তারিত পাঠ রয়েছে। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজি (সা.)-এর পুত্র ইব্রাহিমের দুধমাতা সালামা (রা.)-কে নবীজি (সা.) বলেছিলেন—তোমরা নারীরা কি এতে খুশি নও যে, যখন কোনো নারী তার স্বামীর পক্ষ থেকে গর্ভধারিণী হয় আর স্বামী তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন, তখন সে আল্লাহর জন্য সর্বদা রোজা পালনকারী ও সারা রাত নফল ইবাদতকারীর মতো সওয়াব পেতে থাকবে? তার যখন প্রসব ব্যথা শুরু হয় তখন তার জন্য নয়ন জুড়ানো কী কী নেয়ামত লুকিয়ে রাখা হয়, তা আসমান জমিনের কোনো অধিবাসীই জানে না। সে যখন সন্তান প্রসব করে তখন তার দুধের প্রতিটি ফোঁটার বিনিময়ে একটি করে নেকি দেওয়া হয়। এ সন্তান যদি কোনো রাতে তাকে জাগিয়ে রাখে (কান্নাকাটি করে মাকে বিরক্ত করে ঘুমুতে না দেয়) তাহলে সে আল্লাহর জন্য নিখুঁত সত্তরটি গোলাম আজাদ করার সওয়াব পাবে।’ (মুজামু তাবরানি: ৬৯০৮; মাজমাউজ জাওয়ায়েদ: ৪/৩০৫)। সন্তান যখন মায়ের গর্ভে থাকে, তখন ভ্রূণ অবস্থা থেকেই মায়ের যাপিত জীবনের চলাফেরায়, ওঠাবসায়, সাংসারিক কাজকর্মে, প্রতিটি পদক্ষেপে অবর্ণনীয় ধকল বহন করতে হয়। একজন মায়ের এ অবর্ণনীয় কষ্টের কথা কোরআনে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, ‘সন্তানের মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট সয়ে পেটে বহন করেছে।’ (সুরা লুকমান: ১৪) নারীর আরেকটি প্রধান দায়িত্ব হলো সন্তান প্রসব করা। প্রসবকালে একজন নারীকে রক্তাক্ত ও ক্ষত-বিক্ষত করে আরেকটি মানব সন্তান পৃথিবীর আলো-বাতাস দেখতে পারে। সন্তানকে পৃথিবীতে আনতে কখনো কখনো মা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। তারপরও এ তীব্র যন্ত্রণাকে তুচ্ছ করে মা শুধু দেখতে চায় তার নবজাত শিশুর মায়াবী মুখখানি। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তার মা তাকে খুব কষ্ট করে পেটে ধারণ করেছে, খুব কষ্টে প্রসব করেছে এবং গর্ভধারণ থেকে দুধপান পর্যন্ত ত্রিশ মাস অতিবাহিত করেছে।’ (সুরা আহকাফ: ১৫)। নারীর গর্ভধারণের কষ্ট চিন্তা করে তার প্রাপ্য মর্যাদায় সমাসীন করা পুরুষদের দায়িত্ব। আর নারীরা আল্লাহপ্রদত্ত এ অমোঘ নীতি—গর্ভধারণের গৌরব অন্তরে ধারণ করে অপরিসীম ফজিলত ও সওয়াবের অধিকারী হবেন। লেখক: মাদ্রাসা শিক্ষক
মাতৃত্বের মর্যাদা ও পুরস্কার
স্মরণীয় মুসলিম মনীষী
ইমাম তিরমিজি (রহ.) ইসলামী জ্ঞানবিশ্বের একজন বিশিষ্ট হাদিস বিশারদ, যিনি সহিহ হাদিস সংগ্রহ ও সংকলনের ক্ষেত্রে অনন্য অবদান রেখেছেন। তার পূর্ণ নাম ছিল আবু ঈসা মুহাম্মদ ইবনে ঈসা ইবনে সাওরাহ ইবনে মুসা আত-তিরমিজি। তিনি হিজরি ২০৯ সালে (খ্রিষ্টীয় ৮২৪ সাল) বর্তমান উজবেকিস্তানের তিরমিজ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার নামের সঙ্গে ‘তিরমিজি’ উপাধিটি যুক্ত হয়েছে তার জন্মস্থান তিরমিজের নাম অনুসারে। ইমাম তিরমিজি (রহ.) শৈশবেই জ্ঞানার্জনের প্রতি গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন। অল্প বয়সেই কোরআন মুখস্থ করেন এবং শরিয়ত, তাফসির ও হাদিসশাস্ত্রে দীক্ষা নিতে শুরু করেন। হাদিস শিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি ইরাক, হিজাজ, খোরাসান ও মাওয়ারাউন নাহরসহ বহু অঞ্চল সফর করেন। তিনি এমন এক যুগে জন্মেছিলেন, যখন হাদিস সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রটি এক বৈপ্লবিক পর্যায়ে পৌঁছেছিল। ইমাম বোখারি, ইমাম মুসলিম, ইমাম আবু দাউদ, ইমাম নাসায়ী প্রমুখ তার সমসাময়িক আলেম ছিলেন, যাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, ইমাম তিরমিজি ইমাম বোখারির একজন প্রধান ছাত্র ছিলেন এবং তাকে তিনি গুরুতুল্য সম্মান দিতেন। ইমাম বোখারিও তার প্রতিভার গভীর প্রশংসা করেছিলেন। বলা হয়, তিনি যখন কোনো বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করতেন, তখন ইমাম বোখারির শরণাপন্ন হতেন। ইমাম তিরমিজি সমকালীন তিন প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিসের শিষ্যত্ব অর্জনের সৌভাগ্য লাভ করেন—ইমাম বোখারি, ইমাম মুসলিম, ইমাম আবু দাউদ। ফলে ইমাম তিরমিজির হাদিস সংকলনে এই তিন ইমামের সারনির্যাস সংরক্ষিত হয়েছে। ইমাম তিরমিজির শ্রেষ্ঠ কীর্তি তার সংকলিত হাদিসগ্রন্থ ‘আল-জামিউত তিরমিজি’, যা সুনানে তিরমিজি নামেও পরিচিত। এটি হাদিসশাস্ত্রের প্রসিদ্ধ ‘সিহাহ সিত্তাহ’ (ছয়টি সহিহ হাদিসগ্রন্থ)-এর অন্যতম। এ গ্রন্থের বৈশিষ্ট্য হলো, এতে তিনি হাদিস বর্ণনা করার পাশাপাশি সনদের মান (সহিহ, হাসান, জায়িফ) উল্লেখ করেছেন এবং বিভিন্ন মাজহাব ও ফকিহদের মতামতের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেছেন। তিনিই সর্বপ্রথম ‘হাসান’ (সুন্দর, গ্রহণযোগ্য) হাদিস শ্রেণিকে নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করেন, যা পরবর্তী হাদিসবিদ্যার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হয়। তার অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে ‘শামায়েলু মুহাম্মদিয়া’ (শামায়েলে তিরমিজি) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ বইয়ে তিনি রাসুল (সা.)-এর চারিত্রিক ও বাহ্যিক সৌন্দর্য, চালচলন, পোশাক, আচার-আচরণ ইত্যাদি বর্ণনা করেছেন হৃদয়স্পর্শী ভঙ্গিতে। আজও এ গ্রন্থ মুসলিম বিশ্বের হৃদয়ে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ইমাম তিরমিজি একজন সাধক, পরহেজগার ও দৃষ্টিশক্তিহীন (জীবনের শেষভাগে) আলেম ছিলেন। বলা হয়, হাদিসচর্চা করতে করতে তিনি অন্ধ হয়ে যান, তবে তাতে তার জ্ঞান সাধনায় বিঘ্ন ঘটেনি। তিনি ছিলেন বিনয়ী, মেধাবী ও গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন একজন আলেম। ইমাম তিরমিজি (রহ.) হিজরি ২৭৯ সালে (খ্রিষ্টীয় ৮৯২ সাল) ইন্তেকাল করেন। তার সমাধি উজবেকিস্তানের তিরমিজ অঞ্চলে অবস্থিত, যা আজও মুসলিম জাহানে শ্রদ্ধার কেন্দ্র হিসেবে পরিগণিত। ইমাম তিরমিজি ছিলেন এমন এক আলোকবর্তিকা, যিনি হাদিসশাস্ত্রকে শুধু সংরক্ষণই করেননি, বরং একটি পদ্ধতিগত বিশ্লেষণধর্মী ধারার সূচনা করেছিলেন, যার প্রভাব ও কল্যাণ আজও বিদ্যমান।
স্মরণীয় মুসলিম মনীষী
পাপের ভারে প্রকৃতিতে বিপর্যয় ঘটে
পৃথিবীর বুকে যত বিপর্যয় ও দুর্যোগ সৃষ্টি হয়, তার জন্য প্রধানত দায়ী মানুষের সীমাহীন পাপ ও সীমালঙ্ঘন। প্রকৃতিতে মানুষের অন্যায় হস্তক্ষেপ ও ধ্বংসযজ্ঞের কারণে যেমন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়, তেমনি নৈতিক অধঃপতন ও গুনাহের কারণে সমাজের সুন্দর পরিবেশ নষ্ট হয়। ভালো কাজের সুফল যেভাবে আমরা ভোগ করি, একইভাবে মন্দ কাজের ফলে আমাদের ভুগতে হয় নানা দুর্ভোগ। ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় কিংবা বৈশ্বিক পর্যায়ের ক্ষেত্রেও এটি সত্য। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ সব বিপর্যয়ের জন্য মানুষের কৃতকর্মকেই দায়ী করেছেন—সেটা হোক জাগতিক অন্যায়-অনাচার কিংবা গুনাহ-পাপাচার। আল্লাহ মানুষকে সবসময় পাকড়াও করেন না। তাকে শোধরানোর সুযোগ দেন। তবে তারা যখন সীমালঙ্ঘন করে, তখনই তিনি পাকড়াও করেন। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমাদের যে বিপদাপদ ঘটে, তা তো তোমাদের কর্মফল। আমি তোমাদের অনেক অপরাধ ক্ষমা করে থাকি।’ (সুরা শুআরা, আয়াত: ৩০)। পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টির মাধ্যমে আল্লাহ মানুষকে সতর্ক করেন এবং আখেরাতের মহা শাস্তির ব্যাপারে সাবধান করেন, যাতে তারা জুলুম ও পাপাচার থেকে বিরত থাকতে পারে। আল্লাহ বলেন, ‘স্থলে ও জলে মানুষের কৃতকর্মের কারণেই বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাদের নিজেদের কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা (আল্লাহর পথে) ফিরে আসে।’ (সুরা রুম, আয়াত: ৪১)। মানবতার মুক্তির দিশারি হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ছোট-বড় যত দুর্ভোগ বা হয়রানি বান্দার ওপর আপতিত হয় সবই নিজ কর্মদোষে। আর অধিকাংশই আল্লাহ ক্ষমা করে দেন।’ (বোখারি)। আল্লাহতায়ালার অবাধ্য হয়ে আমাদের পূর্ববর্তী অনেক জাতি ও জনপদ ধ্বংস হয়েছে। যেমন, সাবাবাসীদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘সাবার অধিবাসীদের জন্য তাদের বাসভূমিতে ছিল এক নিদর্শন। দুটি উদ্যান, একটি ছিল ডানদিকে অন্যটি বামদিকে। (তাদের বলা হয়েছিল) তোমরা তোমাদের রবের দেওয়া খাদ্য খাও এবং তার শুকরিয়া আদায় করো। এটা ছিল উত্তম শহর এবং তোমাদের প্রতিপালক ক্ষমাশীল। এরপর তারা অবাধ্যতা করল। ফলে আমি তাদের প্রতি বাঁধভাঙা বন্যা প্রবাহিত করলাম এবং তাদের উদ্যান দুটি পরিবর্তন করে দিলাম এমন দুটি উদ্যানে—যাতে উদগত হয় বিস্বাদ ফলমূল, ঝাউগাছ এবং কিছু কুলগাছ। এটা ছিল কুফরের কারণে তাদের প্রতি আমার শাস্তি। আমি অকৃতজ্ঞ ছাড়া কাউকে শাস্তি দিই না।’ (সুরা সাবা, আয়াত: ১৫-১৭)। ভূমিকম্প সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আপনি বলে দিন, আল্লাহ তোমাদের ওপর থেকে অথবা তোমাদের পায়ের নিচ থেকে আজাব পাঠাতে সক্ষম।’ (সুরা আনআম, আয়াত: ৬৫)। তাফসিরবিদদের মতে, এর ব্যাখ্যা হলো ভূমিকম্প। ভূমিকম্পের প্রকৃত রূপ কতটা ভয়াবহ, সে বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যখন প্রবল কম্পনে প্রকম্পিত হবে জমিন এবং চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়বে পর্বতমালা, অতঃপর তা পর্যবসিত হবে উৎক্ষিপ্ত ধূলিকণায়।’ (সুরা ওয়াকিয়া, আয়াত: ৪-৬)। তা ছাড়া মহান আল্লাহ ভূমিকম্পের মাধ্যমেই কেয়ামত সংঘটিত করবেন। এ ব্যাপারে কোরআনে সুরা জিলজাল নামে পূর্ণাঙ্গ একটি সুরা অবতীর্ণ করেছেন। জলোচ্ছ্বাস ও বন্যা সম্পর্কেও মহান আল্লাহ মানুষকে সতর্ক করেছেন। হজরত নুহ (আ.) তার জাতিকে আল্লাহর সঙ্গে নাফরমানির শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। তবু তাদের চৈতন্যোদয় হয়নি। অবশেষে আল্লাহর আজাব আসে। এক ভয়ংকর প্লাবন ও জলোচ্ছ্বাস তার জাতির অবাধ্য লোকদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এমন প্লাবন সেই জাতিকে গ্রাস করেছিল, যেই প্লাবন হাজার বছর ধরে পৃথিবীতে ইতিহাস হয়ে আছে। তখন নুহ (আ.)-এর নৌকায় যারা আশ্রয় নিয়েছিল তারাই রক্ষা পেয়েছিল। আল্লাহ বলেন, ‘আমি তার (নুহের) বংশধরদের অবশিষ্ট রেখেছি বংশপরম্পরায়।’ (সুরা সাফফাত, আয়াত: ৭৭)। হজরত নুহ (আ.)-এর কওম আল্লাহর হুকুম অমান্য করে দেব-দেবীর পূজা করত। তারা আল্লাহতায়ালার অবাধ্যতার চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। তখন আল্লাহ অসন্তুষ্ট হয়ে তাদের প্রতি মহাপ্লাবন নাজিল করেন এবং সেই প্লাবনে নিমজ্জিত করে তাদের ধ্বংস করে দেন। কিন্তু নুহ (আ.)-এর অল্পসংখ্যক অনুসারীকে আল্লাহ মহাপ্লাবন থেকে হেফাজত করেন। হজরত হুদ (আ.)-এর সম্প্রদায়ও একই অপরাধে অপরাধী ছিল। তাদের আল্লাহতায়ালা প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড়ে ধ্বংস করে দেন। হজরত শোয়াইব (আ.)-এর গোত্র ওজনে কম দিত। এ ব্যাপারে তারা সীমালঙ্ঘন করলে আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দেন। হজরত লুত (আ.)-এর গোত্র সমকামিতায় লিপ্ত হতো। তারা যখন এই অপরাধের চরম সীমায় পৌঁছে গেল, তখন তাদের ভূমিকম্প ও পাথর বর্ষণে ধ্বংস করে দেন এবং নিরপরাধীদের রক্ষা করেন। এরকম অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে যাদের আল্লাহতায়ালা বিভিন্ন অপরাধের কারণে ধ্বংস করে দেন। তবে এ উম্মতে মুহাম্মদি আজাব-গজব দ্বারা সমূলে ধ্বংস হবে না, এটা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দোয়ার ফল এবং উম্মতে মুহাম্মদির বিশেষ বৈশিষ্ট্য। কিন্তু সময়ে সময়ে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপদাপদ দিয়ে সাবধান করা হবে, যা আমরা মাঝেমধ্যে লক্ষ করছি। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারা কি দেখে না যে, তারা প্রতি বছর দুয়েকবার বিপর্যস্ত হয়? এরপরও তারা তওবা করে না এবং উপদেশ গ্রহণ করে না।’ (সুরা তাওবা, আয়াত: ১২৬)। হাদিসে শরিফে আছে, পিতা-মাতা সন্তানকে যত ভালোবাসে আল্লাহতায়ালা তার বান্দাকে তার চেয়েও বেশি ভালোবাসেন। তাই কখনো কখনো মানুষের কর্মদোষে বিপদাপদ সংঘটিত হওয়া সংগত হলেও আল্লাহ দয়াপরবশ হয়ে বান্দাকে ক্ষমা করে দেন এবং বিপদ সংঘটিত করেন না। তবে ক্ষমার অযোগ্য হলে বিপদ সংঘটিত করেন। এটা সার্বভৌম ক্ষমতাধর আল্লাহতায়ালার ইচ্ছাধীন। আমাদের জানা উচিত, এ প্রকৃতির পেছনে একজন স্রষ্টা আছেন, যিনি তা নিয়ন্ত্রণ করেন। আকাশমণ্ডলে ও ভূমণ্ডলে যা আছে সবই তার আজ্ঞাবহ। যখনই তিনি কিছু করতে ইচ্ছা করেন তখন শুধু বলেন, ‘কুন—হও’ তখন সঙ্গে সঙ্গে তা হয়ে যায়। (সুরা ইয়াসিন: আয়াত ৮২)। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টিতে, তার নির্দেশে বায়ুর দিক পরিবর্তনে এবং তার কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত মেঘমালাতে জ্ঞানবান জাতির জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা বাকারা: আয়াত ১৬৪)। তাই প্লেগ, কলেরা, করোনা আল্লাহর নির্দেশেই সংঘটিত হয়েছে, তবে তা বান্দার সীমা লঙ্ঘনজনিত কর্মের জন্য সংঘটিত হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করি না যতক্ষণ না তারা নিজে নিজের অবস্থা পরিবর্তন করে।’ (সুরা রাদ: আয়াত ১১)। সুতরাং বোঝা গেল, মানুষের কর্মদোষে বিভিন্ন পাপাচারে সীমালঙ্ঘনের ফলে জলে-স্থলে বিপদাপদ নাজিল হয়। তাইতো আমাদের অতীতের কৃতকর্মের জন্য তওবা করে সংশোধন হওয়া জরুরি এবং ভবিষ্যতে যেন আমাদের মাধ্যমে এমন কোনো পাপাচার না হয়, যার জন্য আল্লাহতায়ালার ভয়াবহ শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়। কারণ সীমালঙ্ঘিত হলে যে কোনো সময় আমাদের ওপরও আল্লাহতায়ালার কঠিন আজাব আসতে পারে। আর বিচার দিবসের কাঠগড়ায় তো আমাদের অবশ্যই দাঁড়াতে হবে। আল্লাহতায়ালা আমাদের বিপদাপদ মুক্ত করুন এবং ক্ষমা করে দিন। লেখক: ইমাম ও খতিব
পাপের ভারে প্রকৃতিতে বিপর্যয় ঘটে
ক্ষুধা ও মৃত্যুর নগরী গাজা
ক্ষুধা ও মৃত্যুর নগরী গাজা
ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী ছোট গাজা শহরে ক্ষুধা ও মৃত্যু ছাড়া আর কিছু নেই। সকাল থেকে সন্ধ্যা এবং সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত গাজা শহরের মানুষ দেখে শুধু ক্ষুধা ও মৃত্যু। দেখে বোমার লেলিহান শিখা ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী, মানুষের প্রবাহিত রক্ত ও ক্ষুধার যন্ত্রণায় শুকিয়ে যাওয়া শরীরের খুলি। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, গাজা এই মুহূর্তে আধুনিক যুগের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। কারণ অবরোধ এখনো চলমান, পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও খাদ্যসহায়তা ঢুকতে পারছে না এবং উদ্বাস্তুদের অবস্থানেও বেসামরিক জনগণের ওপর হামলা অব্যাহত রয়েছে।গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ১৮ মার্চ থেকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজা উপত্যকার ওপর নতুন করে আগ্রাসন শুরু করার পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার ফিলিস্তিনি শহীদ হয়েছে এবং সাড়ে নয় হাজার আহত হয়েছে। ২০ মার্চ মন্ত্রণালয় আরও জানায়, এ সময়ের মধ্যে ইসরায়েলি বিমান হামলা লক্ষ্যবস্তু করেছে স্কুলগুলোকে, যেখানে উদ্বাস্তুরা আশ্রয় নিয়েছিল; জাতিসংঘের ‘ইউএনআরডব্লিউএ’ সংস্থার শরণার্থী কেন্দ্র ও জনবহুল আবাসিক এলাকাগুলোকেও। এসব হামলায় ভয়াবহ গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, বিশেষ করে গাজা শহর ও মধ্যাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া আগ্রাসনের পর থেকে এখন পর্যন্ত শহীদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৪ হাজার এবং আহতের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার জন। মন্ত্রণালয় আরও জানায়, বর্তমানে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে নিখোঁজ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের অনেকেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে শহীদ হয়েছে আর বাকিদের খবর পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না; কারণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এবং বহু বিপর্যস্ত এলাকায় পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন। সীমিত সম্পদের মধ্যেই কাজ করে চলেছে সিভিল ডিফেন্স ও অ্যাম্বুলেন্স টিমগুলো—চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, পুরো গাজা উপত্যকার অধিকাংশ এলাকায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে এবং ৮০ শতাংশেরও বেশি হাসপাতাল সেবার বাইরে চলে গেছে। ৬৪ দিন ধরে চলা লাগাতার বোমাবর্ষণ ও ধ্বংসযজ্ঞে সাধারণ মানুষের ওপর চালানো অপরাধের ভয়াবহতা তুলে ধরে গাজার সাংবাদিক ও কবি নুর আল-আসির লিখেছেন—দুঃখ, অনাহার ও জবরদস্তি নির্বাসনের ক্লান্তি তাকে বিদায়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছে, কিন্তু তার আগে তিনি বিশ্ববাসীর কাছে আহ্বান জানাচ্ছেন গাজার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর। নুর আরও লিখেছেন, আজ গাজা শুধু বোমা ও গুলির দ্বারা নয়, ক্ষুধার দ্বারাও অবরুদ্ধ। ইসরায়েল যখন থেকে গাজার ভেতরে মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা দেয়, তখন থেকেই তার ক্ষীণ জীবনের আশাটুকুও একে একে নিঃশেষ হতে থাকে। এখানে মানুষ আবর্জনার স্তূপের মধ্যে ঘুমায়; নেই পরিষ্কার পানি, নেই কার্যকর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা বা ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধিও। ফলে রোগ ছড়াচ্ছে, ক্ষুধায় জর্জরিত শিশুরা মারা যাচ্ছে ডায়রিয়া, হেপাটাইটিস-এ এবং চর্মরোগে। নুর আল-আসির বলেন, সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির পতনের পর থেকে তিনি আরও কঠোর পরিশ্রম করছেন, চূড়ান্ত প্রতীকূল পরিস্থিতিতেও তিনি প্রতিবেদন তৈরি করতে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। প্রায়ই তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে কিংবা ঠান্ডা বাতাসে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, সেসব পরিবারের সাক্ষাৎকার নিতে, যাদের পৃথিবী সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে। নুর জানিয়েছেন, মেয়াদোত্তীর্ণ টিনজাত খাবার খাওয়ার ফলে তার হজমপ্রণালিতে সমস্যা হয়েছে। চিকিৎসক তার পায়ের তীব্র ব্যথার কারণ হিসেবে ‘সিডিমেন্টেশন রেট বেড়ে যাওয়া’কে দায়ী করেছেন, যা দাঁড়িয়ে থাকা, অপুষ্টি ও চিকিৎসাহীনতার ফলে বেড়েছে। কারণ এখানে ওষুধ ও ভিটামিনেরও অভাব; অর্থাৎ আরোগ্য হওয়া কার্যত অসম্ভব। প্রতিদিনই ইসরায়েল গাজা ত্যাগে বাধ্য করছে। তারা চায় গাজার মানুষ নিজের ভিটেমাটি, স্বপ্ন, শিকড় ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের অতীত আশ্রয় ভুলে যাক। এখন এমন অবস্থায় পৌঁছেছি যে, অনেকে ফিলিস্তিনের কথা ভাবলেই মনে পড়ে ক্ষুধার যন্ত্রণা, দুর্ভিক্ষ, জানাজার মিছিল আর অপমান। গাজার মানুষের অভিজ্ঞতা শুধু মানবিক বিপর্যয় নয়, বরং এটি একবিংশ শতাব্দীর মানুষের তৈরি ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এবং প্রকাশ্যে দিনের আলোয় সংঘটিত নিষ্ঠুর গণহত্যা। * আলজাজিরা আরবি অবলম্বনে
মাতৃত্বের মর্যাদা ও পুরস্কার
মাতৃত্বের মর্যাদা ও পুরস্কার
ইসলামে মায়ের প্রতি ঘোষণা করা হয়েছে বিশেষ মর্যাদা ও পুরস্কার। মাসের পর মাস সন্তান বহন, ধৈর্য, সন্তান প্রসব, স্তন্যদানসহ অসহনীয় কিছু কষ্ট বহন করতে হয় নারীদের। পৃথিবীর সৃষ্টিলগ্ন থেকে যুগে যুগে নারীরা মধুর এ কষ্ট স্বীকার করে দায়িত্ব পালন করে আসছে। ভবিষ্যতেও তাদের এ দায়িত্ব পালন করতে হবে। এটি আল্লাহতায়ালা প্রদত্ত জীবন বিধান। গর্ভধারণ এবং দীর্ঘ দশ মাস দশ দিন গর্ভের কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতাসম্পন্ন হিসেবে আল্লাহতায়ালা নারী জাতিকে সৃষ্টি করেছেন। এভাবে সৃষ্টিগতভাবে নারীর দৈহিক গঠনে জুড়ে আছে গর্ভধারণক্ষমতা। গর্ভধারণক্ষমতা শুধু নারীদের মধ্যে সীমাবব্ধ নয়, বরং পশুপাখি, কীটপতঙ্গ, প্রাণিকুলের সর্বত্রে আল্লাহর এ বিধান কার্যকর রয়েছে। গর্ভধারণের কঠিন দায়িত্ব পালনের কারণে নারীরা মাতৃত্বের মহা মর্যাদায় সমাসীন হয়েছে। মায়ের মর্যাদা সন্তানের কাছে পিতার তুলনায় তিনগুণ বেশি বলার এটাই অন্যতম কারণ। মাতৃত্বের বিশেষ ফজিলত ও মর্যাদা সম্পর্কে হাদিসে বিস্তারিত পাঠ রয়েছে। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজি (সা.)-এর পুত্র ইব্রাহিমের দুধমাতা সালামা (রা.)-কে নবীজি (সা.) বলেছিলেন—তোমরা নারীরা কি এতে খুশি নও যে, যখন কোনো নারী তার স্বামীর পক্ষ থেকে গর্ভধারিণী হয় আর স্বামী তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন, তখন সে আল্লাহর জন্য সর্বদা রোজা পালনকারী ও সারা রাত নফল ইবাদতকারীর মতো সওয়াব পেতে থাকবে? তার যখন প্রসব ব্যথা শুরু হয় তখন তার জন্য নয়ন জুড়ানো কী কী নেয়ামত লুকিয়ে রাখা হয়, তা আসমান জমিনের কোনো অধিবাসীই জানে না। সে যখন সন্তান প্রসব করে তখন তার দুধের প্রতিটি ফোঁটার বিনিময়ে একটি করে নেকি দেওয়া হয়। এ সন্তান যদি কোনো রাতে তাকে জাগিয়ে রাখে (কান্নাকাটি করে মাকে বিরক্ত করে ঘুমুতে না দেয়) তাহলে সে আল্লাহর জন্য নিখুঁত সত্তরটি গোলাম আজাদ করার সওয়াব পাবে।’ (মুজামু তাবরানি: ৬৯০৮; মাজমাউজ জাওয়ায়েদ: ৪/৩০৫)। সন্তান যখন মায়ের গর্ভে থাকে, তখন ভ্রূণ অবস্থা থেকেই মায়ের যাপিত জীবনের চলাফেরায়, ওঠাবসায়, সাংসারিক কাজকর্মে, প্রতিটি পদক্ষেপে অবর্ণনীয় ধকল বহন করতে হয়। একজন মায়ের এ অবর্ণনীয় কষ্টের কথা কোরআনে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, ‘সন্তানের মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট সয়ে পেটে বহন করেছে।’ (সুরা লুকমান: ১৪) নারীর আরেকটি প্রধান দায়িত্ব হলো সন্তান প্রসব করা। প্রসবকালে একজন নারীকে রক্তাক্ত ও ক্ষত-বিক্ষত করে আরেকটি মানব সন্তান পৃথিবীর আলো-বাতাস দেখতে পারে। সন্তানকে পৃথিবীতে আনতে কখনো কখনো মা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। তারপরও এ তীব্র যন্ত্রণাকে তুচ্ছ করে মা শুধু দেখতে চায় তার নবজাত শিশুর মায়াবী মুখখানি। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তার মা তাকে খুব কষ্ট করে পেটে ধারণ করেছে, খুব কষ্টে প্রসব করেছে এবং গর্ভধারণ থেকে দুধপান পর্যন্ত ত্রিশ মাস অতিবাহিত করেছে।’ (সুরা আহকাফ: ১৫)। নারীর গর্ভধারণের কষ্ট চিন্তা করে তার প্রাপ্য মর্যাদায় সমাসীন করা পুরুষদের দায়িত্ব। আর নারীরা আল্লাহপ্রদত্ত এ অমোঘ নীতি—গর্ভধারণের গৌরব অন্তরে ধারণ করে অপরিসীম ফজিলত ও সওয়াবের অধিকারী হবেন। লেখক: মাদ্রাসা শিক্ষক
স্মরণীয় মুসলিম মনীষী
স্মরণীয় মুসলিম মনীষী
ইমাম তিরমিজি (রহ.) ইসলামী জ্ঞানবিশ্বের একজন বিশিষ্ট হাদিস বিশারদ, যিনি সহিহ হাদিস সংগ্রহ ও সংকলনের ক্ষেত্রে অনন্য অবদান রেখেছেন। তার পূর্ণ নাম ছিল আবু ঈসা মুহাম্মদ ইবনে ঈসা ইবনে সাওরাহ ইবনে মুসা আত-তিরমিজি। তিনি হিজরি ২০৯ সালে (খ্রিষ্টীয় ৮২৪ সাল) বর্তমান উজবেকিস্তানের তিরমিজ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার নামের সঙ্গে ‘তিরমিজি’ উপাধিটি যুক্ত হয়েছে তার জন্মস্থান তিরমিজের নাম অনুসারে। ইমাম তিরমিজি (রহ.) শৈশবেই জ্ঞানার্জনের প্রতি গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন। অল্প বয়সেই কোরআন মুখস্থ করেন এবং শরিয়ত, তাফসির ও হাদিসশাস্ত্রে দীক্ষা নিতে শুরু করেন। হাদিস শিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি ইরাক, হিজাজ, খোরাসান ও মাওয়ারাউন নাহরসহ বহু অঞ্চল সফর করেন। তিনি এমন এক যুগে জন্মেছিলেন, যখন হাদিস সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রটি এক বৈপ্লবিক পর্যায়ে পৌঁছেছিল। ইমাম বোখারি, ইমাম মুসলিম, ইমাম আবু দাউদ, ইমাম নাসায়ী প্রমুখ তার সমসাময়িক আলেম ছিলেন, যাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, ইমাম তিরমিজি ইমাম বোখারির একজন প্রধান ছাত্র ছিলেন এবং তাকে তিনি গুরুতুল্য সম্মান দিতেন। ইমাম বোখারিও তার প্রতিভার গভীর প্রশংসা করেছিলেন। বলা হয়, তিনি যখন কোনো বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করতেন, তখন ইমাম বোখারির শরণাপন্ন হতেন। ইমাম তিরমিজি সমকালীন তিন প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিসের শিষ্যত্ব অর্জনের সৌভাগ্য লাভ করেন—ইমাম বোখারি, ইমাম মুসলিম, ইমাম আবু দাউদ। ফলে ইমাম তিরমিজির হাদিস সংকলনে এই তিন ইমামের সারনির্যাস সংরক্ষিত হয়েছে। ইমাম তিরমিজির শ্রেষ্ঠ কীর্তি তার সংকলিত হাদিসগ্রন্থ ‘আল-জামিউত তিরমিজি’, যা সুনানে তিরমিজি নামেও পরিচিত। এটি হাদিসশাস্ত্রের প্রসিদ্ধ ‘সিহাহ সিত্তাহ’ (ছয়টি সহিহ হাদিসগ্রন্থ)-এর অন্যতম। এ গ্রন্থের বৈশিষ্ট্য হলো, এতে তিনি হাদিস বর্ণনা করার পাশাপাশি সনদের মান (সহিহ, হাসান, জায়িফ) উল্লেখ করেছেন এবং বিভিন্ন মাজহাব ও ফকিহদের মতামতের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেছেন। তিনিই সর্বপ্রথম ‘হাসান’ (সুন্দর, গ্রহণযোগ্য) হাদিস শ্রেণিকে নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করেন, যা পরবর্তী হাদিসবিদ্যার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হয়। তার অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে ‘শামায়েলু মুহাম্মদিয়া’ (শামায়েলে তিরমিজি) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ বইয়ে তিনি রাসুল (সা.)-এর চারিত্রিক ও বাহ্যিক সৌন্দর্য, চালচলন, পোশাক, আচার-আচরণ ইত্যাদি বর্ণনা করেছেন হৃদয়স্পর্শী ভঙ্গিতে। আজও এ গ্রন্থ মুসলিম বিশ্বের হৃদয়ে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ইমাম তিরমিজি একজন সাধক, পরহেজগার ও দৃষ্টিশক্তিহীন (জীবনের শেষভাগে) আলেম ছিলেন। বলা হয়, হাদিসচর্চা করতে করতে তিনি অন্ধ হয়ে যান, তবে তাতে তার জ্ঞান সাধনায় বিঘ্ন ঘটেনি। তিনি ছিলেন বিনয়ী, মেধাবী ও গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন একজন আলেম। ইমাম তিরমিজি (রহ.) হিজরি ২৭৯ সালে (খ্রিষ্টীয় ৮৯২ সাল) ইন্তেকাল করেন। তার সমাধি উজবেকিস্তানের তিরমিজ অঞ্চলে অবস্থিত, যা আজও মুসলিম জাহানে শ্রদ্ধার কেন্দ্র হিসেবে পরিগণিত। ইমাম তিরমিজি ছিলেন এমন এক আলোকবর্তিকা, যিনি হাদিসশাস্ত্রকে শুধু সংরক্ষণই করেননি, বরং একটি পদ্ধতিগত বিশ্লেষণধর্মী ধারার সূচনা করেছিলেন, যার প্রভাব ও কল্যাণ আজও বিদ্যমান।
পাপের ভারে প্রকৃতিতে বিপর্যয় ঘটে
পাপের ভারে প্রকৃতিতে বিপর্যয় ঘটে
পৃথিবীর বুকে যত বিপর্যয় ও দুর্যোগ সৃষ্টি হয়, তার জন্য প্রধানত দায়ী মানুষের সীমাহীন পাপ ও সীমালঙ্ঘন। প্রকৃতিতে মানুষের অন্যায় হস্তক্ষেপ ও ধ্বংসযজ্ঞের কারণে যেমন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়, তেমনি নৈতিক অধঃপতন ও গুনাহের কারণে সমাজের সুন্দর পরিবেশ নষ্ট হয়। ভালো কাজের সুফল যেভাবে আমরা ভোগ করি, একইভাবে মন্দ কাজের ফলে আমাদের ভুগতে হয় নানা দুর্ভোগ। ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় কিংবা বৈশ্বিক পর্যায়ের ক্ষেত্রেও এটি সত্য। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ সব বিপর্যয়ের জন্য মানুষের কৃতকর্মকেই দায়ী করেছেন—সেটা হোক জাগতিক অন্যায়-অনাচার কিংবা গুনাহ-পাপাচার। আল্লাহ মানুষকে সবসময় পাকড়াও করেন না। তাকে শোধরানোর সুযোগ দেন। তবে তারা যখন সীমালঙ্ঘন করে, তখনই তিনি পাকড়াও করেন। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমাদের যে বিপদাপদ ঘটে, তা তো তোমাদের কর্মফল। আমি তোমাদের অনেক অপরাধ ক্ষমা করে থাকি।’ (সুরা শুআরা, আয়াত: ৩০)। পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টির মাধ্যমে আল্লাহ মানুষকে সতর্ক করেন এবং আখেরাতের মহা শাস্তির ব্যাপারে সাবধান করেন, যাতে তারা জুলুম ও পাপাচার থেকে বিরত থাকতে পারে। আল্লাহ বলেন, ‘স্থলে ও জলে মানুষের কৃতকর্মের কারণেই বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাদের নিজেদের কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা (আল্লাহর পথে) ফিরে আসে।’ (সুরা রুম, আয়াত: ৪১)। মানবতার মুক্তির দিশারি হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ছোট-বড় যত দুর্ভোগ বা হয়রানি বান্দার ওপর আপতিত হয় সবই নিজ কর্মদোষে। আর অধিকাংশই আল্লাহ ক্ষমা করে দেন।’ (বোখারি)। আল্লাহতায়ালার অবাধ্য হয়ে আমাদের পূর্ববর্তী অনেক জাতি ও জনপদ ধ্বংস হয়েছে। যেমন, সাবাবাসীদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘সাবার অধিবাসীদের জন্য তাদের বাসভূমিতে ছিল এক নিদর্শন। দুটি উদ্যান, একটি ছিল ডানদিকে অন্যটি বামদিকে। (তাদের বলা হয়েছিল) তোমরা তোমাদের রবের দেওয়া খাদ্য খাও এবং তার শুকরিয়া আদায় করো। এটা ছিল উত্তম শহর এবং তোমাদের প্রতিপালক ক্ষমাশীল। এরপর তারা অবাধ্যতা করল। ফলে আমি তাদের প্রতি বাঁধভাঙা বন্যা প্রবাহিত করলাম এবং তাদের উদ্যান দুটি পরিবর্তন করে দিলাম এমন দুটি উদ্যানে—যাতে উদগত হয় বিস্বাদ ফলমূল, ঝাউগাছ এবং কিছু কুলগাছ। এটা ছিল কুফরের কারণে তাদের প্রতি আমার শাস্তি। আমি অকৃতজ্ঞ ছাড়া কাউকে শাস্তি দিই না।’ (সুরা সাবা, আয়াত: ১৫-১৭)। ভূমিকম্প সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আপনি বলে দিন, আল্লাহ তোমাদের ওপর থেকে অথবা তোমাদের পায়ের নিচ থেকে আজাব পাঠাতে সক্ষম।’ (সুরা আনআম, আয়াত: ৬৫)। তাফসিরবিদদের মতে, এর ব্যাখ্যা হলো ভূমিকম্প। ভূমিকম্পের প্রকৃত রূপ কতটা ভয়াবহ, সে বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যখন প্রবল কম্পনে প্রকম্পিত হবে জমিন এবং চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়বে পর্বতমালা, অতঃপর তা পর্যবসিত হবে উৎক্ষিপ্ত ধূলিকণায়।’ (সুরা ওয়াকিয়া, আয়াত: ৪-৬)। তা ছাড়া মহান আল্লাহ ভূমিকম্পের মাধ্যমেই কেয়ামত সংঘটিত করবেন। এ ব্যাপারে কোরআনে সুরা জিলজাল নামে পূর্ণাঙ্গ একটি সুরা অবতীর্ণ করেছেন। জলোচ্ছ্বাস ও বন্যা সম্পর্কেও মহান আল্লাহ মানুষকে সতর্ক করেছেন। হজরত নুহ (আ.) তার জাতিকে আল্লাহর সঙ্গে নাফরমানির শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। তবু তাদের চৈতন্যোদয় হয়নি। অবশেষে আল্লাহর আজাব আসে। এক ভয়ংকর প্লাবন ও জলোচ্ছ্বাস তার জাতির অবাধ্য লোকদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এমন প্লাবন সেই জাতিকে গ্রাস করেছিল, যেই প্লাবন হাজার বছর ধরে পৃথিবীতে ইতিহাস হয়ে আছে। তখন নুহ (আ.)-এর নৌকায় যারা আশ্রয় নিয়েছিল তারাই রক্ষা পেয়েছিল। আল্লাহ বলেন, ‘আমি তার (নুহের) বংশধরদের অবশিষ্ট রেখেছি বংশপরম্পরায়।’ (সুরা সাফফাত, আয়াত: ৭৭)। হজরত নুহ (আ.)-এর কওম আল্লাহর হুকুম অমান্য করে দেব-দেবীর পূজা করত। তারা আল্লাহতায়ালার অবাধ্যতার চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। তখন আল্লাহ অসন্তুষ্ট হয়ে তাদের প্রতি মহাপ্লাবন নাজিল করেন এবং সেই প্লাবনে নিমজ্জিত করে তাদের ধ্বংস করে দেন। কিন্তু নুহ (আ.)-এর অল্পসংখ্যক অনুসারীকে আল্লাহ মহাপ্লাবন থেকে হেফাজত করেন। হজরত হুদ (আ.)-এর সম্প্রদায়ও একই অপরাধে অপরাধী ছিল। তাদের আল্লাহতায়ালা প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড়ে ধ্বংস করে দেন। হজরত শোয়াইব (আ.)-এর গোত্র ওজনে কম দিত। এ ব্যাপারে তারা সীমালঙ্ঘন করলে আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দেন। হজরত লুত (আ.)-এর গোত্র সমকামিতায় লিপ্ত হতো। তারা যখন এই অপরাধের চরম সীমায় পৌঁছে গেল, তখন তাদের ভূমিকম্প ও পাথর বর্ষণে ধ্বংস করে দেন এবং নিরপরাধীদের রক্ষা করেন। এরকম অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে যাদের আল্লাহতায়ালা বিভিন্ন অপরাধের কারণে ধ্বংস করে দেন। তবে এ উম্মতে মুহাম্মদি আজাব-গজব দ্বারা সমূলে ধ্বংস হবে না, এটা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দোয়ার ফল এবং উম্মতে মুহাম্মদির বিশেষ বৈশিষ্ট্য। কিন্তু সময়ে সময়ে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপদাপদ দিয়ে সাবধান করা হবে, যা আমরা মাঝেমধ্যে লক্ষ করছি। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারা কি দেখে না যে, তারা প্রতি বছর দুয়েকবার বিপর্যস্ত হয়? এরপরও তারা তওবা করে না এবং উপদেশ গ্রহণ করে না।’ (সুরা তাওবা, আয়াত: ১২৬)। হাদিসে শরিফে আছে, পিতা-মাতা সন্তানকে যত ভালোবাসে আল্লাহতায়ালা তার বান্দাকে তার চেয়েও বেশি ভালোবাসেন। তাই কখনো কখনো মানুষের কর্মদোষে বিপদাপদ সংঘটিত হওয়া সংগত হলেও আল্লাহ দয়াপরবশ হয়ে বান্দাকে ক্ষমা করে দেন এবং বিপদ সংঘটিত করেন না। তবে ক্ষমার অযোগ্য হলে বিপদ সংঘটিত করেন। এটা সার্বভৌম ক্ষমতাধর আল্লাহতায়ালার ইচ্ছাধীন। আমাদের জানা উচিত, এ প্রকৃতির পেছনে একজন স্রষ্টা আছেন, যিনি তা নিয়ন্ত্রণ করেন। আকাশমণ্ডলে ও ভূমণ্ডলে যা আছে সবই তার আজ্ঞাবহ। যখনই তিনি কিছু করতে ইচ্ছা করেন তখন শুধু বলেন, ‘কুন—হও’ তখন সঙ্গে সঙ্গে তা হয়ে যায়। (সুরা ইয়াসিন: আয়াত ৮২)। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টিতে, তার নির্দেশে বায়ুর দিক পরিবর্তনে এবং তার কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত মেঘমালাতে জ্ঞানবান জাতির জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা বাকারা: আয়াত ১৬৪)। তাই প্লেগ, কলেরা, করোনা আল্লাহর নির্দেশেই সংঘটিত হয়েছে, তবে তা বান্দার সীমা লঙ্ঘনজনিত কর্মের জন্য সংঘটিত হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করি না যতক্ষণ না তারা নিজে নিজের অবস্থা পরিবর্তন করে।’ (সুরা রাদ: আয়াত ১১)। সুতরাং বোঝা গেল, মানুষের কর্মদোষে বিভিন্ন পাপাচারে সীমালঙ্ঘনের ফলে জলে-স্থলে বিপদাপদ নাজিল হয়। তাইতো আমাদের অতীতের কৃতকর্মের জন্য তওবা করে সংশোধন হওয়া জরুরি এবং ভবিষ্যতে যেন আমাদের মাধ্যমে এমন কোনো পাপাচার না হয়, যার জন্য আল্লাহতায়ালার ভয়াবহ শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়। কারণ সীমালঙ্ঘিত হলে যে কোনো সময় আমাদের ওপরও আল্লাহতায়ালার কঠিন আজাব আসতে পারে। আর বিচার দিবসের কাঠগড়ায় তো আমাদের অবশ্যই দাঁড়াতে হবে। আল্লাহতায়ালা আমাদের বিপদাপদ মুক্ত করুন এবং ক্ষমা করে দিন। লেখক: ইমাম ও খতিব