দীর্ঘ ৫০ বছর পর আবারও মানুষের পদচিহ্ন পড়তে যাচ্ছে মহাকাশে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে বুধবার (১ এপ্রিল) ঐতিহাসিক আর্টেমিস ২ মিশনের সফল উৎক্ষেপণ সম্পন্ন হয়েছে। ৩২ তলা উচ্চতার বিশালাকার রকেটটি যখন গর্জন করে আকাশে ডানা মেলে, তখন সেখানে উপস্থিত হাজার হাজার দর্শক এক রোমাঞ্চকর মুহূর্তের সাক্ষী হন।
আর্টেমিস ২ চারজন নভোচারীকে নিয়ে চাঁদের চারপাশ প্রদক্ষিণের সফল যাত্রা শুরু করেছে। এই যাত্রা মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার মানুষকে পুনরায় চাঁদে ফিরিয়ে আনা এবং শেষ পর্যন্ত মঙ্গলে নভোচারী পাঠানোর পরিকল্পনার একটি বড় পদক্ষেপ।
আর্টেমিস ২-এর ক্রু সদস্যরা হলেন—নাসার নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন। তারা প্রায় ১০ দিনের এক অভিযানে চাঁদের চারপাশ ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। এটি কয়েক দশকের মধ্যে মানুষের মহাকাশে দূরতম ভ্রমণ হতে যাচ্ছে।
লঞ্চ ডিরেক্টর চার্লি ব্ল্যাকওয়েল-থম্পসন বলেন, এই ঐতিহাসিক অভিযানে আপনারা আর্টেমিস দলের সাহস, মার্কিন জনগণের দুঃসাহসিক চেতনা, আমাদের বৈশ্বিক অংশীদারদের সহযোগিতা এবং নতুন প্রজন্মের আশা-স্বপ্ন সাথে নিয়ে যাচ্ছেন। শুভকামনা আর্টেমিস ২। এগিয়ে চলো।
যাত্রার পাঁচ মিনিট পর কমান্ডার ওয়াইজম্যান তাদের লক্ষ্যবস্তু দেখতে পান। ক্যাপসুল থেকে তিনি বলেন, আমরা একটি সুন্দর চন্দ্রোদয় দেখছি, আমরা ঠিক সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছি।
যেমন ছিল উৎক্ষেপণের আগের কয়েক ঘণ্টা
সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উৎক্ষেপণের কয়েক ঘণ্টা আগে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছিল যখন রকেটে হাইড্রোজেন জ্বালানি পূর্ণ করার কাজ শুরু হয়। বছরের শুরুর দিকে একটি কাউন্টডাউন পরীক্ষার সময় এই পর্যায়েই একটি বিপজ্জনক লিক ধরা পড়েছিল, যার ফলে উৎক্ষেপণে দীর্ঘ বিলম্ব হয়েছিল।
নাসার স্বস্তির বিষয় হলো, এবার কোনো বড় ধরনের হাইড্রোজেন লিক শনাক্ত হয়নি। লঞ্চ টিম সফলভাবে ৭ লাখ গ্যালনেরও (২ দশমিক ৬ মিলিয়ন লিটার) বেশি জ্বালানি রকেটে লোড করে, যা নভোচারীদের রকেটে ওঠার পথ সুগম করে দেয়।
উৎক্ষেপণের আগে নাসাকে বেশ কিছু প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধান করতে হয়েছে। একটি সমস্যা ছিল রকেটের ‘ফ্লাইট-টারমিনেশন সিস্টেম’-এ সিগন্যাল না পৌঁছানো। যদি রকেট পথচ্যুত হয়ে জনবসতির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তবে এটি রকেটটিকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।
নাসার মতে, এই সমস্যা দ্রুত সমাধান করা হয়েছে। এছাড়া প্রকৌশলীরা ওরিয়ন ক্যাপসুলের ‘লঞ্চ-অ্যাবর্ট’ সিস্টেমের একটি ব্যাটারির তাপমাত্রা জনিত ত্রুটিও ঠিক করেছেন, যা শেষ পর্যন্ত উৎক্ষেপণে কোনো বাধা সৃষ্টি করেনি।
এরপরে কী ঘটতে যাচ্ছে?
নভোচারীরা প্রথম এক থেকে দুই দিন পৃথিবীর উচ্চ কক্ষপথে অবস্থান করে মহাকাশযানের বিভিন্ন ব্যবস্থার ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাবেন। এর মধ্যে ওরিয়ন ক্যাপসুলের লাইফ-সাপোর্ট, প্রপালশন (চালিকাশক্তি), নেভিগেশন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা পরীক্ষা করা হবে যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে মহাকাশযানটি গভীর মহাকাশে যাওয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।
এই পরীক্ষাগুলো শেষ হলে, ওরিয়ন ‘ট্রান্সলুনার ইনজেকশন’ নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঞ্জিন বার্ন বা দহন সম্পন্ন করবে। এটি মহাকাশযানটিকে পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে বের করে চাঁদের অভিমুখে একটি নির্দিষ্ট পথে চালিত করবে।
এই যাত্রায় কয়েক দিন সময় লাগবে। এই সময়ে ক্রু সদস্যরা মহাকাশযানের সিস্টেমগুলো পর্যবেক্ষণ করা চালিয়ে যাবেন এবং গত কয়েক দশকের মধ্যে যে কোনো মানুষের তুলনায় পৃথিবী থেকে অনেক বেশি দূরে ভ্রমণ করবেন।
এরপর ওরিয়ন একটি ‘ফ্রি-রিটার্ন ট্রাজেক্টোরি’ বা মুক্ত-প্রত্যাবর্তন পথে চাঁদের পেছন দিক দিয়ে উড়ে যাবে। এই পথটি চাঁদ এবং পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ব্যবহার করে ন্যূনতম জ্বালানি খরচে মহাকাশযানটিকে প্রাকৃতিকভাবেই পুনরায় পৃথিবীর দিকে ঘুরিয়ে আনবে। এই পর্যায়ে মহাকাশযানটি পৃথিবী থেকে তার সর্বোচ্চ দূরত্বে পৌঁছাবে।
চাঁদ প্রদক্ষিণের পর ক্রু সদস্যরা পৃথিবীতে ফিরে আসার জন্য আরও কয়েক দিন সময় ব্যয় করবেন। ফিরতি পথে তারা পাওয়ার সিস্টেম, থার্মাল কন্ট্রোল (তাপ নিয়ন্ত্রণ) এবং ক্রু অপারেশন নিয়ে আরও কিছু গভীর মহাকাশ পরীক্ষা চালাবেন।
ওরিয়ন যখন পৃথিবীর কাছাকাছি পৌঁছাবে, তখন ক্যাপসুলটি ঘণ্টায় প্রায় ৪০ হাজার ২৩৩ কিলোমিটার গতিতে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে। এরপর এটি প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করবে এবং সেখান থেকে উদ্ধারকারী দল ক্রু সদস্যদের ফিরিয়ে আনবে।
নাসার অ্যাপোলো মিশনের নভোচারীরা যখন শেষবার চাঁদে হেঁটেছিলেন, তখন বিশ্বের অর্ধেক মানুষের জন্মই হয়নি। তাই আর্টেমিসকে একটি নতুন প্রজন্মের চন্দ্রাভিযান হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
নাসার বিজ্ঞান মিশন প্রধান নিকি ফক্স এই সপ্তাহের শুরুতে বলেছিলেন, এমন অনেক মানুষ আছেন যাদের অ্যাপোলোর কথা মনে নেই। এমন অনেক প্রজন্ম আছে যারা অ্যাপোলোর উৎক্ষেপণের সময় জীবিত ছিল না। এটিই তাদের জন্য ‘অ্যাপোলো’।




