যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল ক্ষুব্ধ হয়ে ইরানের একটি বড় গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালিয়েছে। তবে তিনি বলেন, ইরান থেকে আর কোনো পাল্টা আক্রমণ না এলে ভবিষ্যতে এমন হামলা আর হবে না।
বুধবার (১৮ মার্চ) ইরানের বিশাল সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়। এর জবাবে ইরান হুমকি দেয়, উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল ও গ্যাস স্থাপনাগুলোতে তারা হামলা চালাতে পারে। একই সঙ্গে কাতার ও সৌদি আরবের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়।
এই পরিস্থিতি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। প্রায় চার সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকেই উত্তেজনা বাড়ছে। খবর রয়টার্স
কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান কাটার এনার্জি (QatarEnergy) জানিয়েছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় রাস লাফান শিল্প এলাকায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এই অঞ্চল বিশ্বে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি বড় অংশ প্রক্রিয়াজাত করে।
সৌদি আরব জানিয়েছে, বুধবার রাজধানী রিয়াদের দিকে ছোড়া চারটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তারা প্রতিহত করে ধ্বংস করেছে। এ ছাড়া দেশটির পূর্বাঞ্চলের একটি গ্যাস স্থাপনাতেও ড্রোন হামলার চেষ্টা নস্যাৎ করা হয়।
বৃহস্পতিবার আবারও কাতারের গ্যাস স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইরান। একই সঙ্গে সৌদি রাজধানীও লক্ষ্যবস্তু ছিল। QatarEnergy জানায়, তাদের বেশ কয়েকটি এলএনজি স্থাপনায় বড় ধরনের আগুন লাগে এবং উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়।
ট্রাম্প দাবি করেন, ইসরায়েলের হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকে জানত না এবং কাতারও এতে জড়িত ছিল না। তিনি বলেন, ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালিয়েছে। কিন্তু ইরান বিষয়টি না বুঝেই কাতারের গ্যাস স্থাপনায় আঘাত করেছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরান যদি কাতারের মতো নিরীহ দেশের ওপর আবার হামলা চালায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর জবাব দেবে। প্রয়োজন হলে ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্র সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হতে পারে।
এর আগে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছিল, ইরানের গ্যাসক্ষেত্রে হামলার ইসরায়েলি পরিকল্পনায় ট্রাম্প সম্মতি দিয়েছিলেন।
সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক গ্যাস ভান্ডারের অংশ, যা ইরান ও কাতার যৌথভাবে ব্যবহার করে। কাতার যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি সেখানেই অবস্থিত।
সংঘাত শুরুর পর থেকে ইরান শুধু ইসরায়েল নয়, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও সামরিক স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোকে সতর্ক করেছে, তারা যেন ইরানের বিরুদ্ধে কোনো হামলার জন্য নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না দেয়।
উত্তেজনা কমার কোনো লক্ষণ না থাকায় যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আরও হাজার হাজার সেনা পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে। এসব সেনা হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে মোতায়েন করা হতে পারে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন হয়।
রিয়াদে বৈঠকে বসা ১২টি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়েছেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।
তাদের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, আবাসিক এলাকা, তেল স্থাপনা, বিমানবন্দর ও পানি পরিশোধন কেন্দ্রের মতো বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান বলেন, ইরানের এই চাপ রাজনৈতিক ও নৈতিকভাবে উল্টো ফল দেবে। প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে।
এই বৈঠক চলাকালীন রিয়াদের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় হতে দেখা যায়।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের হাবশান গ্যাস স্থাপনা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলাকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করেছে।
মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানে তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। লেবাননে নিহত হয়েছে প্রায় ৯০০ জন এবং প্রায় আট লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে।
ইরানের হামলায় ইরাক ও উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশেও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এই যুদ্ধে অন্তত ১৩ জন মার্কিন সেনাও নিহত হয়েছেন।




