আওয়ামী লীগের ছয়জন সাবেক সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে আনা ফৌজদারি মামলা ও কারাভোগকে অমানবিক আখ্যা দিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (আইপিইউ)। তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত সংস্থাটির ২১৭তম অধিবেশনে নির্দিষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গৃহীত এক সিদ্ধান্তে এই উদ্বেগ জানানো হয়েছে।
ছয়জন সাবেক সংসদ সদস্যরা হলেন— সাবের হোসেন চৌধুরী, এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী, হাবিবে মিল্লাত, আসাদুজ্জামান নূর, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এবং মুহাম্মদ ফারুক খান। তাদের মধ্যে হাবিবে মিল্লাত ও ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সংসদ সদস্য ছিলেন। বাকি ৪ জন ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সময়ও সদস্য ছিলেন।
আইপিইউ প্রকাশিত প্রতিবেদনে কোনো নির্দিষ্ট সংস্থার নাম উল্লেখ না করা হলেও, তথ্যপ্রমাণ ও সাক্ষ্য প্রদানের ভিত্তিতে অভিযোগকারীদের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে প্রধান তথ্যদাতা হিসেবে ফজলে করিম চৌধুরীর ছেলে ফরাজ করীম চৌধুরীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি আইপিইউর কাছে ব্যক্তিগত সাক্ষ্য ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিয়েছেন। এ ছাড়া মোশাররফ হোসেনসহ কারাবন্দি অন্য সাবেক সংসদ সদস্যদের নিয়মিতভাবে শারীরিক অবস্থার অবনতি ও কারাগারে তাদের প্রতি অবহেলার তথ্য অভিযোগ আকারে দিয়েছেন তাদের পরিবারের সদস্যরা।
পাশাপাশি তাদের আইনজীবীরাও আদালত প্রাঙ্গণে সাবেক সংসদ সদস্যদের ওপর আক্রমণ এবং অভিযোগের অস্পষ্টতা নিয়ে আইপিইউকে তথ্য দিয়েছেন।
একই সঙ্গে আইপিইউ-ও নিজেদের উদ্যোগে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেছে, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে আওয়ামী লীগের শতাধিক সাবেক সংসদ সদস্য বর্তমানে কারাগারে আটক থাকার অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের মতে, সাবেক ছয়জন সংসদ সদস্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হওয়ায় রাজনৈতিক প্রতিশোধের শিকার হচ্ছেন। প্রতিবেদনে তাদের বর্তমান অবস্থা ও তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের ভিত্তিতে কী ধরনের মামলা হয়েছে, তা তুলে ধরা হয়েছে।
সাবের হোসেন চৌধুরী
প্রতিবেদনে সাবের হোসেন চৌধুরীকে আইপিইউর সাবেক অনারারি প্রেসিডেন্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। রাষ্ট্রদ্রোহ, ষড়যন্ত্র, বেআইনি সমাবেশ, বিস্ফোরক ব্যবহার এবং একাধিক হত্যাকাণ্ডসহ অসংখ্য অভিযোগ করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে ৩০টিরও বেশি মামলা রয়েছে বলে প্রতিবেদেন উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৫ অক্টোবর সাবের হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় আদালতে নেওয়ার পথে তার ওপর ডিম ও ইট ছোড়া হয়। এ ঘটনায় তিনি মাথায় গুরুতর আঘাত পান। বর্তমানে জামিনে মুক্ত থাকলেও নতুন মামলার ভয়ে তিনি শঙ্কিত রয়েছেন। এ ছাড়া নিষেধাজ্ঞার কারণে তার উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ৫ আগস্ট তার বাড়িতে অগ্নিসংযোগের বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী
আওয়ামী লীগ সরকারের চট্টগ্রাম-৬ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন ফজলে করিম চৌধুরী। প্রতিবেদনে তাকে আইপিইউর সাবেক সদস্য ও মানবাধিকার সম্পর্কিত আইপিইউ কমিটির সাবেক সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। হত্যা, চাঁদাবাজি ও ঘুষ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) মামলায় তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
আইপিইউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফজলে করিম চৌধুরীকে কারাগারে কঠোর পরিস্থিতিতে রাখা হয়েছে। তার ছেলে ফারাজ করীমের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার বাবার প্রয়োজনীয় বিশেষ চিকিৎসা কারাগারে পাওয়া যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে তার জীবনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হাবিবে মিল্লাত
আওয়ামী লীগের সিরাজগঞ্জ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ছিলেন হাবিবে মিল্লাত। তিনি ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সংসদ সদস্য ছিলেন।
অভিযোগকারীদের মতে, ওই বছরের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় তার বাড়িতে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটের ঘটনা ঘটে। এরপর থেকে তিনি নির্বাসনে আছেন। আগস্টের শেষের দিকে তার বিরুদ্ধে তিনটি খুনের মামলা করা হয়। এ ছাড়া আগস্টে সরকারবিরোধী ছাত্র-জনতার মিছিলে গুলির নির্দেশ দেওয়ার মতো মিথ্যা অভিযোগ করা হয় বলে দবি করেছেন অভিযোগকারীরা।
আসাদুজ্জামান নূর
আওয়ামী লীগের তৃতীয় মন্ত্রিসভায় সংস্কৃতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন আসাদুজ্জামান নূর। কোনো রকম পরোয়ানা ছাড়াই ২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে উল্লেখ করেছে আইপিইউ। পরদিন তাকে হত্যা মামলার আসামি দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হয়েছিল। অভিযোগকারীদের মতে, আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ ছাড়াই তাকে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক রাখা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বার্ধক্য, মেরুদণ্ডে ক্ষয়, ডায়াবেটিস এবং হাঁপানি ও হৃদরোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে কারাগারে রাখা হয়েছে। আদালত তাকে জামিন দিলেও অ্যাটর্নি জেনারেলের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তা স্থগিত রয়েছে। গণঅভ্যুত্থানে সহিংসতায় মৃত্যুর ঘটনায় তার বিরুদ্ধে তিনটি হত্যা মামলা করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আসাদুজ্জামান নূরের বিরুদ্ধে হওয়া মামলার অসঙ্গতি নিয়ে আইপিইউকে তথ্য সরবরাহ করেছে তার পরিবার। অভিযোগে তার বার্ধক্য ও স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত উদ্বেগজনক বিষয়গুলো কর্তৃপক্ষ উপেক্ষা করছে বলে জানানো হয়। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই এবং কর্তৃপক্ষ অভিযোগের বিষয়ে স্পষ্ট প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদন।
ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন
আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মোশাররফ হোসেন। চট্টগ্রাম-১ আসন থেকে সাতবার সংসদ নির্বাচিত হন। ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর তাকে নিজ বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
২০২২ সালের একটি ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। যদিও ওই ঘটনায় তার উপস্থিতি বা সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মেলেনি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এ ছাড়া সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে বলে দাবি করেছে তার পরিবার।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে মোশাররফ হোসেন পারকিনসন-সহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত। আদালত তাকে জামিন দিলেও উচ্চ আদালত তা স্থগিত করেছেন। পরিবারের দাবি, সঠিক চিকিৎসার অভাবে তার শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটেছে।
মুহাম্মদ ফারুক খান
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী মুহাম্মদ ফারুক খান। ২০২৪ সালের ১৫ অক্টোবর ঢাকার সিএমএইচ হাসপাতালে থেরাপি নেওয়ার সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে ২০২২ সালের একটি মামলার অভিযোগ থাকলেও তার আইনজীবীরা আইপিইউকে অভিযোগ করেছেন, এ মামলার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। এ ছাড়া কোনো পরোয়ানা ছাড়াই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তার আইনজীবীরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার বয়স ও স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতি অবস্থা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া তার জামিনের সব আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। জেলখানায় তাকে কঠোর পরিস্থিতিতে রাখা হয়েছে বলে উদ্বেগ জানিয়েছে আইপিইউ।
অভিযোগকারীদের মতে, ফারুক খানকে বিএনপির এক নেতার মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ মামলায় বা ঘটনায় তার কোনো ধরনের যোগসূত্র নেই বলে জানিয়েছেন তারা।
আইপিইউর পাওয়া তথ্যমতে, আওয়ামী লীগের শতাধিক সাবেক সংসদ সদস্য বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে বন্দি রয়েছেন, যাদের আটকের বা গ্রেপ্তারের ধরণ ও পরিস্থিতি প্রায় একই রকম। আইপিইউর নিয়োগকৃত স্বাধীন বিচার পর্যবেক্ষক এবং প্রতিনিধি দলকে বাংলাদেশে আসার জন্য প্রয়োজনীয় ভিসা দিতে অন্তর্বর্তীকালীন কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে এবং বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও কোনো সহযোগিতা মেলেনি বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
২০২৬ সালের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত ১৫২তম আইপিইউ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল জানায়, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর নতুন সরকার আইনের শাসন ও মানবাধিকার রক্ষায় সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তাদের দাবি, সাবেক সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে চলমান বিচারপ্রক্রিয়া রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত এবং জাতীয় আইন অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি তারা কারাগারে বন্দিদের মানবিক আচরণ ও সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়ে জানায়, বর্তমানে দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া এবং ২০২৪ সালের ঘটনাসহ পূর্ববর্তী সরকারের আমলের বিচারিক কার্যক্রম চলছে।
অধিবেশনে আইপিইউ বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল ও ফরাজ চৌধুরীর দেওয়া তথ্যের জন্য ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বিষয় উল্লেখ করেছে প্রতিবেদনে।
সংস্থাটি ফজলে করিম চৌধুরী, আসাদুজ্জামান নূর, মোশাররফ হোসেন ও মুহাম্মদ ফারুক খানের শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মানবিক কারণে জরুরি ভিত্তিতে তাদের জামিনে মুক্তির বিষয়টি বিবেচনা করতে বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে প্রতিটি অভিযোগের সুনির্দিষ্ট ও দাপ্তরিক তথ্য সরকারের কাছে চেয়েছে আইপিইউ।
আইপিইউ এসব মামলার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিতে বাংলাদেশে একটি স্বাধীন পর্যবেক্ষক দল ও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল পাঠাতে এবং বর্তমান সংসদকে কারিগরি সহযোগিতা দিতে নিজেদের আগ্রহের কথা জানিয়েছে। পুরো বিষয়টি সংস্থাটির মানবাধিকার কমিটিতে পর্যবেক্ষণে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আইপিইউর প্রতিবেদন দেখতে এখানে ক্লিক করুন।




