
ফিলিস্তিনের গাজার পশ্চিম তীরের একটি নিঝুম গ্রাম মুঘাইর। পাহাড়ের কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা এই জনপদে শিশুদের কলকাকলিতে মুখর থাকার কথা ছিল মুঘাইর বয়েজ সেকেন্ডারি স্কুলটির। কিন্তু গত ২১ এপ্রিলের করুণ দুপুরে নিমিশেই সব পাল্টে গেল। নবম শ্রেণির কিশোর আউস আল-নাসান তখন স্কুলের পশ্চিম গেটের কাছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই পাহাড়ের ওপর থেকে ছুটে এল একটি ঘাতক বুলেট। কোনো সতর্কতা বা কারণ ছিল না— ইসরায়েলি এক অনিয়মিত সৈন্যের রাইফেল থেকে বের হওয়া সেই বুলেটটি সরাসরি বিদ্ধ করল ১৪ বছরের আউসের মাথায়।
মুহূর্তের মধ্যে নিথর হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল কিশোর আউস। স্কুলের যে দেয়ালে হেলান দিয়ে হয়তো একটু আগেই বন্ধুরা গল্প করছিল, সেই দেয়াল ভিজে গেল আউসের তাজা রক্তে। বন্ধুর রক্তমাখা দেহ পড়ে থাকতে দেখে বাকি ছাত্ররা যখন বুকফাটা আর্তনাদে তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলো, তখন আবারও গুলি ছোড়া হলো। চারদিকে শুধু চিৎকার আর বাঁচার আকুতি। স্কুলের ভেতরে আতঙ্কিত শিক্ষক আর ছাত্ররা তখন সিঁড়ির নিচে কুঁকড়ে বসে আছেন। কেউ কাউকে বলছেন— ‘নিচু হয়ে থাকো!’, কেউবা চিৎকার করছেন— ‘ভেতরে যাও, ও সবাইকে মেরে ফেলবে!’
আউসকে হত্যার পরও দখলদার ইসরায়েলি সেনার যেন তখনও ক্ষুধা মেটেনি। কয়েক মিনিট পর একই বন্দুকের আরেকটি গুলি লক্ষ্য স্থির করল স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক ওয়াহিদ আবু নাইমের ছোট ভাই জিহাদ আবু নাইমের ওপর। ৩৬ বছরের টগবগে যুবক জিহাদকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হলো। অথচ এই মাসেই জিহাদের ঘরে প্রথম সন্তান আসার কথা ছিল। যে অনাগত কন্যার মুখ দেখার অপেক্ষায় দিন গুনছিলেন জিহাদ, তার পৃথিবীতে আসার আগেই তাকে (জিহাদ) বিদায় করে দেওয়া হলো চিরতরে।
রামাল্লার উত্তর-পূর্বে প্রায় তিন হাজার মানুষের গ্রাম মুঘাইরে এই ঘটনা নতুন নয়। আউসের জীবনের নির্মমতা শুরু হয়েছিল আরও আগে। ২০১৯ সালে তার বাবা হামদি আল-নাসানকেও ঠিক এভাবেই এক ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী পিঠে গুলি করে হত্যা করেছিল। তখন আউস ছিল মাত্র তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। শিক্ষকরা গত কয়েক বছর ধরে অনেক যত্ন নিয়ে তাকে আগলে রেখেছিলেন, যাতে বাবার অভাব তাকে স্পর্শ না করে।
শিক্ষক ওয়াহিদ আবু নাইম কেঁদে বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম আউসকে নিরাপদ রাখতে, তার জীবনে একটু শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু আমরা তাকেও রক্ষা করতে পারলাম না।’
শিক্ষাব্যবস্থা এখন পুরো ফিলিস্তিন জুড়েই আক্রান্ত। গাজায় পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ, যেখানে প্রায় আটশ শিক্ষক এবং ১৮ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে।
পশ্চিম তীরের স্কুলগুলো এখন আর নিরাপদ নেই, বরং ইসরায়েলি অনিয়মিত সেনাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। আউস হত্যার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর পাশের গ্রামে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে তৈরি একটি স্কুল বুলডোজার দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও স্কুলের রাস্তায় কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে শিশুদের পথ আটকে দেওয়া হচ্ছে।
আউসের দাদা তালেব আল-নাসান নাতির কথা বলতে গিয়ে থমকে যান। তিনি বলেন, ‘আউস ছিল খুব শান্ত আর ভদ্র একটা ছেলে। ও শুধু বড় হতে চেয়েছিল, নিজের একটা পরিবার গড়তে চেয়েছিল। সাধারণ মানুষের মতো বাঁচতে চেয়েছিল।’
এখন মুঘাইর গ্রামের স্কুলের করিডোরজুড়ে শুনশান নীরবতা। মাঝে মাঝে শুধু বাতাস দীর্ঘশ্বাস ফেলে আউসের রক্তের দাগ লেগে থাকা সেই দেয়ালটার পাশে। পিতৃহীন সন্তানদের আর সন্তানহারা বাবা-মায়ের কান্নায় ফিলিস্তিনের আকাশ আজ আরও ভার হয়ে এসেছে। যেখানে পাঠ্যবইয়ের বদলে শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে প্রিয় বন্ধুর রক্তমাখা নিথর শরীর।
ইউনিসেফের মুখপাত্র জেমস এল্ডার বলেন, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং শিশুদের পড়াশোনা এবং স্বাভাবিক জীবন ধ্বংস করার সুপরিকল্পিত হামলা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ২১ এপ্রিল দুপুরে যখন সশস্ত্র ইসরায়েলিরা স্কুলের দিকে আসছিল, শিক্ষকরা দ্রুত শিক্ষার্থীদের ভেতরে নিয়ে গেট বন্ধ করে দেন। শিক্ষক ওয়াহিদ তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলে একজন বন্দুক উঁচিয়ে তাকে ‘ফিরে যাও’ বলে ধমক দেয়। এরপর শুটারটি পাহাড়ের ওপর অবস্থান নিয়ে ছাত্রদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে আউস নিহত হয়। চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়।
পরের দিন যখন পরিবারগুলো তাদের প্রিয়জনদের দাফন করছিল, তখন ইসরায়েলি বাহিনী গ্রামে অভিযান চালিয়ে ঘরবাড়িতে টিয়ারগ্যাস ও স্টান গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। মানবাধিকার গোষ্ঠী বি’তসেলেম জানিয়েছে, এই হামলাগুলো জাতিগত নিধনের একটি অংশ।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি, গাড়িতে পাথর ছোড়ায় অনিয়মিত সৈন্যরা গুলি চালিয়েছে। কিন্তু ভিডিও ফুটেজ ও রক্তের দাগ প্রমাণ করে যে, ওই শুটার রাস্তা থেকে কয়েকশ মিটার দূরে পাহাড়ের ওপর অবস্থান করছিল।


-1778455118-16678_1778455263.webp)

