
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ভোটগণনা শেষে ফল প্রকাশিত হলেও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও পরাজয় স্বীকার করেননি। বরং তিনি অভিযোগ করেছেন, নির্বাচন কমিশনের সহায়তায় বিজেপি অন্তত ১০০ আসন তাদের কাছ থেকে লুট করে নিয়েছে।
মঙ্গলবার (৫ মে) বিকেল ৪টায় কলকাতার কালীঘাটে সংবাদ সম্মেলন করবেন মমতা ও অভিষেক ব্যানার্জি। তৃণমূল কংগ্রেসকে কীভাবে ‘হারিয়ে দেওয়া হয়েছে’ তাও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরবেন তারা। সূত্রের বরাতে এ খবর জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলা।
নির্বাচনে জনতার রায়ে বিজিপির জয় হয়েছে। কিন্তু বিজেপির জয় এবং তৃণমূলের পরাজয় মানতে নারাজ মমতা। তাদের দাবি, নির্বাচনের আগে লাখ লাখ মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দওয়া হয়েছে। এ নির্বাচন কখনোই সুষ্ঠু ও অবাধ বলে মানা যায় না।
তবে রাজ্যে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি নিয়ে বিজেপি প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসতে চলেছে, সেই বাস্তবতা তৃণমূলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পাল্টাচ্ছে না। তবে মমতার দলের পরাজয়ের পেছনে তার দলীয় নেতৃত্বই প্রধান সমস্যা নাকি তাদের যুক্তিই আসল বিষয়। গত ১৫ বছর ধরে একটানা ক্ষমতায় থাকার পর তৃণমূল কংগ্রেসের এ বিপর্যয়ের মূল কারণ কী তা উঠে এসেছে বিবিসির বিশ্লেষণে।
সোমবার (৪ মে) রাত পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফল ও রাজ্যে বিভিন্ন এলাকায় তৃণমূল ও বিজেপির তুলনামূলক পারফরমেন্স বিশ্লেষণ করে বিবিসি বাংলা এর পেছনে যে মূল পাঁচটি কারণকে চিহ্নিত করেছে। তা হলো-
নারী ভোট ব্যাংকে ধস
দীর্ঘ শাসনামলে পশ্চিমবঙ্গের নারী ভোটের অর্ধেকের বেশি ভোট পেয়ে আসছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল। এতে কোনো সন্দেহ নেই।
‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’, ‘কন্যাশ্রী’ বা ‘সবুজ সাথ ‘র (ছাত্রীদের মধ্যে সাইকেল বিতরণ) মতো ডাইরেক্ট বেনেফিট প্রকল্প তৃণমূল কংগ্রেস সরকারকে নারী ভোটারদের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছিল।
কিন্তু এবারে সেই ভোটব্যাংকে অবধারিত ফাটল ধরেছে– যার একটা বড় কারণ হতে পারে নারী সুরক্ষার মতো ইস্যুতে তৃণমূল কংগ্রেসের ব্যর্থতা।
দুই বছর আগে কলকাতায় একজন চিকিৎসক সরকারি হাসপাতালে ডিউটি দেওয়ার সময় ধর্ষণের শিকার ও নিহত হয়েছিলেন। সেই ‘অভয়া’র বিচারের দাবিতে সংগঠিত আরজিকর আন্দোলন এবারের ভোটে অবশ্যই প্রভাব ফেলেছে। এর একটা বড় প্রমাণ পানিহাটির মতো তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটিতেও আরজিকরের নির্যাতিতার মা বিজেপি প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছেন।
এসআইআরে ক্ষতির ধাক্কা
এসআইআর বা ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের ফলে পশ্চিমবঙ্গে যে ৯০ লাখেরও বেশি নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাতে তৃণমূল কংগ্রেসই যে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত তা এখন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট।
যদিও আসনভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করলে এই ক্ষতির পরিমাণ ও ব্যাপকতা আরও পরিষ্কার বোঝা যাবে। তবে তা সত্ত্বেও এটা বোঝা যাচ্ছে যে, এই গোটা প্রক্রিয়ায় মোটের ওপর লাভবান হয়েছে বিজেপি।
তবে এই তালিকায় লাখ লাখ বৈধ ভোটার বাদ পড়েছেন সেটা যেমন ঠিক– কিন্তু বহু ভুয়া বা মৃত ভোটারেরও নাম যে বাদ পড়েছে তাতেও কোনো সন্দেহ নেই।
বিজেপি আগোগোড়াই দাবি করে এসেছিল তালিকায় এই সব ভুয়া নামের কারণে তৃণমূল বছরের পর বছর ধরে ভোটে সুবিধা পেয়ে এসেছে। দিনশেষে দেখা গেল, দেখা যাচ্ছে সেই বক্তব্য অনেকটাই সত্যি প্রমাণিত হলো।
মমতার সরকারের দুর্নীতি ও ব্যর্থতা
তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের শাসনে তাদের বিরুদ্ধে যে পরিমাণ দুর্নীতি, অপশাসন, দৈনন্দিন জীবনে কাটমানি ও ‘সিন্ডিকেট রাজের’ বাড়বাড়ন্ত এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ উঠেছে, তা পশ্চিমবঙ্গে আর কোনো আমলে উঠেছে কি না সন্দেহ।
তার সঙ্গে এই ১৫ বছরে রাজ্যে যুবক-যুবতীদের জন্য নতুন চাকরি বা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও মমতা ব্যানার্জি সরকার চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। ভোটের ঠিক আগে বেকারদের জন্য মাসিক ১৫০০ টাকা ভাতা চালু করেও সেই হতাশা কাটানো যায়নি।
কিন্তু বাঙালির আত্মাভিমান, নারীদের জন্য নানা সমাজকল্যাণ প্রকল্প, অসাম্প্রদায়িকতা– এই ধরনের নানা হাতিয়ারকে ব্যবহার করে ২০১৬ বা ২০২১ সালেও তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী সময় পার করতে কোনো অসুবিধা হয়নি।
এবারও এসআইআরের কারণে রাজ্যজুড়ে লাখ লাখ বৈধ ভোটারের যে অমানুষিক ভোগান্তি হয়েছে সেটাকে প্রচারের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন মমতা। তার জন্য সুপ্রিম কোর্টে নিজে প্রশ্ন করাসহ কোনো চেষ্টাই বাদ রাখেননি তিনি।
কিন্তু তারপরও দেখা গেল দুর্নীতি ও ব্যর্থতার অভিযোগকে ঢাকতে সেটা যথেষ্ঠ হয়নি। এর ফলে ২০২৬ সালে এসে তৃণমূল কংগ্রেসকে বেশ চড়া মাশুলই দিতে হলো।
হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণ
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন মমতা ব্যানার্জির একটানা নির্বাচনি সাফল্যের পেছনে একটা বড় কারণ হলো রাজ্যের মুসলিমদের প্রায় একচেটিয়া সমর্থন তিনি পেয়ে এসেছেন।
পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার মোটামুটি ৩০ শতাংশের কাছাকাছি মুসলিম। এর মধ্যে ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ ভোটই তৃণমূল কংগ্রেস পেয়ে থাকে। কিন্তু এবার সেই প্রক্রিয়ার পাল্টা একটা হিন্দু ভোটের ‘কনসলিডেশন’ হয়েছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় সুফল পেয়েছে বিজেপি।
যে কারণে তারা মুসলিমগরিষ্ঠ জেলা মালদা বা মুর্শিদাবাদেও বেশ কিছু আসন পেয়েছে।
অন্যদিকে মমতা তার বিরুদ্ধে ‘মুসলিম তোষণের’ অভিযোগ খারিজ করতে সম্ভবত হালে রাজ্যে সরকারি খরচে একের পর এক হিন্দু মন্দির স্থাপন করেছিলেন।
কিন্তু বোঝাই যাচ্ছে এই ‘সফট হিন্দুত্ব’ কাজে আসেনি, রাজ্যের বেশিরভাগ হিন্দু বরং ‘হিন্দুত্ববাদী’ বিজেপিকে বেছে নিয়েছেন।
শাসক দল হিসেবে সুবিধা না পাওয়া
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাজ্যের শাসক দল ভোটের সময় কিছুটা বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকে। সে হিসেবে এবার তৃণমূল কংগ্রেস সে সুবিধা পায়নি বললেই চলে।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরের মুহূর্ত থেকে জাতীয় নির্বাচন কমিশন রাজ্য প্রশাসনের হাত থেকে রাশ তুলে নিয়েছে, ঢালাওভাবে জেলা শাসক ও পুলিশ সুপারদের তারা বদলে দিয়েছে।
সেই সঙ্গে ভোটের বেশ কিছুদিন আগে থেকে রাজ্যে মোতায়েন করা হয়েছে দুই লাখ ৪০ হাজারের বেশি কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী।
অনেকে বলছেন, এই বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতির কারণে ভোট এত শান্তিপূর্ণ হয়েছে এবং মানুষ নিশ্চিন্তে ভোট দিতে পেরেছেন।
তৃণমূল কংগ্রেস গত দেড় মাসে লাগাতার কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ করে গেছে। সেটার কারণ কী ছিল, তাও এই নির্বাচনি ফলাফলের ভিত্তিতে আন্দাজ করা যাচ্ছে।
অন্যভাবে বললে, নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকাও তৃণমূল কংগ্রেসের বিপক্ষেই গেছে।



