
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে জয় ছিনিয়ে নেয় বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। পরবর্তীতে তাকে রাজ্যের নবম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করে বিজেপি। দেশভাগের পর রাজ্যটিতে সরকার গঠন করেছে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতায় থাকা দলটি। তবে মমতার মতো তুখোড় নারী নেতৃত্বকে পরজিত করা বিজেপি রাজ্যে কেন কোনো নারীকে সরকারপ্রধান হিসেবে বেছে নিল না, তা নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়া বিজেপি নেত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। অবশ্য শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের আগে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে তার নামও আলোচনায় ছিল। পরবর্তী এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, এবারের মুখ্যমন্ত্রী তার কাজে সহায়তার জন্য দুজন উপ-মুখ্যমন্ত্রী পেতে পারেন। তাদের মধ্যে একজন নারী থাকবেন এবং আরেকজন পুরুষ। নারী হিসেবেও অগ্নিমিত্রা পালের নাম আলোচনায় ছিল। তালিকায় আরেক নাম ছিল শিলিগুড়ি থেকে বিজয়ী প্রার্থী শংকর ঘোষ।
রাজ্যে দীর্ঘদিন ক্ষমতার মসনদ দখলে রাখা মমতার বিপরীতে বিজেপি কেন নারী মুখ্যমন্ত্রী বেছে নিল না—এর জবাবে অগ্নিমিত্রা পাল বলেন, শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কারণেই তাকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এটা একান্তই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সিদ্ধান্ত।
তিনি বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণই আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠদের, প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আমাদের রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত। আমাদের বিরোধীদলীয় নেতা (শপথ পূববর্তী সংসদের) শুভেন্দু অধিকারী অবশ্যই, এখন তিনিই মুখ্যমন্ত্রী... মানুষের নানা মতামত থাকবে। যদি একজন নারী মুখ্যমন্ত্রী হন, তাহলে তারা বলবেন যে, পরিবর্তনের জন্য হলেও একজন পুরুষ মন্ত্রীকে বেছে নেওয়া উচিত ছিল। তাই আমার মনে হয়, এমন একজনকে প্রয়োজন যার গত ৩০ বছরের রাজনীতির অভিজ্ঞতা আছে, যিনি বিধানসভার ভেতরে ও বাইরে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন... আমার মনে হয় না শুভেন্দু অধিকারীর চেয়ে ভালো আর কেউ হতে পারতেন।
বিজেপির এই নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতোমধ্যে জবাব পেয়ে গেছেন। তিনি অনেক কথা বলেছেন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও অনেক কথা বলেছেন। কিন্তু বাংলার মানুষ তাদের রায় দিয়েছেন, এবং তার এটা বোঝা উচিত যে তিনি আইনের ঊর্ধ্বে নন। তিনি ভারতের সংবিধানের ঊর্ধ্বে নন, এমনকি তিনি ঈশ্বরও নন। তার সহকর্মীরা, সংসদ সদস্যরা সম্ভবত তাকে ‘মা সারদা’ বলে খুশি করার চেষ্টা করেছেন। মা সারদা আমাদের ঈশ্বর। এবং সম্ভবত তিনি খুব খুশিও হয়েছিলেন। মমতা তাদের থামাতে কখনও চেষ্টা করেননি। তাই তাকে আমার কিছু বলার নেই। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ সবকিছু বলে দিয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নতুন সরকারের অগ্রাধিকার কী কী হওয়া উচিত, সে বিষয়েও কথা বলেছেন অগ্নিমিত্রা পাল। তিনি বলেন, প্রথমত আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। পূর্ববর্তী সরকারের দ্বারা সম্পূর্ণরূপে রাজনীতিকরণ করা পুলিশ প্রতিষ্ঠানকে বন্ধ করতে হবে...। দ্বিতীয়ত অবকাঠামোগত উন্নয়ন। এখানে পানি নেই, বাসস্থান নেই, শৌচাগার নেই, রাস্তা নেই, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নেই, তাই অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন। তৃতীয়ত কর্মসংস্থান। আমাদের যে সমস্ত ছেলেমেয়েরা অন্য রাজ্যে কাজ করতে গেছে, তাদের সবাইকে ফিরিয়ে আনতে হবে।
দুই দফার বিধানসভা নির্বাচনে তৎকালীন বিরোধীদল বিজেপি ২০৭টি আসন জিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়েছে। এবারের নির্বাচনে ৮০টি আসনে জয় পেয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাবেক ঘনিষ্ঠ সহচর শুভেন্দু অধিকারী তার হিন্দুত্ববাদী ও অনুপ্রবেশ-বিরোধী প্রচারণার মাধ্যমে বিজেপির প্রচারাভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
গত শনিবার প্রধানমন্ত্রী মোদিসহ বিজেপির শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন শুভেন্দু। অগ্নিমিত্র পাল ছাড়াও দিলীপ ঘোষ, নিশীথ প্রামাণিক, ক্ষুদিরাম টুডু ও অশোক কীর্তনিয়াও তার মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে শপথ নেন। জমকালো শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানটি কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত হয়।



