আমাদের অনেকেই মনে করি, দু-এক রাত ঠিকমতো না ঘুমালেও তেমন কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, বিষয়টি এতটা সহজ নয়। ঘুমের ঘাটতি শুধু ক্লান্তিই তৈরি করে না, এটি শরীরের ভেতরে গভীর প্রভাব ফেলে; বিশেষ করে অন্ত্র বা গাটের ওপর।
বিজ্ঞানীরা এখন জানতে পেরেছেন, পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মস্তিষ্ক থেকে অন্ত্রে অস্বাভাবিক সংকেত পাঠানো হয়, যা অন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ কোষগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যতে নানা ধরনের জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এই গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের অভাব ভেগাস নার্ভের মাধ্যমে অন্ত্রে ভুল সংকেত পাঠায়। ভেগাস নার্ভ হলো এমন একটি স্নায়ু, যা মস্তিষ্ক ও অন্ত্রের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে।
এই ভুল সংকেতের কারণে অন্ত্রে সেরোটোনিন নামের একটি রাসায়নিকের মাত্রা বেড়ে যায়। অতিরিক্ত সেরোটোনিন অন্ত্রের স্টেম সেল বা মূল কোষগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলতে পারে।
স্টেম সেলগুলো অন্ত্রের আবরণ ঠিক রাখতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে অন্ত্রের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হয়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ঘুমের অভাবের কারণে অন্ত্রের স্টেম সেলের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে, যা ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজিজ বা আইবিডি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
এই রোগের মধ্যে রয়েছে:
বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ অনিদ্রা বা ঘুমের সমস্যায় ভোগেন। দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা থাকলে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, মানসিক অবসাদসহ নানা রোগের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
গবেষণাটি মূলত ইঁদুরের ওপর করা হয়েছে। গবেষকরা ইঁদুরগুলোকে দুই দিন ঘুমাতে দেননি। এরপর দেখা যায়:
এতে বোঝা যায়, খুব অল্প সময়ের ঘুমের ঘাটতিও অন্ত্রের ওপর দ্রুত ও গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
সেরোটোনিন সাধারণত অন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি হজমে সাহায্য করে এবং খাবার চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে। তবে সমস্যা হয় যখন এর মাত্রা বেশি হয়ে যায়। তখন এটি ডায়রিয়া, আইবিডি এমনকি টিউমার হওয়ার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের অভাবে শুধু সেরোটোনিন বেশি তৈরি হয় না, বরং শরীর এটি ঠিকমতো শোষণও করতে পারে না। ফলে অন্ত্রে এর পরিমাণ আরও বেড়ে যায়।
গবেষকরা ধারণা করেন, ভেগাস নার্ভই মস্তিষ্ক থেকে অন্ত্রে এই সংকেত পৌঁছে দেয়।
এটি পরীক্ষা করতে তারা কিছু ইঁদুরের ভেগাস নার্ভ কেটে দেন। তখন দেখা যায়:
এতে নিশ্চিত হওয়া যায়, ভেগাস নার্ভ এই পুরো প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এ ছাড়া গবেষকরা অ্যাসিটাইলকোলিন নামের একটি রাসায়নিককেও শনাক্ত করেছেন, যা এই সংকেত পাঠাতে সাহায্য করে।
গবেষকরা এখন এই প্রক্রিয়াটি আরও ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা থাকলে এটি ক্যান্সার বা আইবিডির ঝুঁকি বাড়ায় কি না, তা নিয়ে গবেষণা চলছে।
ভবিষ্যতে এমন চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরি হতে পারে, যা ভেগাস নার্ভ বা সংশ্লিষ্ট রাসায়নিক প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে অন্ত্রের সমস্যা কমাতে সাহায্য করবে।
এই গবেষণা স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, ঘুম শুধু বিশ্রামের জন্য নয়, শরীরের সামগ্রিক সুস্থতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অল্প কয়েক দিনের ঘুমের ঘাটতিও শরীরের ভেতরে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে, বিশেষ করে অন্ত্রের স্বাস্থ্যে।
তাই সুস্থ থাকতে হলে নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা জরুরি। এটি শুধু ক্লান্তি দূর করে না, বরং শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে সুরক্ষিত রাখতেও বড় ভূমিকা রাখে।
সূত্র : লাইভ সাইন্স




