প্রিয়জন হারানোর শোক মানুষের জীবনের সবচেয়ে গভীর ও কঠিন অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। সাধারণত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই কষ্ট কিছুটা কমে আসে। প্রথমদিকে তীব্র দুঃখ, রাগ বা শূন্যতা থাকলেও ধীরে ধীরে মানুষ নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখেই যায় একটা সময়।
তবে সবার ক্ষেত্রে এমনটা হয় না। কিছু মানুষের জন্য শোক হয়ে ওঠে দীর্ঘস্থায়ী। সময়ের সঙ্গে যা কমে না, বরং তার তীব্রতা একইরকম থেকে যায়। এতে স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হয়, দৈনন্দিন কাজেও মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা এই অবস্থাকে বলেন ‘প্রলংড গ্রিফ ডিজঅর্ডার’ বা বাংলায় যাকে বলে ‘দীর্ঘস্থায়ী শোক ব্যাধি’।
প্রলংড গ্রিফ ডিজঅর্ডার হলো এমন এক ধরনের শোক, যা দীর্ঘ সময় ধরে একই তীব্রতায় থেকে যায় এবং ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা সৃষ্টি করে। ২০২২ সালে এটি মানসিক রোগ নির্ণয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এই অবস্থায় মানুষ প্রিয়জনের অভাব থেকে বের হতে পারেন না। তারা বারবার সেই মানুষটির কথা ভাবেন, তাকে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা অনুভব করেন এবং বাস্তবতা মেনে নিতে কষ্ট হয়।
নতুন গবেষণায় দেখাচ্ছে, এই ধরনের শোক শুধু আবেগের বিষয় নয়, এটি মস্তিষ্কের কার্যক্রমের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।
মস্তিষ্কের যে অংশগুলো সম্পর্ক, অনুভূতি এবং আনন্দের সঙ্গে যুক্ত, সেগুলো স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে মস্তিষ্ক যেন এখনো বিশ্বাস করে, হারিয়ে যাওয়া মানুষটি আবার ফিরে আসবে।
এই বিভ্রান্তির কারণে বাস্তবতা মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। স্মৃতি এবং বাস্তবতার মধ্যে এক ধরনের অমিল তৈরি হয়, যা শোককে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।
প্রথম দিকে শোকের সময় অনেকেই প্রিয়জনকে খুব বেশি মনে করেন, মন খারাপ থাকে এবং নিজেকে আলাদা মনে হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অনুভূতি ধীরে ধীরে বদলায়।
কিন্তু প্রলংড গ্রিফ ডিজঅর্ডারের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন ঘটে না। যা হয়—
এই লক্ষণগুলো যদি এক বছরের বেশি সময় ধরে থাকে, তখন এটি দীর্ঘস্থায়ী শোক হিসেবে বিবেচিত হয়।
সবাই এই সমস্যায় ভোগেন না। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৪ শতাংশ মানুষের মধ্যে এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।

যেসব পরিস্থিতিতে ঝুঁকি বেশি
দীর্ঘস্থায়ী শোক শুধু মানসিক নয়, শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে শরীরের স্ট্রেস সিস্টেম সক্রিয় থাকলে এসব সমস্যা দেখা দেয়।
এই সমস্যার জন্য নির্দিষ্ট একটি চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে, যা ‘প্রলংড গ্রিফ থেরাপি’ নামে পরিচিত।
এই থেরাপিতে ধাপে ধাপে মানুষকে—
গবেষণায় দেখা গেছে, এই থেরাপি নেওয়ার পর প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ উন্নতি অনুভব করেন।
শোক একটি স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতি। কিন্তু যখন এটি দীর্ঘ সময় ধরে জীবনকে থামিয়ে দেয়, তখন সেটি গুরুত্ব সহকারে দেখা প্রয়োজন।
প্রলংড গ্রিফ ডিজঅর্ডার আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানসিক কষ্টও শারীরিক সমস্যার মতোই বাস্তব এবং এর চিকিৎসা সম্ভব। সময়মতো সঠিক সহায়তা পেলে মানুষ ধীরে ধীরে এই কঠিন অভিজ্ঞতা থেকে বের হয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।
সূত্র : ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক




