মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এআই প্রযুক্তি অ্যানথ্রপিক। এ ঘটনার পর থেকেই অন্যান্য বড় প্রযুক্তি কোম্পানির মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। তারা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যবস্থায় কোন ধরনের এআই ব্যবহার করা হবে, সেটি নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে চাইছে।
চলতি মাসের শুরুর দিকে পেন্টাগন নির্দেশ দেয়, আগামী ছয় মাসের মধ্যে সামরিক কার্যক্রম থেকে অ্যানথ্রপিকের এআই টেকনোলজি একেবারে সরিয়ে ফেলতে হবে। কোম্পানির প্রধান নির্বাহী ও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে দ্বন্দ্বের জেরে এই সিদ্ধান্ত আসে। পেন্টাগনের এক অভ্যন্তরীণ নথিতে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে—পারমাণবিক অস্ত্র, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ও সাইবার যুদ্ধে অ্যানথ্রপিকের এআই ব্যবহার করা হচ্ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সূত্রগুলো বলছে, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে এআই প্রোগ্রাম ব্যবহারের সম্ভাবনাও রয়েছে। এর মধ্যে অ্যানথ্রপিকের একটি সিস্টেমও রয়েছে। পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে এআই ব্যবহারের নির্দিষ্ট পদ্ধতি জানায়নি। সিবিএস নিউজের সঙ্গে আলাপে এ বিষয়ে বেশ কয়েকজন সামরিক বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, এখন প্রতিদিন প্রায় এক হাজার সম্ভাব্য লক্ষ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে।
নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অ্যাডমিরাল মার্ক মন্টগোমেরি বিষয়টি এভাবে ব্যাখ্যা করেন যে, মানুষের এখনও যে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগে। এআই এ ধরনের কাজ ঝটপট সেরে ফেলে। যে ধরনের বিশ্লেষণে আগে অনেক দিন লেগে যেত, এআই সেটা তাড়াতাড়ি শেষ করতে পারে। আগেকার কোনো ধরনের পরিস্থিতির সঙ্গেই এটা মেলানো যাবে না।
খেলাই বদলে দিচ্ছে এআই
আর দশজন সাধারণ ব্যবহারকারীর মতো করেই এআই ব্যবহার করছে পেন্টাগন। বিপুল তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ ও সংক্ষেপ করতে এআই ব্যবহার করা হচ্ছে এই পরিসরে। পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পাওয়া নথি, ভিডিও ও ছবি বিশ্লেষণ করে এআই সম্ভাব্য পরিস্থিতি তৈরি করতে সাহায্য করে। এতে ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায় এবং সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র নির্বাচন করা যায়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যারন ম্যাকলিন বলেন, আমরা এমন এক সামরিক বিপ্লবের সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি যার চালিকাশক্তি হলো ডিজিটাল বিপ্লব। এখন সব জায়গায় ক্যামেরা, স্মার্টফোন ও সংযুক্ত ডিভাইসের কারণে যুদ্ধক্ষেত্রে এমন বিপুল তথ্য তৈরি হচ্ছে—যা কয়েক প্রজন্ম আগে কল্পনা করাও সম্ভব ছিল না। এই বিশাল তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করে সামরিক সিদ্ধান্ত নিতে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অ্যালগরিদম লক্ষ্য নির্ধারণ, হামলার প্রস্তুতি এবং ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের কাজ এআই প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে করতে পারে।
ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, একসঙ্গে শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে আসলে মানুষ একা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এক্ষেত্রে এআই মূল ভূমিকা পালন করে।
এ পর্যন্ত অ্যানথ্রপিকের ‘ক্লড’ মডেলটিই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের গোপন সিস্টেমে বড় পরিসরে ব্যবহৃত একমাত্র এআই। এ ছাড়া গবেষণা, নীতিনির্ধারণ ও সরঞ্জাম ক্রয়ের মতো প্রশাসনিক কাজেও এআই ব্যবহৃত হচ্ছে।
অস্ত্র চালাচ্ছে এআই?
যুদ্ধক্ষেত্রে এআই একা কাজ করে না। মানুষের তত্ত্বাবধান ও প্রচলিত সামরিক প্রযুক্তি, সবই প্রযয়োজন হয়। অনেক মানুষ মিলেই যুদ্ধক্ষেত্রে এআই কীভাবে ব্যবহার হবে সেটি তত্ত্বাবধান করে। এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার থেকে ড্রোন হোক কিংবা নর্থরোপ গ্রুম্যান, বোয়িং বা লকহেড মার্টিনের মতো লিগ্যাসি ডিফেন্স কনট্র্যাক্টর হোক না কেন; এআইয়ের পরিচালনা করতে হয়। এআইয়ের বিশাল ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল দিয়ে কিন্তু নিজ থেকে প্লেনও ওড়ে না বা মিসাইল ছোড়া হয়ে যায় না। এআই নিজে অস্ত্র চালায় না, বরং হামলার আগে বিশ্লেষণ ও পরিকল্পনায় সাহায্য করে।
মন্টগোমেরির মতে, এআই ব্যবহারের ফলে সামরিক অভিযানের সময়সীমা দিন থেকে ঘণ্টায় নেমে এসেছে। দ্রুত পরিকল্পনা এবং প্রয়োগের মাধ্যমে সামরিক বাহিনীর শক্তিকে এআই আরও অনেক ক্ষমতাধর করে তুলছে বলে তিনি মনে করেন।
একটি সূত্র জানায়, অ্যানথ্রপিকের ‘ক্লড’ এআই মূলত গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন রিপোর্ট থেকে ধরন শনাক্ত করা, সারসংক্ষেপ তৈরি করা এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দ্রুত তুলে ধরা। যে কোনো বিশ্লেষকের চেয়ে এআই দ্রুত এবং নিখুঁত ফলাফল দিতে পারলেও লক্ষ্য নির্ধারণ ও হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও মানুষের হাতেই থাকে।
ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখ ইরানে একটি মেয়েদের স্কুলে হামলায় এআই ব্যবহৃত হয়েছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই যুদ্ধকে আরও কার্যকর করছে, তবে এখনো ছাড়াই যুদ্ধ করা সম্ভব। অধিকাংশ অস্ত্র এখনো প্রচলিত প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর তৈরি। মন্টগোমেরি বলেন, ‘এই যুদ্ধের ৯৮ শতাংশই প্রচলিত অস্ত্র দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। আর সেগুলোর ফলাফলও ভালো।’ তবে ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার অনেক বাড়বে বলে মতামত দেন তিনি।
সামরিক পরিসরে ক্ষমতাধর প্রযুক্তি
গত জুলাইয়ে পেন্টাগন অ্যানথ্রপিকের সঙ্গে ২০ কোটি ডলারের চুক্তি করেছিল, যা পরে বাতিল করা হয়। এআই ব্যবহারের নিয়ম নিয়ে মতবিরোধের জেরে এই সিদ্ধান্ত আসে। এরপর অ্যানথ্রপিক যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে, অভিযোগ করেছে যে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মাইক্রোসফট, ওপেনএআই ও গুগলের কর্মীরাও এই মামলার পক্ষে সমর্থন দিয়েছেন।
পেন্টাগন এখনো ছয় মাসের মধ্যে অ্যানথ্রপিকের প্রযুক্তি সরানোর প্রক্রিয়ায় আছে, তবে এর মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে। এদিকে অন্যান্য প্রযুক্তি কোম্পানিও এগিয়ে আসছে। গুগল ইতোমধ্যে অ-গোপন সামরিক কাজে এআই চালুর ঘোষণা দিয়েছে।
অন্যদিকে ওপেনএআইয়ের প্রধান স্যাম অল্টম্যান জানিয়েছেন, তাদের এআই মডেল পেন্টাগনের সিস্টেমে ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তারা তিনটি বিষয়ে সীমা নির্ধারণ করেছে—স্বয়ংক্রিয় প্রাণঘাতী অস্ত্র, নাগরিকদের ওপর ব্যাপক নজরদারি এবং গুরুত্বপূর্ণ স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে এআই ব্যবহার করা যাবে না।
সূত্র: সিবিএস নিউজ




