সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই এখন এক নতুন ধরনের অদ্ভুত কনটেন্ট চোখে পড়ে। কোথাও দেখা যাচ্ছে সামুচা কাঁদছে, কোথাও ডাল চালকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে অন্য কারও কাছে, আবার কোথাও ফল বা সবজি জড়িয়ে পড়ছে প্রেম, বিচ্ছেদ আর নাটকীয় সম্পর্কের গল্পে।
প্রথমে বিষয়গুলো অবাস্তব বা হাস্যকর মনে হলেও, বাস্তবে এই ভিডিওগুলো বিপুল সংখ্যক মানুষ দেখছেন। অনেকেই বিরক্তি নিয়ে দেখেন, আবার অনেকে কৌতূহল থেকে থেমে যান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এগুলো স্ক্রল করে এড়িয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এআই ‘স্লপ’ বলতে সাধারণত এমন কনটেন্টকে বোঝানো হয়, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে খুব দ্রুত এবং কম খরচে তৈরি করা হয়।
এই ধরনের কনটেন্টের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো—অতিরঞ্জিত ও নাটকীয় গল্প, মানুষসদৃশ আচরণ করা বস্তু বা প্রাণী ও উপরের দিক থেকে আকর্ষণীয়, কিন্তু গভীরে গেলে অসংলগ্ন কনটেন্ট।
সহজ ভাষায়, এগুলো এমন কনটেন্ট যা দ্রুত তৈরি করা যায় এবং দ্রুতই দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও প্ল্যাটফর্মগুলোতে (যেমন রিলস বা শর্টস) কয়েক মিনিট সময় কাটালেই দেখা যায় কথা বলা ফলমূল, আবেগপ্রবণ সবজি, সম্পর্কের জটিলতায় জড়ানো খাবার বা নাটকীয় জীবনে আটকে থাকা প্রাণী।
এই কনটেন্টগুলোতে প্রায়ই টেলিভিশন নাটক বা রিয়েলিটি শোর মতো উপস্থাপন দেখা যায়, প্রেম, প্রতারণা, ঝগড়া, বিচ্ছেদ—সবই কয়েক সেকেন্ডে তুলে ধরা হয়।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে এই ট্রেন্ড আরও বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে, কারণ এখানে স্থানীয় খাবার ও সংস্কৃতিকে গল্পে ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন— চাল-ডালের সম্পর্ক ভাঙন, চা ও বিস্কুটের বিয়ে এবং জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুডকে ঘিরে নাটকীয়তা। এই পরিচিত উপাদানগুলো দর্শকদের কাছে বিষয়গুলোকে আরও আপন করে তোলে।
এই ট্রেন্ডের জনপ্রিয়তার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।
নাটকীয়তার প্রতি আকর্ষণ : দক্ষিণ এশিয়ার দর্শক দীর্ঘদিন ধরেই আবেগঘন ও নাটকীয় গল্পে অভ্যস্ত। পরিবার, প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা—এসব উপাদান এখানে খুব সহজে গ্রহণযোগ্য।
দ্রুত আবেগ তৈরি : এই ভিডিওগুলো খুব অল্প সময়ের মধ্যে মৌলিক আবেগে আঘাত করে—ভালোবাসা, দুঃখ, রাগ বা সহানুভূতি। ফলে দর্শক দ্রুত সংযোগ অনুভব করেন।
সহজে তৈরি করা যায় : এ ধরনের কনটেন্ট তৈরিতে বড় কোনো প্রোডাকশন প্রয়োজন হয় না। এআই টুল ব্যবহার করে অল্প সময়েই বহু ভিডিও তৈরি করা সম্ভব। ফলে কনটেন্টের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।
অ্যালগরিদমের ভূমিকা : সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদম মূলত ব্যবহারকারীর প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে। আপনি পছন্দ করুন বা বিরক্ত হোন—যতক্ষণ দেখছেন বা প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন, ততই এই কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ছে।
এই ট্রেন্ড শুধু বিনোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কিছু উদ্বেগও তৈরি করছে।
নেতিবাচক উপস্থাপন : অনেক ক্ষেত্রে সম্পর্ক, নারী বা সামাজিক বিষয়গুলোকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়।
সংবেদনশীল বিষয়কে হালকাভাবে ব্যবহার : শরীর নিয়ে মন্তব্য, মানসিক সমস্যা বা সামাজিক ইস্যুগুলো কখনো কখনো গুরুত্বহীনভাবে দেখানো হয়।
মনোযোগে প্রভাব : দ্রুত আবেগ তৈরি করা এই ভিডিওগুলো দর্শকের মনোযোগের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘ বা গভীর কনটেন্টে আগ্রহ কমে যেতে পারে।
ভবিষ্যতের ঝুঁকি : এই ধরনের কৌশল ভবিষ্যতে ভুয়া তথ্য, বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট বা ডিপফেক ছড়ানোর ক্ষেত্রেও ব্যবহার হতে পারে।
এআই ‘স্লপ’ মূলত যুক্তির চেয়ে আবেগকে লক্ষ্য করে তৈরি হয়। এটি দর্শককে ভাবতে বাধ্য করে না, বরং দ্রুত প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, সহজে আবেগ জাগায় ও স্ক্রল থামাতে বাধ্য করে।
ফলে এটি খুব সহজেই ভাইরাল হয়ে যায়। এআই-নির্ভর এই নতুন ধরনের কনটেন্ট একদিকে যেমন অদ্ভুত ও বিনোদনমূলক, অন্যদিকে তেমনি এটি সামাজিক মাধ্যমের কনটেন্ট ব্যবহারের ধরনেও পরিবর্তন আনছে।
তাই এসব ভিডিও দেখা বা উপভোগ করার পাশাপাশি সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি রাখা জরুরি। কারণ সব কনটেন্ট শুধু বিনোদন দেয় না, কিছু কনটেন্ট আমাদের চিন্তা, আচরণ এবং দৃষ্টিভঙ্গিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্র : এনডিটিভি




