চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বাইটড্যান্স-এর (ByteDance) তৈরি নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) মডেল হলিউডে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতার কারণেই নয়, বরং সৃজনশীল শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।
টিকটকের মূল প্রতিষ্ঠান বাইটড্যান্সের তৈরি সিড্যান্স ২.০ (Seedance 2.0) নামের এই এআই মডেল খুব অল্প লিখিত নির্দেশনা (prompt) থেকেই সিনেমার মতো মানসম্পন্ন ভিডিও তৈরি করতে পারে। ভিডিওর সঙ্গে থাকে সংলাপ ও সাউন্ড ইফেক্টও। কয়েকটি ছোট নির্দেশনা দিয়েই উচ্চমানের দৃশ্য তৈরি করা সম্ভব বলে দাবি করা হচ্ছে।
সিড্যান্স দিয়ে তৈরি হয়েছে বলে দাবি করা কিছু ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ভাইরাল হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে জনপ্রিয় চরিত্র যেমন স্পাইডার ম্যান ও ডেডপুলকে। এসব ভিডিও প্রকাশের পর বড় স্টুডিও যেমন Disney ও Paramount Pictures কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে।
তবে বিতর্ক কেবল আইনি জটিলতায় সীমাবদ্ধ নয়, এর প্রভাব আরও গভীর।
২০২৫ সালের জুনে সিড্যান্স প্রথম চালু হলেও আট মাস পর আসা দ্বিতীয় সংস্করণই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি আগের এআই ভিডিও মডেলগুলোর তুলনায় আরও সমন্বিত।
এআই দিয়ে ভিডিও তৈরির ক্ষেত্রে আগে থেকেই কিছু টুল ছিল, যেমন মিডওয়ে-জার্নি (Midjourney) এবং সোরা (Sora)। তবে সিড্যান্স একই সঙ্গে লেখা, ছবি ও শব্দকে একটি সিস্টেমে একত্র করেছে, যা একে আলাদা করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিড্যান্সের তৈরি অ্যাকশন দৃশ্যগুলো বেশ বাস্তবসম্মত এবং বড় বাজেটের সিনেমার মতো মনে হয়। এমনকি অভিনেতা উইল স্মিথ-এর পাস্তা খাওয়ার দৃশ্য তৈরি করে তা বাস্তবের মতো দেখাতে সক্ষম হয়েছে এআই-টি। এবং এই ধরনের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
অনেক চলচ্চিত্র নির্মাতা মনে করছেন, ভিডিও তৈরির প্রযুক্তিতে এটি নতুন অধ্যায় সূচনা করতে পারে।
এই প্রযুক্তি যেমন নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলছে, তেমনি কপিরাইট ও নৈতিকতার প্রশ্নও তুলছে।
হলিউডের স্টুডিওগুলো অভিযোগ করেছে, তাদের মালিকানাধীন চরিত্র অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা হচ্ছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, জাপানেও জনপ্রিয় অ্যানিমে চরিত্র নিয়ে তৈরি ভিডিওর কারণে তদন্ত চলছে।
এমন পরিস্থিতি নতুন নয়। ২০২৩ সালে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস অভিযোগ তোলে যে তাদের লেখা অনুমতি ছাড়া এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা হয়েছে। একইভাবে প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম রেডিট (Reddit)–ও এআই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল ব্যবহারকারীদের পোস্ট সংগ্রহের অভিযোগে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আকর্ষণীয় ভিডিও বানানোই যথেষ্ট নয়। কনটেন্টের স্বচ্ছ লেবেলিং, লাইসেন্সিং ও ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
বড় স্টুডিওর উদ্বেগ থাকলেও ছোট প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে কম বাজেটের স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও ও মাইক্রো ড্রামার ক্ষেত্রে।
এশিয়ায় দুই মিনিটের কম দৈর্ঘ্যের বহু পর্বের মাইক্রো ড্রামা জনপ্রিয় হচ্ছে, যেগুলো সাধারণত সীমিত বাজেটে তৈরি হয়। আগে বাজেটের কারণে রোমান্স বা পারিবারিক গল্পেই সীমাবদ্ধ থাকতে হতো। কিন্তু উন্নত এআই ব্যবহার করে এখন বিজ্ঞান কল্পকাহিনি, ঐতিহাসিক নাটক কিংবা অ্যাকশনধর্মী কনটেন্টও তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ইউটিউব, ফেসবুক ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে স্বল্প বাজেটের কনটেন্ট নির্মাতারা এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করলে মান উন্নয়ন সম্ভব হতে পারে। তবে এর সঙ্গে আইনি ও নৈতিক সচেতনতা জরুরি।
সিড্যান্স নতুন করে চীনের প্রযুক্তি খাতকে আলোচনায় এনেছে। এর আগে চীনা এআই মডেল ডিপসিক (DeepSeek) বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলেছিল।
চীন সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিক্সকে অর্থনৈতিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করছে। উন্নত চিপ উৎপাদন, অটোমেশন ও জেনারেটিভ এআইতে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে বড় বিনিয়োগ।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সাল চীনে এআই প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের মোড় ঘোরানোর বছর হতে পারে। শুধু চ্যাটবট নয়, দৈনন্দিন কাজ, লেনদেন, কোডিং ও ভিডিও তৈরিতেও এআই নিয়মিত ব্যবহৃত হতে পারে।
সিড্যান্স ২.০ দেখিয়ে দিয়েছে, এআই প্রযুক্তি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে সিনেমার মতো মানের ভিডিও তৈরি করা সম্ভব। এটি যেমন সৃজনশীলতার নতুন দুয়ার খুলছে, তেমনি কপিরাইট, নৈতিকতা ও কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই প্রযুক্তি বড় সুযোগ হতে পারে, যদি তা দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করা হয়। ভবিষ্যতের সৃজনশীল জগতে মানুষ ও এআইয়ের সহাবস্থানই সম্ভবত হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা।
সূত্র : বিবিসি




