ঢাকা শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
নির্বাচন সর্বশেষ
Live Icon ●LIVE

এশিয়া পোস্ট স্যাটায়ার

ঈদে বাসের টিকিট ফ্রি, ভাড়া নিতে চালকদের হাতে-পায়ে ধরছেন যাত্রীরা

এশিয়া পোস্ট স্যাটায়ার

  ১৯ মার্চ ২০২৬, ১২:০৭
যাত্রীদের বাস ভাড়া দেওয়ার এআই জেনারেটেড প্রতীকী ছবি।

গাবতলী বাস টার্মিনালে আজ এক অদ্ভুত, গা ছমছমে নীরবতা। প্রতি বছর ঈদের আগে এই টার্মিনালের যে রূপ থাকে, তার সঙ্গে আজকের চিত্রের কোনো মিল নেই। সাধারণত এই সময়ে বাতাসে ভাসে ঘাম, ধুলো আর বাসের পোড়া মবিলের গন্ধ। কানে তালা লেগে যাওয়ার মতো চিৎকারে হেলপাররা ডাকতে থাকেন, ‘রংপুর-দিনাজপুর-বগুড়া! ডাইরেক্ট সিট, কোনো লোকাল নাই!’ যাত্রীরা একে অপরের ঘাড়ে উঠে, কাউন্টারের ছোট ছিদ্র দিয়ে হাত গলিয়ে টিকিট নামক সোনার হরিণ ছিনিয়ে আনার যুদ্ধে লিপ্ত হন। কিন্তু এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।

পরিবর্তন অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

টার্মিনালে ঢুকতেই শোনা গেল এক কাউন্টার মাস্টারের মধুমাখা কণ্ঠস্বর, ‘আসুন স্যার, ভেতরে আসুন। এসি চলছে, সোফায় বসুন। চা খাবেন নাকি ঠান্ডা?’

এবারের ঈদযাত্রার আগে এক মন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মৃদু হেসে ঘোষণা করেছিলেন, ‘এবারের ঈদে পরিবহনের ভাড়া সমঝোতার মাধ্যমে স্বাভাবিকের চেয়েও অনেক কম।’ মন্ত্রীর এই বক্তব্যের পরপরই দেশের স্বনামধন্য যাত্রী কল্যাণ সমিতি একটি জাঁকজমকপূর্ণ সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করে বসে, ‘গত ২০ বছরের মধ্যে এবার বাসের ভাড়া সবচেয়ে বেশি! যাত্রীদের রীতিমতো সমঝোতার মাধ্যমে গলাকাটা হচ্ছে।’

সাধারণ মানুষ পড়ল এক মহা ধন্দে। মন্ত্রী বলছেন ভাড়া কম, সমিতি বলছে ২০ বছরের রেকর্ড ভাঙা বেশি! কিন্তু আসল সত্যটা বেরিয়ে এলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। গত দুদিন ধরে ফেসবুকে রীতিমতো ঝড় বইছে। মানুষজন স্ট্যাটাস দিচ্ছে, ট্রল করছে, মিম বানাচ্ছে। কারণ, বাস্তবে এবার বাসের ভাড়া কমও নয়, বেশিও নয়; বরং এবার বাস ভাড়া নিচ্ছেই না! পরিবহন মালিকরা মন্ত্রীর কথাকে এমনভাবে অন্তরে ধারণ করেছেন যে, তারা যাত্রীদের কাছ থেকে এক পয়সাও নিতে রাজি নন। উল্টো যাত্রীরা জোর করে ভাড়া দিতে গিয়ে বাসের হেলপার, ড্রাইভার আর কাউন্টার মাস্টারদের হাতে-পায়ে ধরছেন।

দৃশ্যপট ১: গাবতলী কাউন্টারে হাহাকার

রহিম সাহেব একজন আদ্যোপান্ত মধ্যবিত্ত বাঙালি। প্রতি বছর ঈদে বাড়ি যাওয়ার সময় বাসের টিকিট কাটতে গিয়ে তার মাসিক বেতনের এক-তৃতীয়াংশ হাওয়া হয়ে যায়। এবারও তিনি প্যান্টের পকেটে দশ হাজার টাকা গুঁজে, বুক ফুলিয়ে গাবতলী এসেছেন। মনে মনে প্রস্তুতি নিয়ে এসেছেন, কাউন্টার মাস্টার ৫ হাজার চাইলে তিনি ৩ হাজার বলে দরদাম শুরু করবেন।

তিনি শ্যামলী-হানিফ- নাবিল-এর মতো কোনো এক বিলাসবহুল বাসের কাউন্টারে গিয়ে স্বভাবসুলভ রাগী গলায় বললেন, ‘ভাই, রংপুরের দুইটা টিকিট দেন। কত করে?’

কাউন্টার মাস্টার রহমান সাহেব অত্যন্ত বিনীতভাবে হেসে বললেন, ‘স্যার, জিরো টাকা। মানে একদম ফ্রি। আপনি যে আমাদের বাসে উঠে রংপুর যেতে রাজি হয়েছেন, এটাই আমাদের বড় পাওয়া। এই নিন স্যার আপনার টিকিট, আর এই নিন কমপ্লিমেন্টারি দুই বোতল মিনারেল ওয়াটার।’

রহিম সাহেবের চোখ কপালে উঠে গেল। তিনি ভাবলেন, নিশ্চয়ই কোনো নতুন ধরনের স্ক্যাম। তিনি গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বললেন, ‘রহমান ভাই, আমি তো আর মিডিয়ার লোক না। আমাকে আসল কথা কন। ঈদের বকশিশসহ কত দেব? এই নেন দুই হাজার টাকা, চুপিচুপি পকেটে রাইখা দেন।’

রহমান সাহেব টাকা দেখে রীতিমতো আঁতকে উঠলেন। তিনি দুই হাত জোড় করে বললেন, ‘আরে স্যার করেন কী! করেন কী! কেউ দেখে ফেলবে তো! মন্ত্রী মহোদয় বলেছেন ভাড়া কম, মালিক সমিতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কম হতে হতে এটা এখন শূন্যের কোঠায় নেমেছে। আমরা যদি আপনার কাছ থেকে এক টাকাও নিই, আমাদের চাকরি তো যাবেই, সঙ্গে মালিক আমাদের গাবতলী থেকে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেবে। দয়া করে টাকাটা পকেটে রাখুন স্যার। আমাকে বিপদে ফেলবেন না।’

রহিম সাহেব এবার রেগে গেলেন, ‘কী আশ্চর্য! আমি কি ফকিন্নির পুত নাকি যে মাগনা বাসে যামু? আমার টাকা আছে! আমি ঈদ করতে বাড়ি যাচ্ছি, পকেট কেটে রক্ত বের না হলে কি ঈদের ফিল আসে? আপনারা আমার কাছ থেকে টাকা নেবেন, আমি গালি দেব, তবেই না মনে হবে ঈদযাত্রা! টাকা আপনাকে রাখতেই হবে!’

রহিম সাহেব জোর করে এক হাজার টাকার একটা নোট রহমান সাহেবের পকেটে গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। রহমান সাহেব হাউমাউ করে কেঁদে উঠে কাউন্টারের টেবিলের নিচে লুকিয়ে পড়লেন, ‘বাঁচান! আমাকে জোর করে টাকা দিচ্ছে! কেউ পুলিশ ডাকেন!’

দৃশ্যপট ২: মহাসড়কে চলন্ত বাসে আবেগময় দৃশ্য

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে চলছে একটি যাত্রীবাহী বাস। বাসের ভেতরের পরিবেশ থমথমে। যাত্রীদের চোখেমুখে এক অদ্ভুত অপরাধবোধ। বাসের হেলপার, যার নাম মফিজ, সে যাত্রীদের মাঝে ট্রে-তে করে প্যাকেট বিরিয়ানি আর কোল্ড ড্রিংকস বিতরণ করছে।

পেছনের সিট থেকে এক বয়স্ক যাত্রী, নাম কদ্দুস মিয়া, মফিজের হাত চেপে ধরলেন। কদ্দুস মিয়ার চোখে পানি। তিনি কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, ‘বাবা মফিজ, তুই আমার সন্তানের মতো। প্রতি বছর তুই মুড়ার সিটে (টুলের ওপর) বসাইয়া আমার কাছ থিকা ৮০০ টাকা নিস। এবার আমি এসির নিচে নরম সিটে বসে যাচ্ছি, আর তুই আমাকে বিরিয়ানি খাওয়াচ্ছিস। আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে বাবা। এই নে পাঁচশ টাকা, অন্তত তোর চা-পানের খরচ রাখ।’

মফিজ চোখের পানি মুছতে মুছতে নিজের গামছা দিয়ে কদ্দুস মিয়ার হাতটা সরিয়ে দিল। ‘না চাচা, আমারে পাপের ভাগী করবেন না। আমি টাকা ছুঁতে পারমু না। আমার ইউনিয়ন লিডার বইলা দিছে, কোনো হেলপার যদি যাত্রীর কাছ থেকে একটা টাকাও নেয়, তারে বাসের চাকায় বাইন্ধা ঢাকা টু চট্টগ্রাম ঘুরাইবো। আপনারা শান্তিমতো বিরিয়ানি খান। লাগলে আরও দুই প্যাকেট দিমু, কিন্তু টাকার কথা কইবেন না।’

বাসের আরেক যাত্রী, আধুনিক তরুণ ফয়সাল, স্মার্টফোন বের করে লাইভে চলে গেল। ‘হ্যালো গাইজ! আমি এখন হাইওয়েতে আছি। আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, এই বাসের স্টাফরা আমাদের জিম্মি করে ফেলেছে! তারা কোনোভাবেই আমাদের কাছ থেকে ভাড়া নিচ্ছে না! আমরা জোর করে টাকা দিতে গেলে তারা বাস খাদে ফেলে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে! প্লিজ কেউ আমাদের বাঁচান! আমরা আমাদের কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে টিকিট কিনতে চাই!’

দৃশ্যপট ৩: ফেসবুকের টাইমলাইনে ব্যঙ্গর বন্যা

এদিকে ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) আর টিকটকে রীতিমতো মিমের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। নেটিজেনরা তাদের সৃজনশীলতার চূড়ান্ত পর্যায় প্রদর্শন করছেন।

এক তরুণ স্ট্যাটাস দিয়েছেন: ‘বাসের কন্ডাক্টরকে বললাম, ভাই ১০০ টাকা রাখেন। সে আমাকে উল্টো ৫০০ টাকা দিয়ে বলল, 'স্যার, আপনার প্যান্টের পকেট ছেঁড়া, এই টাকা দিয়ে নতুন প্যান্ট কিনে নিয়েন, কিন্তু ভাড়ার কথা বলবেন না।' আমি এখন চরম ডিপ্রেশনে ভুগছি।’

আরেকজনের মিম: একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একজন যাত্রী বাসের টায়ারের নিচে শুয়ে আছেন, আর ড্রাইভারকে বলছেন, ‘আমার কাছ থেকে ডাবল ভাড়া না নিলে আমি বাসের চাকার নিচ থেকে উঠব না। আমার ইগোতে লেগেছে!’

হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ডিং চলছে: #WeWantToPay, #আমাদের_ভাড়া_নেওয়ার_অধিকার_ফিরিয়ে_দাও, #গলাকাটা_ভাড়া_আমাদের_ঐতিহ্য।

একটি ভাইরাল টিকটক ভিডিওতে দেখা গেল, একজন যাত্রী বাসের সাইলেন্সার পাইপের ভেতরে জোর করে ৫০০ টাকার নোট গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা করছেন, কারণ বাসের কেউ তার টাকা নিতে রাজি হয়নি। তিনি ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে করুণ সুর লাগিয়ে ভিডিওতে লিখেছেন, ‘টাকা আজ বড়ই সস্তা, নেওয়ার মানুষ নেই।’

দৃশ্যপট ৪: বিশেষজ্ঞ মহলে চরম বিভ্রান্তি

যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রধান, যিনি গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দিনরাত এক করে এক্সেল শিটে ডাটা এন্ট্রি করে ২০ বছরের বাসের ভাড়ার ইতিহাস ঘেঁটে একটি রিপোর্ট তৈরি করেছিলেন, তিনি এখন গভীর হতাশায় নিমজ্জিত। তার রিপোর্টের শিরোনাম ছিল, ‘ঈদে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ভাড়া আদায়।’ কিন্তু এখন তিনি বুঝতে পারছেন না, জিরো (০) টাকাকে কীভাবে ‘সর্বোচ্চ ভাড়া’ হিসেবে প্রমাণ করবেন।

তিনি তড়িঘড়ি করে একটি জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডাকলেন। সেখানে তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন, ‘এটি যাত্রীদের বিরুদ্ধে এক গভীর ষড়যন্ত্র! পরিবহন মালিকরা ফ্রিতে বাস সার্ভিস দিয়ে যাত্রীদের মানসিক নির্যাতনের শিকার করছেন। আমাদের দেশের যাত্রীরা প্রতি বছর ঈদে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে, বাসের ছাদে চড়ে, হেলপারের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করে বাড়ি যাওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে। এটা তাদের এক ধরনের অ্যাডভেঞ্চার। ফ্রিতে এসি বাসে শুয়ে-বসে বাড়ি পাঠানো তাদের মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন! আমরা অবিলম্বে আগের মতো তিনগুণ ভাড়া আদায়ের দাবি জানাচ্ছি। যাত্রীদের পকেট কাটার অধিকার তাদের ফিরিয়ে দিতে হবে!’

এদিকে একজন বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী একটি টকশোতে এসে গম্ভীর মুখে বললেন, “দেখুন, বাঙালি জাতি হলো সংগ্রাম প্রিয়। তারা যখন দেখে যে কোনো কষ্ট ছাড়াই তারা বাড়ি পৌঁছে যাচ্ছে, তখন তাদের মধ্যে এক ধরনের আইডেন্টিটি ক্রাইসিস বা আত্মপরিচয়ের সংকট দেখা দেয়। তারা ভাবতে শুরু করে, ‘আমি কি আসলেই বাড়ি যাচ্ছি, নাকি মরে গিয়ে বেহেশতে চলে এসেছি?’ এই ফ্রিতে বাস সেবা আমাদের সামাজিক কাঠামোর জন্য এক মারাত্মক হুমকি। মানুষের সহ্যশক্তি কমে যাবে!”

দৃশ্যপট ৫: রাজপথে যাত্রীদের আন্দোলন

ঈদের ঠিক দুদিন আগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল। গাবতলী ও সায়েদাবাদ টার্মিনালে হাজার হাজার যাত্রী বিক্ষোভ শুরু করলেন। তাদের হাতে প্ল্যাকার্ড। প্ল্যাকার্ডে লেখা, ‘মাগনা যাত্রা মানি না, মানব না’, ‘আমার টাকা, আমার অধিকার’, ‘হেলপার ভাই, ভাড়া নে, নইলে আমার বুকে গুলি কর।’

যাত্রীরা বাসের সামনে শুয়ে পড়ে রাস্তা অবরোধ করলেন। তাদের একটাই দাবি—বাস মালিকদের অতিরিক্ত ভাড়া নিতেই হবে।

আন্দোলনরত এক যাত্রী, যিনি একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন, গণমাধ্যমের সামনে মাইক্রোফোন পেয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন। ‘ভাই, সারা বছর বসের গালি খাই, বউয়ের ঝাড়ি খাই। আমার জীবনের একমাত্র বিনোদন ছিল ঈদের সময় বাসের হেলপারের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে তুমুল ঝগড়া করা। ওই ঝগড়াটা না করলে আমার মনেই হয় না যে ঈদ এসেছে। এরা আমার কাছ থেকে সেই আনন্দটুকু কেড়ে নিয়েছে। আমি ফ্রিতে বাড়ি যাব না! আমি ডাবল ভাড়া দিয়ে, বাসের ইঞ্জিনের কভারের ওপর বসে, গরমে সিদ্ধ হয়ে বাড়ি যেতে চাই! প্লিজ, আমাদের আগের দিনগুলো ফিরিয়ে দিন!’

দৃশ্যপট ৬: গন্তব্যে পৌঁছানোর পর মহানাটক

সব বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে, ফ্রিতে এসি বাসে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে যাত্রীরা যখন তাদের নিজ নিজ গন্তব্যে, যেমন—রংপুর, রাজশাহী বা সিলেটে পৌঁছালেন, তখন শুরু হলো আরেক মহানাটক।

বাস থেকে নামার সময় যাত্রীরা একজোট হলেন। তারা সিদ্ধান্ত নিলেন, বাসের স্টাফদের হাতে টাকা না দেওয়া পর্যন্ত কেউ বাস থেকে নামবেন না। ড্রাইভার সাহেব বাস থামিয়ে দরজা খুলে দিয়ে বললেন, ‘স্যার, আপনারা পৌঁছে গেছেন। এবার দয়া করে নেমে যান। আপনাদের ঈদ শুভ হোক।’

কিন্তু যাত্রীরা সিট থেকে উঠছেন না। তারা সবাই পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে টাকা হাতে নিয়ে বসে আছেন। রহিম সাহেব বাসের ভেতর থেকে লিড দিচ্ছেন। তিনি বললেন, ‘ড্রাইভার ভাই, আমরা নামব, কিন্তু তার আগে আপনাকে আমাদের কাছ থেকে জনপ্রতি ১৫০০ টাকা করে নিতে হবে। আপনি টাকা না নিলে আমরা এই বাসেই ঈদ করব। দরকার হলে এই বাসকেই আমরা আমাদের স্থায়ী ঠিকানা বানাব।’

ড্রাইভার এবং হেলপার মফিজ দুজনেই ভয়ে কাঁপতে শুরু করলেন। মফিজ বলল, ‘স্যার, আপনারা আমাদের পেটে লাথি মারবেন না। আমরা টাকা নিলে মালিক আমাদের জ্যান্ত কবর দিয়ে দেবে। আপনারা দয়া করে নেমে যান। আপনাদের পায়ে ধরি স্যার!’ এই বলে হেলপার মফিজ সত্যি সত্যিই রহিম সাহেবের পায়ের কাছে বসে পড়ল।

রহিম সাহেব পা সরিয়ে নিয়ে বললেন, ‘আরে ভাই, তুমি আমার পায়ে ধরো কেন? আমি তোমার পায়ে ধরছি। এই নাও টাকা!’ রহিম সাহেবও বাসের ফ্লোরে বসে মফিজের পা চেপে ধরলেন।

শুরু হলো এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা। যাত্রীরা বাসের স্টাফদের পায়ে ধরছেন টাকা নেওয়ার জন্য, আর স্টাফরা যাত্রীদের পায়ে ধরছেন টাকা না দিয়ে বাস থেকে নেমে যাওয়ার জন্য। পুরো বাসের ভেতর এক আবেগঘন, অথচ চরম হাস্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো।

শেষমেশ যাত্রীরা এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করলেন। তারা সবাই একসাথে নিজেদের হাতের টাকাগুলো ড্রাইভারের ক্যাবিনের দিকে ছুড়ে মারলেন। টাকার বৃষ্টিতে ড্রাইভার আর হেলপার ঢেকে গেলেন। এরপর যাত্রীরা হুড়মুড় করে বাস থেকে নেমে ভোঁ দৌড় দিলেন, যেন কোনো বিশাল বড় অপরাধ করে পালিয়ে যাচ্ছেন।

ড্রাইভার আর হেলপার সেই টাকার স্তূপের ভেতর বসে রইলেন। তাদের চোখেমুখে আতঙ্ক। এখন এই টাকা তারা কী করবেন? মালিক তো তাদের আস্ত রাখবে না!

বাড়ি পৌঁছে রহিম সাহেব ড্রয়িংরুমে সোফায় হেলান দিয়ে বসলেন। তার শরীর একদম ফুরফুরে, কোনো ক্লান্তি নেই। রাস্তায় কোনো জ্যাম ছিল না, কেউ তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেনি, এমনকি বাসে তাকে ফ্রিতে বিরিয়ানিও খাওয়ানো হয়েছে। কিন্তু তার মনের ভেতর এক গভীর শূন্যতা।

তিনি তার স্ত্রীকে ডেকে বললেন, ‘বুঝলা, এবারের ঈদটা একদম মাটি হয়ে গেল।’

স্ত্রী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেন? কোনো সমস্যা হয়েছে রাস্তায়?’

রহিম সাহেব দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘না, কোনো সমস্যা হয়নি। এটাই তো সবচেয়ে বড় সমস্যা। কেউ আমার পকেট কাটল না, কেউ আমাকে মুড়ার সিটে বসাল না, কেউ গলাকাটা ভাড়া চাইল না। এ কেমন ঈদ? কোথায় গেল আমাদের সেই ঐতিহ্য? কোথায় গেল আমাদের সেই সংগ্রাম? মন্ত্রী মহোদয় আর পরিবহন মালিকরা মিলে আমাদের ঈদের আসল আনন্দটাই কেড়ে নিল!’

বাইরে তখন ঈদের চাঁদ দেখা গেছে। পাড়ার মসজিদে মাইকে ঘোষণা হচ্ছে, ‘আগামীকাল পবিত্র ঈদুল ফিতর।’ কিন্তু দেশের হাজার হাজার যাত্রীর মনে আজ কোনো আনন্দ নেই। তাদের একটাই আক্ষেপ—পরবর্তী ঈদে অন্তত যেন বাসের ভাড়াটা তিনগুণ বেশি নেওয়া হয়, যাতে তারা আবার বুক ফুলিয়ে বলতে পারেন, ‘ঈদযাত্রা মানেই তো একটু কষ্ট, আর একটু গলাকাটা ভাড়া!’

[সতর্কীকরণ: ঈদ উপলক্ষে বাস ভাড়া নিয়ে লিখিত উপরোক্ত বিষয়টি স্যাটায়ার বা রম্য লেখা। পাঠকের বিনোদনের উদ্দেশ্যে এশিয়া পোস্ট স্যাটায়ারটি লিখেছে। বিষয়টি বাস্তব ভেবে পাঠককে বিভ্রান্ত না হতে সতর্ক করা হলো।]

ডিকশনারি থেকে ‘গুপ্ত’ শব্দ ডিলিট, বিপদে বাংলা একাডেমি
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ড. মফিজুর রহমান (ছদ্মনাম) সকালবেলা সবেমাত্র তার প্রিয় দার্জিলিং চায়ে চুমুক দিয়েছেন, এমন সময় তার খাসকামরার দরজা সজোরে খুলে গেল। হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে ঢুকলেন একাডেমির প্রধান আভিধানিক (ডিকশনারি সম্পাদক) অধ্যাপক তোফাজ্জল হোসেন। তার এক হাতে একটি দৈনিক পত্রিকা, অন্য হাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি ফাইল এবং বগলের নিচে একটি হেলমেট। মহাপরিচালক ভ্রু কুঁচকে বললেন, ‘কী ব্যাপার তোফাজ্জল সাহেব? আপনি অফিসে হেলমেট নিয়ে এসেছেন কেন? আর আপনার চেহারা এমন ফ্যাকাশে কেন? কোনো নতুন শব্দের বানান নিয়ে আবার ফেসবুকে ট্রল শুরু হয়েছে নাকি? ‘গরু’ বানানে কি আবার কেউ হ্রস্ব-উ কারের বদলে দীর্ঘ-ঊ কার দিয়ে বসেছে?’ তোফাজ্জল সাহেব ঢোক গিলে বললেন, “স্যার, পরিস্থিতি তার চেয়েও ভয়াবহ। ‘গরু’ বানান নিয়ে কেউ মাথা ঘামাচ্ছে না। সমস্যা শুরু হয়েছে ‘গুপ্ত’ নিয়ে। এই একটা শব্দের কারণে দেশে রীতিমতো গৃহযুদ্ধ লেগে যাওয়ার উপক্রম। চট্টগ্রামের এক কলেজে এই শব্দ নিয়ে মারামারি করে ২০ জনের মাথা ফেটেছে, একজনের পায়ের গোড়ালি প্রায় বিচ্ছিন্ন! আর এখন…” “আর এখন কী?” মহাপরিচালক চায়ের কাপ নামিয়ে রাখলেন। “আর এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে লাল খামে জরুরি নোটিশ এসেছে। তারা বলেছে, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বাংলা একাডেমিকে ‘গুপ্ত’ শব্দের একটি সর্বজনীন, অরাজনৈতিক, নিরীহ এবং ‘অহিংস’ অর্থ নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে। নইলে আমাদের সবার চাকরি নট। শুধু তাই নয়, স্যার, নিচতলায় দুই দলের ছাত্রনেতারা এসে অবস্থান নিয়েছে। একদল বলছে ‘গুপ্ত’ শব্দটাকে অভিধান থেকে চিরতরে মুছে ফেলতে হবে, আরেক দল বলছে শব্দটা অভিধানে রাখতে হবে, তবে ব্র্যাকেটে লিখে দিতে হবে যে এটা শুধু বিরোধী দলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য!” মহাপরিচালক ড. মফিজুর রহমান দুই হাতে মাথা চেপে ধরলেন। তার মনে হলো, সাহিত্য চর্চা ও অভিধান প্রণয়নের মতো এমন নিরীহ পেশায় না এসে যদি তিনি বর্ডার গার্ডে যোগ দিতেন, তবে জীবনটা অনেক বেশি নিরাপদ ও শান্তিময় হতো। ‘গুপ্’ ধাতুর ময়নাতদন্ত ও ইমারজেন্সি মিটিং: বেলা ১১টায় বাংলা একাডেমির সভাকক্ষে জরুরি সভা ডাকা হলো। দেশের বাঘা বাঘা ভাষাবিজ্ঞানী, ব্যাকরণবিদ, এবং কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপককে ঘুম থেকে ডেকে আনা হয়েছে। সভার বিষয়বস্তু: ‘গুপ্ত’ শব্দের রাজনৈতিক পুনর্বাসন। সভার শুরুতে মহাপরিচালক গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, ‘উপস্থিত সুধীমণ্ডলী, আপনারা নিশ্চয়ই জানেন দেশ আজ এক গভীর ভাষাতাত্ত্বিক সংকটের মুখোমুখি। একটি মাত্র শব্দ, যার জন্ম আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগে, সেটি আজ আমাদের জাতীয় নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। আমাদের আজ সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এই ‘গুপ্ত’ শব্দটিকে আমরা কীভাবে নিষ্ক্রিয় করতে পারি। বোম ডিসপোজাল ইউনিটের মতো আজ আমাদের ওয়ার্ড ডিসপোজাল ইউনিট হিসেবে কাজ করতে হবে।’ প্রবীণ ভাষাবিজ্ঞানী ড. আসজাদুল হক তার মোটা চশমার ফ্রেমটা ঠিক করে বললেন, ‘কিন্তু স্যার, এটা তো ব্যাকরণগতভাবে অসম্ভব। সংস্কৃত ‘গুপ্’ ধাতুর সঙ্গে ‘ক্ত’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ‘গুপ্ত’ শব্দের উৎপত্তি। এর অর্থ হলো যা গোপন করা হয়েছে বা লুক্কায়িত। আমরা তো আর ব্যাকরণের ধাতু পরিবর্তন করতে পারি না। হাজার হাজার বছর ধরে…।’ তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে এক তরুণ গবেষক টেবিল চাপড়ে বলে উঠলেন, ‘রাখেন আপনার ‘গুপ্’ ধাতু! দেশে যখন মানুষের পায়ের গোড়ালি থাকে না, তখন আপনার ধাতুর কী দরকার? আপনি কি জানেন এই ধাতুর কারণে কতগুলো মায়ের বুক খালি হওয়ার জোগাড় হয়েছে? আমি প্রস্তাব করছি, ‘গুপ্’ ধাতুকে অবিলম্বে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হোক। এটি একটি প্রতিক্রিয়াশীল ধাতু। এটি বৈষম্যমূলক ধাতু।’ ড. আসজাদুল হক হতবাক হয়ে বললেন, ‘ধাতু আবার প্রতিক্রিয়াশীল হয় কীভাবে।’ তরুণ গবেষক খেঁকিয়ে উঠলেন, ‘অবশ্যই হয়। যে ধাতু প্রকাশ্যে থাকতে পারে না, যে ধাতু লুকিয়ে থাকে, তাকে কোনোভাবেই প্রগতিশীল বলা যায় না। আমি তো মনে করি কৌটিল্য তার অর্থশাস্ত্রে এই ‘গুপ্তচর’ শব্দটা বানিয়েছিলেনই আজকের এই রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করার জন্য। এটা প্রাচীন ভারতের একটা মাস্টারপ্ল্যান।’ মহাপরিচালক হাত তুলে সবাইকে শান্ত করলেন। ‘দয়া করে ইতিহাস আর ব্যাকরণ নিয়ে ঝগড়া করবেন না। আমাদের প্র্যাকটিক্যাল সমাধানে আসতে হবে। আমরা যদি অভিধান থেকে ‘গুপ্ত’ শব্দটা বাদ দিয়ে দিই, তাহলে কী কী সমস্যা হতে পারে, তার একটা তালিকা করুন।’ শব্দার্থ বদলের মহোৎসব ও অভিধানের সংকট তালিকা করতে গিয়ে দেখা গেল, পরিস্থিতি ‘প্যান্ডোরাস বক্স’ খোলার চেয়েও ভয়ংকর। ‘গুপ্ত’ শব্দটা বাদ দিলে বাংলা ভাষার অর্ধেক রোমাঞ্চ আর সাহিত্যিক সৌন্দর্য ধসে পড়বে। প্রধান আভিধানিক তোফাজ্জল সাহেব একে একে সমস্যাগুলো তুলে ধরতে লাগলেন: গুপ্তধন: “স্যার, ‘গুপ্ত’ বাদ দিলে ‘গুপ্তধন’-এর কী হবে? আমাদের রূপকথার গল্পগুলোতে তো আর ‘প্রকাশ্যধন’ বলা যাবে না। আলি বাবা ও চল্লিশ চোর কি তাহলে ‘প্রকাশ্য গুহায়’ ‘ওপেন ধন’ খুঁজবে? আর ট্রেজার হান্ট বা গুপ্তধন খোঁজার যে থ্রিলার বইগুলো আছে, সেগুলোর নাম কী হবে? ‘জনসম্মুখে রক্ষিত ধনতন্ত্র’?” গুপ্তচর: ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা ‘গুপ্তচর’ নিয়ে। জেমস বন্ড থেকে শুরু করে মাসুদ রানা—এঁদের পেশা কী হবে? আমরা কি তাদের ‘তথ্য-উন্নয়ন কর্মী’ বা ‘সরাসরি সম্প্রচারিত এজেন্ট’ বলব? জেমস বন্ড কি এসে বলবে, ‘মাই নেম ইজ বন্ড, জেমস বন্ড, আমি একজন প্রকাশ্য-চর’?” গুপ্তহত্যা: ‘পত্রিকায় রোজ লেখা হয় ‘গুপ্তহত্যা’। এখন কি লিখতে হবে ‘অজ্ঞাত পরিচয়ে ওপেন-হত্যা’ বা ‘সারপ্রাইজ কিলিং’? চিকিৎসাবিজ্ঞানের চরম সংকট (গুপ্তাঙ্গ): “স্যার, সবচেয়ে সেনসিটিভ বিষয় হলো চিকিৎসাবিজ্ঞান। অ্যানাটমি বইয়ে ‘গুপ্তাঙ্গ’ বলে একটা শব্দ আছে। এখন চিকিৎসকরা তো মহাবিপদে পড়েছেন। এক রোগী নাকি কাল ডাক্তারকে গিয়ে বলেছে, ‘ডাক্তার সাহেব, আমার প্রকাশ্যাঙ্গে ইনফেকশন হয়েছে!’ ডাক্তার তো শুনে বেহুঁশ। এখন আমরা কি অভিধানে লিখব— ‘যে অঙ্গ সাধারণত কাপড়ে ঢাকা থাকে কিন্তু রাজনৈতিক কারণে যাকে আর গুপ্ত বলা যাবে না’?” গুপ্ত সমিতি: ইতিহাসের বই থেকে বাংলার বিপ্লবীদের কী হবে? ‘অনুশীলন সমিতি’ বা ‘যুগান্তর’ দল তো ছিল গুপ্ত সমিতি। মাস্টারদা সূর্য সেন কি তাহলে ‘গুপ্ত’ ছিলেন না? ইতিহাস বইয়ের লেখকরা ফোন করে জানতে চাইছেন, তারা কি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ‘প্রকাশ্য বিপ্লব’ লিখে ইতিহাস পাল্টে ফেলবেন কি না। সব শুনে মহাপরিচালক ড. মফিজুর রহমান ঘামতে শুরু করলেন। তিনি পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছলেন। “বুঝতে পারছি, শব্দটা বাদ দেওয়া যাবে না। তাহলে এর অর্থ পরিবর্তন করে দেওয়া হোক। ‘গুপ্ত’ মানে লিখে দেওয়া হোক— ‘এমন কিছু যা আসলে প্রকাশ্য, কিন্তু দেখার সুবিধার্থে একটু আড়ালে রাখা হয়েছে’।” দেশজুড়ে ‘গুপ্ত’ আতঙ্ক ও নাম পরিবর্তনের হিড়িক বাংলা একাডেমিতে যখন রুদ্ধদ্বার বৈঠক চলছে, তখন সারা দেশে ‘গুপ্ত’ শব্দটি নিয়ে শুরু হয়েছে চরম সোশ্যাল হিস্টেরিয়া। সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন সেসব নিরীহ মানুষ, যাদের নামের শেষে ‘গুপ্ত’ পদবি যুক্ত আছে। সেনগুপ্ত, দাশগুপ্ত, দত্তগুপ্ত—এই পদবির মানুষেরা হঠাৎ করেই নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে চরম আতঙ্কে ভুগছেন। পরদিন সকালে ঢাকা জজকোর্টের সামনে নোটারি পাবলিকের অফিসে দেখা গেল বিশাল লম্বা লাইন। সবার হাতে এফিডেভিট বা হলফনামার কাগজ। নোটারি পাবলিকের এক উকিল ক্লান্ত গলায় ডাকলেন, “পরবর্তী জন আসুন। আপনার নাম কী?” লোকটি কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “আজ্ঞে, আমার নাম ভবেশ দাশগুপ্ত।” উকিল চমকে উঠে বললেন, “আস্তে! আস্তে বলুন! কেউ শুনে ফেললে আপনাকে ধরে পিটুনি দেবে। আপনি কি জানেন না দেশে এখন ‘গুপ্ত’ নিষিদ্ধ? তা, কী করতে চান?” ভবেশ বাবু বললেন, “স্যার, আমার পদবিটা বদলে দিন। পাড়ার মোড়ে দাঁড়ালে ছেলেপেলেরা আমাকে দেখে বলছে, ‘ঐ দেখ, একটা গুপ্ত যাচ্ছে! নিশ্চয়ই ও ভেতরে ভেতরে অন্য কোনো দলের স্লিপার সেল!’ আমার তো স্যার ভয়ে রাতে ঘুম হচ্ছে না। আমার পদবিটা পরিবর্তন করে ‘দাশ-প্রকাশ্য’ করে দিন। অথবা ‘দাশ-স্বচ্ছ’ করে দিন। ট্রান্সপারেন্সি থাকা দরকার, স্যার।” পাশের লাইন থেকে আরেক ভদ্রলোক বলে উঠলেন, “আমার নাম সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত। আমি আজ থেকে ‘সমরেন্দ্র সেন-ওপেন’। ফেসবুকে নাম বদলে দিয়েছি। কেউ আমাকে আর ‘গুপ্ত’ বলে সন্দেহ করতে পারবে না। আমি এখন থেকে পুরোপুরি ওপেন সোর্স!” শুধু তাই নয়, ইতিহাস বইতেও সেলফ-সেন্সরশিপ শুরু হয়ে গেল। স্কুলের এক প্রধান শিক্ষক তার নিজস্ব উদ্যোগে ইতিহাসের বই থেকে ‘গুপ্ত সাম্রাজ্য’ অধ্যায়ের ওপর কালো কালি লেপে দিয়েছেন। তিনি ছাত্রদের পড়াচ্ছেন, “প্রাচীন ভারতে মৌর্য সাম্রাজ্যের পর একটি সাম্রাজ্য এসেছিল, যার নাম মুখে আনা নিষেধ। তবে তারা খুব ক্ষমতাশালী ছিল। প্রথম চন্দ্র[সেন্সরড] ছিলেন এই সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা।” হোটেল-রেস্তোরাঁয় খাবারের মেনু থেকেও ‘গুপ্ত’ শব্দটি উধাও হয়ে গেল। পুরান ঢাকার এক বিখ্যাত কাবাবের দোকানের স্পেশাল আইটেম ছিল ‘গুপ্ত কাবাব’ (ভেতরে কিমা লুকানো থাকে বলে এই নাম)। মালিক ভয়ে সেই রাতেই সাইনবোর্ড পাল্টে লিখলেন: “এখানে ১০০% প্রকাশ্য কাবাব পাওয়া যায়। কাবাবের ভেতরে কোনো রাজনৈতিক বা আদর্শিক কিমা লুকানো নেই। সব ওপেন।” ছাত্রনেতাদের আলটিমেটাম ও একাডেমির ঘেরাও: দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই বাংলা একাডেমি চত্বরে স্লোগান শোনা গেল। “গুপ্ত শব্দের আস্তানা—ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও!” “যে শব্দ গোড়ালি কাটে—সেই শব্দের গালে গালে, জুতো মারো তালে তালে!” দুই দলের ছাত্রনেতারা এসে সোজা মহাপরিচালকের রুমে ঢুকে পড়লেন। প্রথম দলের নেতা টেবিল চাপড়ে বললেন, “স্যার, অভিধানে ‘গুপ্ত’ শব্দের পাশে স্পষ্ট করে লিখে দিতে হবে যে, ‘যারা প্রকাশ্যে এক কথা বলে আর ভেতরে অন্য এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে, তারাই গুপ্ত’ এবং ব্র্যাকেটে আমাদের বিরোধী দলের নাম লিখে দিতে হবে। এটা আমাদের এক দফা দাবি।” দ্বিতীয় দলের নেতা তেড়ে এসে বললেন, “কক্ষনো না! আমরা প্রকাশ্যে রাজনীতি করি। আমাদের গঠনতন্ত্র ওয়েবসাইটে দেওয়া আছে। আমরা কেন গুপ্ত হতে যাব? অভিধানে লিখতে হবে— ‘গুপ্ত মানে হলো একটি ঐতিহাসিক মিথ্যাচার, যা রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য ব্যবহার করা হয়।’ এবং এর সমার্থক শব্দ হিসেবে লিখতে হবে— ‘প্রোপাগান্ডা’ বা ‘গুজব’।” মহাপরিচালক দুই দলের মাঝখানে বসে কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, “বাবারা, তোরা একটু শান্ত হ। অভিধান তো আর পলিটিক্যাল ম্যানিফেস্টো না যে যখন খুশি ব্র্যাকেটে দলের নাম ঢুকিয়ে দেব। হরিনাথ দে, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ—এরা যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাহলে তোরা কি তাদেরকেও ঘেরাও করতি?” প্রথম নেতা বললেন, “শহীদুল্লাহ সাহেব বেঁচে থাকলে তাকেও বলতাম আপডেট হতে। যুগ পাল্টেছে স্যার। এখন শব্দ মানেই অস্ত্র। আপনি যদি আমাদের কথামতো অভিধান না ছাপেন, তাহলে আমরা বাংলা একাডেমির বইমেলায় ‘গুপ্ত’ প্রকাশনীগুলোর স্টল ভাঙচুর করব।” মহাপরিচালক অবাক হয়ে বললেন, ‘গুপ্ত প্রকাশনী আবার কোনটা?’ নেতা বললেন, “যাদের বইয়ের প্রচ্ছদ দেখে ভেতরে কী লেখা আছে বোঝা যায় না, তারাই গুপ্ত প্রকাশনী!” পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ভাষাবিজ্ঞানী ড. আসজাদুল হক একটা অভিনব প্রস্তাব দিলেন। তিনি বললেন, “দেখুন, আমরা একটা আপস-মীমাংসায় আসতে পারি। আমরা অভিধানে ‘গুপ্ত’ শব্দের তিনটি আলাদা অর্থ দেব। অর্থ ১ (ঐতিহাসিক): যা লুক্কায়িত (যেমন: গুপ্তধন)। অর্থ ২ (রাজনৈতিক-অভিযোগ): প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য ব্যবহৃত একটি মারাত্মক বিশেষ্য বা বিশেষণ। অর্থ ৩ (চিকিৎসাবিজ্ঞান): যা প্রকাশ করা যায় না। আর সবচেয়ে বড় কথা, আমরা শব্দের নিচে সিগারেটের প্যাকেটের মতো একটা সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ জুড়ে দেব।” ছাত্রনেতারা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। ‘সতর্কীকরণ? সেটা আবার কী?’ ড. আসজাদুল হক খসড়া পড়ে শোনালেন: “সতর্কীকরণ: ‘গুপ্ত’ শব্দটি একটি দাহ্য ও বিপজ্জনক শব্দ। যত্রতত্র, বিশেষ করে কলেজের দেয়ালে, প্রতিপক্ষের পোস্টে বা চায়ের দোকানে এই শব্দ ব্যবহার করা স্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকর। এর অতিরিক্ত ব্যবহারে লাঠিসোঁটা, কিরিচ, ইটপাটকেল উড়ে আসতে পারে, ক্লাস বাতিল হতে পারে এবং সর্বোপরি পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলা একাডেমি নিজ দায়িত্বে এই শব্দ ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছে।” প্রস্তাব শুনে প্রথম দলের নেতা একটু নরম হলেন। ‘হুম, সতর্কীকরণ থাকলে মন্দ হয় না। মানুষ অন্তত ভয় পাবে।’ দ্বিতীয় দলের নেতা বললেন, ‘ঠিক আছে, তবে সতর্কীকরণের ফন্ট সাইজ বড় হতে হবে। আর লাল কালিতে ছাপতে হবে।” টকশোতে ‘গুপ্ত’ বিতর্ক: সেদিন রাতেই দেশের সব কটি টিভি চ্যানেলে প্রাইম টাইম টকশো শুরু হলো। আলোচনার একমাত্র বিষয়: ‘গুপ্ত শব্দের রাজনৈতিক অর্থনীতি ও সমাজতাত্ত্বিক প্রভাব।’ একটি বেসরকারি চ্যানেলের টকশোতে সঞ্চালক অত্যন্ত গম্ভীর মুখে বললেন, “দর্শক, আজ আমরা আলোচনা করব এমন একটি শব্দ নিয়ে, যা আমাদের জাতীয় জীবনে এক অভূতপূর্ব বিভাজন তৈরি করেছে। আজ আমাদের স্টুডিওতে উপস্থিত আছেন বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী, একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং একজন ব্যাকরণবিদ।” সঞ্চালক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের দিকে ফিরে বললেন, ‘আপনার কাছে প্রথমেই জানতে চাই, এই যে হঠাৎ করে আমাদের রাজনীতিতে ‘গুপ্ত’ শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটল, এর পেছনে কি কোনো গুপ্ত ষড়যন্ত্র আছে? ইলুমিনাতি বা ফ্রিমেসনদের মতো কেউ কি এখানে কলকাঠি নাড়ছে?” বিশ্লেষক গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “দেখুন, বিষয়টিকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। প্রাচীন বাভারিয়ায় যেমন ইলুমিনাতি ছিল, আমাদের দেশেও এখন পলিটিক্যাল ইলুমিনাতি তৈরি হয়েছে। এরা প্রকাশ্যে নিরীহ, কিন্তু ভেতরে হাইলি একটিভ। আমার তো মনে হয় ‘গুপ্ত’ শব্দটি একটি কোডওয়ার্ড। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের মধ্যে সিগন্যাল আদান-প্রদান করছে। চট্টগ্রাম সিটি কলেজের দেয়ালের লেখাটি কোনো সাধারণ গ্রাফিতি ছিল না, এটি ছিল একটি সাংকেতিক মেসেজ!” ব্যাকরণবিদ রেগে গিয়ে বললেন, “আরে ভাই, আপনারা সব কিছুতেই ষড়যন্ত্র খোঁজেন কেন? ‘গুপ্ত’ একটি সাধারণ বিশেষণ। এর কাজ হলো বিশেষ্যের অবস্থা বোঝানো। আপনারা তো এখন ব্যাকরণকেই রিমান্ডে নেওয়ার ব্যবস্থা করছেন!” সমাজবিজ্ঞানী চশমা মুছে বললেন, “আমি মনে করি, আমাদের সমাজ এখন একটি ‘পোস্ট-গুপ্ত’ (Post-Gupto) যুগে প্রবেশ করেছে। আগে মানুষ লুকিয়ে প্রেম করত, তাকে বলত গুপ্তপ্রেম। এখন সব ফেসবুকে রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস দিয়ে করে। অর্থাৎ সমাজ থেকে গুপ্ততা হারিয়ে যাচ্ছে। এই যে রাজনীতিতে গুপ্ত নিয়ে এত অ্যালার্জি, তার মূল কারণ হলো আমাদের জেন-জি (Gen-Z) প্রজন্ম সবকিছুতে স্বচ্ছতা চায়। তারা কোনো ‘হিডেন চার্জ’ পছন্দ করে না, তা মোবাইল বিলেই হোক আর রাজনীতিতেই হোক।” টকশো যখন তুঙ্গে, তখন হঠাৎ নিচে ব্রেকিং নিউজ স্ক্রল যেতে শুরু করল: “ব্রেকিং নিউজ: বাংলা একাডেমির নতুন সিদ্ধান্ত—আগামীকাল থেকে ‘গুপ্ত’ শব্দের বদলে সরকারিভাবে ‘অপ্রকাশ্য-অস্থায়ী-অবস্থান’ পরিভাষাটি ব্যবহৃত হবে।” উপসংহার: নতুন শব্দের আগমন ও অনন্ত চক্র অবশেষে বহু কাঠখড় পুড়িয়ে, তিন দিন তিন রাত না ঘুমিয়ে বাংলা একাডেমির বিশেষজ্ঞ কমিটি একটি যুগান্তকারী প্রজ্ঞাপন জারি করল। প্রজ্ঞাপনে বলা হলো: “যেহেতু ‘গুপ্ত’ শব্দটি জনমনে ব্যাপক বিভ্রান্তি, ভীতি এবং শারীরিক জখমের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাই বৃহত্তর জনস্বার্থে এবং জাতীয় শান্তি রক্ষার্থে অভিধান থেকে আপাতত শব্দটির রাজনৈতিক ব্যবহার স্থগিত করা হলো। কেউ কাউকে রাজনৈতিকভাবে ‘গুপ্ত’ বলতে পারবে না। এর বদলে কেউ যদি কাউকে সন্দেহ করে, তবে তাকে ‘পেন্ডিং-প্রকাশ্য’ বা ‘অপেক্ষমাণ-স্বচ্ছতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করতে হবে।” বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশের পর মহাপরিচালক ড. মফিজুর রহমান স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। তিনি জানলার দিকে তাকিয়ে দেখলেন, বাইরের আকাশ পরিষ্কার। কলেজের ক্যাম্পাসগুলোতে আর মারামারি নেই। দাশগুপ্তরা আবার নিজেদের নামের শেষে ‘গুপ্ত’ লিখছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের বইগুলোও রক্ষা পেয়েছে। তিনি আবার তার প্রিয় দার্জিলিং চায়ে চুমুক দিতে যাবেন, ঠিক তখনই তার খাস কামরার দরজা আবার সজোরে খুলে গেল। সেই তোফাজ্জল সাহেব। হাতে আবার পত্রিকা, বগলে সেই হেলমেট, আর এবার তিনি রীতিমতো কাঁপছেন। “কী হলো আবার তোফাজ্জল? এবার তো সব সমাধান করে দিলাম। ‘গুপ্ত’ নিয়ে আর কোনো ঝামেলা আছে নাকি?” মহাপরিচালক বিরক্ত হয়ে বললেন। তোফাজ্জল সাহেব ঢোক গিলে বললেন, “স্যার, ‘গুপ্ত’ নিয়ে আর কোনো ঝামেলা নেই। কিন্তু... কিন্তু...” “কিন্তু কী? পরিষ্কার করে বলুন!” “স্যার, আজ সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক হলের দেয়ালে নতুন একটা গ্রাফিতি দেখা গেছে। সেখানে লেখা ছিল ‘স্বৈরাচারের দোসরদের প্রকাশ্যে বিচার চাই।’ কিন্তু রাতের আঁধারে কে বা কারা ‘প্রকাশ্যে’ শব্দটা মুছে সেখানে লিখে দিয়ে গেছে ‘উহ্য’। বাক্যটা দাঁড়িয়েছে— ‘স্বৈরাচারের দোসরদের উহ্য বিচার চাই’।” মহাপরিচালক লাফিয়ে উঠলেন। “উহ্য? মানে সাইলেন্ট? তাতে কী হয়েছে?” তোফাজ্জল সাহেব প্রায় কেঁদে ফেলে বললেন, “স্যার, একদল বলছে ‘উহ্য’ মানে হলো বিচার না করে মাফ করে দেওয়া। আরেক দল বলছে ‘উহ্য’ মানে হলো গুম করে দেওয়া। এই নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে আজ সকালে ব্যাপক গোলাগুলি শুরু হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে আবার ফ্যাক্স এসেছে স্যার... এবার আমাদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ‘উহ্য’ শব্দের মীমাংসা করতে হবে। নিচে ছাত্ররা লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তারা জানতে চায় ‘উহ্য’ আসলে কোন দলের এজেন্ট!” ড. মফিজুর রহমান ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লেন। তার মনে হলো, এই দেশে অভিধান লেখা আর মাইনফিল্ডে হাঁটা একই কথা। তিনি ড্রয়ার থেকে একটি সাদা কাগজ বের করে পদত্যাগপত্র লিখতে শুরু করলেন, যার শিরোনাম দিলেন— “একটি উহ্য-গুপ্ত আভিধানিকের প্রকাশ্য প্রস্থান!”
ডিকশনারি থেকে ‘গুপ্ত’ শব্দ ডিলিট, বিপদে বাংলা একাডেমি
এশিয়া পোস্ট স্যাটায়ার / ‘মোরগ পোলাও’ নাম ‘মুরগি পোলাও’ করার বিল সংসদে পাস
মাননীয় স্পিকার, একটি মুরগি তার সারা জীবন ডিম দেয়। নিজের বুকের মাংস দিয়ে সে পোলাওকে সুস্বাদু করে। কিন্তু পরিবেশনের সময় বাবুর্চি হাঁক দিয়ে বলে—এই, ভিআইপি টেবিলে দুইটা মোরগ পোলাও দে! এটা কি পিতৃতন্ত্রের চরম আস্ফালন নয়? অন্যের কৃতিত্ব নিজের নামে চালিয়ে দেওয়ার এই পুরুষতান্ত্রিক কুম্ভীলকবৃত্তি আমরা আর মেনে নিতে পারি না।  আগামী ৩১ মে জাতীয় সংসদে এভাবেই বক্তব্য রাখছিলেন জাতীয় মুরগিমন্ত্রী খকখক। তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে আজ বাঙালির রন্ধনশিল্পের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ও অভাবনীয় অধ্যায়ের সূচনা হলো।  শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা রন্ধনতান্ত্রিক বৈষম্য এবং ভাষাগত পুরুষতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে জাতীয় সংসদে বিপুল করতালির মধ্য দিয়ে পাস হয়েছে ‘পোল্ট্রি নামকরণ (সংশোধন ও জেন্ডার সমতা) বিল-২০২৬’। এই বিলের সবচেয়ে আলোচিত ধারা অনুযায়ী, এখন থেকে দেশের সীমানার ভেতর আর কোথাও ‘মোরগ পোলাও’ বিক্রি, পরিবেশন বা বিজ্ঞাপন দেওয়া যাবে না। এর পরিবর্তে সর্বস্তরে বাধ্যতামূলকভাবে ‘মুরগি পোলাও’ শব্দটি ব্যবহার করতে হবে। সংসদের চলতি অধিবেশনে বিলটি উত্থাপন করা হলে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে তুমুল হাস্যরসাত্মক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। তবে শেষ পর্যন্ত লিঙ্গসমতা, ভাষাতাত্ত্বিক সততা এবং ভোক্তাদের অধিকার সংরক্ষণের যুক্তিতে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়ে যায়। পিতৃতান্ত্রিক কুম্ভীলকবৃত্তি ও বিলের প্রেক্ষাপট বিলের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে যত ‘মোরগ পোলাও’ বিক্রি হয়, তার ৯৯ দশমকি ৯ শতাংশ রান্না হয় ব্রয়লার, সোনালি বা লেয়ার মুরগি দিয়ে। দেশি মোরগ দিয়ে পোলাও রান্নার প্রচলন আজ কেবলই রূপকথার অংশ। কিন্তু যুগ যুগ ধরে পাতিলের ভেতর জীবন দিচ্ছে নিরীহ স্ত্রী-মুরগি, অথচ মেন্যু কার্ডে বড় বড় অক্ষরে নাম লেখা হচ্ছে ‘মোরগ’-এর। সংসদে বিলটি উত্থাপনকালে মুরগিমন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি তার আবেগঘন বক্তৃতায় বলেন, মাননীয় স্পিকার, আপনি একবার ভেবে দেখুন। একটি মুরগি সারা জীবন ডিম দেয়। এরপর যখন তার ডিম দেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়, তখন তাকে জবাই করে পোলাওয়ের হাঁড়িতে ফেলে দেওয়া হয়। নিজের বুকের মাংস দিয়ে সে পোলাওকে সুস্বাদু করে। কিন্তু পরিবেশনের সময় বাবুর্চি হাঁক দিয়ে বলে—এই, ভিআইপি টেবিলে দুইটা মোরগ পোলাও দে! মাননীয় স্পিকার, এটা কি পিতৃতন্ত্রের চরম আস্ফালন নয়? অন্যের কৃতিত্ব নিজের নামে চালিয়ে দেওয়ার এই পুরুষতান্ত্রিক কুম্ভীলকবৃত্তি আমরা আর মেনে নিতে পারি না। তার এই বক্তব্যের পর সংসদের নারী সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তাকে সমর্থন জানান। ভোক্তা অধিকার ও সত্যের জয় এই বিল পাসের পেছনে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছিল দেশের বেশ কয়েকটি অধিকার রক্ষা সংগঠন। সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছিলেন যে, এই মিথ্যা নামকরণের মাধ্যমে মূলত ভোক্তাদের সাথে প্রতারণা করা হচ্ছে।  বিল পাসের পর এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ফোরামের মুখপাত্র বলেন, আমরা সবসময় ভোক্তাদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার। একজন ভোক্তা যখন রেস্তোরাঁয় গিয়ে কষ্টার্জিত টাকা খরচ করেন, তখন তার অধিকার আছে এটা জানার যে, তিনি আসলে কী খাচ্ছেন। আপনি মেন্যুতে লিখছেন ‘মোরগ’, কিন্তু ভোক্তার প্লেটে দিচ্ছেন ‘মুরগি’। এটি সুস্পষ্টভাবে ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন’-এর লঙ্ঘন। এই বিল পাসের মাধ্যমে ভোক্তারা দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত প্রতারণা থেকে মুক্তি পেলেন। তিনি রেস্তোরাঁ মালিকদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এখন থেকে কোনো ভোক্তা যদি অভিযোগ করেন যে, তিনি মুরগি পোলাওয়ের দাম দিয়ে মোরগ পেয়েছেন, তবে রেস্তোরাঁর লাইসেন্স বাতিল করা হবে। সংসদীয় বিতর্ক: যা বললেন আইনপ্রণেতারা সংসদে বিলটি নিয়ে বেশ চমকপ্রদ বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। বিরোধী দলের একজন প্রবীণ সংসদ সদস্য বিলের বিরোধিতা করে বলেন, মাননীয় স্পিকার, মোরগ পোলাও আমাদের ঐতিহ্য। ঢাকার নবাবরা মোরগ পোলাও খেতেন। এই নাম পরিবর্তন করলে আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ওপর চরম আঘাত আসবে। আগামীকাল হয়তো বলা হবে ‘হাঁস-বুনো’ নাম পরিবর্তন করে ‘হাঁসী-বুনো’ করতে হবে! আমরা কি আমাদের ভাষাকে পোল্ট্রি ফার্ম বানিয়ে ফেলব? জবাবে সরকারি দলের এক তরুণ সাংসদ দাঁড়িয়ে বলেন, মাননীয় স্পিকার, বিরোধী দলের সদস্য ঐতিহ্যের দোহাই দিচ্ছেন। কিন্তু তিনি কি জানেন, নবাবরা আসলেই দেশি মোরগ খেতেন। তাদের বাবুর্চিরা আস্ত দেশি মোরগ দমে বসাতেন। কিন্তু বর্তমান যুগে রেস্তোরাঁর মালিকরা ফার্মের যে মুরগি দিয়ে পোলাও রাঁধেন, তাকে মোরগ বলাটা নবাবদেরও অপমান। আমরা নবাবদের অপমান করতে চাই না। আমরা কেবল সত্যটাকে মেন্যু কার্ডে তুলে আনতে চাই। আরেকজন সাংসদ একধাপ এগিয়ে প্রস্তাব করেন, মাননীয় স্পিকার, শুধু মুরগি পোলাও কেন? যারা ব্রয়লার খায়, তাদের মেন্যুতে লেখা উচিত ‘উভলিঙ্গ ব্রয়লার পোলাও’। কারণ ব্রয়লারের আসলে কোনো নির্দিষ্ট জেন্ডার আইডেন্টিটি নেই, তারা কেবল মাংসের পিণ্ড!  অবশ্য স্পিকার এই প্রস্তাবটি মূল বিল থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেন। পুরান ঢাকায় শোকের ছায়া ও বাবুর্চিদের প্রতিক্রিয়া সংসদে এই বিল পাসের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পরই পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁ পাড়া নাজিরাবাজার, চকবাজার ও লালবাগে এক থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বংশ পরম্পরায় যারা মোরগ পোলাও রান্না করে আসছেন, তারা এই সিদ্ধান্তকে ‘ঢাকাইয়া সংস্কৃতির ওপর ডিজিটাল আগ্রাসন’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। নাজিরাবাজারের বিখ্যাত ‘মখমল বাবুর্চি’ তার ডেকচির সামনে বসে অশ্রুসজল চোখে সাংবাদিকদের বলেন, আমাগো দাদাজান রাঁধতো মোরগ পোলাও, আব্বাজান রাঁধতো মোরগ পোলাও। আমরাও রাইন্ধা আইলাম। এহন কাস্টমার আইসা যদি কয়, এই মিয়া এক প্লেট মুরগি পোলাও দাও, তাইলে কি ইজ্জত থাকে কন? মুরগি তো রাঁধে মায়েরা, ঘরে। আমরা তো উস্তাদ মানুষ, আমরা রাঁধমু মোরগ। আইনে পাস হইছে বইলা কি আর হাঁড়ির সোয়াদ বদলাইয়া যাইব? পুরান ঢাকার রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির পক্ষ থেকে আগামী রোববার আধাবেলা ‘ডেকচি ধর্মঘট’-এর ডাক দেওয়া হয়েছে। তারা হুমকি দিয়েছেন, নাম পরিবর্তন না করলে তারা পোলাওয়ে আলু বোখারা দেওয়া বন্ধ করে দেবেন। ছাপাখানা ও অর্থনীতির ওপর আকস্মিক প্রভাব এই আইন পাসের সাথে সাথে বাংলাবাজার ও ফকিরাপুলের ছাপাখানাগুলোতে রাতারাতি ব্যস্ততা বেড়ে গেছে। কারণ, দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা লাখ লাখ রেস্তোরাঁর মেন্যু কার্ড, নিয়ন সাইন এবং বিলবোর্ড পরিবর্তন করতে হবে। ফকিরাপুলের এক প্রেস মালিক হাসিমুখে বলেন, করোনার পর আমাদের ব্যবসা একদম বসে গিয়েছিল। এই ‘মুরগি পোলাও’ আইন আমাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। কাল রাত থেকে অন্তত দশ হাজার রেস্তোরাঁর মেন্যু কার্ড নতুন করে ছাপানোর অর্ডার পেয়েছি। তবে বানানের ব্যাপারে সবাই খুব সতর্ক। কেউ কেউ ‘মুরগী’ দীর্ঘ-ঈ কার দিয়ে ছাপাতে চাইলেও, আমরা বাংলা একাডেমির নিয়ম মেনে হ্রস্ব-ই কার দিয়ে ‘মুরগি পোলাও’ ছাপিয়ে দিচ্ছি। অর্থনীতিবিদরা ধারণা করছেন, শুধুমাত্র মেন্যু কার্ড ও সাইনবোর্ড পরিবর্তনের এই হিড়িকের কারণে দেশের জিডিপিতে অন্তত ০.০১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল ও কূটনৈতিক রেশ নাম পরিবর্তনের এই ঘটনা শুধু দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও এর ঢেউ লেগেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক ফিনান্সিয়াল সামিটে বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে যে নৈশভোজের আয়োজন করার কথা ছিল, তার মেন্যু রাতারাতি পরিবর্তন করা হয়েছে। সেখানে আগে ইংরেজিতে লেখা ছিল 'Traditional Morog Polao (Rooster Pilaf)', যা পরিবর্তন করে 'Empowered Hen Pilaf (মুরগি পোলাও) - A Tribute to Gender Equality in Culinary Arts' করা হয়েছে। জাতিসংঘের ‘উইমেন এন্টারপ্রেনিউরশিপ অ্যান্ড পোল্ট্রি রাইটস’ (WEPR) নামক একটি অঙ্গসংগঠন বাংলাদেশের এই পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করেছে। তারা এক টুইট বার্তায় জানিয়েছে, বাংলাদেশ দেখিয়ে দিল কীভাবে রান্নাঘর থেকে জেন্ডার সমতার শুরু হতে পারে। পিতৃতান্ত্রিক রন্ধনশৈলী ভেঙে মুরগিদের তাদের প্রাপ্য সম্মান বুঝিয়ে দেওয়ার এই উদ্যোগ গোটা বিশ্বের জন্য অনুকরণীয়। তবে আন্তর্জাতিক রন্ধন সমালোচক গর্ডন রামজে এক সাক্ষাৎকারে বিরক্তি প্রকাশ করে বলেছেন, ইট ডাজন্ট ম্যাটার হোয়াট ইউ কল ইট! মোরগ অর মুরগি! জাস্ট ডোন্ট ওভারকুক দ্য ড্যাম রাইস! বিকল্প প্রস্তাবনা: জেন্ডার-নিউট্রাল ‘পাখি পোলাও’ সংসদে বিল পাসের আগে ভাষাতাত্ত্বিকদের একটি প্যানেল ডাকা হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্ত্ব বিভাগের এক প্রবীণ অধ্যাপক প্রস্তাব করেছিলেন যে, মোরগ বা মুরগি কোনোটিতেই না গিয়ে মূল ফারসি শব্দের আক্ষরিক অনুবাদ করা হোক। তিনি যুক্তি দেখান, ফারসি ‘মুর্গ’ মানে যেকোনো পাখি। তাই জেন্ডার-নিউট্রাল অবস্থান নিতে চাইলে এর নাম দেওয়া উচিত ‘পাখি পোলাও’ বা ‘পক্ষী পোলাও’। তবে রেস্তোরাঁ মালিকরা এই প্রস্তাব তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তাদের যুক্তি ছিল, ‘পাখি পোলাও’ নাম শুনলে ভোক্তারা ভাবতে পারেন যে তাদের কাক, শালিখ বা চড়ুই পাখি দিয়ে পোলাও খাওয়ানো হচ্ছে, যা ব্যবসায় মারাত্মক ধস নামাবে। এরপরই ‘মুরগি পোলাও’ নামটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় বিলটি পাস হওয়ার পর থেকে ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) এবং ইউটিউবে রীতিমতো মিমের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। নেটিজেনরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। একদল হ্যাশট্যাগ চালু করেছেন #JusticeForMurgi এবং #MurgiPolaoEra নামে। তারা বলছেন, এতোদিন ধরে মুরগি খেয়ে মোরগের নাম জপার মতো হিপোক্রেসি আর হতে পারে না। আরেকদল, যারা মূলত ভোজনরসিক, তারা #SaveMorogPolao নামে ক্যাম্পেইন চালাচ্ছেন। তাদের একজন লিখেছেন, ভাই, আমি যখন রোস্টের আস্ত রানটা ছিঁড়ে মুখে দিই, তখন আমার ফিলিং আসে যে আমি কোনো নবাব বা রাজা-বাদশাহ! মোরগ পোলাও নামটার মধ্যে একটা রাজকীয় ভাইব আছে। ‘মুরগি পোলাও’ শুনলে মনে হয় জ্বর আসার পর আম্মা জোর করে পথ্য খাওয়াচ্ছে। আমার ভাইব নষ্ট করার অধিকার সরকারের নেই! কিছু কিছু টিকটকার এরই মধ্যে ‘মুরগি পোলাও ডান্স’ নামে নতুন ট্রেন্ড চালু করেছেন, যা মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ পাচ্ছে। নতুন যুগের সূচনা সব বিতর্ক, হাসি-ঠাট্টা আর আক্ষেপের পর একটি বিষয় পরিষ্কার—বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে একটি আইকনিক যুগের অবসান ঘটল। আজ থেকে বিয়েবাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে কোনো মুরব্বি আর চিৎকার করে বলবেন না, এই বাবুর্চি, বরযাত্রীর টেবিলে জলদি মোরগ পোলাও দে! বরং তাকে বলতে হবে, বরযাত্রীদের জন্য মুরগি পোলাও পরিবেশন করা হোক। হয়তো উচ্চারণে একটু হোঁচট খেতে হবে প্রথম প্রথম। হয়তো নস্টালজিয়ায় ভুগে অনেকেই দীর্ঘশ্বাস ফেলবেন। কিন্তু ইতিহাসের সত্য এটাই যে, অবশেষে বাংলার হাঁড়িগুলোতে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেই মুরগি তার জীবন উৎসর্গ করে পোলাওকে সুস্বাদু করছে, মেন্যু কার্ডে আজ তারই নাম খোদিত হলো। একটি নিছক খাদ্য কীভাবে রাজনীতি, অর্থনীতি, ভাষা ও লিঙ্গসমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে, ‘মুরগি পোলাও বিল-২০২৬’ তার এক ধ্রুপদী উদাহরণ হয়ে থাকবে। এখন কেবল দেখার অপেক্ষা, আগামী ঈদে শাশুড়িরা তাদের জামাইদের পাতে ‘আস্ত মুরগি’ তুলে দেওয়ার সময় কতটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
‘মোরগ পোলাও’ নাম ‘মুরগি পোলাও’ করার বিল সংসদে পাস
এশিয়া পোস্ট স্যাটায়ার / বিদ্যুৎকেন্দ্র পাহারা দিতে ১০ হাজার হারিকেন কেনার আবেদন
বিদ্যুতের ‘মিসড কল’ যুগ বর্তমান বাংলাদেশে বিদ্যুতের অবস্থা অনেকটা পাড়া-মহল্লার সেইসব বখাটে ছেলেদের মতো, যারা গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে সুন্দরী মেয়েদের দেখে শিস বাজিয়েই ভোঁ দৌড় দেয়। ধরতে গেলে পাওয়া যায় না, কিন্তু অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। অথবা বলা যায়, বিদ্যুৎ এখন অনেকটা সেলুলার নেটওয়ার্কের ‘মিসড কল’-এর মতো। প্রচণ্ড গরমে আপনি যখন ঘামতে ঘামতে একেবারে সিদ্ধ আলু হয়ে গেছেন, তখন হঠাৎ সিলিং ফ্যানটা ‘ক্যাঁচ’ করে এক ইঞ্চি ঘুরে আবার থেমে যায়। আপনি আনন্দে লাফিয়ে উঠে চিৎকার করেন, ‘কারেন্ট আসছে!’ কিন্তু পরক্ষণেই বোঝেন, ওটা আসলে কারেন্ট আসেনি, আপনাকে শুধু একটা ‘মিসড কল’ দিয়ে গেল। জানান দিয়ে গেল যে, ‘আমি আছি, কিন্তু তোমার জন্য নেই!’ বিদ্যুত সংকটের সার্বিক অবস্থা নিয়ে ‘যেদিন কম সেদিন সাত ঘণ্টা, কোনো দিন আবার ১০ ঘণ্টারও বেশি হয় লোডশেডিং’ শিরোনামে একটি সংবাদও প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। সারা দেশে এখন এই ‘মিসড কল’ বিদ্যুতের কারণে চুরি ব্যাপক বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে অনেকে বিক্ষোভ করার জন্য হারিকেন বা হাতপাখা হাতে নিয়ে প্ল্যাকার্ড বানানোর প্র্যাকটিস করছে। যেহেতু বিদ্যুৎ নেই, তাই ডিজিটাল ব্যানারের বদলে এখন কাঠকয়লা দিয়ে পুরোনো ক্যালেন্ডারের উল্টো পিঠে স্লোগান লেখা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ অবশ্য এই গরমে জনগণকে পুদিনা পাতার শরবত খাওয়া এবং অন্ধকারে বসে রোমান্টিক ‘ক্যান্ডেল লাইট ডিনার’ করার পরামর্শ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু জনগণ রোমান্টিসিজমের চেয়ে ফ্যানের বাতাসকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়ায় পরিস্থিতি বেশ ঘোলাটে। বন্ধ বিদ্যুৎকেন্দ্র ও চুরির শঙ্কা জ্বালানি সংকটের কারণে দেশে কয়লা, গ্যাস বা তেলের চরম অভাব। ফলে দিনে দিনে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক মেগা, আল্ট্রা-সুপার-ক্রিটিক্যাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। হাজার হাজার কোটি টাকার টারবাইন, বয়লার আর জেনারেটরগুলো এখন নিস্তব্ধ। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দেখলেই বোঝা যাচ্ছে এগুলোতে এখন ‘কারেন্ট’ নামক কোনো এক জাদুকরি বস্তুর উৎপাদন হচ্ছে না। কিন্তু সমস্যা দেখা দিয়েছে অন্য জায়গায়। এই বিশালাকার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পাহারা দেওয়া এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেহেতু কেন্দ্রগুলোতে বিদ্যুৎ নেই, তাই রাতে এগুলো রীতিমতো ভূতুড়ে আকার ধারণ করে। আর এই অন্ধকারের সুযোগ নিতে পারে এলাকার পেশাদার চোরেরা। তারা অন্ধকারে এসে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরের তামার তার, জেনারেটরের নাট-বল্টু, এমনকি অফিসের বাথরুমের বদনা পর্যন্ত খুলে নিয়ে যেতে পারে। গত সপ্তাহে এক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ডিরেক্টরের শখের রিভলভিং চেয়ার চুরি হয়ে গেছে। চোরেরা এতটাই বেপরোয়া যে, অন্ধকারে ভারী ট্রান্সফরমার চুরি করতে না পেরে তারা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরেই ‘স্ক্র্যাপ মেটাল’ বা ভাঙাড়ির দোকান খুলে বসতে পারে! এজন্য এখনই ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। ঘুটঘুটে অন্ধকারে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অবস্থা বেগতিক দেখে ‘জাতীয় বিদ্যুৎ উধাও বোর্ড’-এর প্রধান কার্যালয়ে এক জরুরি বৈঠকের ডাক দেওয়া হলো। সময় রাত ৮টা। স্বভাবতই বোর্ডে কোনো বিদ্যুৎ নেই। আইপিএসের ব্যাটারিও দুদিন আগে চার্জের অভাবে মারা গেছে। বোর্ডের মহাপরিচালক (ডিজি) ‘বজ্রকণ্ঠ’ বড়ুয়া সাহেব অন্ধকারে বসে কয়েক হাজার কোটি টাকার একটি টেন্ডারের ফাইল দিয়ে নিজেকে বাতাস করছেন। তার সামনে বসে আছেন প্রধান প্রকৌশলী ‘মি. শর্টসার্কিট’ এবং প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা জনাব ‘অন্ধকার আলী’ আলী। পুরো রুম আলোকিত হয়ে আছে ডিজি সাহেবের পুরোনো নকিয়া ফোনের নিভু নিভু ফ্ল্যাশলাইটে। ডিজি বজ্রকণ্ঠ বড়ুয়া ঘাম মুছতে মুছতে বললেন, ‘ভদ্রমহোদয়গণ, আমাদের অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ। জ্বালানি নেই, তাই কারেন্টও নেই। কিন্তু চোর তো আর বসে নেই! তারা তো ২৪ ঘণ্টা ডিউটি করছে। গতকাল খবর পেলাম, আমাদের একটি প্ল্যান্টের মেইন গেটটাই নাকি চুরি হয়ে গেছে! আপনারা করছেনটা কী?’ নিরাপত্তা কর্মকর্তা অন্ধকার আলী কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, ‘স্যার, গেট চুরি যাওয়ার সময় তো ঘুটঘুটে অন্ধকার ছিল। আমাদের সিকিউরিটি গার্ডরা চোখে কিছুই দেখতে পায়নি। তারা ভেবেছিল বাতাসে হয়তো গেট নড়ছে।’ ডিজি সাহেব রেগে গিয়ে বললেন, ‘তাহলে সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো কী করছিল? ওগুলো কি শুধু শুধু লাগিয়েছি?’ প্রধান প্রকৌশলী শর্টসার্কিট গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, ‘স্যার, সিসিটিভি তো কারেন্টে চলে। কারেন্ট না থাকলে ওগুলো তো প্লাস্টিকের খেলনা ছাড়া আর কিছুই নয়। আর আইপিএস দিয়ে চালাবো, সেই আইপিএস চার্জ দেওয়ার জন্যও তো কারেন্ট লাগে!’ ডিজি হতাশ হয়ে বললেন, ‘তাহলে উপায়? আমরা কি চোরদের হাতে সব ছেড়ে দেব? আমাদের এই বিলিয়ন ডলারের সম্পদ রক্ষার কি কোনো উপায় নেই?’ ‘দ্য হারিকেন থিওরি’ রুমের ভেতর পিনপতন নীরবতা। শুধু মশার ভনভন শব্দ আর ডিজি সাহেবের ফাইলে থাপ্পড় দিয়ে মশা মারার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। হঠাৎ নিরাপত্তা কর্মকর্তা অন্ধকার আলী লাফিয়ে উঠলেন। ‘স্যার! পেয়েছি! ইউরেকা!’ ডিজি চমকে উঠে বললেন, ‘কী পেয়েছেন? কারেন্ট?’ ‘না স্যার, কারেন্ট না, বুদ্ধি পেয়েছি! আমাদের শেকড়ে ফিরে যেতে হবে। আমাদের ঐতিহ্যের কাছে ফিরে যেতে হবে। সিসিটিভি, ফ্লাডলাইট, আইপিএস—এসব পশ্চিমা প্রযুক্তি আমাদের ধোঁকা দিয়েছে। আমাদের এখন একমাত্র ভরসা... হ্যারিকেন!’ ডিজি এবং প্রধান প্রকৌশলী দুজনেই অবাক হয়ে তাকালেন। অন্ধকার আলী ব্যাখ্যা করতে শুরু করলেন, ‘স্যার, ভেবে দেখুন। হারিকেনের কোনো ব্যাটারি লাগে না, কোনো চার্জ লাগে না। শুধু একটু কেরোসিন আর একটা দেশলাই! আমাদের গার্ডদের হাতে যদি একটা করে হারিকেন ধরিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে তারা পুরো বিদ্যুৎকেন্দ্র চষে বেড়াতে পারবে। হারিকেনের লালচে আলোতে গার্ডদের দেখলে চোরেরা দূর থেকে ভাববে, বিদ্যুৎকেন্দ্রে জিন-ভূত ঘুরে বেড়াচ্ছে। একে তো আলো, তার ওপর ভূতের ভয়—টু ইন ওয়ান সিকিউরিটি! চোর ধারেকাছেও ঘেঁষবে না!’ প্রধান প্রকৌশলীও সায় দিলেন, ‘স্যার, আইডিয়াটা কিন্তু মাস্টারপিস। তাছাড়া হারিকেন কিনলে পরিবেশবাদীরাও খুশি হবে। জিরো কার্বন... মানে, জিরো ইলেকট্রিসিটি ফুটপ্রিন্ট!’ ডিজি বজ্রকণ্ঠ বড়ুয়ার মুখে অন্ধকারেও এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। তিনি টেবিল চাপড়ে বললেন, ‘ব্রিলিয়ান্ট! কাল সকালেই মন্ত্রণালয়ের কাছে আমরা ১০ হাজার হারিকেন কেনার প্রস্তাব পাঠাবো। সঙ্গে আনুষঙ্গিক খরচের একটা স্পেশাল বাজেটও তৈরি করুন।’ মন্ত্রণালয়ের কাছে পেশ করা ঐতিহাসিক আবেদনপত্র পরদিন সকালে ড্রাফটম্যানকে দিয়ে চরম গোপনীয়তায় একটি প্রস্তাবনা তৈরি করা হলো। প্রস্তাবনার শিরোনাম দেওয়া হলো: ‘জ্বালানি সংকটে উৎপাদন বন্ধ থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রসমূহের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ‘স্মার্ট’ হারিকেন ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জামাদি ক্রয় প্রকল্প।’ মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর লেখা চিঠির বয়ান ছিল নিম্নরূপ: ‘মহোদয়, সবিনয় নিবেদন এই যে, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে আমাদের অতি আদরের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বর্তমানে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কিন্তু এই সুযোগে একদল দেশি ও আন্তর্জাতিক চোর সিন্ডিকেট আমাদের মূল্যবান টারবাইন, তার, এবং অফিসের আসবাবপত্র চুরির মহোৎসবে মেতে উঠেছে। যেহেতু বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ নেই, সেহেতু আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা (যেমন—সিসিটিভি, সেন্সর অ্যালার্ম) সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায়, জাতীয় সম্পদ রক্ষার্থে আমাদের আদি, অকৃত্রিম ও নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি ‘হারিকেন’-এর শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। অতএব, দেশের সকল বন্ধ বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাহারাদারদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ১০,০০০ (দশ হাজার) পিস ‘স্মার্ট ও ট্যাকটিক্যাল হারিকেন’ এবং এর আনুষঙ্গিক সরঞ্জামাদি ক্রয়ের জন্য নিম্নলিখিত বাজেট অনুমোদনের বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।’ হারিকেন প্রকল্পের বাজেট সরকারি বাজেট বলে কথা, সাধারণ হারিকেন তো আর সাধারণ দামে কেনা যাবে না! তাই বাজেটের ফর্দটা বেশ যত্ন নিয়েই বানানো হলো: ১. ১০,০০০ পিস ‘স্মার্ট’ ট্যাকটিক্যাল হারিকেন (আমদানিকৃত): প্রতিটি হারিকেনের মূল্য ধরা হলো ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। যৌক্তিকতা: এগুলো সাধারণ হারিকেন নয়। এগুলো হবে ‘অ্যারোডাইনামিক’ ডিজাইনের, যাতে কালবৈশাখী ঝড়েও আলো না নেভে। এর কাচ হবে বুলেটপ্রুফ (যদি চোর ঢিল মারে)। তাছাড়া এই হারিকেনে একটি ‘ইউএসবি পোর্ট’ সংযুক্ত থাকবে। (যদিও বিদ্যুৎ নেই, তবুও ২০৪০ সালের মধ্যে কখনো যদি কারেন্ট আসে, তবে এই পোর্ট দিয়ে মোবাইল চার্জ করা যাবে—এই হলো ভবিষ্যৎদর্শী পরিকল্পনা)। ২. ভিআইপি অ্যাভিয়েশন-গ্রেড কেরোসিন (১ লাখ লিটার): প্রতি লিটার কেরোসিনের মূল্য ধরা হলো ২ হাজার টাকা। যৌক্তিকতা: সাধারণ কেরোসিনে ধোঁয়া বেশি হয়, যা গার্ডদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তাই বিমানের জ্বালানি সমতুল্য পরিশোধিত ‘পারফিউমড কেরোসিন’ আমদানি করা হবে, যা পুড়লে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গোলাপ ও রজনীগন্ধার সুবাস ছড়িয়ে পড়বে। চোরেরা চুরি করতে এসে সুগন্ধে ঘুমিয়ে পড়বে। ৩. সুইডিশ সেফটি দেশলাই (৫০ হাজার বাক্স): প্রতি বক্স ৫০০০ টাকা। যৌক্তিকতা: সাধারণ দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালাতে গিয়ে বারুদ ছিটকে গার্ডদের আঙুল পুড়ে যেতে পারে। তাই সরাসরি সুইডেন থেকে উন্নত প্রযুক্তির ঘর্ষণ-প্রতিরোধী দেশলাই আনা হবে। ৪. হারিকেনের সলতে বা ফিতা (১ হাজার কিলোমিটার): যৌক্তিকতা: হারিকেন নিরবচ্ছিন্নভাবে জ্বালাতে উন্নতমানের ফায়ারপ্রুফ সলতে লাগবে, যা সহজে পুড়বে না (কীভাবে পুড়বে না, তা বিজ্ঞানের এক অজানা রহস্য)। ৫. বিদেশি প্রশিক্ষণ (ক্যাপাসিটি বিল্ডিং): বাজেট: ৫০ কোটি টাকা। যৌক্তিকতা: হারিকেন একটি জটিল ম্যানুয়াল যন্ত্র। এর সলতে কতটুকু উঁচুতে রাখলে সঠিক আলো পাওয়া যায়, কাচ কালো হয়ে গেলে কীভাবে খবরের কাগজ দিয়ে মুছতে হয় এবং দেশলাইয়ের কাঠি একবারে কীভাবে জ্বালাতে হয়—এসব বিষয়ে উচ্চতর জ্ঞান লাভের জন্য ১০০ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার একটি প্রতিনিধি দল সুইজারল্যান্ড, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে ১৫ দিনের ‘হ্যারিকেন ম্যানেজমেন্ট কোর্স’-এ অংশগ্রহণ করবেন। ৬. ১০ হাজার ‘হ্যারিকেন অপারেটর’ নিয়োগ: পাহারাদারদের পক্ষে একা হারিকেন ধরা এবং লাঠি ঘোরানো সম্ভব নয়। তাই তাদের পেছনে শুধু হারিকেন ধরে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য ১০ হাজার নতুন লোকবল নিয়োগ দেওয়া হবে। এক চিলতে আলোর অপেক্ষা মন্ত্রণালয়ে এই ফাইল যাওয়ার পর কী হলো, তা এখনও এক রহস্য। তবে শোনা যাচ্ছে, খোদ মন্ত্রণালয়ের বাতিই নাকি গত তিন দিন ধরে বন্ধ। ফ্যান না ঘোরায় সচিব সাহেব নিজেই হাতপাখা দিয়ে বাতাস খাচ্ছেন আর অন্ধকারে ফাইল খুঁজছেন। এদিকে মিসড কল দিয়ে যাওয়া বিদ্যুতের অপেক্ষায় পুরো জাতি অন্ধকারে বসেই ঘামতে থাকুক। কারণ, কথায় আছে না—অন্ধকারই তো আলোর সত্যিকারের কদর বোঝায়! শুধু এই কদর বুঝতে গিয়ে যে জনগণের পিঠের চামড়া গরমে পুড়ে আর মশার কামড়ে ফুলে একাকার হয়ে যাচ্ছে, সেদিকে তাকানোর সময় আপাতত কারো নেই। সবাই এখন হারিকেন প্রকল্পের টেন্ডার বাগানোর স্বপ্নে বিভোর।
বিদ্যুৎকেন্দ্র পাহারা দিতে ১০ হাজার হারিকেন কেনার আবেদন
এশিয়া পোস্ট স্যাটায়ার / ‘জ্যান্ত কবর না দিতে’ বাংলাদেশিদের নিয়ে নেতানিয়াহুর সংবাদ সম্মেলন
তেল আবিবের মাটির ২০০ ফুট নিচে এক অতিগোপন বাংকারে আজ এক অভাবনীয় সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হলো। তবে মজার ব্যাপার হলো, এই সংবাদ সম্মেলনে সিএনএন, বিবিসি, রয়টার্স বা আলজাজিরার কোনো নামিদামি সাংবাদিককে ডাকা হয়নি। বরং এটি বিশেষভাবে লাইভ স্ট্রিম করা হয়েছে বাংলাদেশের কিছু ভুঁইফোড় নিউজ পোর্টাল, ফেসবুক পেজের অ্যাডমিন এবং ইউটিউব কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের উদ্দেশ্যে। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত এবং দৃশ্যত চরম হতাশ অবস্থায় ডায়াসে এসে দাঁড়ালেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার চোখের নিচে কালি, হাতে একগাদা স্ক্রিনশট। স্ক্রিনশটগুলোর বেশিরভাগই লাল, হলুদ আর নিয়ন রঙের বিশাল ফন্টে লেখা— ‘এইমাত্র পাওয়া: নেতানিয়াহুর শেষ বিদায়! কাঁপছে ইসরায়েল! মাটির নিচে তলিয়ে গেল তেল আবিব!’ গলা পরিষ্কার করে, অনেকটা কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে নেতানিয়াহু তার ‘মানবিক আবেদন’ শুরু করলেন: ‘সুপ্রিয় বাংলাদেশি কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, ফেসবুক পেজের অ্যাডমিন, এবং ‘ডুম ডুম’ ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দিয়ে খবর পড়া ভাইয়েরা... আপনাদের কাছে আমার করজোড়ে বিনীত অনুরোধ, দয়া করে আমাকে মাফ করে দিন! আমাকে অন্তত জ্যান্ত কবর দেবেন না ভাই! বিশ্বাস করুন, আমরা মাঠে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ করছি ঠিকই, কিন্তু আপনাদের খবরের টাইটেল দেখে আমার নিজের দেশের মানুষ যতটা ভয় পাচ্ছে, ইরানের আসল মিসাইলেও ততটা ভয় পাচ্ছে না। আপনারা আমাকে দিনে ঠিক কতবার মারেন? সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি এক চ্যানেলে আমি ব্রেইন স্ট্রোক করেছি। দুপুরে লাঞ্চ করতে বসে দেখি আরেক পেজে আমার জানাজা পড়ানো হচ্ছে! আর রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে দেখি, আমি নাকি ভয়ে মোজতবা খামেনির পা জড়িয়ে ধরে কাঁদছি! ভাই, মোজতবা খামেনি নিজেই নাকি ঠিকমতো হাঁটতে পারে না, আমি তার পা ধরব কী করে? আমার সেনাবাহিনীর (IDF) মোরাল এখন একদম তলানিতে। কাল সকালে আমার এক শীর্ষ সেনাপতি এসে ইস্তফাপত্র দিল। আমি বললাম, ‘কেন? যুদ্ধ তো সবে শুরু!’ সে মোবাইল বের করে বাংলাদেশের একটা ফেসবুক পেজের ভিডিও দেখিয়ে বলল, ‘স্যার, আপনি কি খবর দেখেন না? ইরানের কাছে নাকি এমন এক ড্রোন আছে, যেটা আগে মানুষের নাম ধরে ডাকে, তারপর দরজা খুললেই গুলি করে দেয়!  এইমাত্র বাংলাদেশের ওই ভাইয়াটা কনফার্ম করল!’ ভাইয়েরা আমার, আপনারা ইরানের বীরত্ব দেখাতে গিয়ে তাদের রীতিমতো ‘অ্যাভেঞ্জার্স’ বা ‘সুপারম্যান’ বানিয়ে দিয়েছেন! আপনাদের বানানো খবর দেখে স্বয়ং ইরানের সুপ্রিম লিডার খামেনি সাহেবও হয়তো আপনাদের চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করে বসে আছেন এটা জানার জন্য যে, তার নিজের কাছে আর কী কী জাদুকরী অস্ত্র আছে! আপনাদের এক ভিডিওতে দেখলাম, ইরান নাকি এমন এক মিসাইল ছুড়েছে যেটা মাঝপথে চা খাওয়ার জন্য ব্রেক নেয়, আমাদের রাডারকে বোকা বানায়, তারপর আবার উড়ে এসে টার্গেটে আঘাত হানে! ভাই, এসব তো হলিউডের সায়েন্স ফিকশন সিনেমাতেও দেখায় না! আমার বিশ্বখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা 'মোসাদ' (Mossad) এখন চরম ডিপ্রেশনে ভুগছে। মোসাদের প্রধান কাল আমাকে ফোন করে হাউমাউ করে কেঁদে দিলেন। বললেন, ‘স্যার, আমরা এত বিলিয়ন ডলার খরচ করে ইন্টেলিজেন্স বের করি, আর বাংলাদেশের ওই ইউটিউব চ্যানেলগুলো আমাদের চেয়ে দশ দিন আগে ভবিষ্যদ্বাণী করে দিচ্ছে! কালকের ভিডিওতে তারা বলল, ইসরায়েল নাকি আজ রাতেই আটলান্টিক মহাসাগরে ডুবে যাবে! স্যার, আমরা কি সাঁতার কাটা শিখব?’ ইসরায়েলের সাধারণ মানুষ এখন সাইরেন শুনলে আর বাংকারে যায় না, তারা আগে বাংলাদেশের ফেসবুক পেজ রিফ্রেশ করে দেখে যে তারা কি এখনও বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে! কাল রাতে আমার স্ত্রী সারা নেতানিয়াহু আমাকে ঘুম থেকে ধাক্কা দিয়ে তুলে বলছে, ‘ওঠো! জলদি ওঠো! বাংলাদেশের ওই চ্যানেল তো ব্রেকিং নিউজ দিল, আমরা নাকি সাবমেরিনে করে আমেরিকায় পালাচ্ছি! তুমি এখনো বিছানায় ঘুমাচ্ছ কেন? জলদি সুটকেস গোছাও!’ আমি আপনাদের কাছে অত্যন্ত বিনীতভাবে মানবিক আবেদন জানাচ্ছি। যুদ্ধ আমরা ময়দানে লড়ে নেব, কিন্তু দয়া করে আপনাদের এডিটিং প্যানেলে বসে আমাদের ধ্বংস করবেন না। আপনাদের এই ‘থাম্বনেইল-সন্ত্রাস’ আর বিকট শব্দের সাসপেন্স মিউজিক বন্ধ করুন। আপনারা চাইলে আমি আপনাদের সব কয়টা চ্যানেলে স্পন্সরশিপ দেব, আমার পুরো মন্ত্রিসভাকে দিয়ে আপনাদের চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করাব, বেল আইকনেও চাপ দিয়ে রাখব, ভিডিওতে লাইক-কমেন্ট-শেয়ার সবই করব... তাও দয়া করে আমাদের একটু শান্তিতে থাকতে দিন। বক্তব্য শেষে নেতানিয়াহু পকেট থেকে টিস্যু বের করে চোখ মুছতে লাগলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে এক পাশ থেকে তার এক নিরাপত্তা উপদেষ্টা হন্তদন্ত হয়ে বাংকারে প্রবেশ করলেন। হাতে আইপ্যাড। কাঁপতে কাঁপতে তিনি বললেন, ‘‘স্যার! সর্বনাশ হয়ে গেছে! বাংলাদেশের একটা পেজ মাত্র ব্রেকিং নিউজ দিয়ে লাইভে এসেছে— তারা বলছে, আপনি নাকি ভয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এখন গাজায় ত্রাণ বিলি করতে চলে গেছেন!’ নেতানিয়াহু আর কিছু বলতে পারলেন না। শূন্য দৃষ্টিতে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর কপালে হাত দিয়ে মাইক্রোফোনের ওপর মাথা ঠুকে জ্ঞান হারালেন। সংবাদ সম্মেলন এখানেই সমাপ্ত! [সতর্কীকরণ: নেতানিয়াহুকে নিয়ে লিখিত উপরোক্ত বিষয়টি স্যাটায়ার বা রম্য লেখা। পাঠকের বিনোদনের উদ্দেশে এশিয়া পোস্ট স্যাটায়ারটি লিখেছে। বিষয়টি বাস্তব ভেবে পাঠককে বিভ্রান্ত না হতে সতর্ক করা হলো।]
‘জ্যান্ত কবর না দিতে’ বাংলাদেশিদের নিয়ে নেতানিয়াহুর সংবাদ সম্মেলন
এশিয়া পোস্ট স্যাটায়ার / ঈদের দিন ব্যাচেলরদের কষ্ট দূর করার ৯ উপায়
ঈদের দিন সকাল। চারপাশে সবাই নতুন পাঞ্জাবি পরে ঘুরছে, আর আপনি মেসের ভাঙা খাটে শুয়ে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে আছেন। বাড়ি যাওয়া হয়নি, পকেটে টাকা নেই, চাকরিও নেই। বুকের ভেতর হু হু করে ওঠাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বেকার ও শিক্ষিত ব্যাচেলর ভাইয়েরা, দুঃখ করে কী লাভ? আসুন, এই করুণ পরিস্থিতিকে একটু অন্য চোখে দেখি।  আপনাদের ঈদের দিনটিকে রঙিন করতে রইল ১০টি শতভাগ ‘কার্যকরী’ স্যাটায়ারিক উপায়— নতুন জামার কষ্ট দূর করুন নতুন পাঞ্জাবি কেনার টাকা নেই তো কী হয়েছে? মেসের খাটের নিচে গত তিন মাস ধরে পড়ে থাকা সেই শার্টটা বের করুন। এরপর আধা কেজি ডিটারজেন্ট দিয়ে এমনভাবে ঘষুন যেন শার্টের ভেতরের ময়লার সাথে আপনার জীবনের সব হতাশা ধুয়ে যায়। কড়া রোদে শুকানোর পর ডিটারজেন্টের যে কড়া গন্ধ বেরোবে, চোখ বন্ধ করে ভাবুন—এটাই নামিদামি ব্র্যান্ডের পারফিউম! ব্যাচেলর স্পেশাল মাল্টিভার্স খিচুড়ি পোলাও-কোর্মা মিস করছেন? চিন্তা নেই! রান্নাঘরে গিয়ে হাঁড়িতে বেঁচে থাকা চাল, ডাল, আলু আর সব রকম মসলা একসাথে মিশিয়ে বানিয়ে ফেলুন ‘ব্যাচেলর স্পেশাল মাল্টিভার্স খিচুড়ি’। মাংস নেই তো কী হয়েছে? ডিম ভেজে সেটাকে গরুর মাংস ভেবে চিবোতে থাকুন। মনে রাখবেন, পেট ভরানোটাই আসল, স্বাদ তো মনের ভুল! ঈদ সালামি নিশ্চিত করুন ঈদে বাসায় নেই বলে কি সালামি জুটবে না? মোটেই না! সকালে উঠেই সব আত্মীয়-স্বজন, বড় ভাই আর ধনী কাজিনদের ইমোশনাল মেসেজ পাঠান— "ঈদের দিনে পরিবারকে খুব মিস করছি... আপনাদের দোয়াই আমার সম্বল।" আর ঠিক নিচেই ব্র্যাকেটে লিখে দিন: "(বিকাশ/নগদ নম্বর: ০১XXX... সেন্ড মানি খরচসহ দিলে ভালো হয়)"। দেখবেন, দু-একজন ইমোশনাল হয়ে ঠিকই কিছু পাঠিয়ে দেবে! প্রেমিকাকে খুশি করুন পকেটে বাতাস, এদিকে প্রেমিকার ফোন— "বেবি, আমার জন্য ঈদে কী কিনলে?" ঘাবড়াবেন না। একদম গম্ভীর গলায় দার্শনিক হয়ে যান। বলুন, "জান, পুঁজিবাদী সমাজ আমাদের শিখিয়েছে ভালোবাসা মানেই উপহার। কিন্তু আমি এই ঈদে বস্তুতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছি। আমার এই খাঁটি প্রেমই তোমার সেরা ঈদ গিফট!" (বুক ধড়ফড় করলেও গলা কাঁপতে দেওয়া যাবে না)। বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ যেসব বন্ধু আপনাকে মেসে ফেলে বাড়ি গিয়ে ঈদের মাংস খাচ্ছে, তাদের একটু প্যারা না দিলে কি হয়? ফোন করে করুণ গলায় বলুন, "দোস্ত, তোর তোশকটা তো ইঁদুরে কেটে শেষ করে দিল!" অথবা, ওদের আপলোড করা সুন্দর সুন্দর ঈদের ছবির নিচে কমেন্ট করুন— "ভাই, পাঞ্জাবিটা কি গত বছরের? নাকি ধার করা?" দেখবেন, ওদের ঈদের আনন্দ একটু হলেও মাটি হবে, আর আপনার শান্তি লাগবে। দুবাই ঘুরে আসুন ঈদের দিন বাইরে প্রচুর রোদ, জ্যাম আর আত্মীয়দের "চাকরি কবে পাবি" জাতীয় প্রশ্ন। এই সব কিছু থেকে বাঁচার সেরা উপায় হলো— ঘুম। চোখ বন্ধ করুন আর স্বপ্নে দুবাই গিয়ে ঈদ উদযাপন করে আসুন। এই ঘুমের কোনো খরচ নেই, আর কেউ ডিস্টার্ব করারও নেই। ঘুম থেকে উঠলে দেখবেন ঈদের দিন অর্ধেক শেষ! দামি গাড়িতে চড়ার অনুভুতি নিন রুমমেট যে পাঞ্জাবিটা ভুল করে মেসে ফেলে গেছে, সেটা ইস্ত্রি করে পরে ফেলুন। এরপর মেসের সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে পাশের বাড়ির আঙ্কেলের দামি গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে একটা সেলফি তুলুন। ক্যাপশনে লিখুন— "ঈদ ভাইবস! আলহামদুলিল্লাহ ফর এভরিথিং।" কেউ বুঝতেই পারবে না আপনার পেটে খিদে আর পকেটে শূন্যতা। বিনা পুঁজিতে রাজকীয় ভোজ এলাকায় পরিচিত কোনো বিবাহিত বড় ভাই থাকলে ঠিক দুপুরের সময় করুণ মুখ করে তার বাসায় হাজির হয়ে যান। গিয়ে শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলুন, "ভাইয়া, আজ মেসের চুলা জ্বলেনি...।" ব্যাস! ভাবি এমনিতেই মায়া করে আপনাকে পোলাও-মাংস খাইয়ে দেবে। একেই বলে বিনা পুঁজিতে রাজকীয় ভোজ। সমব্যাথী ভাইদের সাথে আড্ডা সবশেষে, মেসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আপনার মতো যে কজন অভাগা ব্যাচেলর রয়ে গেছে, তাদের সাথে এক কাপ লাল চা হাতে আড্ডায় বসুন। নিজেদের দুঃখগুলো নিয়ে হাসাহাসি করুন। বিশ্বাস করুন, এই মেসে থাকা দিনগুলো, এই একসাথে চা খাওয়া আর পকেট ফাঁকা থাকার গল্পগুলোই একদিন আপনাদের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি হয়ে থাকবে।
ঈদের দিন ব্যাচেলরদের কষ্ট দূর করার ৯ উপায়
ডিকশনারি থেকে ‘গুপ্ত’ শব্দ ডিলিট, বিপদে বাংলা একাডেমি
ডিকশনারি থেকে ‘গুপ্ত’ শব্দ ডিলিট, বিপদে বাংলা একাডেমি
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ড. মফিজুর রহমান (ছদ্মনাম) সকালবেলা সবেমাত্র তার প্রিয় দার্জিলিং চায়ে চুমুক দিয়েছেন, এমন সময় তার খাসকামরার দরজা সজোরে খুলে গেল। হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে ঢুকলেন একাডেমির প্রধান আভিধানিক (ডিকশনারি সম্পাদক) অধ্যাপক তোফাজ্জল হোসেন। তার এক হাতে একটি দৈনিক পত্রিকা, অন্য হাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি ফাইল এবং বগলের নিচে একটি হেলমেট। মহাপরিচালক ভ্রু কুঁচকে বললেন, ‘কী ব্যাপার তোফাজ্জল সাহেব? আপনি অফিসে হেলমেট নিয়ে এসেছেন কেন? আর আপনার চেহারা এমন ফ্যাকাশে কেন? কোনো নতুন শব্দের বানান নিয়ে আবার ফেসবুকে ট্রল শুরু হয়েছে নাকি? ‘গরু’ বানানে কি আবার কেউ হ্রস্ব-উ কারের বদলে দীর্ঘ-ঊ কার দিয়ে বসেছে?’ তোফাজ্জল সাহেব ঢোক গিলে বললেন, “স্যার, পরিস্থিতি তার চেয়েও ভয়াবহ। ‘গরু’ বানান নিয়ে কেউ মাথা ঘামাচ্ছে না। সমস্যা শুরু হয়েছে ‘গুপ্ত’ নিয়ে। এই একটা শব্দের কারণে দেশে রীতিমতো গৃহযুদ্ধ লেগে যাওয়ার উপক্রম। চট্টগ্রামের এক কলেজে এই শব্দ নিয়ে মারামারি করে ২০ জনের মাথা ফেটেছে, একজনের পায়ের গোড়ালি প্রায় বিচ্ছিন্ন! আর এখন…” “আর এখন কী?” মহাপরিচালক চায়ের কাপ নামিয়ে রাখলেন। “আর এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে লাল খামে জরুরি নোটিশ এসেছে। তারা বলেছে, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বাংলা একাডেমিকে ‘গুপ্ত’ শব্দের একটি সর্বজনীন, অরাজনৈতিক, নিরীহ এবং ‘অহিংস’ অর্থ নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে। নইলে আমাদের সবার চাকরি নট। শুধু তাই নয়, স্যার, নিচতলায় দুই দলের ছাত্রনেতারা এসে অবস্থান নিয়েছে। একদল বলছে ‘গুপ্ত’ শব্দটাকে অভিধান থেকে চিরতরে মুছে ফেলতে হবে, আরেক দল বলছে শব্দটা অভিধানে রাখতে হবে, তবে ব্র্যাকেটে লিখে দিতে হবে যে এটা শুধু বিরোধী দলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য!” মহাপরিচালক ড. মফিজুর রহমান দুই হাতে মাথা চেপে ধরলেন। তার মনে হলো, সাহিত্য চর্চা ও অভিধান প্রণয়নের মতো এমন নিরীহ পেশায় না এসে যদি তিনি বর্ডার গার্ডে যোগ দিতেন, তবে জীবনটা অনেক বেশি নিরাপদ ও শান্তিময় হতো। ‘গুপ্’ ধাতুর ময়নাতদন্ত ও ইমারজেন্সি মিটিং: বেলা ১১টায় বাংলা একাডেমির সভাকক্ষে জরুরি সভা ডাকা হলো। দেশের বাঘা বাঘা ভাষাবিজ্ঞানী, ব্যাকরণবিদ, এবং কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপককে ঘুম থেকে ডেকে আনা হয়েছে। সভার বিষয়বস্তু: ‘গুপ্ত’ শব্দের রাজনৈতিক পুনর্বাসন। সভার শুরুতে মহাপরিচালক গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, ‘উপস্থিত সুধীমণ্ডলী, আপনারা নিশ্চয়ই জানেন দেশ আজ এক গভীর ভাষাতাত্ত্বিক সংকটের মুখোমুখি। একটি মাত্র শব্দ, যার জন্ম আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগে, সেটি আজ আমাদের জাতীয় নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। আমাদের আজ সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এই ‘গুপ্ত’ শব্দটিকে আমরা কীভাবে নিষ্ক্রিয় করতে পারি। বোম ডিসপোজাল ইউনিটের মতো আজ আমাদের ওয়ার্ড ডিসপোজাল ইউনিট হিসেবে কাজ করতে হবে।’ প্রবীণ ভাষাবিজ্ঞানী ড. আসজাদুল হক তার মোটা চশমার ফ্রেমটা ঠিক করে বললেন, ‘কিন্তু স্যার, এটা তো ব্যাকরণগতভাবে অসম্ভব। সংস্কৃত ‘গুপ্’ ধাতুর সঙ্গে ‘ক্ত’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ‘গুপ্ত’ শব্দের উৎপত্তি। এর অর্থ হলো যা গোপন করা হয়েছে বা লুক্কায়িত। আমরা তো আর ব্যাকরণের ধাতু পরিবর্তন করতে পারি না। হাজার হাজার বছর ধরে…।’ তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে এক তরুণ গবেষক টেবিল চাপড়ে বলে উঠলেন, ‘রাখেন আপনার ‘গুপ্’ ধাতু! দেশে যখন মানুষের পায়ের গোড়ালি থাকে না, তখন আপনার ধাতুর কী দরকার? আপনি কি জানেন এই ধাতুর কারণে কতগুলো মায়ের বুক খালি হওয়ার জোগাড় হয়েছে? আমি প্রস্তাব করছি, ‘গুপ্’ ধাতুকে অবিলম্বে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হোক। এটি একটি প্রতিক্রিয়াশীল ধাতু। এটি বৈষম্যমূলক ধাতু।’ ড. আসজাদুল হক হতবাক হয়ে বললেন, ‘ধাতু আবার প্রতিক্রিয়াশীল হয় কীভাবে।’ তরুণ গবেষক খেঁকিয়ে উঠলেন, ‘অবশ্যই হয়। যে ধাতু প্রকাশ্যে থাকতে পারে না, যে ধাতু লুকিয়ে থাকে, তাকে কোনোভাবেই প্রগতিশীল বলা যায় না। আমি তো মনে করি কৌটিল্য তার অর্থশাস্ত্রে এই ‘গুপ্তচর’ শব্দটা বানিয়েছিলেনই আজকের এই রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করার জন্য। এটা প্রাচীন ভারতের একটা মাস্টারপ্ল্যান।’ মহাপরিচালক হাত তুলে সবাইকে শান্ত করলেন। ‘দয়া করে ইতিহাস আর ব্যাকরণ নিয়ে ঝগড়া করবেন না। আমাদের প্র্যাকটিক্যাল সমাধানে আসতে হবে। আমরা যদি অভিধান থেকে ‘গুপ্ত’ শব্দটা বাদ দিয়ে দিই, তাহলে কী কী সমস্যা হতে পারে, তার একটা তালিকা করুন।’ শব্দার্থ বদলের মহোৎসব ও অভিধানের সংকট তালিকা করতে গিয়ে দেখা গেল, পরিস্থিতি ‘প্যান্ডোরাস বক্স’ খোলার চেয়েও ভয়ংকর। ‘গুপ্ত’ শব্দটা বাদ দিলে বাংলা ভাষার অর্ধেক রোমাঞ্চ আর সাহিত্যিক সৌন্দর্য ধসে পড়বে। প্রধান আভিধানিক তোফাজ্জল সাহেব একে একে সমস্যাগুলো তুলে ধরতে লাগলেন: গুপ্তধন: “স্যার, ‘গুপ্ত’ বাদ দিলে ‘গুপ্তধন’-এর কী হবে? আমাদের রূপকথার গল্পগুলোতে তো আর ‘প্রকাশ্যধন’ বলা যাবে না। আলি বাবা ও চল্লিশ চোর কি তাহলে ‘প্রকাশ্য গুহায়’ ‘ওপেন ধন’ খুঁজবে? আর ট্রেজার হান্ট বা গুপ্তধন খোঁজার যে থ্রিলার বইগুলো আছে, সেগুলোর নাম কী হবে? ‘জনসম্মুখে রক্ষিত ধনতন্ত্র’?” গুপ্তচর: ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা ‘গুপ্তচর’ নিয়ে। জেমস বন্ড থেকে শুরু করে মাসুদ রানা—এঁদের পেশা কী হবে? আমরা কি তাদের ‘তথ্য-উন্নয়ন কর্মী’ বা ‘সরাসরি সম্প্রচারিত এজেন্ট’ বলব? জেমস বন্ড কি এসে বলবে, ‘মাই নেম ইজ বন্ড, জেমস বন্ড, আমি একজন প্রকাশ্য-চর’?” গুপ্তহত্যা: ‘পত্রিকায় রোজ লেখা হয় ‘গুপ্তহত্যা’। এখন কি লিখতে হবে ‘অজ্ঞাত পরিচয়ে ওপেন-হত্যা’ বা ‘সারপ্রাইজ কিলিং’? চিকিৎসাবিজ্ঞানের চরম সংকট (গুপ্তাঙ্গ): “স্যার, সবচেয়ে সেনসিটিভ বিষয় হলো চিকিৎসাবিজ্ঞান। অ্যানাটমি বইয়ে ‘গুপ্তাঙ্গ’ বলে একটা শব্দ আছে। এখন চিকিৎসকরা তো মহাবিপদে পড়েছেন। এক রোগী নাকি কাল ডাক্তারকে গিয়ে বলেছে, ‘ডাক্তার সাহেব, আমার প্রকাশ্যাঙ্গে ইনফেকশন হয়েছে!’ ডাক্তার তো শুনে বেহুঁশ। এখন আমরা কি অভিধানে লিখব— ‘যে অঙ্গ সাধারণত কাপড়ে ঢাকা থাকে কিন্তু রাজনৈতিক কারণে যাকে আর গুপ্ত বলা যাবে না’?” গুপ্ত সমিতি: ইতিহাসের বই থেকে বাংলার বিপ্লবীদের কী হবে? ‘অনুশীলন সমিতি’ বা ‘যুগান্তর’ দল তো ছিল গুপ্ত সমিতি। মাস্টারদা সূর্য সেন কি তাহলে ‘গুপ্ত’ ছিলেন না? ইতিহাস বইয়ের লেখকরা ফোন করে জানতে চাইছেন, তারা কি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ‘প্রকাশ্য বিপ্লব’ লিখে ইতিহাস পাল্টে ফেলবেন কি না। সব শুনে মহাপরিচালক ড. মফিজুর রহমান ঘামতে শুরু করলেন। তিনি পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছলেন। “বুঝতে পারছি, শব্দটা বাদ দেওয়া যাবে না। তাহলে এর অর্থ পরিবর্তন করে দেওয়া হোক। ‘গুপ্ত’ মানে লিখে দেওয়া হোক— ‘এমন কিছু যা আসলে প্রকাশ্য, কিন্তু দেখার সুবিধার্থে একটু আড়ালে রাখা হয়েছে’।” দেশজুড়ে ‘গুপ্ত’ আতঙ্ক ও নাম পরিবর্তনের হিড়িক বাংলা একাডেমিতে যখন রুদ্ধদ্বার বৈঠক চলছে, তখন সারা দেশে ‘গুপ্ত’ শব্দটি নিয়ে শুরু হয়েছে চরম সোশ্যাল হিস্টেরিয়া। সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন সেসব নিরীহ মানুষ, যাদের নামের শেষে ‘গুপ্ত’ পদবি যুক্ত আছে। সেনগুপ্ত, দাশগুপ্ত, দত্তগুপ্ত—এই পদবির মানুষেরা হঠাৎ করেই নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে চরম আতঙ্কে ভুগছেন। পরদিন সকালে ঢাকা জজকোর্টের সামনে নোটারি পাবলিকের অফিসে দেখা গেল বিশাল লম্বা লাইন। সবার হাতে এফিডেভিট বা হলফনামার কাগজ। নোটারি পাবলিকের এক উকিল ক্লান্ত গলায় ডাকলেন, “পরবর্তী জন আসুন। আপনার নাম কী?” লোকটি কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “আজ্ঞে, আমার নাম ভবেশ দাশগুপ্ত।” উকিল চমকে উঠে বললেন, “আস্তে! আস্তে বলুন! কেউ শুনে ফেললে আপনাকে ধরে পিটুনি দেবে। আপনি কি জানেন না দেশে এখন ‘গুপ্ত’ নিষিদ্ধ? তা, কী করতে চান?” ভবেশ বাবু বললেন, “স্যার, আমার পদবিটা বদলে দিন। পাড়ার মোড়ে দাঁড়ালে ছেলেপেলেরা আমাকে দেখে বলছে, ‘ঐ দেখ, একটা গুপ্ত যাচ্ছে! নিশ্চয়ই ও ভেতরে ভেতরে অন্য কোনো দলের স্লিপার সেল!’ আমার তো স্যার ভয়ে রাতে ঘুম হচ্ছে না। আমার পদবিটা পরিবর্তন করে ‘দাশ-প্রকাশ্য’ করে দিন। অথবা ‘দাশ-স্বচ্ছ’ করে দিন। ট্রান্সপারেন্সি থাকা দরকার, স্যার।” পাশের লাইন থেকে আরেক ভদ্রলোক বলে উঠলেন, “আমার নাম সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত। আমি আজ থেকে ‘সমরেন্দ্র সেন-ওপেন’। ফেসবুকে নাম বদলে দিয়েছি। কেউ আমাকে আর ‘গুপ্ত’ বলে সন্দেহ করতে পারবে না। আমি এখন থেকে পুরোপুরি ওপেন সোর্স!” শুধু তাই নয়, ইতিহাস বইতেও সেলফ-সেন্সরশিপ শুরু হয়ে গেল। স্কুলের এক প্রধান শিক্ষক তার নিজস্ব উদ্যোগে ইতিহাসের বই থেকে ‘গুপ্ত সাম্রাজ্য’ অধ্যায়ের ওপর কালো কালি লেপে দিয়েছেন। তিনি ছাত্রদের পড়াচ্ছেন, “প্রাচীন ভারতে মৌর্য সাম্রাজ্যের পর একটি সাম্রাজ্য এসেছিল, যার নাম মুখে আনা নিষেধ। তবে তারা খুব ক্ষমতাশালী ছিল। প্রথম চন্দ্র[সেন্সরড] ছিলেন এই সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা।” হোটেল-রেস্তোরাঁয় খাবারের মেনু থেকেও ‘গুপ্ত’ শব্দটি উধাও হয়ে গেল। পুরান ঢাকার এক বিখ্যাত কাবাবের দোকানের স্পেশাল আইটেম ছিল ‘গুপ্ত কাবাব’ (ভেতরে কিমা লুকানো থাকে বলে এই নাম)। মালিক ভয়ে সেই রাতেই সাইনবোর্ড পাল্টে লিখলেন: “এখানে ১০০% প্রকাশ্য কাবাব পাওয়া যায়। কাবাবের ভেতরে কোনো রাজনৈতিক বা আদর্শিক কিমা লুকানো নেই। সব ওপেন।” ছাত্রনেতাদের আলটিমেটাম ও একাডেমির ঘেরাও: দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই বাংলা একাডেমি চত্বরে স্লোগান শোনা গেল। “গুপ্ত শব্দের আস্তানা—ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও!” “যে শব্দ গোড়ালি কাটে—সেই শব্দের গালে গালে, জুতো মারো তালে তালে!” দুই দলের ছাত্রনেতারা এসে সোজা মহাপরিচালকের রুমে ঢুকে পড়লেন। প্রথম দলের নেতা টেবিল চাপড়ে বললেন, “স্যার, অভিধানে ‘গুপ্ত’ শব্দের পাশে স্পষ্ট করে লিখে দিতে হবে যে, ‘যারা প্রকাশ্যে এক কথা বলে আর ভেতরে অন্য এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে, তারাই গুপ্ত’ এবং ব্র্যাকেটে আমাদের বিরোধী দলের নাম লিখে দিতে হবে। এটা আমাদের এক দফা দাবি।” দ্বিতীয় দলের নেতা তেড়ে এসে বললেন, “কক্ষনো না! আমরা প্রকাশ্যে রাজনীতি করি। আমাদের গঠনতন্ত্র ওয়েবসাইটে দেওয়া আছে। আমরা কেন গুপ্ত হতে যাব? অভিধানে লিখতে হবে— ‘গুপ্ত মানে হলো একটি ঐতিহাসিক মিথ্যাচার, যা রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য ব্যবহার করা হয়।’ এবং এর সমার্থক শব্দ হিসেবে লিখতে হবে— ‘প্রোপাগান্ডা’ বা ‘গুজব’।” মহাপরিচালক দুই দলের মাঝখানে বসে কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, “বাবারা, তোরা একটু শান্ত হ। অভিধান তো আর পলিটিক্যাল ম্যানিফেস্টো না যে যখন খুশি ব্র্যাকেটে দলের নাম ঢুকিয়ে দেব। হরিনাথ দে, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ—এরা যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাহলে তোরা কি তাদেরকেও ঘেরাও করতি?” প্রথম নেতা বললেন, “শহীদুল্লাহ সাহেব বেঁচে থাকলে তাকেও বলতাম আপডেট হতে। যুগ পাল্টেছে স্যার। এখন শব্দ মানেই অস্ত্র। আপনি যদি আমাদের কথামতো অভিধান না ছাপেন, তাহলে আমরা বাংলা একাডেমির বইমেলায় ‘গুপ্ত’ প্রকাশনীগুলোর স্টল ভাঙচুর করব।” মহাপরিচালক অবাক হয়ে বললেন, ‘গুপ্ত প্রকাশনী আবার কোনটা?’ নেতা বললেন, “যাদের বইয়ের প্রচ্ছদ দেখে ভেতরে কী লেখা আছে বোঝা যায় না, তারাই গুপ্ত প্রকাশনী!” পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ভাষাবিজ্ঞানী ড. আসজাদুল হক একটা অভিনব প্রস্তাব দিলেন। তিনি বললেন, “দেখুন, আমরা একটা আপস-মীমাংসায় আসতে পারি। আমরা অভিধানে ‘গুপ্ত’ শব্দের তিনটি আলাদা অর্থ দেব। অর্থ ১ (ঐতিহাসিক): যা লুক্কায়িত (যেমন: গুপ্তধন)। অর্থ ২ (রাজনৈতিক-অভিযোগ): প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য ব্যবহৃত একটি মারাত্মক বিশেষ্য বা বিশেষণ। অর্থ ৩ (চিকিৎসাবিজ্ঞান): যা প্রকাশ করা যায় না। আর সবচেয়ে বড় কথা, আমরা শব্দের নিচে সিগারেটের প্যাকেটের মতো একটা সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ জুড়ে দেব।” ছাত্রনেতারা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। ‘সতর্কীকরণ? সেটা আবার কী?’ ড. আসজাদুল হক খসড়া পড়ে শোনালেন: “সতর্কীকরণ: ‘গুপ্ত’ শব্দটি একটি দাহ্য ও বিপজ্জনক শব্দ। যত্রতত্র, বিশেষ করে কলেজের দেয়ালে, প্রতিপক্ষের পোস্টে বা চায়ের দোকানে এই শব্দ ব্যবহার করা স্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকর। এর অতিরিক্ত ব্যবহারে লাঠিসোঁটা, কিরিচ, ইটপাটকেল উড়ে আসতে পারে, ক্লাস বাতিল হতে পারে এবং সর্বোপরি পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলা একাডেমি নিজ দায়িত্বে এই শব্দ ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছে।” প্রস্তাব শুনে প্রথম দলের নেতা একটু নরম হলেন। ‘হুম, সতর্কীকরণ থাকলে মন্দ হয় না। মানুষ অন্তত ভয় পাবে।’ দ্বিতীয় দলের নেতা বললেন, ‘ঠিক আছে, তবে সতর্কীকরণের ফন্ট সাইজ বড় হতে হবে। আর লাল কালিতে ছাপতে হবে।” টকশোতে ‘গুপ্ত’ বিতর্ক: সেদিন রাতেই দেশের সব কটি টিভি চ্যানেলে প্রাইম টাইম টকশো শুরু হলো। আলোচনার একমাত্র বিষয়: ‘গুপ্ত শব্দের রাজনৈতিক অর্থনীতি ও সমাজতাত্ত্বিক প্রভাব।’ একটি বেসরকারি চ্যানেলের টকশোতে সঞ্চালক অত্যন্ত গম্ভীর মুখে বললেন, “দর্শক, আজ আমরা আলোচনা করব এমন একটি শব্দ নিয়ে, যা আমাদের জাতীয় জীবনে এক অভূতপূর্ব বিভাজন তৈরি করেছে। আজ আমাদের স্টুডিওতে উপস্থিত আছেন বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী, একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং একজন ব্যাকরণবিদ।” সঞ্চালক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের দিকে ফিরে বললেন, ‘আপনার কাছে প্রথমেই জানতে চাই, এই যে হঠাৎ করে আমাদের রাজনীতিতে ‘গুপ্ত’ শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটল, এর পেছনে কি কোনো গুপ্ত ষড়যন্ত্র আছে? ইলুমিনাতি বা ফ্রিমেসনদের মতো কেউ কি এখানে কলকাঠি নাড়ছে?” বিশ্লেষক গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “দেখুন, বিষয়টিকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। প্রাচীন বাভারিয়ায় যেমন ইলুমিনাতি ছিল, আমাদের দেশেও এখন পলিটিক্যাল ইলুমিনাতি তৈরি হয়েছে। এরা প্রকাশ্যে নিরীহ, কিন্তু ভেতরে হাইলি একটিভ। আমার তো মনে হয় ‘গুপ্ত’ শব্দটি একটি কোডওয়ার্ড। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের মধ্যে সিগন্যাল আদান-প্রদান করছে। চট্টগ্রাম সিটি কলেজের দেয়ালের লেখাটি কোনো সাধারণ গ্রাফিতি ছিল না, এটি ছিল একটি সাংকেতিক মেসেজ!” ব্যাকরণবিদ রেগে গিয়ে বললেন, “আরে ভাই, আপনারা সব কিছুতেই ষড়যন্ত্র খোঁজেন কেন? ‘গুপ্ত’ একটি সাধারণ বিশেষণ। এর কাজ হলো বিশেষ্যের অবস্থা বোঝানো। আপনারা তো এখন ব্যাকরণকেই রিমান্ডে নেওয়ার ব্যবস্থা করছেন!” সমাজবিজ্ঞানী চশমা মুছে বললেন, “আমি মনে করি, আমাদের সমাজ এখন একটি ‘পোস্ট-গুপ্ত’ (Post-Gupto) যুগে প্রবেশ করেছে। আগে মানুষ লুকিয়ে প্রেম করত, তাকে বলত গুপ্তপ্রেম। এখন সব ফেসবুকে রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস দিয়ে করে। অর্থাৎ সমাজ থেকে গুপ্ততা হারিয়ে যাচ্ছে। এই যে রাজনীতিতে গুপ্ত নিয়ে এত অ্যালার্জি, তার মূল কারণ হলো আমাদের জেন-জি (Gen-Z) প্রজন্ম সবকিছুতে স্বচ্ছতা চায়। তারা কোনো ‘হিডেন চার্জ’ পছন্দ করে না, তা মোবাইল বিলেই হোক আর রাজনীতিতেই হোক।” টকশো যখন তুঙ্গে, তখন হঠাৎ নিচে ব্রেকিং নিউজ স্ক্রল যেতে শুরু করল: “ব্রেকিং নিউজ: বাংলা একাডেমির নতুন সিদ্ধান্ত—আগামীকাল থেকে ‘গুপ্ত’ শব্দের বদলে সরকারিভাবে ‘অপ্রকাশ্য-অস্থায়ী-অবস্থান’ পরিভাষাটি ব্যবহৃত হবে।” উপসংহার: নতুন শব্দের আগমন ও অনন্ত চক্র অবশেষে বহু কাঠখড় পুড়িয়ে, তিন দিন তিন রাত না ঘুমিয়ে বাংলা একাডেমির বিশেষজ্ঞ কমিটি একটি যুগান্তকারী প্রজ্ঞাপন জারি করল। প্রজ্ঞাপনে বলা হলো: “যেহেতু ‘গুপ্ত’ শব্দটি জনমনে ব্যাপক বিভ্রান্তি, ভীতি এবং শারীরিক জখমের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাই বৃহত্তর জনস্বার্থে এবং জাতীয় শান্তি রক্ষার্থে অভিধান থেকে আপাতত শব্দটির রাজনৈতিক ব্যবহার স্থগিত করা হলো। কেউ কাউকে রাজনৈতিকভাবে ‘গুপ্ত’ বলতে পারবে না। এর বদলে কেউ যদি কাউকে সন্দেহ করে, তবে তাকে ‘পেন্ডিং-প্রকাশ্য’ বা ‘অপেক্ষমাণ-স্বচ্ছতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করতে হবে।” বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশের পর মহাপরিচালক ড. মফিজুর রহমান স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। তিনি জানলার দিকে তাকিয়ে দেখলেন, বাইরের আকাশ পরিষ্কার। কলেজের ক্যাম্পাসগুলোতে আর মারামারি নেই। দাশগুপ্তরা আবার নিজেদের নামের শেষে ‘গুপ্ত’ লিখছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের বইগুলোও রক্ষা পেয়েছে। তিনি আবার তার প্রিয় দার্জিলিং চায়ে চুমুক দিতে যাবেন, ঠিক তখনই তার খাস কামরার দরজা আবার সজোরে খুলে গেল। সেই তোফাজ্জল সাহেব। হাতে আবার পত্রিকা, বগলে সেই হেলমেট, আর এবার তিনি রীতিমতো কাঁপছেন। “কী হলো আবার তোফাজ্জল? এবার তো সব সমাধান করে দিলাম। ‘গুপ্ত’ নিয়ে আর কোনো ঝামেলা আছে নাকি?” মহাপরিচালক বিরক্ত হয়ে বললেন। তোফাজ্জল সাহেব ঢোক গিলে বললেন, “স্যার, ‘গুপ্ত’ নিয়ে আর কোনো ঝামেলা নেই। কিন্তু... কিন্তু...” “কিন্তু কী? পরিষ্কার করে বলুন!” “স্যার, আজ সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক হলের দেয়ালে নতুন একটা গ্রাফিতি দেখা গেছে। সেখানে লেখা ছিল ‘স্বৈরাচারের দোসরদের প্রকাশ্যে বিচার চাই।’ কিন্তু রাতের আঁধারে কে বা কারা ‘প্রকাশ্যে’ শব্দটা মুছে সেখানে লিখে দিয়ে গেছে ‘উহ্য’। বাক্যটা দাঁড়িয়েছে— ‘স্বৈরাচারের দোসরদের উহ্য বিচার চাই’।” মহাপরিচালক লাফিয়ে উঠলেন। “উহ্য? মানে সাইলেন্ট? তাতে কী হয়েছে?” তোফাজ্জল সাহেব প্রায় কেঁদে ফেলে বললেন, “স্যার, একদল বলছে ‘উহ্য’ মানে হলো বিচার না করে মাফ করে দেওয়া। আরেক দল বলছে ‘উহ্য’ মানে হলো গুম করে দেওয়া। এই নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে আজ সকালে ব্যাপক গোলাগুলি শুরু হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে আবার ফ্যাক্স এসেছে স্যার... এবার আমাদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ‘উহ্য’ শব্দের মীমাংসা করতে হবে। নিচে ছাত্ররা লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তারা জানতে চায় ‘উহ্য’ আসলে কোন দলের এজেন্ট!” ড. মফিজুর রহমান ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লেন। তার মনে হলো, এই দেশে অভিধান লেখা আর মাইনফিল্ডে হাঁটা একই কথা। তিনি ড্রয়ার থেকে একটি সাদা কাগজ বের করে পদত্যাগপত্র লিখতে শুরু করলেন, যার শিরোনাম দিলেন— “একটি উহ্য-গুপ্ত আভিধানিকের প্রকাশ্য প্রস্থান!”
‘মোরগ পোলাও’ নাম ‘মুরগি পোলাও’ করার বিল সংসদে পাস
এশিয়া পোস্ট স্যাটায়ার / ‘মোরগ পোলাও’ নাম ‘মুরগি পোলাও’ করার বিল সংসদে পাস
মাননীয় স্পিকার, একটি মুরগি তার সারা জীবন ডিম দেয়। নিজের বুকের মাংস দিয়ে সে পোলাওকে সুস্বাদু করে। কিন্তু পরিবেশনের সময় বাবুর্চি হাঁক দিয়ে বলে—এই, ভিআইপি টেবিলে দুইটা মোরগ পোলাও দে! এটা কি পিতৃতন্ত্রের চরম আস্ফালন নয়? অন্যের কৃতিত্ব নিজের নামে চালিয়ে দেওয়ার এই পুরুষতান্ত্রিক কুম্ভীলকবৃত্তি আমরা আর মেনে নিতে পারি না।  আগামী ৩১ মে জাতীয় সংসদে এভাবেই বক্তব্য রাখছিলেন জাতীয় মুরগিমন্ত্রী খকখক। তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে আজ বাঙালির রন্ধনশিল্পের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ও অভাবনীয় অধ্যায়ের সূচনা হলো।  শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা রন্ধনতান্ত্রিক বৈষম্য এবং ভাষাগত পুরুষতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে জাতীয় সংসদে বিপুল করতালির মধ্য দিয়ে পাস হয়েছে ‘পোল্ট্রি নামকরণ (সংশোধন ও জেন্ডার সমতা) বিল-২০২৬’। এই বিলের সবচেয়ে আলোচিত ধারা অনুযায়ী, এখন থেকে দেশের সীমানার ভেতর আর কোথাও ‘মোরগ পোলাও’ বিক্রি, পরিবেশন বা বিজ্ঞাপন দেওয়া যাবে না। এর পরিবর্তে সর্বস্তরে বাধ্যতামূলকভাবে ‘মুরগি পোলাও’ শব্দটি ব্যবহার করতে হবে। সংসদের চলতি অধিবেশনে বিলটি উত্থাপন করা হলে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে তুমুল হাস্যরসাত্মক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। তবে শেষ পর্যন্ত লিঙ্গসমতা, ভাষাতাত্ত্বিক সততা এবং ভোক্তাদের অধিকার সংরক্ষণের যুক্তিতে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়ে যায়। পিতৃতান্ত্রিক কুম্ভীলকবৃত্তি ও বিলের প্রেক্ষাপট বিলের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে যত ‘মোরগ পোলাও’ বিক্রি হয়, তার ৯৯ দশমকি ৯ শতাংশ রান্না হয় ব্রয়লার, সোনালি বা লেয়ার মুরগি দিয়ে। দেশি মোরগ দিয়ে পোলাও রান্নার প্রচলন আজ কেবলই রূপকথার অংশ। কিন্তু যুগ যুগ ধরে পাতিলের ভেতর জীবন দিচ্ছে নিরীহ স্ত্রী-মুরগি, অথচ মেন্যু কার্ডে বড় বড় অক্ষরে নাম লেখা হচ্ছে ‘মোরগ’-এর। সংসদে বিলটি উত্থাপনকালে মুরগিমন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি তার আবেগঘন বক্তৃতায় বলেন, মাননীয় স্পিকার, আপনি একবার ভেবে দেখুন। একটি মুরগি সারা জীবন ডিম দেয়। এরপর যখন তার ডিম দেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়, তখন তাকে জবাই করে পোলাওয়ের হাঁড়িতে ফেলে দেওয়া হয়। নিজের বুকের মাংস দিয়ে সে পোলাওকে সুস্বাদু করে। কিন্তু পরিবেশনের সময় বাবুর্চি হাঁক দিয়ে বলে—এই, ভিআইপি টেবিলে দুইটা মোরগ পোলাও দে! মাননীয় স্পিকার, এটা কি পিতৃতন্ত্রের চরম আস্ফালন নয়? অন্যের কৃতিত্ব নিজের নামে চালিয়ে দেওয়ার এই পুরুষতান্ত্রিক কুম্ভীলকবৃত্তি আমরা আর মেনে নিতে পারি না। তার এই বক্তব্যের পর সংসদের নারী সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তাকে সমর্থন জানান। ভোক্তা অধিকার ও সত্যের জয় এই বিল পাসের পেছনে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছিল দেশের বেশ কয়েকটি অধিকার রক্ষা সংগঠন। সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছিলেন যে, এই মিথ্যা নামকরণের মাধ্যমে মূলত ভোক্তাদের সাথে প্রতারণা করা হচ্ছে।  বিল পাসের পর এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ফোরামের মুখপাত্র বলেন, আমরা সবসময় ভোক্তাদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার। একজন ভোক্তা যখন রেস্তোরাঁয় গিয়ে কষ্টার্জিত টাকা খরচ করেন, তখন তার অধিকার আছে এটা জানার যে, তিনি আসলে কী খাচ্ছেন। আপনি মেন্যুতে লিখছেন ‘মোরগ’, কিন্তু ভোক্তার প্লেটে দিচ্ছেন ‘মুরগি’। এটি সুস্পষ্টভাবে ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন’-এর লঙ্ঘন। এই বিল পাসের মাধ্যমে ভোক্তারা দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত প্রতারণা থেকে মুক্তি পেলেন। তিনি রেস্তোরাঁ মালিকদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এখন থেকে কোনো ভোক্তা যদি অভিযোগ করেন যে, তিনি মুরগি পোলাওয়ের দাম দিয়ে মোরগ পেয়েছেন, তবে রেস্তোরাঁর লাইসেন্স বাতিল করা হবে। সংসদীয় বিতর্ক: যা বললেন আইনপ্রণেতারা সংসদে বিলটি নিয়ে বেশ চমকপ্রদ বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। বিরোধী দলের একজন প্রবীণ সংসদ সদস্য বিলের বিরোধিতা করে বলেন, মাননীয় স্পিকার, মোরগ পোলাও আমাদের ঐতিহ্য। ঢাকার নবাবরা মোরগ পোলাও খেতেন। এই নাম পরিবর্তন করলে আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ওপর চরম আঘাত আসবে। আগামীকাল হয়তো বলা হবে ‘হাঁস-বুনো’ নাম পরিবর্তন করে ‘হাঁসী-বুনো’ করতে হবে! আমরা কি আমাদের ভাষাকে পোল্ট্রি ফার্ম বানিয়ে ফেলব? জবাবে সরকারি দলের এক তরুণ সাংসদ দাঁড়িয়ে বলেন, মাননীয় স্পিকার, বিরোধী দলের সদস্য ঐতিহ্যের দোহাই দিচ্ছেন। কিন্তু তিনি কি জানেন, নবাবরা আসলেই দেশি মোরগ খেতেন। তাদের বাবুর্চিরা আস্ত দেশি মোরগ দমে বসাতেন। কিন্তু বর্তমান যুগে রেস্তোরাঁর মালিকরা ফার্মের যে মুরগি দিয়ে পোলাও রাঁধেন, তাকে মোরগ বলাটা নবাবদেরও অপমান। আমরা নবাবদের অপমান করতে চাই না। আমরা কেবল সত্যটাকে মেন্যু কার্ডে তুলে আনতে চাই। আরেকজন সাংসদ একধাপ এগিয়ে প্রস্তাব করেন, মাননীয় স্পিকার, শুধু মুরগি পোলাও কেন? যারা ব্রয়লার খায়, তাদের মেন্যুতে লেখা উচিত ‘উভলিঙ্গ ব্রয়লার পোলাও’। কারণ ব্রয়লারের আসলে কোনো নির্দিষ্ট জেন্ডার আইডেন্টিটি নেই, তারা কেবল মাংসের পিণ্ড!  অবশ্য স্পিকার এই প্রস্তাবটি মূল বিল থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেন। পুরান ঢাকায় শোকের ছায়া ও বাবুর্চিদের প্রতিক্রিয়া সংসদে এই বিল পাসের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পরই পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁ পাড়া নাজিরাবাজার, চকবাজার ও লালবাগে এক থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বংশ পরম্পরায় যারা মোরগ পোলাও রান্না করে আসছেন, তারা এই সিদ্ধান্তকে ‘ঢাকাইয়া সংস্কৃতির ওপর ডিজিটাল আগ্রাসন’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। নাজিরাবাজারের বিখ্যাত ‘মখমল বাবুর্চি’ তার ডেকচির সামনে বসে অশ্রুসজল চোখে সাংবাদিকদের বলেন, আমাগো দাদাজান রাঁধতো মোরগ পোলাও, আব্বাজান রাঁধতো মোরগ পোলাও। আমরাও রাইন্ধা আইলাম। এহন কাস্টমার আইসা যদি কয়, এই মিয়া এক প্লেট মুরগি পোলাও দাও, তাইলে কি ইজ্জত থাকে কন? মুরগি তো রাঁধে মায়েরা, ঘরে। আমরা তো উস্তাদ মানুষ, আমরা রাঁধমু মোরগ। আইনে পাস হইছে বইলা কি আর হাঁড়ির সোয়াদ বদলাইয়া যাইব? পুরান ঢাকার রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির পক্ষ থেকে আগামী রোববার আধাবেলা ‘ডেকচি ধর্মঘট’-এর ডাক দেওয়া হয়েছে। তারা হুমকি দিয়েছেন, নাম পরিবর্তন না করলে তারা পোলাওয়ে আলু বোখারা দেওয়া বন্ধ করে দেবেন। ছাপাখানা ও অর্থনীতির ওপর আকস্মিক প্রভাব এই আইন পাসের সাথে সাথে বাংলাবাজার ও ফকিরাপুলের ছাপাখানাগুলোতে রাতারাতি ব্যস্ততা বেড়ে গেছে। কারণ, দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা লাখ লাখ রেস্তোরাঁর মেন্যু কার্ড, নিয়ন সাইন এবং বিলবোর্ড পরিবর্তন করতে হবে। ফকিরাপুলের এক প্রেস মালিক হাসিমুখে বলেন, করোনার পর আমাদের ব্যবসা একদম বসে গিয়েছিল। এই ‘মুরগি পোলাও’ আইন আমাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। কাল রাত থেকে অন্তত দশ হাজার রেস্তোরাঁর মেন্যু কার্ড নতুন করে ছাপানোর অর্ডার পেয়েছি। তবে বানানের ব্যাপারে সবাই খুব সতর্ক। কেউ কেউ ‘মুরগী’ দীর্ঘ-ঈ কার দিয়ে ছাপাতে চাইলেও, আমরা বাংলা একাডেমির নিয়ম মেনে হ্রস্ব-ই কার দিয়ে ‘মুরগি পোলাও’ ছাপিয়ে দিচ্ছি। অর্থনীতিবিদরা ধারণা করছেন, শুধুমাত্র মেন্যু কার্ড ও সাইনবোর্ড পরিবর্তনের এই হিড়িকের কারণে দেশের জিডিপিতে অন্তত ০.০১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল ও কূটনৈতিক রেশ নাম পরিবর্তনের এই ঘটনা শুধু দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও এর ঢেউ লেগেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক ফিনান্সিয়াল সামিটে বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে যে নৈশভোজের আয়োজন করার কথা ছিল, তার মেন্যু রাতারাতি পরিবর্তন করা হয়েছে। সেখানে আগে ইংরেজিতে লেখা ছিল 'Traditional Morog Polao (Rooster Pilaf)', যা পরিবর্তন করে 'Empowered Hen Pilaf (মুরগি পোলাও) - A Tribute to Gender Equality in Culinary Arts' করা হয়েছে। জাতিসংঘের ‘উইমেন এন্টারপ্রেনিউরশিপ অ্যান্ড পোল্ট্রি রাইটস’ (WEPR) নামক একটি অঙ্গসংগঠন বাংলাদেশের এই পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করেছে। তারা এক টুইট বার্তায় জানিয়েছে, বাংলাদেশ দেখিয়ে দিল কীভাবে রান্নাঘর থেকে জেন্ডার সমতার শুরু হতে পারে। পিতৃতান্ত্রিক রন্ধনশৈলী ভেঙে মুরগিদের তাদের প্রাপ্য সম্মান বুঝিয়ে দেওয়ার এই উদ্যোগ গোটা বিশ্বের জন্য অনুকরণীয়। তবে আন্তর্জাতিক রন্ধন সমালোচক গর্ডন রামজে এক সাক্ষাৎকারে বিরক্তি প্রকাশ করে বলেছেন, ইট ডাজন্ট ম্যাটার হোয়াট ইউ কল ইট! মোরগ অর মুরগি! জাস্ট ডোন্ট ওভারকুক দ্য ড্যাম রাইস! বিকল্প প্রস্তাবনা: জেন্ডার-নিউট্রাল ‘পাখি পোলাও’ সংসদে বিল পাসের আগে ভাষাতাত্ত্বিকদের একটি প্যানেল ডাকা হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্ত্ব বিভাগের এক প্রবীণ অধ্যাপক প্রস্তাব করেছিলেন যে, মোরগ বা মুরগি কোনোটিতেই না গিয়ে মূল ফারসি শব্দের আক্ষরিক অনুবাদ করা হোক। তিনি যুক্তি দেখান, ফারসি ‘মুর্গ’ মানে যেকোনো পাখি। তাই জেন্ডার-নিউট্রাল অবস্থান নিতে চাইলে এর নাম দেওয়া উচিত ‘পাখি পোলাও’ বা ‘পক্ষী পোলাও’। তবে রেস্তোরাঁ মালিকরা এই প্রস্তাব তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তাদের যুক্তি ছিল, ‘পাখি পোলাও’ নাম শুনলে ভোক্তারা ভাবতে পারেন যে তাদের কাক, শালিখ বা চড়ুই পাখি দিয়ে পোলাও খাওয়ানো হচ্ছে, যা ব্যবসায় মারাত্মক ধস নামাবে। এরপরই ‘মুরগি পোলাও’ নামটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় বিলটি পাস হওয়ার পর থেকে ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) এবং ইউটিউবে রীতিমতো মিমের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। নেটিজেনরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। একদল হ্যাশট্যাগ চালু করেছেন #JusticeForMurgi এবং #MurgiPolaoEra নামে। তারা বলছেন, এতোদিন ধরে মুরগি খেয়ে মোরগের নাম জপার মতো হিপোক্রেসি আর হতে পারে না। আরেকদল, যারা মূলত ভোজনরসিক, তারা #SaveMorogPolao নামে ক্যাম্পেইন চালাচ্ছেন। তাদের একজন লিখেছেন, ভাই, আমি যখন রোস্টের আস্ত রানটা ছিঁড়ে মুখে দিই, তখন আমার ফিলিং আসে যে আমি কোনো নবাব বা রাজা-বাদশাহ! মোরগ পোলাও নামটার মধ্যে একটা রাজকীয় ভাইব আছে। ‘মুরগি পোলাও’ শুনলে মনে হয় জ্বর আসার পর আম্মা জোর করে পথ্য খাওয়াচ্ছে। আমার ভাইব নষ্ট করার অধিকার সরকারের নেই! কিছু কিছু টিকটকার এরই মধ্যে ‘মুরগি পোলাও ডান্স’ নামে নতুন ট্রেন্ড চালু করেছেন, যা মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ পাচ্ছে। নতুন যুগের সূচনা সব বিতর্ক, হাসি-ঠাট্টা আর আক্ষেপের পর একটি বিষয় পরিষ্কার—বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে একটি আইকনিক যুগের অবসান ঘটল। আজ থেকে বিয়েবাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে কোনো মুরব্বি আর চিৎকার করে বলবেন না, এই বাবুর্চি, বরযাত্রীর টেবিলে জলদি মোরগ পোলাও দে! বরং তাকে বলতে হবে, বরযাত্রীদের জন্য মুরগি পোলাও পরিবেশন করা হোক। হয়তো উচ্চারণে একটু হোঁচট খেতে হবে প্রথম প্রথম। হয়তো নস্টালজিয়ায় ভুগে অনেকেই দীর্ঘশ্বাস ফেলবেন। কিন্তু ইতিহাসের সত্য এটাই যে, অবশেষে বাংলার হাঁড়িগুলোতে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেই মুরগি তার জীবন উৎসর্গ করে পোলাওকে সুস্বাদু করছে, মেন্যু কার্ডে আজ তারই নাম খোদিত হলো। একটি নিছক খাদ্য কীভাবে রাজনীতি, অর্থনীতি, ভাষা ও লিঙ্গসমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে, ‘মুরগি পোলাও বিল-২০২৬’ তার এক ধ্রুপদী উদাহরণ হয়ে থাকবে। এখন কেবল দেখার অপেক্ষা, আগামী ঈদে শাশুড়িরা তাদের জামাইদের পাতে ‘আস্ত মুরগি’ তুলে দেওয়ার সময় কতটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
বিদ্যুৎকেন্দ্র পাহারা দিতে ১০ হাজার হারিকেন কেনার আবেদন
এশিয়া পোস্ট স্যাটায়ার / বিদ্যুৎকেন্দ্র পাহারা দিতে ১০ হাজার হারিকেন কেনার আবেদন
বিদ্যুতের ‘মিসড কল’ যুগ বর্তমান বাংলাদেশে বিদ্যুতের অবস্থা অনেকটা পাড়া-মহল্লার সেইসব বখাটে ছেলেদের মতো, যারা গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে সুন্দরী মেয়েদের দেখে শিস বাজিয়েই ভোঁ দৌড় দেয়। ধরতে গেলে পাওয়া যায় না, কিন্তু অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। অথবা বলা যায়, বিদ্যুৎ এখন অনেকটা সেলুলার নেটওয়ার্কের ‘মিসড কল’-এর মতো। প্রচণ্ড গরমে আপনি যখন ঘামতে ঘামতে একেবারে সিদ্ধ আলু হয়ে গেছেন, তখন হঠাৎ সিলিং ফ্যানটা ‘ক্যাঁচ’ করে এক ইঞ্চি ঘুরে আবার থেমে যায়। আপনি আনন্দে লাফিয়ে উঠে চিৎকার করেন, ‘কারেন্ট আসছে!’ কিন্তু পরক্ষণেই বোঝেন, ওটা আসলে কারেন্ট আসেনি, আপনাকে শুধু একটা ‘মিসড কল’ দিয়ে গেল। জানান দিয়ে গেল যে, ‘আমি আছি, কিন্তু তোমার জন্য নেই!’ বিদ্যুত সংকটের সার্বিক অবস্থা নিয়ে ‘যেদিন কম সেদিন সাত ঘণ্টা, কোনো দিন আবার ১০ ঘণ্টারও বেশি হয় লোডশেডিং’ শিরোনামে একটি সংবাদও প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। সারা দেশে এখন এই ‘মিসড কল’ বিদ্যুতের কারণে চুরি ব্যাপক বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে অনেকে বিক্ষোভ করার জন্য হারিকেন বা হাতপাখা হাতে নিয়ে প্ল্যাকার্ড বানানোর প্র্যাকটিস করছে। যেহেতু বিদ্যুৎ নেই, তাই ডিজিটাল ব্যানারের বদলে এখন কাঠকয়লা দিয়ে পুরোনো ক্যালেন্ডারের উল্টো পিঠে স্লোগান লেখা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ অবশ্য এই গরমে জনগণকে পুদিনা পাতার শরবত খাওয়া এবং অন্ধকারে বসে রোমান্টিক ‘ক্যান্ডেল লাইট ডিনার’ করার পরামর্শ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু জনগণ রোমান্টিসিজমের চেয়ে ফ্যানের বাতাসকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়ায় পরিস্থিতি বেশ ঘোলাটে। বন্ধ বিদ্যুৎকেন্দ্র ও চুরির শঙ্কা জ্বালানি সংকটের কারণে দেশে কয়লা, গ্যাস বা তেলের চরম অভাব। ফলে দিনে দিনে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক মেগা, আল্ট্রা-সুপার-ক্রিটিক্যাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। হাজার হাজার কোটি টাকার টারবাইন, বয়লার আর জেনারেটরগুলো এখন নিস্তব্ধ। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দেখলেই বোঝা যাচ্ছে এগুলোতে এখন ‘কারেন্ট’ নামক কোনো এক জাদুকরি বস্তুর উৎপাদন হচ্ছে না। কিন্তু সমস্যা দেখা দিয়েছে অন্য জায়গায়। এই বিশালাকার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পাহারা দেওয়া এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেহেতু কেন্দ্রগুলোতে বিদ্যুৎ নেই, তাই রাতে এগুলো রীতিমতো ভূতুড়ে আকার ধারণ করে। আর এই অন্ধকারের সুযোগ নিতে পারে এলাকার পেশাদার চোরেরা। তারা অন্ধকারে এসে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরের তামার তার, জেনারেটরের নাট-বল্টু, এমনকি অফিসের বাথরুমের বদনা পর্যন্ত খুলে নিয়ে যেতে পারে। গত সপ্তাহে এক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ডিরেক্টরের শখের রিভলভিং চেয়ার চুরি হয়ে গেছে। চোরেরা এতটাই বেপরোয়া যে, অন্ধকারে ভারী ট্রান্সফরমার চুরি করতে না পেরে তারা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরেই ‘স্ক্র্যাপ মেটাল’ বা ভাঙাড়ির দোকান খুলে বসতে পারে! এজন্য এখনই ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। ঘুটঘুটে অন্ধকারে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অবস্থা বেগতিক দেখে ‘জাতীয় বিদ্যুৎ উধাও বোর্ড’-এর প্রধান কার্যালয়ে এক জরুরি বৈঠকের ডাক দেওয়া হলো। সময় রাত ৮টা। স্বভাবতই বোর্ডে কোনো বিদ্যুৎ নেই। আইপিএসের ব্যাটারিও দুদিন আগে চার্জের অভাবে মারা গেছে। বোর্ডের মহাপরিচালক (ডিজি) ‘বজ্রকণ্ঠ’ বড়ুয়া সাহেব অন্ধকারে বসে কয়েক হাজার কোটি টাকার একটি টেন্ডারের ফাইল দিয়ে নিজেকে বাতাস করছেন। তার সামনে বসে আছেন প্রধান প্রকৌশলী ‘মি. শর্টসার্কিট’ এবং প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা জনাব ‘অন্ধকার আলী’ আলী। পুরো রুম আলোকিত হয়ে আছে ডিজি সাহেবের পুরোনো নকিয়া ফোনের নিভু নিভু ফ্ল্যাশলাইটে। ডিজি বজ্রকণ্ঠ বড়ুয়া ঘাম মুছতে মুছতে বললেন, ‘ভদ্রমহোদয়গণ, আমাদের অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ। জ্বালানি নেই, তাই কারেন্টও নেই। কিন্তু চোর তো আর বসে নেই! তারা তো ২৪ ঘণ্টা ডিউটি করছে। গতকাল খবর পেলাম, আমাদের একটি প্ল্যান্টের মেইন গেটটাই নাকি চুরি হয়ে গেছে! আপনারা করছেনটা কী?’ নিরাপত্তা কর্মকর্তা অন্ধকার আলী কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, ‘স্যার, গেট চুরি যাওয়ার সময় তো ঘুটঘুটে অন্ধকার ছিল। আমাদের সিকিউরিটি গার্ডরা চোখে কিছুই দেখতে পায়নি। তারা ভেবেছিল বাতাসে হয়তো গেট নড়ছে।’ ডিজি সাহেব রেগে গিয়ে বললেন, ‘তাহলে সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো কী করছিল? ওগুলো কি শুধু শুধু লাগিয়েছি?’ প্রধান প্রকৌশলী শর্টসার্কিট গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, ‘স্যার, সিসিটিভি তো কারেন্টে চলে। কারেন্ট না থাকলে ওগুলো তো প্লাস্টিকের খেলনা ছাড়া আর কিছুই নয়। আর আইপিএস দিয়ে চালাবো, সেই আইপিএস চার্জ দেওয়ার জন্যও তো কারেন্ট লাগে!’ ডিজি হতাশ হয়ে বললেন, ‘তাহলে উপায়? আমরা কি চোরদের হাতে সব ছেড়ে দেব? আমাদের এই বিলিয়ন ডলারের সম্পদ রক্ষার কি কোনো উপায় নেই?’ ‘দ্য হারিকেন থিওরি’ রুমের ভেতর পিনপতন নীরবতা। শুধু মশার ভনভন শব্দ আর ডিজি সাহেবের ফাইলে থাপ্পড় দিয়ে মশা মারার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। হঠাৎ নিরাপত্তা কর্মকর্তা অন্ধকার আলী লাফিয়ে উঠলেন। ‘স্যার! পেয়েছি! ইউরেকা!’ ডিজি চমকে উঠে বললেন, ‘কী পেয়েছেন? কারেন্ট?’ ‘না স্যার, কারেন্ট না, বুদ্ধি পেয়েছি! আমাদের শেকড়ে ফিরে যেতে হবে। আমাদের ঐতিহ্যের কাছে ফিরে যেতে হবে। সিসিটিভি, ফ্লাডলাইট, আইপিএস—এসব পশ্চিমা প্রযুক্তি আমাদের ধোঁকা দিয়েছে। আমাদের এখন একমাত্র ভরসা... হ্যারিকেন!’ ডিজি এবং প্রধান প্রকৌশলী দুজনেই অবাক হয়ে তাকালেন। অন্ধকার আলী ব্যাখ্যা করতে শুরু করলেন, ‘স্যার, ভেবে দেখুন। হারিকেনের কোনো ব্যাটারি লাগে না, কোনো চার্জ লাগে না। শুধু একটু কেরোসিন আর একটা দেশলাই! আমাদের গার্ডদের হাতে যদি একটা করে হারিকেন ধরিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে তারা পুরো বিদ্যুৎকেন্দ্র চষে বেড়াতে পারবে। হারিকেনের লালচে আলোতে গার্ডদের দেখলে চোরেরা দূর থেকে ভাববে, বিদ্যুৎকেন্দ্রে জিন-ভূত ঘুরে বেড়াচ্ছে। একে তো আলো, তার ওপর ভূতের ভয়—টু ইন ওয়ান সিকিউরিটি! চোর ধারেকাছেও ঘেঁষবে না!’ প্রধান প্রকৌশলীও সায় দিলেন, ‘স্যার, আইডিয়াটা কিন্তু মাস্টারপিস। তাছাড়া হারিকেন কিনলে পরিবেশবাদীরাও খুশি হবে। জিরো কার্বন... মানে, জিরো ইলেকট্রিসিটি ফুটপ্রিন্ট!’ ডিজি বজ্রকণ্ঠ বড়ুয়ার মুখে অন্ধকারেও এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। তিনি টেবিল চাপড়ে বললেন, ‘ব্রিলিয়ান্ট! কাল সকালেই মন্ত্রণালয়ের কাছে আমরা ১০ হাজার হারিকেন কেনার প্রস্তাব পাঠাবো। সঙ্গে আনুষঙ্গিক খরচের একটা স্পেশাল বাজেটও তৈরি করুন।’ মন্ত্রণালয়ের কাছে পেশ করা ঐতিহাসিক আবেদনপত্র পরদিন সকালে ড্রাফটম্যানকে দিয়ে চরম গোপনীয়তায় একটি প্রস্তাবনা তৈরি করা হলো। প্রস্তাবনার শিরোনাম দেওয়া হলো: ‘জ্বালানি সংকটে উৎপাদন বন্ধ থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রসমূহের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ‘স্মার্ট’ হারিকেন ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জামাদি ক্রয় প্রকল্প।’ মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর লেখা চিঠির বয়ান ছিল নিম্নরূপ: ‘মহোদয়, সবিনয় নিবেদন এই যে, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে আমাদের অতি আদরের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বর্তমানে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কিন্তু এই সুযোগে একদল দেশি ও আন্তর্জাতিক চোর সিন্ডিকেট আমাদের মূল্যবান টারবাইন, তার, এবং অফিসের আসবাবপত্র চুরির মহোৎসবে মেতে উঠেছে। যেহেতু বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ নেই, সেহেতু আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা (যেমন—সিসিটিভি, সেন্সর অ্যালার্ম) সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায়, জাতীয় সম্পদ রক্ষার্থে আমাদের আদি, অকৃত্রিম ও নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি ‘হারিকেন’-এর শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। অতএব, দেশের সকল বন্ধ বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাহারাদারদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ১০,০০০ (দশ হাজার) পিস ‘স্মার্ট ও ট্যাকটিক্যাল হারিকেন’ এবং এর আনুষঙ্গিক সরঞ্জামাদি ক্রয়ের জন্য নিম্নলিখিত বাজেট অনুমোদনের বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।’ হারিকেন প্রকল্পের বাজেট সরকারি বাজেট বলে কথা, সাধারণ হারিকেন তো আর সাধারণ দামে কেনা যাবে না! তাই বাজেটের ফর্দটা বেশ যত্ন নিয়েই বানানো হলো: ১. ১০,০০০ পিস ‘স্মার্ট’ ট্যাকটিক্যাল হারিকেন (আমদানিকৃত): প্রতিটি হারিকেনের মূল্য ধরা হলো ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। যৌক্তিকতা: এগুলো সাধারণ হারিকেন নয়। এগুলো হবে ‘অ্যারোডাইনামিক’ ডিজাইনের, যাতে কালবৈশাখী ঝড়েও আলো না নেভে। এর কাচ হবে বুলেটপ্রুফ (যদি চোর ঢিল মারে)। তাছাড়া এই হারিকেনে একটি ‘ইউএসবি পোর্ট’ সংযুক্ত থাকবে। (যদিও বিদ্যুৎ নেই, তবুও ২০৪০ সালের মধ্যে কখনো যদি কারেন্ট আসে, তবে এই পোর্ট দিয়ে মোবাইল চার্জ করা যাবে—এই হলো ভবিষ্যৎদর্শী পরিকল্পনা)। ২. ভিআইপি অ্যাভিয়েশন-গ্রেড কেরোসিন (১ লাখ লিটার): প্রতি লিটার কেরোসিনের মূল্য ধরা হলো ২ হাজার টাকা। যৌক্তিকতা: সাধারণ কেরোসিনে ধোঁয়া বেশি হয়, যা গার্ডদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তাই বিমানের জ্বালানি সমতুল্য পরিশোধিত ‘পারফিউমড কেরোসিন’ আমদানি করা হবে, যা পুড়লে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গোলাপ ও রজনীগন্ধার সুবাস ছড়িয়ে পড়বে। চোরেরা চুরি করতে এসে সুগন্ধে ঘুমিয়ে পড়বে। ৩. সুইডিশ সেফটি দেশলাই (৫০ হাজার বাক্স): প্রতি বক্স ৫০০০ টাকা। যৌক্তিকতা: সাধারণ দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালাতে গিয়ে বারুদ ছিটকে গার্ডদের আঙুল পুড়ে যেতে পারে। তাই সরাসরি সুইডেন থেকে উন্নত প্রযুক্তির ঘর্ষণ-প্রতিরোধী দেশলাই আনা হবে। ৪. হারিকেনের সলতে বা ফিতা (১ হাজার কিলোমিটার): যৌক্তিকতা: হারিকেন নিরবচ্ছিন্নভাবে জ্বালাতে উন্নতমানের ফায়ারপ্রুফ সলতে লাগবে, যা সহজে পুড়বে না (কীভাবে পুড়বে না, তা বিজ্ঞানের এক অজানা রহস্য)। ৫. বিদেশি প্রশিক্ষণ (ক্যাপাসিটি বিল্ডিং): বাজেট: ৫০ কোটি টাকা। যৌক্তিকতা: হারিকেন একটি জটিল ম্যানুয়াল যন্ত্র। এর সলতে কতটুকু উঁচুতে রাখলে সঠিক আলো পাওয়া যায়, কাচ কালো হয়ে গেলে কীভাবে খবরের কাগজ দিয়ে মুছতে হয় এবং দেশলাইয়ের কাঠি একবারে কীভাবে জ্বালাতে হয়—এসব বিষয়ে উচ্চতর জ্ঞান লাভের জন্য ১০০ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার একটি প্রতিনিধি দল সুইজারল্যান্ড, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে ১৫ দিনের ‘হ্যারিকেন ম্যানেজমেন্ট কোর্স’-এ অংশগ্রহণ করবেন। ৬. ১০ হাজার ‘হ্যারিকেন অপারেটর’ নিয়োগ: পাহারাদারদের পক্ষে একা হারিকেন ধরা এবং লাঠি ঘোরানো সম্ভব নয়। তাই তাদের পেছনে শুধু হারিকেন ধরে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য ১০ হাজার নতুন লোকবল নিয়োগ দেওয়া হবে। এক চিলতে আলোর অপেক্ষা মন্ত্রণালয়ে এই ফাইল যাওয়ার পর কী হলো, তা এখনও এক রহস্য। তবে শোনা যাচ্ছে, খোদ মন্ত্রণালয়ের বাতিই নাকি গত তিন দিন ধরে বন্ধ। ফ্যান না ঘোরায় সচিব সাহেব নিজেই হাতপাখা দিয়ে বাতাস খাচ্ছেন আর অন্ধকারে ফাইল খুঁজছেন। এদিকে মিসড কল দিয়ে যাওয়া বিদ্যুতের অপেক্ষায় পুরো জাতি অন্ধকারে বসেই ঘামতে থাকুক। কারণ, কথায় আছে না—অন্ধকারই তো আলোর সত্যিকারের কদর বোঝায়! শুধু এই কদর বুঝতে গিয়ে যে জনগণের পিঠের চামড়া গরমে পুড়ে আর মশার কামড়ে ফুলে একাকার হয়ে যাচ্ছে, সেদিকে তাকানোর সময় আপাতত কারো নেই। সবাই এখন হারিকেন প্রকল্পের টেন্ডার বাগানোর স্বপ্নে বিভোর।
‘জ্যান্ত কবর না দিতে’ বাংলাদেশিদের নিয়ে নেতানিয়াহুর সংবাদ সম্মেলন
এশিয়া পোস্ট স্যাটায়ার / ‘জ্যান্ত কবর না দিতে’ বাংলাদেশিদের নিয়ে নেতানিয়াহুর সংবাদ সম্মেলন
তেল আবিবের মাটির ২০০ ফুট নিচে এক অতিগোপন বাংকারে আজ এক অভাবনীয় সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হলো। তবে মজার ব্যাপার হলো, এই সংবাদ সম্মেলনে সিএনএন, বিবিসি, রয়টার্স বা আলজাজিরার কোনো নামিদামি সাংবাদিককে ডাকা হয়নি। বরং এটি বিশেষভাবে লাইভ স্ট্রিম করা হয়েছে বাংলাদেশের কিছু ভুঁইফোড় নিউজ পোর্টাল, ফেসবুক পেজের অ্যাডমিন এবং ইউটিউব কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের উদ্দেশ্যে। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত এবং দৃশ্যত চরম হতাশ অবস্থায় ডায়াসে এসে দাঁড়ালেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার চোখের নিচে কালি, হাতে একগাদা স্ক্রিনশট। স্ক্রিনশটগুলোর বেশিরভাগই লাল, হলুদ আর নিয়ন রঙের বিশাল ফন্টে লেখা— ‘এইমাত্র পাওয়া: নেতানিয়াহুর শেষ বিদায়! কাঁপছে ইসরায়েল! মাটির নিচে তলিয়ে গেল তেল আবিব!’ গলা পরিষ্কার করে, অনেকটা কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে নেতানিয়াহু তার ‘মানবিক আবেদন’ শুরু করলেন: ‘সুপ্রিয় বাংলাদেশি কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, ফেসবুক পেজের অ্যাডমিন, এবং ‘ডুম ডুম’ ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দিয়ে খবর পড়া ভাইয়েরা... আপনাদের কাছে আমার করজোড়ে বিনীত অনুরোধ, দয়া করে আমাকে মাফ করে দিন! আমাকে অন্তত জ্যান্ত কবর দেবেন না ভাই! বিশ্বাস করুন, আমরা মাঠে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ করছি ঠিকই, কিন্তু আপনাদের খবরের টাইটেল দেখে আমার নিজের দেশের মানুষ যতটা ভয় পাচ্ছে, ইরানের আসল মিসাইলেও ততটা ভয় পাচ্ছে না। আপনারা আমাকে দিনে ঠিক কতবার মারেন? সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি এক চ্যানেলে আমি ব্রেইন স্ট্রোক করেছি। দুপুরে লাঞ্চ করতে বসে দেখি আরেক পেজে আমার জানাজা পড়ানো হচ্ছে! আর রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে দেখি, আমি নাকি ভয়ে মোজতবা খামেনির পা জড়িয়ে ধরে কাঁদছি! ভাই, মোজতবা খামেনি নিজেই নাকি ঠিকমতো হাঁটতে পারে না, আমি তার পা ধরব কী করে? আমার সেনাবাহিনীর (IDF) মোরাল এখন একদম তলানিতে। কাল সকালে আমার এক শীর্ষ সেনাপতি এসে ইস্তফাপত্র দিল। আমি বললাম, ‘কেন? যুদ্ধ তো সবে শুরু!’ সে মোবাইল বের করে বাংলাদেশের একটা ফেসবুক পেজের ভিডিও দেখিয়ে বলল, ‘স্যার, আপনি কি খবর দেখেন না? ইরানের কাছে নাকি এমন এক ড্রোন আছে, যেটা আগে মানুষের নাম ধরে ডাকে, তারপর দরজা খুললেই গুলি করে দেয়!  এইমাত্র বাংলাদেশের ওই ভাইয়াটা কনফার্ম করল!’ ভাইয়েরা আমার, আপনারা ইরানের বীরত্ব দেখাতে গিয়ে তাদের রীতিমতো ‘অ্যাভেঞ্জার্স’ বা ‘সুপারম্যান’ বানিয়ে দিয়েছেন! আপনাদের বানানো খবর দেখে স্বয়ং ইরানের সুপ্রিম লিডার খামেনি সাহেবও হয়তো আপনাদের চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করে বসে আছেন এটা জানার জন্য যে, তার নিজের কাছে আর কী কী জাদুকরী অস্ত্র আছে! আপনাদের এক ভিডিওতে দেখলাম, ইরান নাকি এমন এক মিসাইল ছুড়েছে যেটা মাঝপথে চা খাওয়ার জন্য ব্রেক নেয়, আমাদের রাডারকে বোকা বানায়, তারপর আবার উড়ে এসে টার্গেটে আঘাত হানে! ভাই, এসব তো হলিউডের সায়েন্স ফিকশন সিনেমাতেও দেখায় না! আমার বিশ্বখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা 'মোসাদ' (Mossad) এখন চরম ডিপ্রেশনে ভুগছে। মোসাদের প্রধান কাল আমাকে ফোন করে হাউমাউ করে কেঁদে দিলেন। বললেন, ‘স্যার, আমরা এত বিলিয়ন ডলার খরচ করে ইন্টেলিজেন্স বের করি, আর বাংলাদেশের ওই ইউটিউব চ্যানেলগুলো আমাদের চেয়ে দশ দিন আগে ভবিষ্যদ্বাণী করে দিচ্ছে! কালকের ভিডিওতে তারা বলল, ইসরায়েল নাকি আজ রাতেই আটলান্টিক মহাসাগরে ডুবে যাবে! স্যার, আমরা কি সাঁতার কাটা শিখব?’ ইসরায়েলের সাধারণ মানুষ এখন সাইরেন শুনলে আর বাংকারে যায় না, তারা আগে বাংলাদেশের ফেসবুক পেজ রিফ্রেশ করে দেখে যে তারা কি এখনও বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে! কাল রাতে আমার স্ত্রী সারা নেতানিয়াহু আমাকে ঘুম থেকে ধাক্কা দিয়ে তুলে বলছে, ‘ওঠো! জলদি ওঠো! বাংলাদেশের ওই চ্যানেল তো ব্রেকিং নিউজ দিল, আমরা নাকি সাবমেরিনে করে আমেরিকায় পালাচ্ছি! তুমি এখনো বিছানায় ঘুমাচ্ছ কেন? জলদি সুটকেস গোছাও!’ আমি আপনাদের কাছে অত্যন্ত বিনীতভাবে মানবিক আবেদন জানাচ্ছি। যুদ্ধ আমরা ময়দানে লড়ে নেব, কিন্তু দয়া করে আপনাদের এডিটিং প্যানেলে বসে আমাদের ধ্বংস করবেন না। আপনাদের এই ‘থাম্বনেইল-সন্ত্রাস’ আর বিকট শব্দের সাসপেন্স মিউজিক বন্ধ করুন। আপনারা চাইলে আমি আপনাদের সব কয়টা চ্যানেলে স্পন্সরশিপ দেব, আমার পুরো মন্ত্রিসভাকে দিয়ে আপনাদের চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করাব, বেল আইকনেও চাপ দিয়ে রাখব, ভিডিওতে লাইক-কমেন্ট-শেয়ার সবই করব... তাও দয়া করে আমাদের একটু শান্তিতে থাকতে দিন। বক্তব্য শেষে নেতানিয়াহু পকেট থেকে টিস্যু বের করে চোখ মুছতে লাগলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে এক পাশ থেকে তার এক নিরাপত্তা উপদেষ্টা হন্তদন্ত হয়ে বাংকারে প্রবেশ করলেন। হাতে আইপ্যাড। কাঁপতে কাঁপতে তিনি বললেন, ‘‘স্যার! সর্বনাশ হয়ে গেছে! বাংলাদেশের একটা পেজ মাত্র ব্রেকিং নিউজ দিয়ে লাইভে এসেছে— তারা বলছে, আপনি নাকি ভয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এখন গাজায় ত্রাণ বিলি করতে চলে গেছেন!’ নেতানিয়াহু আর কিছু বলতে পারলেন না। শূন্য দৃষ্টিতে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর কপালে হাত দিয়ে মাইক্রোফোনের ওপর মাথা ঠুকে জ্ঞান হারালেন। সংবাদ সম্মেলন এখানেই সমাপ্ত! [সতর্কীকরণ: নেতানিয়াহুকে নিয়ে লিখিত উপরোক্ত বিষয়টি স্যাটায়ার বা রম্য লেখা। পাঠকের বিনোদনের উদ্দেশে এশিয়া পোস্ট স্যাটায়ারটি লিখেছে। বিষয়টি বাস্তব ভেবে পাঠককে বিভ্রান্ত না হতে সতর্ক করা হলো।]